টার্কিশ কোলাজ – ৪

ইস্তিকলাল অ্যাভেনিউ-এ দুপুর সাড়ে বারোটার সময় যা ভিড় দেখলাম, তা সত্যি সত্যি-ই কলকাতার পুজোর ভিড়ের সঙ্গে তুলনীয় – অন্তত ম্যাডক্স স্ক্যোয়ারে ষষ্ঠীর সন্ধ্যাবেলায় এত লোক দেখতাম নব্বইয়ের শেষে। এখন কি অবস্থা অবশ্য জানি না, কলকাতার পুজো শেষ দেখেছি ২০০১-এ। কাগজে এখন যেরকম ঘড়ি ধরে বিন্দুতে সিন্ধু মাপার প্রয়াস চালায়, দেখে গতিক সুবিধের ঠেকে না। সে যাই হোক, জনস্রোতে ভাসার একটা মজা আছে, স্পেশ্যালি আপনার হাতে যদি সময়-ই সময় আর উদ্দেশ্য বলে সত্যিই কিছু না থেকে থাকে। প্রথমত, এগিয়ে চলার জন্য আপনাকে বিন্দুমাত্র এফার্ট দিতে হবে না, মনে হবে যেন এসকেলাটরে চড়ে এগিয়ে চলেছেন। দ্বিতীয়ত, এই যে কত মুলুকের লোক, কাঁহা কাঁহা থেকে এসে কত কিসিমের জিনিসপত্র কিনে পেপার ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, আমেরিকান ট্রাভেলারের সুটকেস ভর্তি করে নিয়ে চলেছে, এ দেখেও  মজা। তো সেই নির্মল আনন্দ-ই নিচ্ছিলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কিছুক্ষণ পর কানের কাছে বড় প্যাঁ-পোঁ আরম্ভ হতে খেয়াল হল  সেই লাল রঙের কাঠের তৈরি ট্রামগুলোর একটা এসে অনুরোধ করছে ট্রাম লাইন ছেড়ে দেওয়ার জন্য। তুর্কী সরকার এই বিশাল রাস্তাটায় সমস্ত রকম যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন, রয়েছে কেবল হিস্টোরিক্যাল চার্ম বাড়ানোর অভিপ্রায়ে এই ট্রামগুলো। সারা রাস্তাই যেহেতু জনগণের কব্জায়, বিনীত অনুরোধ না করে উপায় কি? জীবনানন্দ স্মরণে বালিগঞ্জের মুখটায় অন্তত এরকম কিছু করলে মন্দ হয় না; অবশ্য শেষবার গড়িয়াহাটে দেখলাম ট্রাম কন্ডাকটর বিস্তর মুখ খারাপ করে করে হেদিয়ে গেলেন, দুদিক থেকে লোকজন রাস্তা পেরিয়েই চলেছেন; লাল সবুজ হল, সবুজ হলুদ হল, হলুদ আবার লাল হল, কন্ডাকটরের মুখের বেগুনী আভা আর নেভে না।

istanbul_Tram

তো রাস্তা ছেড়ে যেই সাইড হয়েছি, দেখি চোখের সামনে ম্যাজেস্টিক সিনেমা। বেজায় চমকালাম, না ম্যাজেস্টিক এর ‘পপার’ সুলভ দুর্দশা দেখে নয়, স্পষ্ট চোখের সামনে দেখলাম “with English subtitles in Present Tense”। প্রেজেন্ট টেন্সেই সাবটাইটল কেন লেখা হল, এ প্রশ্ন কাকে না ভাবাবে বলুন? দেন অ্যান্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, এ সিনেমা দেখতেই হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সিনেমা শুরু হতে কুড়ি মিনিট। এদিকে আরো দশ মিনিট দূরেই রয়েছে ‘রবিন্সন ক্রুসো’ বইয়ের দোকান, ইস্তানবুলের বিখ্যাত ইন্ডি বুকস্টোর। আর্থিক অনটনে উঠে যাব যাব করছে, সেখানে গিয়ে দু’একটা বই না কিনলেই নয়। তো দৌড়ে দৌড়ে গেলাম, হাঁফাতে হাঁফাতে ঝপাঝপ Buket Uzuner এর ‘Istanbullu’ আর Barrie Kerper সম্পাদিত “Istanbul :The Collected Traveler” ঝোলায় ফেলে, “গেঁড়ে বসে থাকুন, ওঠার নামটিও করবেন না” বলে সহমর্মিতা প্রকাশ করে ফির সে দে দৌড়। ম্যাজেস্টিকের সেলোন নাম্বার চারে ঢুকে খেয়াল পড়ল প্রেজেন্ট টেন্সে সাবটাইটল দেখার আশায় লাঞ্চ অবধি করতে ভুলে গেছি। চোখ গোলগোল করে দেখছি (একেই চশমাটা সিয়াটল এয়ারপোর্টে হারিয়ে এসেছি), পনের মিনিটের মাথায় ফের টের পেলাম কেউ কথা রাখে না। সিনেমার প্রোটাগনিস্ট আগে ফরচুন-টেলারের কাজ করেছে কিনা, এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যান দিচ্ছে আর তলায় সাবটাইটল ভেসে উঠছে, এবং দিব্যি পাস্ট টেন্স দেখা যাচ্ছে। রাগের চোটে তালটাই কেটে গেল, সিনেমাটা যদিও দিব্যি বানিয়েছে। শেষ হল, ভাবছি কাউন্টারে গিয়ে অভিযোগ জানাব কিনা, এমন সময় দেখি পর্দায় ফুটে উঠল  ‘Simdiki Zaman‘ অর্থাৎ কিনা চলচ্চিত্রের নাম, আর তার নিচে ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে ‘Present Tense’, বুঝলেন তো? হুঁ, গুগল ট্রান্সলেটর-ও কনফার্ম করেছে।

