শিক্ষক দিবসের গপ্পো

(বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – সর্বৈব সত্য কথা)

মধ্য কলকাতার কলেজটিতে পাস কোর্সের স্টুডেন্ট পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু সেই কারণেই যে পৃথুলা অধ্যক্ষার চলতে ফিরতে হাঁফ ধরে যাচ্ছে, এ কথা অবশ্য অধিকাংশ অধ্যাপক-অধ্যাপিকারাই মানতে চাইছেন না।  কিন্তু সেসব গুনগুনানি সবই আড়ালে, আবডালে। তার অবশ্য বিস্তর কারণ আছে, ভদ্রতার খাতির বাদ দিয়েও। মূল কারণ অবশ্যই ওই ‘অধ্যাপক’ তকমাটা ধরে রাখা। আদতে কিন্তু সত্তর শতাংশই পার্ট টাইম লেকচারার, মাস গেলে হাজার আটেক কি হাজার দশেকে এনারা কিভাবে দিন গুজরান করেন, সে একটা রহস্য বটে। মোটামুটি সবাই ইউনিভার্সিটির র‍্যাঙ্ক-হোল্ডার তাই বাপ-মা নিতান্তই ঘর থেকে খেদিয়ে দিতে পারছেন না, চক্ষুলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু এত লেখাপড়া শিখিয়ে শেষে এই, এর থেকে তো মাদুর পেতে টিউশনি করতে পারতিস এসব হৃদয়বিদারক আক্ষেপকে ট্যাকল করার জন্য হাতে রয়ে গেছে ওই ‘অধ্যাপক’ তকমা। অন্তত লোককে বলা যায়, কে আর তারপর খতিয়ে দেখতে যাচ্ছে ফুলটাইম না পার্টটাইম। এর মধ্যে আবার ‘ইতি গজ’ কে জোরদার করে তুলতে সরকার পার্মানেন্ট পার্ট-টাইম লেকচারারশিপের ব্যবস্থা করেছেন। অবাক হবেন না, মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর বুদ্ধি এখনো গজগজ করছে। তা সাতসকালে অধ্যক্ষার গজগজানি না শুনলে যে আট-হাজারি চাকরিটা চলে যাবে সে ভয় নেই। কিন্তু আশায় মরে চাষা, বছর দশেকের মধ্যে একটা ফুলটাইম পজিশন বেরোবে না কে বলতে পারে? তাই বসকে কার্বোহাইড্রেট কমানোর উপদেশ দিয়ে শহীদ কেই বা হতে চায়? কলেজে পড়ানোর স্বপ্ন দেখার মতন বোকামি এরা করে ফেলেছেন তো বটেই তবে কিনা মানুষ ঠেকে শেখে। তাই অধ্যক্ষার টনক নড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ছুটে গেছে এঁদের-ও (অবশ্য টাকী কি বর্ধমান  থেকে যারা ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করেন তাঁদের ঘুমটুমের বিলাসিতা দেখানোর স্কোপ নেই; একটাই সুবিধে, ভোরের প্রথম আর রাতের শেষ ট্রেনে যাতায়াত করতে হয় বলে বসে ঝিমনো যায়।)।

তো হপ্তাখানেক ধরে অনেক মাথার চুল ছেঁড়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উচ্চ-মাধ্যমিকে পাস করলেই ঢুকিয়ে দেওয়া হবে, মার্কস নো বার। কেউ কেউ একটু আপত্তি করছিলেন বটে তবে তাদেরকে এক ধমকেই থামানো গেছে – আরে এঞ্জিনীয়ারিং কলেজগুলোতেই যদি উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করলেই অ্যাডমিশন মেলে, জেনারেল কলেজ কি সাপের পাঁচ পা দেখেছে? এ খবরটা অনেকে আবার জানতেন না তাই ভাবী এঞ্জিনীয়াররা ঠিক কিরকম রাস্তাঘাট, বাড়ি বা সফটওয়্যার বানাবেন সেসব ভেবে একটু চমকে চমকে উঠছিলেন, কিন্তু একটা ভালো কাজে অত খুঁত না কাড়াই ভালো।

