কখনো বিষ্ণু দে, কখনো যামিনী রায়

jb1

তর্কটা কেন বিষ্ণু দে আর যামিনী রায়কে নিয়েই চলত সে প্রশ্নটা বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে; আর এক্স্যাক্টলি কি নিয়ে তর্ক সে নিয়েও কখনোসখনো মাথা ঘামিয়ে ফেলতাম । গৌরীপ্রসন্নকে এরকম বালখিল্য প্রশ্ন নিশ্চয় কেউ করেননি, তাই উত্তর পাওয়ার আশা নেই বলেই ধরে নিয়েছিলাম । আশার আলো হঠাৎ-ই দেখালেন অশোক মিত্র।  ওনার ‘আপিলা চাপিলা’ পড়েই প্রথম জানতে পারি যে যামিনী রায় এবং তাঁর শিল্পকলার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন  বিষ্ণু দে । এতটাই যে প্রায় উপযাচক হয়ে ঘনিষ্ঠদের কাছে যামিনী রায়ের ছবি বেচার-ও চেষ্টা করতেন। এখানে একটু বলে রাখা ভালো যে  বিষ্ণু দে  কে নিয়ে  অল্প কিছু স্মৃতিচারণ পাওয়া যাবে সমর সেনের ‘বাবুবৃত্তান্ত’ বইটিতেও। অশোক মিত্রের লেখা পড়ে বেশ উৎসাহী হয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারি  বিষ্ণু দে  ‘যামিনী রায়’ নামে একটি বইও লিখেছেন। কিছুদিন হল বইটি হাতে এসেছিল, অবশেষে পড়া শেষ হল। আর পড়েই মনে হল হতেই হত, বিষ্ণু দের সঙ্গে যামিনী রায়ের নাম যাবে না তো যাবে কার? কেন সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

টিপিক্যাল জীবনীগ্রন্থ বলতে যা বুঝি, ‘যামিনী রায়’ তার ধারেকাছ দিয়ে যায় না। বিষ্ণু দের গদ্যসাহিত্য বা প্রবন্ধসাহিত্য আমি বিশেষ পড়িনি, কিন্তু বিংশ শতকের অন্যতম বাঙ্গালী কবির কাছে পাঠকের প্রত্যাশা বেশী থাকারই কথা। বিষ্ণু দে হতাশ করেন নি; শুকনো তথ্য দিয়ে যেমন বোঝাই করেন নি এ বই তেমনই শুধু লঘু রচনা দিয়েও কাজ সেরে ফেলেন নি। ভক্তের উচ্ছ্বাস চোখে নিশ্চয় পড়ে কিন্তু সেখানে পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট। বইয়ের অনেক কটি প্রবন্ধেই (হ্যাঁ, অনেক কটি প্রবন্ধ একসঙ্গে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন-আলেখ্যর রূপ দিয়েছে)   খুব চমৎকার ভাবে এই ব্যাপারটি ধরা পড়েছে তবে তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ‘যামিনী রায় ও শিল্পবিচার’। পরিচয় পত্রিকায় অশোক মিত্র যামিনী রায়ের শিল্পকলা নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিষ্ণু দে সেটির সমালোচনা করেন এই লেখাটিতে। যামিনী রায় অঙ্কিত পোর্ট্রেটসমূহ নিয়ে অশোক মিত্র বিস্তারিত আলোচনা করলেও, ওনার আঁকা ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে বিশেষ রা কাড়েননি; খানিকটা সমালোচনার সুরেই বরং বলেছেন “এ ল্যান্ডস্কেপে ঝড়জল নেই, অগ্নিদগ্ধ দিন, এমনকি দিগন্তবিস্তৃত মাঠ-ও নেই।” প্রত্যুত্তরে বিষ্ণু দে যেভাবে যামিনী রায়ের আঁকা ল্যান্ডস্কেপের লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছেন, তা প্রকৃত ভক্তের পক্ষেই সম্ভব। যামিনী রায় নিজেই তাঁর এই কাজগুলোকে বিশেষ মূল্য দেন নি, স্বভাবতই সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে লম্বা টানা চোখের বাইরেও তাঁর প্রতিভা আরো কত অসামান্য দৃশ্যকে ক্যানভাসবন্দী করেছে। কিন্তু ফ্যানবয়রা সাধারণ মানুষ নন, আর তাই বিষ্ণু  দে-র কলম জানাচ্ছে, “আমি অন্তত কিছুতেই ভুলতে পারি না সংখ্যায় শতাধিক সেইসব বহির্দৃশ্যচিত্র – বাঁকুড়ার দিগন্তবিস্তৃত ঊষর মাঠ, সাঁওতাল-দেশের পাথর-মাটির ঢেউ, ধানক্ষেতে লাঙ্গল চাষী, থৈথৈ বাদল-জলে মেয়েদের বীজরোপণ, রৌদ্রে ঝকঝকে বৃক্ষছায়াঘন মাঠপথবাড়ি, আলোছায়ায় প্রতীক্ষারত বস্তির ছবি, একাধিক অসুস্থ কলকাতার বিষণ্ণ বাড়িতে বাড়িতে ঘেঁষাঘেঁষি গলি; বাগবাজারের গঙ্গায় বোঝাই নৌকা, টিনের শেড আর মেঘবিদ্যুতের ঘনঘটা বা আলোর দীপ্তি, টলোমলো জলধারা, নৌকায় পার্থিব কিন্তু অসীমে উধাও রহস্যময় জলরাশি, কাশীপুরের দোতলা বাড়ি, বেলেতোড়ের বাংলো বা কুঠি, পাহাড় রেললাইনে স্টেশনের দুরন্ত বাঁক, দক্ষিণেশ্বরের বটগাছ, সুস্থ শহরের আদর্শ বীথি ও বাসাবাড়ি – কত বলা যায়।”  আবার সার্থক শিল্প-সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করেছেন কিভাবে দেশী ঘরানায় বিদেশী পুরাণের রূপদানের সমস্যা থেকে যামিনী রায় তৈরী করেন তাঁর বাইবল সিরিজ; জানিয়েছেন কিভাবে যামিনী রায়ের পরের দিকের কাজে ধরা পড়েছে এক অভূতপূর্ব  বর্ণদ্যুতি, যার অনেকটা প্রেরণা এসেছে বাইজান্টীয় মোজেইকের কাজ থেকে।

