ঈশ্বর সৃষ্টির সন্ধানে

মানুষ এবং ঈশ্বর –  স্রষ্টা কে, সৃষ্টিই বা কে? চরম প্রশ্ন, পরম প্রশ্ন। নাস্তিক এবং আস্তিকরা যুগযুগ ধরে বিতর্কে  জড়িয়ে পড়েও কূলকিনারা করতে পারেন নি। একটা মধ্যপন্থা বেছে নিয়ে (পালিভাষায় যাকে বলে ‘মজঝিম পটিপদা’) তাই কিছুজন আবার নিজেদের বলতে শুরু করলেন ‘অ্যাগনোস্টিক’ (চেনাশোনা বাঙ্গালী সেলিব্রিটিদের মধ্যে অমর্ত্য সেন একজন) । আমি বহুদিন ধরে দুটো হাইপথেসিস নিয়েই ভাবনাচিন্তা করছি, এবং স্বভাবতই স্রষ্টা মানুষ এহেন হাইপথেসিস নিয়ে বেশী উত্তেজিত বোধ করেছি। যদি এমনটা হয়েই থাকে, তবে কিভাবে হল? কি কারণ? কন্সপিরেসি থিয়োরী শোনা যায়, প্লেন টালমাটাল হলেই অক্সিজেন মাস্ক পরে ফেলতে হয় যাতে চরম বিপদে শেষের মুহূর্তে মাথা বেশি কাজ করতে না পারে। এ ক্ষেত্রেও কারণটা কি খানিক তাই? নশ্বর জীবনের যাবতীয় দুঃখকষ্ট যাতে কিছুটা সুদিং আবহাওয়ায় সয়ে নেওয়া যায়? ঐশ্বরিক জগতের মোহ থাকল ওই অক্সিজেনের কাজ দিতে! নাকি, আমার আপনার মতন মানুষ সেট অফ রুলস তৈরী করলে বাকিরা নাও মানতে পারে, তাই এক ‘সুপার’ (থুড়ি সুপ্রীম) পাওয়ারের আগমন? প্রশ্নগুলো চমৎকার, ভাবনাচিন্তার অনেক খোরাক দ্যায়। সেই ভাবনাচিন্তা থেকেই লিখেছিলাম এই সিরিজ ‘ঈশ্বর সৃষ্টির সন্ধানে’ (সুন্দর একটা কাকতালীয় সংযোগ সৃষ্টি করে বেরিয়েওছিল ‘সৃষ্টি’ পত্রিকায় (২০০৯)। অফ কোর্স,  পিওর লজিক দিয়ে দেখলে অন্য হাইপথেসিসটাও সত্যিই হতে পারে। কোনটা সত্যি সেটা যাবজ্জীবনে জানা সম্ভব নয়, তাই যত দিন যাচ্ছে আমার স্ট্যান্ডটাও অ্যাগনোস্টিকদের সঙ্গেই কনভারজ করছে।

iss1

iss2

iss3

Advertisements

বেবেক

আমার ঘরের ঠিক পাশেই বেবেকের ঘর, তাতে বড় বড় করে লেখা “শ…শ…শ – বেবেক ঘুমোচ্ছে”। একমাস ধরে  আমি মন দিয়ে সে কথা মেনে চললেও বেবেকের দিক থেকে কোনো রেসিপ্রোসিটি দেখতে পাচ্ছি না। বেবেক জাগে ঠিক রাত তিনটের সময়, ব্রাহ্মমুহূর্তের ক্যালকুলেশনটা দেখছি ঠিকঠাক করে উঠতে পারছে না। বেবেকের মা অবশ্য বিস্তর প্রস্তুতি নিয়েছেন এ ব্যাপারে, ফলত ওনার-ও ঘুম ভাঙ্গে রাত তিনটে; বেবেকের মা প্রফেসর কিন্তু নিজের ছেলে মানুষ হলে তবে না বাকি ছেলেপুলেদের নিয়ে মাথা ঘামাবেন। সুতরাং, তিনি ঘুমোতে চলে যান সন্ধ্যা আটটা নাগাদ। ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্টের বাড়িতে বারবিকিউ পার্টিই থাকুক কিম্বা কো-অথরের সঙ্গে শলাপরামর্শ, সাতটার মধ্যে সব কাজ শেষ হওয়া দরকার – বেবেকের অর্ডার। সাতটা থেকে আটটা অবধি যুদ্ধকালীন তৎপরতা চলে, প্রথম আধ ঘন্টা তিনি মোহন হাসি হেসে চার হাত-পায়ে লিভিং স্পেসের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। মাঝরাস্তা অবধি গিয়ে তারপর থপ করে বসে পড়েন, বেবেকজননীর তখন কাজ হচ্ছে কোলে করে তুলে এনে আবার স্টার্টিং পয়েন্টে ছেড়ে দেওয়া। এরকম করে বিস্তর ক্যালরি খরচা হয়, সুতরাং পরের আধ ঘন্টা বেবেক-ন্যানী তাকে কোলে দুলিয়ে দুলিয়ে বিস্তর বেবেকপরিজ জাতীয় জিনিস খাওয়ান। বেবেকপরিজের অল্টারনেটিভ ফাংশনটা আফিমের ড্যালা বা সিদ্ধির গুলির কাজের সঙ্গে সমতুল্য। খেয়েই ঝিমুনি আসে, তারপর একটা স্বর্গীয় হাসি, শেষে বনগাঁবাসী মাসি-পিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ। এনারা চলে এলেই প্রফেসরও সময় নষ্ট না করে শুয়ে পড়েন। মুশকিল হল, বেবেকের শত ইচ্ছা সত্ত্বেও এহেন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। তাই রাত তিনটে থেকে খোলা জানলা দিয়ে বেবেকের থটপ্রসেস ভেসে আস্তে শুরু করলেই নিদ্রাদেবীও চম্পট দ্যান। আমিও চুপ করে শুনি চাঁদ কিরকম গব-গব-গবাস শব্দে ডুবে যাচ্ছে। আরো ঘন্টা দুয়েক পরে যখন চোখ সত্যি বুজে আসতে চায়, তখনও বেবেকের কলকলানি শুনে মনে হয় বিটলেটার সঙ্গে এবার একটা সামনাসামনি মোলাকাত হওয়াটা নিতান্তই দরকার। ওহ, আপনাদের বলা হয়নি বেবেকের দর্শন পাওয়ার সৌভাগ্য এখনো হয়নি, বেবেকজননীর থেকেই যা গল্পগাছা শুনেছি।

মাঝে মাঝে অবশ্য ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ির দিকে হয়ে যায়।আজ যেমন ঠিক রাত দুটো থেকে তারস্বরে চিৎকার ভেসে আসতে শুরু করল। বিলক্ষণ বুঝলাম, তরুণ তুর্কী ব্যাপারটা নেহাত কথার কথা নয়, ফ্রেজটার মধ্যে একটা সার্থক জোশ আছে। একবার ভাবলাম, যে রামচিমটিটা আমিই এতদিন কাটবো বলে ভাবছিলাম সেটা প্রফেসর কেটে ফেলেছেন কিনা। যতই হোক, তিনিও মানুষ আর আমেরিকাতেও বসবাস করেন না, যে চিমটি  কাটলেই গুয়ান্টানামো ভ্রমণ নিশ্চিত হবে। একবার অবশ্য মনে হল, পেট কামড়াচ্ছে না তো? কিম্বা কান কটকট? স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজে পড়ালেও প্রফেসরের বেবেকভাষা এখনো ঠিক আয়ত্তে আসে নি, সুতরাং কমিউনিকেশন নিয়ে একটা প্রব্লেম থেকেই যায়। কারণ যাই হোক না কেন, ঘুমের দফারফা হল। ঘন্টাতিনেক ধরে ভাবতে চেষ্টা করলাম নন্দ ঘোষের পাশের বাড়ির বুথ সাহেবের বাচ্চার এতটাই দম ছিল কিনা। ভেবে ভেবে মাথা গরম হয়ে গেল, চোখেমুখে জল ছিটিয়ে প্রাতর্ভ্রমণে যাওয়াটাই উচিত হবে বলে সাব্যস্ত করলাম। আর বেরোতে বেরোতে খেয়াল করলাম, বেবেকও ট্যাঁ-ফো করছে না। সেটাই স্বাভাবিক, তার কাজ হয়ে গেছে – আমাকে বিছানাচ্যুত করা।

