বিপন্ন কাদিন

স্প্রিংকলার থেকে জল ছড়িয়ে পড়ার বিরামহীন শব্দ চুপটি করে থাকা ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধতাকেই আরো জোরদার করে তুলছে। সেমিস্টার শুরু হতে এখনো দিন পনের বাকি, তরুণ অধ্যাপক খেয়াল করলেন ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এও খুব কম অ্যাপার্টমেন্টেই  আলো জ্বলছে। ক্যাম্পাসের চওড়া পিচের রাস্তার দু’ধারে সার দিয়ে মৃদু  নিওনের আলো ভারী মায়াবী লাগছিল, জোর করেই নস্টালজিক হতে ইচ্ছে করছিল জে-এন-ইউ র দিনগুলোর কথা ভেবে। সম্বিত ফিরে এল অধ্যাপকজায়ার উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে, “এই, গন্ধটা পাচ্ছ?” গন্ধ একটা নাকে আসছিল বটে, রাস্তার পাশের লন থেকে কাটা ঘাসের গন্ধ। সে কথা বলাটা সমীচীন হবে না বোধ করে সেফ খেললেন, “কই না তো, কিসের গন্ধ?” “আহ,  কনসেন্ট্রেট করো। ভারতীয় মশলার গন্ধ পাচ্ছ না? কিরকম একটা হিং-বাটার গন্ধ।”  অধ্যাপকজায়ার ঘ্রাণশক্তি প্রখর সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই কিন্তু একবার ভাবনা হল খিদের চোটে নাক হ্যালুসিনেশনে ভুগছে না তো। ইস্তানবুলের ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছেছেন ঘন্টা দুয়েক হল; এয়ারপোর্টের খাবার পছন্দ না হওয়ায় প্ল্যান ছিল ক্যাম্পাস ক্যাফেটেরিয়াতে ডিনারটা সারার। এদিকে দু’জনেই বেমালুম ভুলে গেছেন যে সেদিনকে তুরস্কের ‘বিজয় দিবস’, একানব্বই বছর পুরনো তুর্কী ইতিহাস ভুলে যাওয়ার ফলশ্রুতি হতে চলেছে নিরম্বু উপবাস। নিরম্বুটা বাড়িয়ে বলা নয়, জলের রসদ-ও শেষ অথচ ক্যাম্পাসময় ক্যাফেটেরিয়া, গ্রসারি স্টোর, ডর্ম ডাইনিং হল বন্ধ। হিং-বাটার গন্ধ স্নায়ুমন্ডলীকে সত্যি সত্যি কতটা উত্তেজিত করে জানা নেই, তবে অধ্যাপকজায়া রীতিমতন হুমকি দেওয়ার ভঙ্গীতে কানে কানে বললেন “মিনিট দশেকের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না করলে আমি কিন্তু ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এর দোরে দোরে গিয়ে হামলা শুরু করব।” এহেন মরিয়া প্রস্তাবে পিলে চমকানোরই কথা, অধ্যাপক আরো ব্যাকুল হয়ে চারপাশে তাকাতে শুরু করলেন কোনো মধুসূদন দাদার দেখা পাওয়ার আশায়। মনে মনে ‘ত্রাহি  মধুসূদন’ বলেছেন আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা মিলল। মাথাভরতি উসকোখুসকো চুল, গালে এক মুখ দাড়ি দেখে স্পষ্টতই বোঝা গেল ইনি গবেষক ছাত্র। খাবার কোথায় পাওয়া যাবে শুনে অনেকক্ষণ মাথা চুলকে, দাড়িতে টান মেরে জানালেন “ইওর বেস্ট বেট উড বী…”, আধ মিনিটের সাসপেন্স, “হাঙ্গার”।