পরমা তখনো প্রথমা হয়নি – বৈশাখী সংখ্যায় বিস্তর অচেনা খাবারদাবারের রেসিপি দিয়ে ভারী ভালো লাগিয়ে তুলেছিল। নামগুলোও জবরদস্ত –  মাছের ডুবলি, ডিমের তুরফি, চামলাই শাকপাক, সরষে শাপলা, কমলালেবুর কালিয়া, করলার তিতরায়তা, সাপটার টক, শর্করপারা, টিকরশাহি ইত্যাদি ইত্যাদি।  অনেক কিছুই খাইনি এর মধ্যে, ইনক্লুডিং শর্করপারা। পরে অবশ্য খেয়াল পড়ল উত্তর ভারতেও একটা স্ন্যাক আছে, শক্কর পারা নামে। কয়েকদিন আগে  ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়ায় একটা অতি সুস্বাদু ডেসার্ট দিল,  চমৎকার মুচমুচে পেস্ট্রি তার ওপরে আবার মুক্তোর দানার মতন এক ফোঁটা অ্যামন্ড।  খাওয়ার পর দেখি মেনুতে লেখা  Şekerpare! ব্যাস আর যায় কোথায়, দু’য়ে দু’য়ে চার। এই হল গিয়ে গ্লোবালাইজেশন, পরমার সনাতনী বাংলা খাবার না খেতে পেয়ে হা-হুতাশ করছিলেন, পেয়ে গেলেন ইস্তানবুলে।

sekerpare

পরের দিনই আবার ছোটো ছোটো রসের মিষ্টি খেয়ে ভারি পান্তুয়ার কথা মনে পড়ছিল, তফাতের মধ্যে এটায় চিনচিনে মিষ্টি ভাবটা নেই আর পেস্তার গুঁড়ো দিয়ে সুন্দর ডেকরেট করা। যতবার বাজখাঁই ‘কেমালপাশা ত্যাতলাজি’ নামটা দেখছি ততবারই মনে হচ্ছে যাই বলো বাপু, একটা নাড়ির টান দিব্যি টের পাচ্ছি। শেষে আর থাকতে না পেরে বিস্তর রিসার্চ করে, পেজ কে পেজ গুগল ট্রান্সলেট করে দেখি ওমা, আমাদের গুলাবজামুন-ই হল গিয়ে তুরস্কের ‘কেমালপাশা ত্যাতলাজি’। বলছিলাম কি, হুঁ হুঁ।

kemalpasa

তবে কিনা,  কবি বলেছেন “যত হাসি তত কান্না, বলে গেছেন রাম শন্না “(আই মীন রাম শর্মা)। গ্রসারি স্টোরে গিয়ে দেখি সারি সারি ‘Peynir’। এটিমোলজিস্টকে আর পায় কে! লাফাতে লাফাতে নিয়ে এলাম, তখনো মাছ কিনে ওঠা হয়নি। কাঁহাতক আর মাংস খাওয়া যায়, পনির মশালাই হোক রাত্রে। মশলা-টশলা রেডি, কিউব কিউব করে কাটাও হয়ে গেছে; এবার তেল গরম করে ভাজার পালা। যেই না গরম তেলে ঢালা, কি বলব, চোখের সামনে মাখনের সমুদ্র তৈরি হল। আমি আবার একটু ভেবড়ে গিয়ে তার মধ্যেই ইন্টারনেট খুলে বসলাম, বং মম থেকে তরলা দালাল, সবাই দিব্যি গেলে বলেছেন পনির ভাজাটা আবশ্যক। ততক্ষণে অবশ্য পনির নয়, পেইনির তার লিকুইডিফায়েড ফর্মে কড়াই উপছে রীতিমতন ধাওয়া করতে শুরু করেছে। ঝাড়ু হাতে সম্মুখসমরে যাওয়ার আগে আরো একটা আপ্তবাক্য মনে পড়ল, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী!

(স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s