মিনিট পাঁচেক হেঁটে প্রথম পমেগ্রানেট গাছটার সামনে এসে ভারী চমকে গেলাম, দেখি গুগলে কর্মরত সেই খিটকেল ভদ্রলোক গাছের নিচের বেঞ্চে চুপটি করে বসে আছেন। কয়েকদিন আগে কে যেন আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, ইনি  গুগলের মাউন্টেন-ভিউ অফিসে বছর আষ্টেক কাজ করে আপাতত ইস্তানবুলের গুগল অফিসে আছেন। আলাপের মুহূর্তে আমার দিকে লাল লাল চোখে এমন রাগমাগ করে তাকালেন আমি আর পালাবার পথ পাই না। প্রথমে ভাবলাম বিদেশী দেখে রেগে গেলেন কিনা, তারপর মনে হল মাউন্টেনে-ভিউয়ের অমন খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে আসতে হলে যে কারোরই চোখ অমন লাল হয়েই থাকবে। ইউনিভার্সিটি ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এ থাকেন মানে নিশ্চয় গিন্নীর জন্য গ্রীন কার্ড জলাঞ্জলি দিয়ে আসতে হয়েছে।  ভাবছিলাম পাশের সরু শর্টকাটটা দিয়ে টুক করে সরে পড়ব, এমন সময় ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। আর স্পষ্ট দেখলাম খুব হাসছেন, চোখমুখ হাসছে, সারা শরীরে একটা পরিতৃপ্তির ছোঁয়া। আমাকে দেখে বেশ আহ্লাদিত গলায় বললেন, “আরে আপনি, আসুন আসুন।” আমিও হেসেই উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। চোখ দুটো এখনো লাল, টকটকে। ভদ্রলোক বোধহয় বুঝতে পারলেন, ঈষৎ করুণ হেসে বললেন “বছর খানেক হতে চলল, এখনো অভ্যাসটা হয়ে ওঠেনি।” আর তক্ষুনি টের পেলাম পাশেই একটা প্র্যাম, আর সঙ্গে সঙ্গে সব জলবৎ তরলম হল। দুরুদুরু বুকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, “বেবেক?” ভদ্রলোক একটু অবাকই হলেন বটে, তাই ‘হ্যাঁ’ বলে আবার জুড়ে দিলেন “আমার’। আমি আর কি করে বোঝাই, আমার কাছে বেবেক এক জনই। ততক্ষণে প্র্যামের কভা্র খুলে ফেলেছি, আর কি বলব আমাকে দেখেই নেড়াচুল খাড়া করে সে কি মিষ্টি হাসি,  দেখা হল শেষমেশ। আর ছোট্ট মুঠোর মধ্যে আমার তর্জনীটা সেঁধিয়ে যেতেই বুঝলাম ‘Enchanted’ কাকে বলে।

“When you touch a star
Then you really are enchanted
Find a seed and plant it
Love will make it grow”

পুনশ্চ : বেবেক শব্দটা কি সুন্দর না? ব্যক্তিগত, রিদমিক।

টার্কিশ কোলাজ – ৪

ইস্তিকলাল অ্যাভেনিউ-এ দুপুর সাড়ে বারোটার সময় যা ভিড় দেখলাম, তা সত্যি সত্যি-ই কলকাতার পুজোর ভিড়ের সঙ্গে তুলনীয় – অন্তত ম্যাডক্স স্ক্যোয়ারে ষষ্ঠীর সন্ধ্যাবেলায় এত লোক দেখতাম নব্বইয়ের শেষে। এখন কি অবস্থা অবশ্য জানি না, কলকাতার পুজো শেষ দেখেছি ২০০১-এ। কাগজে এখন যেরকম ঘড়ি ধরে বিন্দুতে সিন্ধু মাপার প্রয়াস চালায়, দেখে গতিক সুবিধের ঠেকে না। সে যাই হোক, জনস্রোতে ভাসার একটা মজা আছে, স্পেশ্যালি আপনার হাতে যদি সময়-ই সময় আর উদ্দেশ্য বলে সত্যিই কিছু না থেকে থাকে। প্রথমত, এগিয়ে চলার জন্য আপনাকে বিন্দুমাত্র এফার্ট দিতে হবে না, মনে হবে যেন এসকেলাটরে চড়ে এগিয়ে চলেছেন। দ্বিতীয়ত, এই যে কত মুলুকের লোক, কাঁহা কাঁহা থেকে এসে কত কিসিমের জিনিসপত্র কিনে পেপার ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, আমেরিকান ট্রাভেলারের সুটকেস ভর্তি করে নিয়ে চলেছে, এ দেখেও  মজা। তো সেই নির্মল আনন্দ-ই নিচ্ছিলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কিছুক্ষণ পর কানের কাছে বড় প্যাঁ-পোঁ আরম্ভ হতে খেয়াল হল  সেই লাল রঙের কাঠের তৈরি ট্রামগুলোর একটা এসে অনুরোধ করছে ট্রাম লাইন ছেড়ে দেওয়ার জন্য। তুর্কী সরকার এই বিশাল রাস্তাটায় সমস্ত রকম যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন, রয়েছে কেবল হিস্টোরিক্যাল চার্ম বাড়ানোর অভিপ্রায়ে এই ট্রামগুলো। সারা রাস্তাই যেহেতু জনগণের কব্জায়, বিনীত অনুরোধ না করে উপায় কি? জীবনানন্দ স্মরণে বালিগঞ্জের মুখটায় অন্তত এরকম কিছু করলে মন্দ হয় না; অবশ্য শেষবার গড়িয়াহাটে দেখলাম ট্রাম কন্ডাকটর বিস্তর মুখ খারাপ করে করে হেদিয়ে গেলেন, দুদিক থেকে লোকজন রাস্তা পেরিয়েই চলেছেন; লাল সবুজ হল, সবুজ হলুদ হল, হলুদ আবার লাল হল, কন্ডাকটরের মুখের বেগুনী আভা আর নেভে না।

istanbul_Tram

তো রাস্তা ছেড়ে যেই সাইড হয়েছি, দেখি চোখের সামনে ম্যাজেস্টিক সিনেমা। বেজায় চমকালাম, না ম্যাজেস্টিক এর ‘পপার’ সুলভ দুর্দশা দেখে নয়, স্পষ্ট চোখের সামনে দেখলাম “with English subtitles in Present Tense”। প্রেজেন্ট টেন্সেই সাবটাইটল কেন লেখা হল, এ প্রশ্ন কাকে না ভাবাবে বলুন? দেন অ্যান্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, এ সিনেমা দেখতেই হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সিনেমা শুরু হতে কুড়ি মিনিট। এদিকে আরো দশ মিনিট দূরেই রয়েছে ‘রবিন্সন ক্রুসো’ বইয়ের দোকান, ইস্তানবুলের বিখ্যাত ইন্ডি বুকস্টোর। আর্থিক অনটনে উঠে যাব যাব করছে, সেখানে গিয়ে দু’একটা বই না কিনলেই নয়। তো দৌড়ে দৌড়ে গেলাম, হাঁফাতে হাঁফাতে ঝপাঝপ Buket Uzuner এর ‘Istanbullu’ আর Barrie Kerper সম্পাদিত “Istanbul :The Collected Traveler” ঝোলায় ফেলে, “গেঁড়ে বসে থাকুন, ওঠার নামটিও করবেন না” বলে সহমর্মিতা প্রকাশ করে ফির সে দে দৌড়। ম্যাজেস্টিকের সেলোন নাম্বার চারে ঢুকে খেয়াল পড়ল প্রেজেন্ট টেন্সে সাবটাইটল দেখার আশায় লাঞ্চ অবধি করতে ভুলে গেছি। চোখ গোলগোল করে দেখছি (একেই চশমাটা সিয়াটল এয়ারপোর্টে হারিয়ে এসেছি), পনের মিনিটের মাথায় ফের টের পেলাম কেউ কথা রাখে না। সিনেমার প্রোটাগনিস্ট আগে ফরচুন-টেলারের কাজ করেছে কিনা, এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যান দিচ্ছে আর তলায় সাবটাইটল ভেসে উঠছে, এবং দিব্যি পাস্ট টেন্স দেখা যাচ্ছে। রাগের চোটে তালটাই কেটে গেল, সিনেমাটা যদিও দিব্যি বানিয়েছে। শেষ হল, ভাবছি কাউন্টারে গিয়ে অভিযোগ জানাব কিনা, এমন সময় দেখি পর্দায় ফুটে উঠল  ‘Simdiki Zaman‘ অর্থাৎ কিনা চলচ্চিত্রের নাম, আর তার নিচে ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে ‘Present Tense’, বুঝলেন তো? হুঁ, গুগল ট্রান্সলেটর-ও কনফার্ম করেছে।

পরমা তখনো প্রথমা হয়নি – বৈশাখী সংখ্যায় বিস্তর অচেনা খাবারদাবারের রেসিপি দিয়ে ভারী ভালো লাগিয়ে তুলেছিল। নামগুলোও জবরদস্ত –  মাছের ডুবলি, ডিমের তুরফি, চামলাই শাকপাক, সরষে শাপলা, কমলালেবুর কালিয়া, করলার তিতরায়তা, সাপটার টক, শর্করপারা, টিকরশাহি ইত্যাদি ইত্যাদি।  অনেক কিছুই খাইনি এর মধ্যে, ইনক্লুডিং শর্করপারা। পরে অবশ্য খেয়াল পড়ল উত্তর ভারতেও একটা স্ন্যাক আছে, শক্কর পারা নামে। কয়েকদিন আগে  ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়ায় একটা অতি সুস্বাদু ডেসার্ট দিল,  চমৎকার মুচমুচে পেস্ট্রি তার ওপরে আবার মুক্তোর দানার মতন এক ফোঁটা অ্যামন্ড।  খাওয়ার পর দেখি মেনুতে লেখা  Şekerpare! ব্যাস আর যায় কোথায়, দু’য়ে দু’য়ে চার। এই হল গিয়ে গ্লোবালাইজেশন, পরমার সনাতনী বাংলা খাবার না খেতে পেয়ে হা-হুতাশ করছিলেন, পেয়ে গেলেন ইস্তানবুলে।

sekerpare

পরের দিনই আবার ছোটো ছোটো রসের মিষ্টি খেয়ে ভারি পান্তুয়ার কথা মনে পড়ছিল, তফাতের মধ্যে এটায় চিনচিনে মিষ্টি ভাবটা নেই আর পেস্তার গুঁড়ো দিয়ে সুন্দর ডেকরেট করা। যতবার বাজখাঁই ‘কেমালপাশা ত্যাতলাজি’ নামটা দেখছি ততবারই মনে হচ্ছে যাই বলো বাপু, একটা নাড়ির টান দিব্যি টের পাচ্ছি। শেষে আর থাকতে না পেরে বিস্তর রিসার্চ করে, পেজ কে পেজ গুগল ট্রান্সলেট করে দেখি ওমা, আমাদের গুলাবজামুন-ই হল গিয়ে তুরস্কের ‘কেমালপাশা ত্যাতলাজি’। বলছিলাম কি, হুঁ হুঁ।