কিন্তু বইয়ের কথা বলা এ পোস্টের মূল উদ্দেশ্য নয়, ফিরে যাই মূল আলোচনায়। একটা সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, গৌরীপ্রসন্নর লেখায় দু’জনের এক লাইনে উল্লেখ নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু বিষ্ণু দে কে লেখা যামিনী রায়ের চিঠিগুলো দেখলে সে সম্ভাবনার বাইরে গিয়েও কিছু ভাবা সম্ভব। চিঠিগুলি পড়লে মনে হয় যে বিষ্ণু দে যামিনী রায়ের একাধারে স্নেহভাজন, শ্রদ্ধাস্পদ ও বন্ধু। বিষ্ণু দে কে তিনি বাঁকুড়ায় নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতে চেয়েছেন, চিঠিতে ডিটেইলড ইন্সট্রাকশনস দেওয়া – কোন এনকোয়ারি অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, বি-এন-আর রেলওয়ের গাড়ী কটায় ছাড়বে, টিকিটের দাম কত ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সঙ্গে এটাও লিখেছেন “আপনি অসুবিধার কথা লিখিয়াছেন, আপনি তো জানেন আপনাদের জন্য আমার কোনো অসুবিধা, অসুবিধাই মনে হয় না।” বাঁকুড়া বেড়াতে গিয়ে বিষ্ণু দে যামিনী রায়ের বাড়ির কাছেই এক জঙ্গলে বেড়াতে যেতে চান; সেই জঙ্গলেই যামিনী রায়ের পুত্র জীমূত বন্য জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হা্রিয়েছিলেন। এক স্নেহাস্পদকে হারানোর যন্ত্রণা থেকে আরেক স্নেহাস্পদকে বারণ করার আকুতিটুকু র‍্যান্ডম পাঠকের কানেও নিতান্ত করুণভাবেই বাজে। আবার বিষ্ণু দে কলকাতায় যামিনী রায়ের ছবি বিক্রির ব্যবস্থা করলে একটু যেন কুন্ঠিত ভাবেই বহু ধন্যবাদজজ্ঞাপন করেছেন। সাংসারিক চিঠির-ও কমতি নেই – কখনো জানাচ্ছেন বিষ্ণু দে’র পরিবারের জন্য বাঁকুড়ার গামছা আর বেডকভার পাঠাচ্ছেন, কখনো বা আবার স্থানীয় কোনো ছেলেকে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তির জন্য তদ্বির করছেন। আর ছবি আঁকা? তা নিয়েও চিঠি লিখেছেন বৈকি! সাতচল্লিশের অগস্ট মাসের এক চিঠিতে (যামিনী রায়ের তখন ষাট বছর বয়স, আর বিষ্ণু দে’র আটত্রিশ) খানিকটা হতাশার সুরে বলেছেন তৎকালীন শিল্পধারার সঙ্গে নিজের কাজকে মিলিয়ে উঠতে পারছেন না অথচ তিনি এটাও বিশ্বাস করতে চান না যে শুধু তাঁর কাজটাই প্রকৃত কাজ। বাহান্ন সালের আরেক চিঠিতে জানিয়েছেন ছবির মাধ্যমে যুগের চিন্তাকে বোঝার প্রচেষ্টা, ভিন্ন ধর্ম পন্থাকে জানার আগ্রহ এসবরেই প্রাথমিক অনুপ্রেরণা ছিল ক্যালকাটা আর্ট স্কুল (মূলত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। সময় সময় শুধুই তরুণ বন্ধুর লেখার প্রশংসা করে চিঠি – বিষ্ণু দের কবিতায় সংযম, প্রবন্ধে ভাষাসৃজনের  ক্ষমতা নিয়ে হার্দিক মতামত দিয়েছেন।

দুজনের মধ্যের এই বন্ডিং সত্যিই চমকপ্রদ। নিছক বন্ধুত্বের ট্যাগ এখানে লাগানো যায় না, শ্রদ্ধা বা স্নেহের পারস্পরিক টানের বাইরেও রয়ে যায় এক বিশেষ দায়বদ্ধতা, যেটা হয়ত দুই শিল্পীর মধ্যেই থাকা সম্ভব। কিন্তু যেকোনো দুই শিল্পীর মধ্যেই কি এরকম দায়বদ্ধতা দেখতে পাবেন? সম্ভবত না, একটা আত্মিক যোগাযোগ থাকাও নিতান্ত দরকার। গৌরীপ্রসন্ন-ও কি এরকমই কিছু ভেবেছিলেন? হয়তো, হয়তো!

(স্থিরচিত্র উৎস – ‘যামিনী রায়’ (বিষ্ণু দে, আশা প্রকাশনী)

Advertisements

5 thoughts on “কখনো বিষ্ণু দে, কখনো যামিনী রায়

  1. হ্যাঁ, সেরকম মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক; তার পরেও ভাবি যদি একটা কার্যকারণ সম্পর্ক থেকে যায়!

    Like

  2. ধন্যবাদ অমিতাভ 🙂 মান্না দে কি এখনো ইন্টারভিউ দিচ্ছেন? আর হয়তো উনিই বলতে পারবেন!

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s