বাংলার ম্যাম আর উর্দুর ছোকরা অধ্যাপকের ওপর ভার পড়েছিল অ্যাডমিশন প্রসেসটা সামলানোর। সক্কাল সক্কাল বেশ কিছুক্ষণ মাছি তাড়ানোর পর দেখা গেল গুটগুট করে বেশ কিছু ছেলেপুলে আসছে এদিক পানে।অধিকাংশেরই বেশ কৃশকায়  চেহারা, সময় সময় এত ধুঁকতে ধুঁকতে আসে মনে হয় অ্যাডমিশনের বদলে খাবার দিলে কাজের কাজ হত। কলেজ মধ্য কলকাতাতে হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ শহরতলী (মানে সুন্দরবন) থেকে ট্রেনে করে আসে। এত কষ্টের কারণ একটাই, স্থানীয় দাদারা বলে দিয়েছেন যতই পার্টিলিস্টে নাম লেখাও, ভবিষ্যৎ-এ গ্রুপ ডি স্টাফের চাকরির জন্য একটা ডিগ্রী নিতান্তই দরকার। যাই হোক, বাংলা-উর্দু কম্বিনেশনে চমৎকার কাজ চলছিল, ভর্তির ফর্মে দমাদ্দম সিল মেরে ঢালাও অ্যাডমিশন। গোল বাধল আরেকটু দুপুরের দিকে যখন ইউনিয়নের দাদারা ভাতঘুম দিয়ে হেলতে দুলতে কলেজে ঢুকলেন। বাংলা ম্যামের সামান্য তন্দ্রা মতন আসছিল হঠাৎ চেঁচামেচি শুনে দেখেন জনা  তিন বেজায় মুশকো চেহারার লোক সোনার চেন পরে ধাঁধাঁ করে এদিক পানেই দৌড়ে আসছে। ভারী ভয় পেয়ে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন, উর্দুর অধ্যাপক আশ্বস্ত করলেন “ভয় নেই, ওরা ইউনিয়ন করে।” “বলেন কি? ছাত্র নাকি?” “হাসালেন ম্যাডাম, স্টুডেন্টস ইউনিয়নে আবার ছাত্র কোথায়?” ইতিমধ্যে তারা এসে মহা হুল্লোড় লাগিয়ে দিয়েছে “এসব কি ম্যাডাম, আপনারা তো কলেজের কোনো প্রেস্টিজ রাখলেন না।” বাংলা ম্যাম একটু কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন “কেন বলুন তো?” যে ষন্ডাটি সোনার চেনের সঙ্গে কানে একটা মাকড়িও পড়েছিল সে বলল “আরে ম্যাডাম, আমরা আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। তুমি বলুন, আপনিটাপনি নয়।” লিভাইস জিনসধারী অবশ্য সম্বোধন নিয়ে অত বিচলিত নয়, “আররে, ওসব রাখ। এনারা টিচার না চিটার? ইউনিয়নকে কেউ কিচ্ছু জানাল না, আমরা না এসে পড়লে তো আজ ভুষিমালে ভরিয়ে দিতেন।” উর্দুর তরুণ প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তৃতীয় দাদা শত্রুঘ্ন সিনহার ‘খামোশ’ স্টাইলে এমন হাত দেখালেন যে প্রতিবাদটা বেমালুম গিলে ফেলতে হল। কিন্তু বাংলার ম্যামকে দমানো অত সহজ নয়, এমনিতে ভয়টয় নিয্যস পান কিন্তু ঝগড়া একবার শুরু হয়ে গেলে অপরপক্ষের বুকে উঠে দাড়ি উপড়ে তবে শান্তি। “আপনারা থাকেন কোথায়? প্রিন্সিপাল তো নোটিশ পাঠিয়েছিলেন, জবাব দেন নি কেন? আপনারা মিছিল থেকে এদিকে তাকানোর ফুরসত পাবেন না আর দোষ শুধু আমাদের?” এত ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠবেন কেউ সেটা এক্সপেক্ট করেনি বোধহয়, সবাই  ব্যোমকে গেছে। প্রিন্সিপালের নোটিশ পাঠানোর খবরটা ডাহা ধাপ্পা কিন্তু এত কনভিকশন নিয়ে বলেছেন যে এরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। নিজেদের মধ্যে কি গুজুরগুজুর করে কেটে পড়ল, মাকড়িধারী যেতে যেতে খালি বলে গেল “ম্যাডাম, আপনি বলবেন না। আমরা আপনার থেকে অনেক ছোট।”

এর পরপরই ছেলেপুলের আসা বন্ধ হয়ে গেল। আরো ঘন্টাখানেক ওয়েট করে এরা উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন, আর ঠিক তক্ষুনি দেখা গেল বড় লীডার একটা বিশাল মিছিল নিয়ে আসছেন। পেছনে সাঙ্গোপাঙ্গ আর তাদেরও পেছনে বেশ কিছু অ্যাডমিশন প্রার্থী। লীডার এসে একটা চার্মিং হাসি (ইকোনমিক টাইমস যেমন রঘুরাম রাজনের হাসিকে ‘স্যোয়াভ’ বলে ঠিক সেরকমটি) উপহার দিয়ে বললেন “আপনারা আমাদের সাপোর্ট নিতে না চাইলে কি হবে আমরা কিন্তু সবসময়েই সাপোর্ট দিতে চাই। আফটার অল, কলেজের ভালো দেখাটাই তো আমাদের কাজ। নিন, এদের সবাইকে ভর্তি করে নিন।” ঘন্টাদেড়েক বাদে সব কাজ চুকিয়ে ওঠার সময় খেয়াল পড়ল উর্দুর অধ্যাপক বেপাত্তা। কলেজ গেট দিয়ে বেরনোর সময় বাংলা ম্যাম দেখেন ভদ্রলোক এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখ চুন করে সিগ্রেট খেয়ে চলেছেন। গলা খাঁকারি দিতে ভদ্রলোক তাকিয়ে একটু ম্লান হাসলেন। ইউনিয়ন নিয়ে এমনিতেই মাথা গরম হয়ে ছিল, তারমধ্যে ইনি লা-পতা হয়ে যাওয়ায় ম্যাম ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন, “আশ্চর্য লোক তো মশাই আপনি, আমাকে একা ফেলে রেখে এখানে এসে সিগ্রেট খাচ্ছেন?” “সরি, আসলে উপরি রোজগারটা মিস হয়ে গেল। তাই অল্প দুখী হয়ে পড়েছি।” বাংলার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে বললেন, “ইউনিয়নের ভোল পালটে গেছে দেখে একটু সন্দেহ হল। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, সবার থেকে টাকা নিয়ে খাতায় নাম লেখাচ্ছে। সেই নিয়ে প্রশ্ন করতেই ফিফটিন পারসেন্ট অফার করল !” অধ্যাপিকার বাক্যিহারা মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন “চিন্তা নেই, আপনাকেও ভুলে যায়নি। যাচ্ছিল আপনার কাছে, বলে দিলাম আরে ও মহা খাড়ুশ মহিলা, ওসব ফ্যাচাং-এ যেও না। যা করছ করো, আমি কিছু বলছি না।”

বাংলা ম্যাম কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে দৌড়লেন। আট হাজারীদের ইমোশনাল হলে চলবে না, বাস মিস করলেই চিত্তির।

Advertisements