kemalpasa

তবে কিনা,  কবি বলেছেন “যত হাসি তত কান্না, বলে গেছেন রাম শন্না “(আই মীন রাম শর্মা)। গ্রসারি স্টোরে গিয়ে দেখি সারি সারি ‘Peynir’। এটিমোলজিস্টকে আর পায় কে! লাফাতে লাফাতে নিয়ে এলাম, তখনো মাছ কিনে ওঠা হয়নি। কাঁহাতক আর মাংস খাওয়া যায়, পনির মশালাই হোক রাত্রে। মশলা-টশলা রেডি, কিউব কিউব করে কাটাও হয়ে গেছে; এবার তেল গরম করে ভাজার পালা। যেই না গরম তেলে ঢালা, কি বলব, চোখের সামনে মাখনের সমুদ্র তৈরি হল। আমি আবার একটু ভেবড়ে গিয়ে তার মধ্যেই ইন্টারনেট খুলে বসলাম, বং মম থেকে তরলা দালাল, সবাই দিব্যি গেলে বলেছেন পনির ভাজাটা আবশ্যক। ততক্ষণে অবশ্য পনির নয়, পেইনির তার লিকুইডিফায়েড ফর্মে কড়াই উপছে রীতিমতন ধাওয়া করতে শুরু করেছে। ঝাড়ু হাতে সম্মুখসমরে যাওয়ার আগে আরো একটা আপ্তবাক্য মনে পড়ল, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী!

(স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)

টার্কিশ কোলাজ – ৩

Traffic

ইস্তানবুল ২০২০-র অলিম্পিকস আয়োজন করার ভার পায়নি। আমারই যা একটু খারাপ লাগছিল (সদ্য-আগতর আদিখ্যেতা?), তুর্কী বন্ধু এবং ছাত্রছাত্রীরা দেখলাম বিশেষ বিচলিত নন। অলিম্পিকস আয়োজন করে এথেন্স তথা গ্রীস এবং ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে দক্ষিণ আফ্রিকার যা হাঁড়ির হাল হয়েছে, সেসব দেখেশুনেই বোধহয় লোকজন অস্ফুটে বলছেন “বাঁচা গেল, বাবা।” ব্রেজিলেও ২০১৪ এবং ২০১৬ নিয়ে যা তুলকালাম চলছে, এখানকার লোকজন ভাবছেন ফাঁড়া কাটল। গতকাল রাস্তায় বেরিয়ে মনে হল, সিরিয়ার যুদ্ধ-টোকিওর বেটার ইনফ্রাস্ট্রাকচার – তাকসিম স্কোয়্যারে বিক্ষোভ এসব কোনোটাই ইস্তানবুলের অলিম্পিকসের দায়িত্ব না পাওয়ার কারণ নয়। অলিম্পিকস কমিটির সদস্যরা মোস্ট প্রব্যাবলি হিসেব করে দেখেছেন স্টেডিয়ামে ভরবে না। হাঁ হাঁ করে ওঠার আগে কারণটা বলতে দিন প্লীজ! আমার ইউনিভার্সিটি থেকে তাকসিম স্কোয়ারের (শহরের প্রাণকেন্দ্র) দূরত্ব বোধহয় চল্লিশ কিলোমিটারের আশেপাশে হবে। দিন ভালো থাকলে, অল্পস্বল্প ট্রাফিক জ্যাম পেয়েও মোটামুটি ৪৫-৫০ মিনিটে চলে যাওয়া যায়। গতকাল ছিল শনিবার এবং লাগল ঝাড়া আড়াই ঘন্টা। ইস্তানবুলের ট্র্যাফিক জ্যামকে টেক্কা দিতে পারে এরকম শহর বোধহয় পৃথিবীতে নেই, অ্যাপারেন্টলি জাকার্তা ছাড়া। এবং যতটা সময় লাগতে পারে তার থেকে ঘন্টা খানেক, ঘন্টা দেড়েক দেরি হওয়াটা রীতিমতন দস্তুর আর কি! এবার ভাবুন, উসেইন বোল্ট ১০০ মিটার দৌড়তে চলেছেন (যদিও ঘোষণা করেছেন যে ২০১৬-র সোনার মেডেলগুলো পেয়েই জুতোজোড়া তুলে রাখবেন), এরকম বিশ্বের বিস্ময় চাক্ষুষ করতে কতক্ষণ সময় আছে আপনার কাছে? সাড়ে ন’সেকন্ড মতন। ইস্তানবুলে বসে সাড়ে ন’সেকন্ড, ইয়ার্কি? গাড়ির টায়ার এক ইঞ্চি গড়াতে লেগে যাচ্ছে সাড়ে ন’মিনিট।  ১৭ তারিখে  রিয়াল মাদ্রিদ আসছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির গ্রুপ ম্যাচে  এখানকার সেরা দল গালাতাসারায়ের সঙ্গে খেলতে। এক তুর্কী ছাত্র দেখলাম হিসেব কষছে “অ্যাকাউন্টিং এর পরীক্ষা শেষ বিকেল সাড়ে চারটে। তারপর দৌড়ে হস্টেলে ফিরে গাড়ি নিয়ে (হ্যাঁ, হস্টেলে থাকলেও গাড়ি আছে, অবাক হবেন না) বেরোতে বেরোতে ৪-৪৫। মেন গেটে চেকফেক করে বেরোতে বেরোতে তার মানে প্রায় পাঁচটা। ইরি ত্-তারা, ম্যাচ তো রাত নটা পঁয়তাল্লিশে শুরু, হল না বোধহয়।” বন্ধুবান্ধবরা দেখলাম আশ্বাস দিচ্ছে আর দূরে গিয়ে বেজায় মাথা নাড়ছে। আরে ম্যাচ দেখবি তো পরীক্ষ দিস না। চল্লিশ কিলোমিটার যাওয়ার জন্য নাকি বাবু হাতে রেখেছেন মাত্র চার ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট, বেয়াকুব আর কাকে বলে!

পাকিস্তানি ছাত্রী মারিয়া লন্ডন ফেরত, এবং এথনিক ফুড বেজায় ভালোবাসে। অন্য পাকিস্তানীদের মতন সারাক্ষণ বিরিয়ানি মিস করে না, তার প্রাণ কাঁদে থাই এবং চাইনিজ খাদ্যবস্তুর জন্য। দু’দিন আগে ক্যাম্পাসের সেরা রেস্তোরাঁয় বেজায় লেকচার দিয়ে এসেছে অথেনটিক থাই কারিতে কতটা নারকেল দুধ পড়বে সেই নিয়ে। এমন ঝড়ের বেগে ইংলিশে ধাতানি দিয়েছে যে টার্কিশ ভাষী শেফের জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে শোনা ছাড়া কোনো অপশন ছিল না। আজকে দেখি কন্যার মুখে একগাল হাসি, বলল “সেদিনকার ব্লিৎসক্রিগে কাজ দিয়েছে! আজকে যা চমৎকার চাইনীজ বানিয়েছে না, আহা! প্লীজ, খেয়ে আসুন।” প্রতিবেশী দেশের চাইনীজ প্রেম নিয়ে একটু সন্দেহ সব সময়েই আছে আমার, তবে কিনা সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। গেলাম, অর্ডার করলাম এবং অর্ডার করার মিনিট চল্লিশ পরে খানা হাতে পেলাম। চল্লিশ মিনিট ধরে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর থেকেও সাবকন্টিনেন্টাল টাচে বানানো চাইনীজের লোভে  আর ওয়েটারদের ব্যাস্তসমস্ত করে তুলিনি। প্রথম গ্রাস, এবং জিভ পুড়ে ছারখার। না, গরমে নয়, নুনে। শেফ ভদ্রলোক নিজে মনে হয় কোনোদিন চাইনীজ খাননি, এমনকি রান্না করতে করতে চাখেন-ও নি। সুতরাং, সয়া সসে যে কতটা নুন থাকতে পারে সে নিয়ে তাঁর সিমপ্লি কোনো আইডিয়া নেই, শুধু জানেন যে চাইনীজ খাবারে সয়া সস দিতে হয়। তাই সয়া সসের ঝোলে নুডলস চুবিয়েও তিনি ভরপুর নুন দিয়েছেন, মানে হাতে করে কাঁচা কাঁচা নুন। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, এর একটা টার্কিশ উপসংহার আছে। টার্কিশ কাবাব ইস্কান্দার (এর গল্প অন্য  আরেকদিন) খাওয়ার সময় এরা কাবাবের ওপর বাটার সস ঢেলে দিয়ে যায়। বাটার সস মানে গলানো বাটার, আপনার কোলেস্টরল লেভেল যাই হোক না কেন, ওই বাটার সস ছাড়া ইস্কান্দার খাওয়া মানে একটা ব্ল্যাসফেমি করে বসলেন। এই তুর্কী কুক দেশপ্রেমের জন্যই হোক, বা ইম্প্রোভাইজ করতে গিয়েই হোক সেই বাটার সস এখানেও ঢেলেছেন। আর বাটার সসের দুটোই ইনগ্রেডিয়েন্ট – বাটার এবং নুন, অতএব য পলায়তি স জীবতি। পালাতে পালাতে মনে পড়ল, মারিয়া এই খেয়েই বেজায় আহ্লাদিত – তার মানে পাকিস্তানি চাইনীজের স্বাদ-ও সমতুল্য। চাইনীজ প্রিমিয়ারের কানে একবার তুললে হয়, এই যে পাকিস্তান পাকিস্তান করে হেদিয়ে যাচ্ছেন, একবার-ও আপনাদের দেশের খাবারটা ওদেশে গিয়ে চেখেছেন? আমার দৃঢ় ধারণা পাকিস্তানী চাইনীজ যদি তুর্কী চাইনীজের পঞ্চাশ শতাংশ-ও নিয়ে আসতে পারে, পরের পঞ্চাশ বছরের জন্য চীন পাকিস্তানকে রসদ যোগানো বন্ধ করে দেবে। মুশকিল একটাই, এসব আইডিয়া দেওয়ার জন্য দিল্লী যাওয়ার টাইম নেই, আর এ বিদেশে ক্রিকেট-বলিউড-বিরিয়ানি নিয়ে আলোচনার জন্য আছে তো ওই পাকিস্তানীরাই। সুতরাং,  নেক্সট কিছু বছরের জন্য সাধু সাবধান; ইস্তানবুল হোক কি লাহোর, চাইনীজ খেতে চাইলে পকেটে গোটা আলু নিয়ে ঘুরবেন। নুনকে জব্দ করতে আলু হল যাকে বলে ব্রহ্মাস্ত্র; এক গ্রাস করে চাইনীজ খাবেন আর এক কামড় করে কাঁচা আলু। Bon appétit!

