টার্কিশ কোলাজ – ৩

Traffic

ইস্তানবুল ২০২০-র অলিম্পিকস আয়োজন করার ভার পায়নি। আমারই যা একটু খারাপ লাগছিল (সদ্য-আগতর আদিখ্যেতা?), তুর্কী বন্ধু এবং ছাত্রছাত্রীরা দেখলাম বিশেষ বিচলিত নন। অলিম্পিকস আয়োজন করে এথেন্স তথা গ্রীস এবং ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে দক্ষিণ আফ্রিকার যা হাঁড়ির হাল হয়েছে, সেসব দেখেশুনেই বোধহয় লোকজন অস্ফুটে বলছেন “বাঁচা গেল, বাবা।” ব্রেজিলেও ২০১৪ এবং ২০১৬ নিয়ে যা তুলকালাম চলছে, এখানকার লোকজন ভাবছেন ফাঁড়া কাটল। গতকাল রাস্তায় বেরিয়ে মনে হল, সিরিয়ার যুদ্ধ-টোকিওর বেটার ইনফ্রাস্ট্রাকচার – তাকসিম স্কোয়্যারে বিক্ষোভ এসব কোনোটাই ইস্তানবুলের অলিম্পিকসের দায়িত্ব না পাওয়ার কারণ নয়। অলিম্পিকস কমিটির সদস্যরা মোস্ট প্রব্যাবলি হিসেব করে দেখেছেন স্টেডিয়ামে ভরবে না। হাঁ হাঁ করে ওঠার আগে কারণটা বলতে দিন প্লীজ! আমার ইউনিভার্সিটি থেকে তাকসিম স্কোয়ারের (শহরের প্রাণকেন্দ্র) দূরত্ব বোধহয় চল্লিশ কিলোমিটারের আশেপাশে হবে। দিন ভালো থাকলে, অল্পস্বল্প ট্রাফিক জ্যাম পেয়েও মোটামুটি ৪৫-৫০ মিনিটে চলে যাওয়া যায়। গতকাল ছিল শনিবার এবং লাগল ঝাড়া আড়াই ঘন্টা। ইস্তানবুলের ট্র্যাফিক জ্যামকে টেক্কা দিতে পারে এরকম শহর বোধহয় পৃথিবীতে নেই, অ্যাপারেন্টলি জাকার্তা ছাড়া। এবং যতটা সময় লাগতে পারে তার থেকে ঘন্টা খানেক, ঘন্টা দেড়েক দেরি হওয়াটা রীতিমতন দস্তুর আর কি! এবার ভাবুন, উসেইন বোল্ট ১০০ মিটার দৌড়তে চলেছেন (যদিও ঘোষণা করেছেন যে ২০১৬-র সোনার মেডেলগুলো পেয়েই জুতোজোড়া তুলে রাখবেন), এরকম বিশ্বের বিস্ময় চাক্ষুষ করতে কতক্ষণ সময় আছে আপনার কাছে? সাড়ে ন’সেকন্ড মতন। ইস্তানবুলে বসে সাড়ে ন’সেকন্ড, ইয়ার্কি? গাড়ির টায়ার এক ইঞ্চি গড়াতে লেগে যাচ্ছে সাড়ে ন’মিনিট।  ১৭ তারিখে  রিয়াল মাদ্রিদ আসছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির গ্রুপ ম্যাচে  এখানকার সেরা দল গালাতাসারায়ের সঙ্গে খেলতে। এক তুর্কী ছাত্র দেখলাম হিসেব কষছে “অ্যাকাউন্টিং এর পরীক্ষা শেষ বিকেল সাড়ে চারটে। তারপর দৌড়ে হস্টেলে ফিরে গাড়ি নিয়ে (হ্যাঁ, হস্টেলে থাকলেও গাড়ি আছে, অবাক হবেন না) বেরোতে বেরোতে ৪-৪৫। মেন গেটে চেকফেক করে বেরোতে বেরোতে তার মানে প্রায় পাঁচটা। ইরি ত্-তারা, ম্যাচ তো রাত নটা পঁয়তাল্লিশে শুরু, হল না বোধহয়।” বন্ধুবান্ধবরা দেখলাম আশ্বাস দিচ্ছে আর দূরে গিয়ে বেজায় মাথা নাড়ছে। আরে ম্যাচ দেখবি তো পরীক্ষ দিস না। চল্লিশ কিলোমিটার যাওয়ার জন্য নাকি বাবু হাতে রেখেছেন মাত্র চার ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট, বেয়াকুব আর কাকে বলে!