খিদের মুখে এহেন উত্তর শুনে অধ্যাপকঘরণী প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছিলেন, তাঁকে কোনোমতে সামলিয়ে অধ্যাপক কাষ্ঠ হেসে থ্যাঙ্কস জানিয়ে এবং মনে মনে মুন্ডপাত করতে করতে চললেন আধ মাইল ঠেঙ্গিয়ে মেন গেটের উদ্দেশ্যে – যদি দ্বাররক্ষকরা কোনো সহায়তা করতে পারেন। এর মধ্যে আলোকোজ্জ্বল মেন রাস্তা না ধরে শর্টকাট হবে এই আশায় একটা ঢালু জমি দিয়ে নামতে গিয়ে দু’জনেই প্রায় ‘জংলী’র শাম্মী কাপুর এবং সায়রা বানুর স্টাইলে গড়াগড়ি খেলেন। স্বভাবতই সায়রা বানুর মতনই অধ্যাপকজায়াও এমন হিংস্র চোখে তাকালেন যে হার্টবীট মিস হওয়ার জোগাড়। আরো মিনিট দশেক উর্দ্ধশ্বাসে পা চালিয়ে মেন গেটে পৌঁছনো গেল। মুশলিক এই যে দ্বাররক্ষক তরুণ তুর্কীরা কেউই ইংরেজীটা বোঝেন না। না মানে না-ই, ইয়েস-নো-ফাদার-মাদার অবধি না। বহু ইংরেজী-তুর্কী বোবা বাকযুদ্ধের মাঝে একজন হঠাৎ প্রায় আর্কিমিডিসের মতনই ইউরেকা বলে নেচে উঠলেন। অধ্যাপক এবং তাঁর সহধর্মিণী দুজনেই বেজায় চমকেছেন, মিরাকল তাহলে সত্যিই ঘটে। একটু পরে বোঝা গেল আর্কিমিডিস ‘ওয়াটার’ শব্দটা বুঝতে পেরেছেন এবং তাই সানন্দে দুজনকেই অভ্যর্থনা জানিয়েছেন ঘরে কোণে রাখা ওয়াটারকুলার থেকে জল নিয়ে খেতে। কিন্তু তার বেশী আর কিছুতেই এগনো যায় না; হাত মুঠো করে মুখের দিকে আনার সঙ্কেতেও তাঁরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। পেটে কয়েকবার হাত বুলিয়ে দেখানোয় ঘোর সন্দেহের চোখে তাকালেন; অধ্যাপকজায়া বিস্তর রেগেছিলেন, তার মধ্যেও ফিসফিস করে বললেন “ওগো, ওসব দেখিও না। যদি ভাবে পেটে ব্যাথা করছে?” তারপর কি ভেবে বললেন “সরো, আমি একটু টার্কিশ জানি; চেষ্টা করে দেখি।” অধ্যাপকের হাঁ হয়ে যাওয়া মুখ আরো হাঁ করিয়ে দিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন “কাদিন, কাদিন”। সেই শুনে সবাই কিরকম লক্ষ্মী ছেলের মতন ঘাড় নাড়তে লাগল। কাদিন শুনেই এক সুদর্শন তরুণ (বলা বাহুল্য যে এনারা সবাই সুদর্শন) খান দুয়েক ফোন থেকে চার-পাঁচ বার কাদের ডায়াল করে ফেললেন। অতঃপর হিরো এলেন, স্লো মোশনে, বাইকে চড়ে। এবং শুধোলেন “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?” এর থেকেও দরদী ভাষা মানবজাতির ইতিহাসে কিছু আছে? যাই হোক, ইনি জানালেন সবই বন্ধ কেবল ডমিনোজের পিজ্জা পাওয়া যেতে পারে। কমিউনিস্ট আপব্রিঙ্গিং থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক বিলক্ষণ জানতেন পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে শুধু আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল গুলো, হাতেনাতে থিয়োরী প্রুভ হচ্ছে দেখে বেজায় খুশী হচ্ছিলেন তবে মনে পড়ল আগে কাদিন রহস্যের উদ্ধার করা দরকার। “কি বললে বলো তো? এ তো ম্যাজিক।” “না তো কি? তোমার ভরসায় থাকলেই হয়েছিল আর কি?” গোঁফে তা দিয়ে অধ্যাপক প্রত্যুত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, মসৃণ চামড়ার ওপর দিয়ে হাত পিছলে যাওয়ায় খেয়াল পড়ল ম্যানেজমেন্ট স্কুলে পড়ানোর হেতু বহুদিনের সঙ্গীকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করে এসেছেন। সেই দুঃখেই বোধহয় কড়া উত্তরের বদলে সারেন্ডার ঘোষণা করে বললেন “সে কথা আর কবে অস্বীকার করলুম? তুমিই রক্ষক। কিন্তু মানেটা কি?”
-“আমি নারী।”
-“অ্যাঁ! শুধু নারী?”

-“আবার কি? সরাসরি বললাম ‘ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস’ “।

-“ড্যামসেল তো বুঝলুম। কিন্তু ইন ডিস্ট্রেস?”
-“এ ড্যামসেলের এত দুর্দিন আসেনি যে ইন ডিস্ট্রেস উচ্চারণ করে বোঝাতে হবে। ওর জন্য ভ্রূভঙ্গীমাই যথেষ্ট।”

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমোহ্!

পুনশ্চ – দাড়িওয়ালা তরুণ তুর্কীকে বৃথাই গালমন্দ করা, আজকেই জানা গেল ক্যাম্পাসের এক প্রান্তে অবস্থিত ফ্যাকাল্টি ক্লাব কাম রেস্তোরাঁটির নাম ‘হাঙ্গার’, অনেক রাত অবধি খোলা থাকে!