(স্থিরচিত্র উৎস – http://www.trekearth.com/gallery/Middle_East/Turkey/Marmara/Istanbul/photo118730.htm & Google Images)

কখনো বিষ্ণু দে, কখনো যামিনী রায়

jb1

তর্কটা কেন বিষ্ণু দে আর যামিনী রায়কে নিয়েই চলত সে প্রশ্নটা বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে; আর এক্স্যাক্টলি কি নিয়ে তর্ক সে নিয়েও কখনোসখনো মাথা ঘামিয়ে ফেলতাম । গৌরীপ্রসন্নকে এরকম বালখিল্য প্রশ্ন নিশ্চয় কেউ করেননি, তাই উত্তর পাওয়ার আশা নেই বলেই ধরে নিয়েছিলাম । আশার আলো হঠাৎ-ই দেখালেন অশোক মিত্র।  ওনার ‘আপিলা চাপিলা’ পড়েই প্রথম জানতে পারি যে যামিনী রায় এবং তাঁর শিল্পকলার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন  বিষ্ণু দে । এতটাই যে প্রায় উপযাচক হয়ে ঘনিষ্ঠদের কাছে যামিনী রায়ের ছবি বেচার-ও চেষ্টা করতেন। এখানে একটু বলে রাখা ভালো যে  বিষ্ণু দে  কে নিয়ে  অল্প কিছু স্মৃতিচারণ পাওয়া যাবে সমর সেনের ‘বাবুবৃত্তান্ত’ বইটিতেও। অশোক মিত্রের লেখা পড়ে বেশ উৎসাহী হয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারি  বিষ্ণু দে  ‘যামিনী রায়’ নামে একটি বইও লিখেছেন। কিছুদিন হল বইটি হাতে এসেছিল, অবশেষে পড়া শেষ হল। আর পড়েই মনে হল হতেই হত, বিষ্ণু দের সঙ্গে যামিনী রায়ের নাম যাবে না তো যাবে কার? কেন সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

টিপিক্যাল জীবনীগ্রন্থ বলতে যা বুঝি, ‘যামিনী রায়’ তার ধারেকাছ দিয়ে যায় না। বিষ্ণু দের গদ্যসাহিত্য বা প্রবন্ধসাহিত্য আমি বিশেষ পড়িনি, কিন্তু বিংশ শতকের অন্যতম বাঙ্গালী কবির কাছে পাঠকের প্রত্যাশা বেশী থাকারই কথা। বিষ্ণু দে হতাশ করেন নি; শুকনো তথ্য দিয়ে যেমন বোঝাই করেন নি এ বই তেমনই শুধু লঘু রচনা দিয়েও কাজ সেরে ফেলেন নি। ভক্তের উচ্ছ্বাস চোখে নিশ্চয় পড়ে কিন্তু সেখানে পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট। বইয়ের অনেক কটি প্রবন্ধেই (হ্যাঁ, অনেক কটি প্রবন্ধ একসঙ্গে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন-আলেখ্যর রূপ দিয়েছে)   খুব চমৎকার ভাবে এই ব্যাপারটি ধরা পড়েছে তবে তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ‘যামিনী রায় ও শিল্পবিচার’। পরিচয় পত্রিকায় অশোক মিত্র যামিনী রায়ের শিল্পকলা নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিষ্ণু দে সেটির সমালোচনা করেন এই লেখাটিতে। যামিনী রায় অঙ্কিত পোর্ট্রেটসমূহ নিয়ে অশোক মিত্র বিস্তারিত আলোচনা করলেও, ওনার আঁকা ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে বিশেষ রা কাড়েননি; খানিকটা সমালোচনার সুরেই বরং বলেছেন “এ ল্যান্ডস্কেপে ঝড়জল নেই, অগ্নিদগ্ধ দিন, এমনকি দিগন্তবিস্তৃত মাঠ-ও নেই।” প্রত্যুত্তরে বিষ্ণু দে যেভাবে যামিনী রায়ের আঁকা ল্যান্ডস্কেপের লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছেন, তা প্রকৃত ভক্তের পক্ষেই সম্ভব। যামিনী রায় নিজেই তাঁর এই কাজগুলোকে বিশেষ মূল্য দেন নি, স্বভাবতই সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে লম্বা টানা চোখের বাইরেও তাঁর প্রতিভা আরো কত অসামান্য দৃশ্যকে ক্যানভাসবন্দী করেছে। কিন্তু ফ্যানবয়রা সাধারণ মানুষ নন, আর তাই বিষ্ণু  দে-র কলম জানাচ্ছে, “আমি অন্তত কিছুতেই ভুলতে পারি না সংখ্যায় শতাধিক সেইসব বহির্দৃশ্যচিত্র – বাঁকুড়ার দিগন্তবিস্তৃত ঊষর মাঠ, সাঁওতাল-দেশের পাথর-মাটির ঢেউ, ধানক্ষেতে লাঙ্গল চাষী, থৈথৈ বাদল-জলে মেয়েদের বীজরোপণ, রৌদ্রে ঝকঝকে বৃক্ষছায়াঘন মাঠপথবাড়ি, আলোছায়ায় প্রতীক্ষারত বস্তির ছবি, একাধিক অসুস্থ কলকাতার বিষণ্ণ বাড়িতে বাড়িতে ঘেঁষাঘেঁষি গলি; বাগবাজারের গঙ্গায় বোঝাই নৌকা, টিনের শেড আর মেঘবিদ্যুতের ঘনঘটা বা আলোর দীপ্তি, টলোমলো জলধারা, নৌকায় পার্থিব কিন্তু অসীমে উধাও রহস্যময় জলরাশি, কাশীপুরের দোতলা বাড়ি, বেলেতোড়ের বাংলো বা কুঠি, পাহাড় রেললাইনে স্টেশনের দুরন্ত বাঁক, দক্ষিণেশ্বরের বটগাছ, সুস্থ শহরের আদর্শ বীথি ও বাসাবাড়ি – কত বলা যায়।”  আবার সার্থক শিল্প-সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করেছেন কিভাবে দেশী ঘরানায় বিদেশী পুরাণের রূপদানের সমস্যা থেকে যামিনী রায় তৈরী করেন তাঁর বাইবল সিরিজ; জানিয়েছেন কিভাবে যামিনী রায়ের পরের দিকের কাজে ধরা পড়েছে এক অভূতপূর্ব  বর্ণদ্যুতি, যার অনেকটা প্রেরণা এসেছে বাইজান্টীয় মোজেইকের কাজ থেকে।

কিন্তু বইয়ের কথা বলা এ পোস্টের মূল উদ্দেশ্য নয়, ফিরে যাই মূল আলোচনায়। একটা সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, গৌরীপ্রসন্নর লেখায় দু’জনের এক লাইনে উল্লেখ নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু বিষ্ণু দে কে লেখা যামিনী রায়ের চিঠিগুলো দেখলে সে সম্ভাবনার বাইরে গিয়েও কিছু ভাবা সম্ভব। চিঠিগুলি পড়লে মনে হয় যে বিষ্ণু দে যামিনী রায়ের একাধারে স্নেহভাজন, শ্রদ্ধাস্পদ ও বন্ধু। বিষ্ণু দে কে তিনি বাঁকুড়ায় নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতে চেয়েছেন, চিঠিতে ডিটেইলড ইন্সট্রাকশনস দেওয়া – কোন এনকোয়ারি অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, বি-এন-আর রেলওয়ের গাড়ী কটায় ছাড়বে, টিকিটের দাম কত ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সঙ্গে এটাও লিখেছেন “আপনি অসুবিধার কথা লিখিয়াছেন, আপনি তো জানেন আপনাদের জন্য আমার কোনো অসুবিধা, অসুবিধাই মনে হয় না।” বাঁকুড়া বেড়াতে গিয়ে বিষ্ণু দে যামিনী রায়ের বাড়ির কাছেই এক জঙ্গলে বেড়াতে যেতে চান; সেই জঙ্গলেই যামিনী রায়ের পুত্র জীমূত বন্য জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হা্রিয়েছিলেন। এক স্নেহাস্পদকে হারানোর যন্ত্রণা থেকে আরেক স্নেহাস্পদকে বারণ করার আকুতিটুকু র‍্যান্ডম পাঠকের কানেও নিতান্ত করুণভাবেই বাজে। আবার বিষ্ণু দে কলকাতায় যামিনী রায়ের ছবি বিক্রির ব্যবস্থা করলে একটু যেন কুন্ঠিত ভাবেই বহু ধন্যবাদজজ্ঞাপন করেছেন। সাংসারিক চিঠির-ও কমতি নেই – কখনো জানাচ্ছেন বিষ্ণু দে’র পরিবারের জন্য বাঁকুড়ার গামছা আর বেডকভার পাঠাচ্ছেন, কখনো বা আবার স্থানীয় কোনো ছেলেকে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তির জন্য তদ্বির করছেন। আর ছবি আঁকা? তা নিয়েও চিঠি লিখেছেন বৈকি! সাতচল্লিশের অগস্ট মাসের এক চিঠিতে (যামিনী রায়ের তখন ষাট বছর বয়স, আর বিষ্ণু দে’র আটত্রিশ) খানিকটা হতাশার সুরে বলেছেন তৎকালীন শিল্পধারার সঙ্গে নিজের কাজকে মিলিয়ে উঠতে পারছেন না অথচ তিনি এটাও বিশ্বাস করতে চান না যে শুধু তাঁর কাজটাই প্রকৃত কাজ। বাহান্ন সালের আরেক চিঠিতে জানিয়েছেন ছবির মাধ্যমে যুগের চিন্তাকে বোঝার প্রচেষ্টা, ভিন্ন ধর্ম পন্থাকে জানার আগ্রহ এসবরেই প্রাথমিক অনুপ্রেরণা ছিল ক্যালকাটা আর্ট স্কুল (মূলত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। সময় সময় শুধুই তরুণ বন্ধুর লেখার প্রশংসা করে চিঠি – বিষ্ণু দের কবিতায় সংযম, প্রবন্ধে ভাষাসৃজনের  ক্ষমতা নিয়ে হার্দিক মতামত দিয়েছেন।