পাকিস্তানি ছাত্রী মারিয়া লন্ডন ফেরত, এবং এথনিক ফুড বেজায় ভালোবাসে। অন্য পাকিস্তানীদের মতন সারাক্ষণ বিরিয়ানি মিস করে না, তার প্রাণ কাঁদে থাই এবং চাইনিজ খাদ্যবস্তুর জন্য। দু’দিন আগে ক্যাম্পাসের সেরা রেস্তোরাঁয় বেজায় লেকচার দিয়ে এসেছে অথেনটিক থাই কারিতে কতটা নারকেল দুধ পড়বে সেই নিয়ে। এমন ঝড়ের বেগে ইংলিশে ধাতানি দিয়েছে যে টার্কিশ ভাষী শেফের জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে শোনা ছাড়া কোনো অপশন ছিল না। আজকে দেখি কন্যার মুখে একগাল হাসি, বলল “সেদিনকার ব্লিৎসক্রিগে কাজ দিয়েছে! আজকে যা চমৎকার চাইনীজ বানিয়েছে না, আহা! প্লীজ, খেয়ে আসুন।” প্রতিবেশী দেশের চাইনীজ প্রেম নিয়ে একটু সন্দেহ সব সময়েই আছে আমার, তবে কিনা সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। গেলাম, অর্ডার করলাম এবং অর্ডার করার মিনিট চল্লিশ পরে খানা হাতে পেলাম। চল্লিশ মিনিট ধরে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর থেকেও সাবকন্টিনেন্টাল টাচে বানানো চাইনীজের লোভে  আর ওয়েটারদের ব্যাস্তসমস্ত করে তুলিনি। প্রথম গ্রাস, এবং জিভ পুড়ে ছারখার। না, গরমে নয়, নুনে। শেফ ভদ্রলোক নিজে মনে হয় কোনোদিন চাইনীজ খাননি, এমনকি রান্না করতে করতে চাখেন-ও নি। সুতরাং, সয়া সসে যে কতটা নুন থাকতে পারে সে নিয়ে তাঁর সিমপ্লি কোনো আইডিয়া নেই, শুধু জানেন যে চাইনীজ খাবারে সয়া সস দিতে হয়। তাই সয়া সসের ঝোলে নুডলস চুবিয়েও তিনি ভরপুর নুন দিয়েছেন, মানে হাতে করে কাঁচা কাঁচা নুন। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, এর একটা টার্কিশ উপসংহার আছে। টার্কিশ কাবাব ইস্কান্দার (এর গল্প অন্য  আরেকদিন) খাওয়ার সময় এরা কাবাবের ওপর বাটার সস ঢেলে দিয়ে যায়। বাটার সস মানে গলানো বাটার, আপনার কোলেস্টরল লেভেল যাই হোক না কেন, ওই বাটার সস ছাড়া ইস্কান্দার খাওয়া মানে একটা ব্ল্যাসফেমি করে বসলেন। এই তুর্কী কুক দেশপ্রেমের জন্যই হোক, বা ইম্প্রোভাইজ করতে গিয়েই হোক সেই বাটার সস এখানেও ঢেলেছেন। আর বাটার সসের দুটোই ইনগ্রেডিয়েন্ট – বাটার এবং নুন, অতএব য পলায়তি স জীবতি। পালাতে পালাতে মনে পড়ল, মারিয়া এই খেয়েই বেজায় আহ্লাদিত – তার মানে পাকিস্তানি চাইনীজের স্বাদ-ও সমতুল্য। চাইনীজ প্রিমিয়ারের কানে একবার তুললে হয়, এই যে পাকিস্তান পাকিস্তান করে হেদিয়ে যাচ্ছেন, একবার-ও আপনাদের দেশের খাবারটা ওদেশে গিয়ে চেখেছেন? আমার দৃঢ় ধারণা পাকিস্তানী চাইনীজ যদি তুর্কী চাইনীজের পঞ্চাশ শতাংশ-ও নিয়ে আসতে পারে, পরের পঞ্চাশ বছরের জন্য চীন পাকিস্তানকে রসদ যোগানো বন্ধ করে দেবে। মুশকিল একটাই, এসব আইডিয়া দেওয়ার জন্য দিল্লী যাওয়ার টাইম নেই, আর এ বিদেশে ক্রিকেট-বলিউড-বিরিয়ানি নিয়ে আলোচনার জন্য আছে তো ওই পাকিস্তানীরাই। সুতরাং,  নেক্সট কিছু বছরের জন্য সাধু সাবধান; ইস্তানবুল হোক কি লাহোর, চাইনীজ খেতে চাইলে পকেটে গোটা আলু নিয়ে ঘুরবেন। নুনকে জব্দ করতে আলু হল যাকে বলে ব্রহ্মাস্ত্র; এক গ্রাস করে চাইনীজ খাবেন আর এক কামড় করে কাঁচা আলু। Bon appétit!

(স্থিরচিত্র উৎস – http://www.trekearth.com/gallery/Middle_East/Turkey/Marmara/Istanbul/photo118730.htm & Google Images)

Advertisements

2 thoughts on “টার্কিশ কোলাজ – ৩

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s