দুজনের মধ্যের এই বন্ডিং সত্যিই চমকপ্রদ। নিছক বন্ধুত্বের ট্যাগ এখানে লাগানো যায় না, শ্রদ্ধা বা স্নেহের পারস্পরিক টানের বাইরেও রয়ে যায় এক বিশেষ দায়বদ্ধতা, যেটা হয়ত দুই শিল্পীর মধ্যেই থাকা সম্ভব। কিন্তু যেকোনো দুই শিল্পীর মধ্যেই কি এরকম দায়বদ্ধতা দেখতে পাবেন? সম্ভবত না, একটা আত্মিক যোগাযোগ থাকাও নিতান্ত দরকার। গৌরীপ্রসন্ন-ও কি এরকমই কিছু ভেবেছিলেন? হয়তো, হয়তো!

(স্থিরচিত্র উৎস – ‘যামিনী রায়’ (বিষ্ণু দে, আশা প্রকাশনী)

টার্কিশ কোলাজ – ২

Daily cat Istanbul

ইউনিভার্সিটি থেকে প্রত্যেক ফ্যাকাল্টি মেম্বার-ই একটি করে ল্যাপটপ পান, আমিও পেলাম। পেয়েই চক্ষু চড়কগাছ, কীবোর্ডটি টার্কিশ ভাষীদের জন্য বানানো।তবে যতটা রিঅ্যাক্ট করলাম ব্যাপারটা আদতে অতটাও খারাপ নয়।     শ্রীল শ্রীযুক্ত আতাতুর্ক মহোদয়ের দৌলতে টার্কিশ অ্যালফাবেট-ও মূলত ল্যাটিন, সাতটি অক্ষর খালি উচ্চারণের সুবিধার্থে মূল ল্যাটিন অক্ষরের ওপর একটু কারিকুরি করে গড়ে তোলা হয়েছে। একদিকে যেমন কিউ, ডবলিউ এবং এক্স  টার্কিশ অ্যালফাবেটের মধ্যে পড়ে না, উল্টোদিকে আবার ল্যাজওলা সি, ল্যাজওলা এস, লোয়ারকেসে ফুটকিবিহীন আই বা দু’দুটো ফুটকিওলা ও কে পেয়ে যাবেন। মুশকিলটা মূলত হচ্ছে এই ফুটকিবিহীন আই কে নিয়ে। ইনি বসে আছেন আমাদের ইউসুয়াল কীবোর্ডে ফুটকিওলা আইয়ের জায়গায়। তাই শেষ ক’দিন ধরে ভারত, আমেরিকা এবং পৃথিবীর অন্য যেসব জায়গায় অফিসিয়াল ই-মেল ছাড়তে হয়েছে, তাতে আই বাবাজীবন ‘বিন্দু’বিসর্গ জানাচ্ছেন না। মজাটা হল অন্য দেশের লোকেরা এটা বোধহয় লক্ষ্যও করেন নি কিন্তু তুর্কী কলীগরা একটু কনফিউসড। হয়েছে কি, ফুটকিবিহীন আই-এর উচ্চারণটা খানিকটা অ্যা এবং খানিকটা ই-র ওয়েটেড কম্বিনেশন বিশেষ। তাই Prabirendra না লিখে Prabırendra লিখলে প্রব্যারেন্দ্র এবং প্রবেরেন্দ্রর মাঝামাঝি কিছু শোনাবে। তাই ওনারা একটু চিন্তায় পড়েছেন, ব্যাটা সাতদিন যেতে না যেতেই কি অ্যাক্সেন্ট মারছে দেখো! গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ল্যাজওলা সি’র প্রতি আমার নিখাদ প্রেম। সি’র ল্যাজ গজালেই আপনাকে ‘zi’ বলতে হবে। পরশুরাম বেঁচে থাকলে গিয়ে বলে আসতাম ” শেষমেষ ‘z’ান্তি পেরেছি স্যর”! তো ভালোবাসায় দিগ্বিদিক ভুলে  ‘জী, জী’ করে যাচ্ছি, c/si/j/z কেউ ছাড় পাচ্ছে না।

সবে সপ্তাহখানেক হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছি কিন্তু তাতেই ওজন এবং আকৃতি নিয়ে ব্রেন বড় ঝামেলায় পড়েছে। সবই বেজায় ছোটো ছোটো লাগছে। মানুষজনের কথা ছেড়েই দিলাম, আলুর সাইজ দেখে ভাবছি সেপ্টেম্বরেই বাজারে নতুন আলু উঠে এসেছে? তাড়াহুড়োতে এয়ারপোর্টে চশমাটা হারিয়ে এসেছি তাই কাক এবং পায়রা চোখে পড়লেই মনে হচ্ছে নতুন চশমা বানানোটা নিতান্তই দরকার। এমনকি ক্যাম্পাসের চেরি ফলের গাছ দেখে ভাবছিলাম নতুন কোনো বেরি বোধহয়। মোদ্দা কথা হল, দৈত্যাকৃতি আমেরিকান পশু-পাখী, গাছপালা এবং জড়পদার্থ না দেখতে পেয়ে চমকে চমকে উঠছি আর স্বপ্নে গার্জিয়ান এঞ্জেল এসে বলে যাচ্ছেন “এটাই বাস্তব, ওটা জেনেটিক এঞ্জিনীয়ারিং-এর কেরামতি।” কালকে একটু তো তো করে বলেই ফেললাম “যাই বলুন, ও দেশে কিন্তু একটা আপেল টেবলের ওপর রেখে দিলে একটুও না টসকিয়ে মাস তিনেক থেকে যেত।” উলুবনে আর কত মুক্তো ছড়ানো যায় বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম  ল্যাজ, শিং নিয়ে টকটকে লাল রঙের শয়তান-ও দেখা দিয়ে যাচ্ছেন;  বেশি বিরক্ত করছেন না, খালি বলছেন “পাইরেট বে“।

জীবজন্তুর কথা প্রসঙ্গে বলি ইস্তানবুলের বেড়ালরা প্রায় বিশ্ববিখ্যাত। তাদের ক্যামেরাবন্দী করার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে লোকেরা আসেন। অতি সম্প্রতি টাম্বলারেও তুর্কী মার্জারকুলের দেখা পাওয়া যাচ্ছে । ইস্তানবুলের রাস্তায় মেলা বেড়াল দেখতে পাবেন –  সিংহের মতন কেশর নিয়ে পার্সিয়ান বেড়াল, ‘মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’র কভার থেকে উঠে আসা কালো কুচকুচে বেড়াল,  ইনসাইড-আউট ক্যাট এবং আর যা যা চাই। ক্যাম্পাসে অত বৈচিত্র্য নেই বটে, কিন্তু তেনারা সর্বত্র বিরাজমান। ক্যাফেটেরিয়া, লাইব্রেরী, ডরমিটরি তে তো বটেই কালকে দেখলাম এক দুধে-আলতা রূপসী সেমিনার রুমেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রথম দিন পৌঁছনোর পর সর্বপ্রথম অভ্যর্থনা জানাতেও এঁদেরই একজন উপস্থিত ছিলেন। বিদেশী বলে ভ্রূক্ষেপ অবধি না করে পায়ে মাথা ঘষতে শুরু করেছিলেন তারপর অবশ্য সেই কাজটাই সুটকেসের সঙ্গে করতে গিয়ে দু’জনেই সশব্দে পপাত চ । তাতে অবশ্য একটা কাজের কাজ হল, আমার পড়শীরা টের পেলেন “ভুবন ভ্রমিয়া শেষে…” ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এ যাতে ঢুকে না পড়েন, সেটা এনসিওর করতে গিয়ে চার রাউন্ড চু-কিতকিত খেলে জিততে হল কিন্তু এ শুনে পরাভূতকে অবহেলা করবেন না। কাঁচের দরজার এদিক থেকে দেখি রণে ভঙ্গ না দিয়ে তিনি পেছনের দু পায়ে দাঁড়িয়ে সামনের দু’পা দিয়ে দরজার হাতল ঘোরাচ্ছেন। বিশ্বাস করুন, টানছেন না,  ঘোরাচ্ছেন – দেখে চক্ষু স্থির এবং সার্থক দুটোই হল। মনে পড়ল বহু যুগ আগে ‘সৃষ্টি‘র বেড়াল সংখ্যার জন্য একটা ছড়া লিখেছিলাম,

অথ মার্জার ঘটিত

একটি পুষি ঘুমকাতুরে, আরেক মেনি ছোঁচা ;
ঠিক দুপুরে আসেন হুলো গোঁফটি খোঁচা খোঁচা।
কত আবদার, কত ডাক তার  – কিছুতেই নেই তুষ্টি
তবু মা বলেন,
“আহা ষাট ষাট, মা ষষ্ঠীর গুষ্ঠী”।

একটি বিল্লী দুধসাদা এবং মিশকালোটিও জাতভাই,
পাটকিলে যিনি সকালে আসেন, বরাদ্দ দুধ চাই-ই চাই।
সুযোগ পেলে মন দ্যান তিনি দু’টুকরো মাছ পাচারে,
তবু মা বলেন,
“আহা ষাট ষাট, মা ষষ্ঠীর বাছা রে”।

মার্জারকুলনন্দিনী আসেন ডিনার সারতে রাত্রে,
গোঁসা হয় ভারী, যদি না ধরি খাদ্য সাজিয়ে পাত্রে।
অভিমানী ভারী, সাধ্য-সাধনায় করেন অন্ন ধ্বংস,
তবু মা বলেন,
“আহা ষাট ষাট, মা ষষ্ঠীর বংশ”।

তিতিবিরক্ত হয়ে তাই বলি কৃপা কর দেবী আর নয়,
নিত্যিদিনই মার্জারকুলের এই উৎপাত কার সয়?
চড়ালাম ফুল, বুঝলেন ভুল, ছিলেন কি জানি কি ঘোরে,
মা বলে যান,
“দেবীর কৃপায় কোলটি গিয়েছে ভরে”।

সেই কথাই বলছিলাম আর কি, ষষ্ঠী যদি কোনো জায়গার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হন তো সে এই ইস্তানবুল!

(স্থিরচিত্র উৎস – Daily Cat Istanbul)

টার্কিশ কোলাজ – ১

Marmara_Sea

বেলা দশটার দিকে রোদ যখন বেশ ঝলমলিয়ে ওঠে, তখন অফিসের জানলা দিয়ে দূরে ‘সী অফ মারমারা‘ বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। বেশ মজাই লাগে; এই এতক্ষণ ধরে মনে হচ্ছিল দূরে শুধুই আকাশ আর তার মাঝে একটা ফুটকির মতন কালো মেঘ আর সূয্যিমামা দেখা দিলেই বোঝা যায় দিকচক্রবাল ভারী ঠকাচ্ছিল, আকাশের অনেকটাই আদতে জল আর কালো ফুটকিটা ছোট্ট একটা দ্বীপ বোধহয়। মারমারা কথাটা শুনে ইস্তক মনটা কি যেন হাতড়াচ্ছিল, কি যে সেটাই ঠাহর হচ্ছিল না। তারপর যেই উইকিদেবতা জানালেন কথাটা আদতে এসেছে গ্রীক শব্দ মারমারন থেকে, তক্ষুনি বুঝলাম রহস্যটা কি। মারমারন বলুন কি মারমারা, সবই বোঝায় মার্বল (যা নাকি ওখানকার দ্বীপে প্রচুর পরিমাণেই পাওয়া যেত এককালে); আর মার্বলের শুদ্ধ বাংলা বা সংস্কৃত? ভাবুন, ভাবুন! অ্যাই তো, এতক্ষণে ঠিক মনে পড়েছে – মর্ম্মর! অ্যামেচার এটিমোলজিস্টরা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন উত্তেজনার যথেষ্ট কারণ আছে। এটা দেখেই আমার এক টার্কিশ কলীগের সঙ্গে বসে গেলাম  দু’ভাষাতে কমন শব্দর একটা লিস্টি বানাতে (ওকে অবশ্য বলিনি যে আদতে বাংলা ভাষাই ঋণী) – আদালত, দুনিয়া, আয়না, দোস্ত আরো কত শত শব্দ যে বেরোল। আগের উইকএন্ডে যে  ইস্তানবুলের রাস্তায় ‘পেয়খানা’র-ও দেখা পেয়েছি, সেটা অবশ্য বেমালুম চেপে গেলাম।

বেশ কিছু পাকিস্তানি এম-বি-এ ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে আলাপ হল। প্রতি বছরেই তিন-চার জন করে আসে , এবারে একসঙ্গে সাতজন পড়তে এসেছে। কয়েকজন এসেছে লাহোর ইউনিভার্সিটি  অফ ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স থেকে, বাকিরা লাহোরেরই ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স থেকে। নাম প্রায় এক হলেও দুয়ের মধ্যে বিস্তর রেষারেষি। ভারতীয় অধ্যাপক শুনেই সব বিস্তর চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিল, “এই ব্ল্যান্ড তুর্কী রান্না খাচ্ছেন কি করে?”,  “কবে বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়াবেন আগে বলুন?”, “তাকসিম স্ক্যোয়ারের কাছে শুনেছি একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ আছে, ট্রাই করেছেন?” ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা জিনিস বোঝা গেল যে এরা সবাই বিরিয়ানি জিনিসটা ভারী মিস করছে। পাকিস্তানীদের বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়াব অত সাহস এখনো আসেনি, তাই বাড়িতে নেমন্তন্ন তৎক্ষণাৎ না করতে পারলেও কথা দিলাম ‘সোয়াদ’-এ গিয়ে একবার সবাই মিলে খেয়ে আসব। আমার কিন্তু টার্কিশ রান্না দিব্যি লেগেছে, ইউনিভার্সিটি  কাফেটেরিয়াতে অলমোস্ট বাড়ির স্টাইলে রান্না করে। যদিও ‘কেবাব নেশন’ হিসাবেই এ দেশ পরিচিত, এরা কিন্তু রান্নায় প্রচুর পরিমাণে দেশী বেগুন, বিলিতি বেগুন আর ইয়োগার্ট ব্যবহার করে। সুস্বাদু খাবারকে কেন ব্ল্যান্ড বলছে ভাবতে গিয়ে খেয়াল পড়ল বহুদিন আগে পড়া এই সত্যি ঘটনাটা –

বাজপেয়ী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন ইসলামাবাদ ( এদিকে মুশারফের চ্যালাচামুন্ডারা উল্টোদিকের বাসে করে কার্গিল যাচ্ছিল , বাজপেয়ী সেটা টের পান নি), সঙ্গে গেছেন বেশ কিছু ভারতীয় সাংবাদিক। দুপুরের খাবার খুঁজতে বেরিয়ে ঢুকেছেন রাস্তার পাশের এক দোকানে। মুঘলাই রান্নার বেজায় খোশগন্ধ বেরোচ্ছে, বাঙ্গালী এবং উত্তর ভারতীয়দের জিভ দিয়ে জল পড়ে আর কি। বাধ সাধলেন দক্ষিণী সাংবাদিকরা, ভেজ ডিশ পাওয়া যায় কিনা সেটা আগে কনফার্ম করতে হবে। ইতিমধ্যে বিশালদেহী পাঠান মালিক চলে এসেছেন, ভারতীয় পত্রকার শুনে বিশেষ সমাদরে তাঁদেরকে ভেতরে নিয়ে যেতে তৈরী। দক্ষিণী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানালেন আলবত ভেজ ডিশ পাওয়া যাবে! বেফিকর তসরিফ রাখার অনুরোধ জানিয়ে কথা দিলেন কোনো সমস্যা হবে না। তা কিছুক্ষণের মধ্যেই গরম গরম নন-ভেজ ডিশ চলে এল, কিন্তু ভেজ প্রিপারেশনের আর দেখা মেলে না।বাঙ্গালী জিভ প্রায় জলশূন্য হয়ে যায়, কিন্তু ভদ্রতা বলেও একটা ব্যাপার আছে। আরো বোধহয় মিনিট চল্লিশ  পর অবশেষে ভেজ ডিশের আগমন – বিশাল বাটি ভর্তি বড় বড় মাংসের টুকরোর চোখ জুড়িয়ে দেওয়া, মন উদাস করে দেওয়া ঝোল। আর অবশ্যই সঙ্গে কিছু সব্জীর টুকরো।

তাই টমেটো, বেগুন আর ইয়োগার্টের মধ্যে মাংস ঠেসে দিলেও ব্ল্যান্ড যে লাগবে, তা বলা বাহুল্য!

(স্থিরচিত্র উৎস – Google images, http://en.loadtr.com/Marmara_Sea-404337.htm)

শিক্ষক দিবসের গপ্পো

(বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – সর্বৈব সত্য কথা)

মধ্য কলকাতার কলেজটিতে পাস কোর্সের স্টুডেন্ট পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু সেই কারণেই যে পৃথুলা অধ্যক্ষার চলতে ফিরতে হাঁফ ধরে যাচ্ছে, এ কথা অবশ্য অধিকাংশ অধ্যাপক-অধ্যাপিকারাই মানতে চাইছেন না।  কিন্তু সেসব গুনগুনানি সবই আড়ালে, আবডালে। তার অবশ্য বিস্তর কারণ আছে, ভদ্রতার খাতির বাদ দিয়েও। মূল কারণ অবশ্যই ওই ‘অধ্যাপক’ তকমাটা ধরে রাখা। আদতে কিন্তু সত্তর শতাংশই পার্ট টাইম লেকচারার, মাস গেলে হাজার আটেক কি হাজার দশেকে এনারা কিভাবে দিন গুজরান করেন, সে একটা রহস্য বটে। মোটামুটি সবাই ইউনিভার্সিটির র‍্যাঙ্ক-হোল্ডার তাই বাপ-মা নিতান্তই ঘর থেকে খেদিয়ে দিতে পারছেন না, চক্ষুলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু এত লেখাপড়া শিখিয়ে শেষে এই, এর থেকে তো মাদুর পেতে টিউশনি করতে পারতিস এসব হৃদয়বিদারক আক্ষেপকে ট্যাকল করার জন্য হাতে রয়ে গেছে ওই ‘অধ্যাপক’ তকমা। অন্তত লোককে বলা যায়, কে আর তারপর খতিয়ে দেখতে যাচ্ছে ফুলটাইম না পার্টটাইম। এর মধ্যে আবার ‘ইতি গজ’ কে জোরদার করে তুলতে সরকার পার্মানেন্ট পার্ট-টাইম লেকচারারশিপের ব্যবস্থা করেছেন। অবাক হবেন না, মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর বুদ্ধি এখনো গজগজ করছে। তা সাতসকালে অধ্যক্ষার গজগজানি না শুনলে যে আট-হাজারি চাকরিটা চলে যাবে সে ভয় নেই। কিন্তু আশায় মরে চাষা, বছর দশেকের মধ্যে একটা ফুলটাইম পজিশন বেরোবে না কে বলতে পারে? তাই বসকে কার্বোহাইড্রেট কমানোর উপদেশ দিয়ে শহীদ কেই বা হতে চায়? কলেজে পড়ানোর স্বপ্ন দেখার মতন বোকামি এরা করে ফেলেছেন তো বটেই তবে কিনা মানুষ ঠেকে শেখে। তাই অধ্যক্ষার টনক নড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ছুটে গেছে এঁদের-ও (অবশ্য টাকী কি বর্ধমান  থেকে যারা ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করেন তাঁদের ঘুমটুমের বিলাসিতা দেখানোর স্কোপ নেই; একটাই সুবিধে, ভোরের প্রথম আর রাতের শেষ ট্রেনে যাতায়াত করতে হয় বলে বসে ঝিমনো যায়।)।

তো হপ্তাখানেক ধরে অনেক মাথার চুল ছেঁড়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উচ্চ-মাধ্যমিকে পাস করলেই ঢুকিয়ে দেওয়া হবে, মার্কস নো বার। কেউ কেউ একটু আপত্তি করছিলেন বটে তবে তাদেরকে এক ধমকেই থামানো গেছে – আরে এঞ্জিনীয়ারিং কলেজগুলোতেই যদি উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করলেই অ্যাডমিশন মেলে, জেনারেল কলেজ কি সাপের পাঁচ পা দেখেছে? এ খবরটা অনেকে আবার জানতেন না তাই ভাবী এঞ্জিনীয়াররা ঠিক কিরকম রাস্তাঘাট, বাড়ি বা সফটওয়্যার বানাবেন সেসব ভেবে একটু চমকে চমকে উঠছিলেন, কিন্তু একটা ভালো কাজে অত খুঁত না কাড়াই ভালো।

বাংলার ম্যাম আর উর্দুর ছোকরা অধ্যাপকের ওপর ভার পড়েছিল অ্যাডমিশন প্রসেসটা সামলানোর। সক্কাল সক্কাল বেশ কিছুক্ষণ মাছি তাড়ানোর পর দেখা গেল গুটগুট করে বেশ কিছু ছেলেপুলে আসছে এদিক পানে।অধিকাংশেরই বেশ কৃশকায়  চেহারা, সময় সময় এত ধুঁকতে ধুঁকতে আসে মনে হয় অ্যাডমিশনের বদলে খাবার দিলে কাজের কাজ হত। কলেজ মধ্য কলকাতাতে হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ শহরতলী (মানে সুন্দরবন) থেকে ট্রেনে করে আসে। এত কষ্টের কারণ একটাই, স্থানীয় দাদারা বলে দিয়েছেন যতই পার্টিলিস্টে নাম লেখাও, ভবিষ্যৎ-এ গ্রুপ ডি স্টাফের চাকরির জন্য একটা ডিগ্রী নিতান্তই দরকার। যাই হোক, বাংলা-উর্দু কম্বিনেশনে চমৎকার কাজ চলছিল, ভর্তির ফর্মে দমাদ্দম সিল মেরে ঢালাও অ্যাডমিশন। গোল বাধল আরেকটু দুপুরের দিকে যখন ইউনিয়নের দাদারা ভাতঘুম দিয়ে হেলতে দুলতে কলেজে ঢুকলেন। বাংলা ম্যামের সামান্য তন্দ্রা মতন আসছিল হঠাৎ চেঁচামেচি শুনে দেখেন জনা  তিন বেজায় মুশকো চেহারার লোক সোনার চেন পরে ধাঁধাঁ করে এদিক পানেই দৌড়ে আসছে। ভারী ভয় পেয়ে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন, উর্দুর অধ্যাপক আশ্বস্ত করলেন “ভয় নেই, ওরা ইউনিয়ন করে।” “বলেন কি? ছাত্র নাকি?” “হাসালেন ম্যাডাম, স্টুডেন্টস ইউনিয়নে আবার ছাত্র কোথায়?” ইতিমধ্যে তারা এসে মহা হুল্লোড় লাগিয়ে দিয়েছে “এসব কি ম্যাডাম, আপনারা তো কলেজের কোনো প্রেস্টিজ রাখলেন না।” বাংলা ম্যাম একটু কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন “কেন বলুন তো?” যে ষন্ডাটি সোনার চেনের সঙ্গে কানে একটা মাকড়িও পড়েছিল সে বলল “আরে ম্যাডাম, আমরা আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। তুমি বলুন, আপনিটাপনি নয়।” লিভাইস জিনসধারী অবশ্য সম্বোধন নিয়ে অত বিচলিত নয়, “আররে, ওসব রাখ। এনারা টিচার না চিটার? ইউনিয়নকে কেউ কিচ্ছু জানাল না, আমরা না এসে পড়লে তো আজ ভুষিমালে ভরিয়ে দিতেন।” উর্দুর তরুণ প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তৃতীয় দাদা শত্রুঘ্ন সিনহার ‘খামোশ’ স্টাইলে এমন হাত দেখালেন যে প্রতিবাদটা বেমালুম গিলে ফেলতে হল। কিন্তু বাংলার ম্যামকে দমানো অত সহজ নয়, এমনিতে ভয়টয় নিয্যস পান কিন্তু ঝগড়া একবার শুরু হয়ে গেলে অপরপক্ষের বুকে উঠে দাড়ি উপড়ে তবে শান্তি। “আপনারা থাকেন কোথায়? প্রিন্সিপাল তো নোটিশ পাঠিয়েছিলেন, জবাব দেন নি কেন? আপনারা মিছিল থেকে এদিকে তাকানোর ফুরসত পাবেন না আর দোষ শুধু আমাদের?” এত ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠবেন কেউ সেটা এক্সপেক্ট করেনি বোধহয়, সবাই  ব্যোমকে গেছে। প্রিন্সিপালের নোটিশ পাঠানোর খবরটা ডাহা ধাপ্পা কিন্তু এত কনভিকশন নিয়ে বলেছেন যে এরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। নিজেদের মধ্যে কি গুজুরগুজুর করে কেটে পড়ল, মাকড়িধারী যেতে যেতে খালি বলে গেল “ম্যাডাম, আপনি বলবেন না। আমরা আপনার থেকে অনেক ছোট।”

এর পরপরই ছেলেপুলের আসা বন্ধ হয়ে গেল। আরো ঘন্টাখানেক ওয়েট করে এরা উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন, আর ঠিক তক্ষুনি দেখা গেল বড় লীডার একটা বিশাল মিছিল নিয়ে আসছেন। পেছনে সাঙ্গোপাঙ্গ আর তাদেরও পেছনে বেশ কিছু অ্যাডমিশন প্রার্থী। লীডার এসে একটা চার্মিং হাসি (ইকোনমিক টাইমস যেমন রঘুরাম রাজনের হাসিকে ‘স্যোয়াভ’ বলে ঠিক সেরকমটি) উপহার দিয়ে বললেন “আপনারা আমাদের সাপোর্ট নিতে না চাইলে কি হবে আমরা কিন্তু সবসময়েই সাপোর্ট দিতে চাই। আফটার অল, কলেজের ভালো দেখাটাই তো আমাদের কাজ। নিন, এদের সবাইকে ভর্তি করে নিন।” ঘন্টাদেড়েক বাদে সব কাজ চুকিয়ে ওঠার সময় খেয়াল পড়ল উর্দুর অধ্যাপক বেপাত্তা। কলেজ গেট দিয়ে বেরনোর সময় বাংলা ম্যাম দেখেন ভদ্রলোক এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখ চুন করে সিগ্রেট খেয়ে চলেছেন। গলা খাঁকারি দিতে ভদ্রলোক তাকিয়ে একটু ম্লান হাসলেন। ইউনিয়ন নিয়ে এমনিতেই মাথা গরম হয়ে ছিল, তারমধ্যে ইনি লা-পতা হয়ে যাওয়ায় ম্যাম ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন, “আশ্চর্য লোক তো মশাই আপনি, আমাকে একা ফেলে রেখে এখানে এসে সিগ্রেট খাচ্ছেন?” “সরি, আসলে উপরি রোজগারটা মিস হয়ে গেল। তাই অল্প দুখী হয়ে পড়েছি।” বাংলার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে বললেন, “ইউনিয়নের ভোল পালটে গেছে দেখে একটু সন্দেহ হল। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, সবার থেকে টাকা নিয়ে খাতায় নাম লেখাচ্ছে। সেই নিয়ে প্রশ্ন করতেই ফিফটিন পারসেন্ট অফার করল !” অধ্যাপিকার বাক্যিহারা মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন “চিন্তা নেই, আপনাকেও ভুলে যায়নি। যাচ্ছিল আপনার কাছে, বলে দিলাম আরে ও মহা খাড়ুশ মহিলা, ওসব ফ্যাচাং-এ যেও না। যা করছ করো, আমি কিছু বলছি না।”

বাংলা ম্যাম কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে দৌড়লেন। আট হাজারীদের ইমোশনাল হলে চলবে না, বাস মিস করলেই চিত্তির।

বিপন্ন কাদিন

স্প্রিংকলার থেকে জল ছড়িয়ে পড়ার বিরামহীন শব্দ চুপটি করে থাকা ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধতাকেই আরো জোরদার করে তুলছে। সেমিস্টার শুরু হতে এখনো দিন পনের বাকি, তরুণ অধ্যাপক খেয়াল করলেন ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এও খুব কম অ্যাপার্টমেন্টেই  আলো জ্বলছে। ক্যাম্পাসের চওড়া পিচের রাস্তার দু’ধারে সার দিয়ে মৃদু  নিওনের আলো ভারী মায়াবী লাগছিল, জোর করেই নস্টালজিক হতে ইচ্ছে করছিল জে-এন-ইউ র দিনগুলোর কথা ভেবে। সম্বিত ফিরে এল অধ্যাপকজায়ার উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে, “এই, গন্ধটা পাচ্ছ?” গন্ধ একটা নাকে আসছিল বটে, রাস্তার পাশের লন থেকে কাটা ঘাসের গন্ধ। সে কথা বলাটা সমীচীন হবে না বোধ করে সেফ খেললেন, “কই না তো, কিসের গন্ধ?” “আহ,  কনসেন্ট্রেট করো। ভারতীয় মশলার গন্ধ পাচ্ছ না? কিরকম একটা হিং-বাটার গন্ধ।”  অধ্যাপকজায়ার ঘ্রাণশক্তি প্রখর সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই কিন্তু একবার ভাবনা হল খিদের চোটে নাক হ্যালুসিনেশনে ভুগছে না তো। ইস্তানবুলের ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছেছেন ঘন্টা দুয়েক হল; এয়ারপোর্টের খাবার পছন্দ না হওয়ায় প্ল্যান ছিল ক্যাম্পাস ক্যাফেটেরিয়াতে ডিনারটা সারার। এদিকে দু’জনেই বেমালুম ভুলে গেছেন যে সেদিনকে তুরস্কের ‘বিজয় দিবস’, একানব্বই বছর পুরনো তুর্কী ইতিহাস ভুলে যাওয়ার ফলশ্রুতি হতে চলেছে নিরম্বু উপবাস। নিরম্বুটা বাড়িয়ে বলা নয়, জলের রসদ-ও শেষ অথচ ক্যাম্পাসময় ক্যাফেটেরিয়া, গ্রসারি স্টোর, ডর্ম ডাইনিং হল বন্ধ। হিং-বাটার গন্ধ স্নায়ুমন্ডলীকে সত্যি সত্যি কতটা উত্তেজিত করে জানা নেই, তবে অধ্যাপকজায়া রীতিমতন হুমকি দেওয়ার ভঙ্গীতে কানে কানে বললেন “মিনিট দশেকের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না করলে আমি কিন্তু ফ্যাকাল্টি হাউসিং-এর দোরে দোরে গিয়ে হামলা শুরু করব।” এহেন মরিয়া প্রস্তাবে পিলে চমকানোরই কথা, অধ্যাপক আরো ব্যাকুল হয়ে চারপাশে তাকাতে শুরু করলেন কোনো মধুসূদন দাদার দেখা পাওয়ার আশায়। মনে মনে ‘ত্রাহি  মধুসূদন’ বলেছেন আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা মিলল। মাথাভরতি উসকোখুসকো চুল, গালে এক মুখ দাড়ি দেখে স্পষ্টতই বোঝা গেল ইনি গবেষক ছাত্র। খাবার কোথায় পাওয়া যাবে শুনে অনেকক্ষণ মাথা চুলকে, দাড়িতে টান মেরে জানালেন “ইওর বেস্ট বেট উড বী…”, আধ মিনিটের সাসপেন্স, “হাঙ্গার”।

খিদের মুখে এহেন উত্তর শুনে অধ্যাপকঘরণী প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছিলেন, তাঁকে কোনোমতে সামলিয়ে অধ্যাপক কাষ্ঠ হেসে থ্যাঙ্কস জানিয়ে এবং মনে মনে মুন্ডপাত করতে করতে চললেন আধ মাইল ঠেঙ্গিয়ে মেন গেটের উদ্দেশ্যে – যদি দ্বাররক্ষকরা কোনো সহায়তা করতে পারেন। এর মধ্যে আলোকোজ্জ্বল মেন রাস্তা না ধরে শর্টকাট হবে এই আশায় একটা ঢালু জমি দিয়ে নামতে গিয়ে দু’জনেই প্রায় ‘জংলী’র শাম্মী কাপুর এবং সায়রা বানুর স্টাইলে গড়াগড়ি খেলেন। স্বভাবতই সায়রা বানুর মতনই অধ্যাপকজায়াও এমন হিংস্র চোখে তাকালেন যে হার্টবীট মিস হওয়ার জোগাড়। আরো মিনিট দশেক উর্দ্ধশ্বাসে পা চালিয়ে মেন গেটে পৌঁছনো গেল। মুশলিক এই যে দ্বাররক্ষক তরুণ তুর্কীরা কেউই ইংরেজীটা বোঝেন না। না মানে না-ই, ইয়েস-নো-ফাদার-মাদার অবধি না। বহু ইংরেজী-তুর্কী বোবা বাকযুদ্ধের মাঝে একজন হঠাৎ প্রায় আর্কিমিডিসের মতনই ইউরেকা বলে নেচে উঠলেন। অধ্যাপক এবং তাঁর সহধর্মিণী দুজনেই বেজায় চমকেছেন, মিরাকল তাহলে সত্যিই ঘটে। একটু পরে বোঝা গেল আর্কিমিডিস ‘ওয়াটার’ শব্দটা বুঝতে পেরেছেন এবং তাই সানন্দে দুজনকেই অভ্যর্থনা জানিয়েছেন ঘরে কোণে রাখা ওয়াটারকুলার থেকে জল নিয়ে খেতে। কিন্তু তার বেশী আর কিছুতেই এগনো যায় না; হাত মুঠো করে মুখের দিকে আনার সঙ্কেতেও তাঁরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। পেটে কয়েকবার হাত বুলিয়ে দেখানোয় ঘোর সন্দেহের চোখে তাকালেন; অধ্যাপকজায়া বিস্তর রেগেছিলেন, তার মধ্যেও ফিসফিস করে বললেন “ওগো, ওসব দেখিও না। যদি ভাবে পেটে ব্যাথা করছে?” তারপর কি ভেবে বললেন “সরো, আমি একটু টার্কিশ জানি; চেষ্টা করে দেখি।” অধ্যাপকের হাঁ হয়ে যাওয়া মুখ আরো হাঁ করিয়ে দিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন “কাদিন, কাদিন”। সেই শুনে সবাই কিরকম লক্ষ্মী ছেলের মতন ঘাড় নাড়তে লাগল। কাদিন শুনেই এক সুদর্শন তরুণ (বলা বাহুল্য যে এনারা সবাই সুদর্শন) খান দুয়েক ফোন থেকে চার-পাঁচ বার কাদের ডায়াল করে ফেললেন। অতঃপর হিরো এলেন, স্লো মোশনে, বাইকে চড়ে। এবং শুধোলেন “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?” এর থেকেও দরদী ভাষা মানবজাতির ইতিহাসে কিছু আছে? যাই হোক, ইনি জানালেন সবই বন্ধ কেবল ডমিনোজের পিজ্জা পাওয়া যেতে পারে। কমিউনিস্ট আপব্রিঙ্গিং থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক বিলক্ষণ জানতেন পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে শুধু আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল গুলো, হাতেনাতে থিয়োরী প্রুভ হচ্ছে দেখে বেজায় খুশী হচ্ছিলেন তবে মনে পড়ল আগে কাদিন রহস্যের উদ্ধার করা দরকার। “কি বললে বলো তো? এ তো ম্যাজিক।” “না তো কি? তোমার ভরসায় থাকলেই হয়েছিল আর কি?” গোঁফে তা দিয়ে অধ্যাপক প্রত্যুত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, মসৃণ চামড়ার ওপর দিয়ে হাত পিছলে যাওয়ায় খেয়াল পড়ল ম্যানেজমেন্ট স্কুলে পড়ানোর হেতু বহুদিনের সঙ্গীকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করে এসেছেন। সেই দুঃখেই বোধহয় কড়া উত্তরের বদলে সারেন্ডার ঘোষণা করে বললেন “সে কথা আর কবে অস্বীকার করলুম? তুমিই রক্ষক। কিন্তু মানেটা কি?”
-“আমি নারী।”
-“অ্যাঁ! শুধু নারী?”

-“আবার কি? সরাসরি বললাম ‘ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস’ “।

-“ড্যামসেল তো বুঝলুম। কিন্তু ইন ডিস্ট্রেস?”
-“এ ড্যামসেলের এত দুর্দিন আসেনি যে ইন ডিস্ট্রেস উচ্চারণ করে বোঝাতে হবে। ওর জন্য ভ্রূভঙ্গীমাই যথেষ্ট।”

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমোহ্!

পুনশ্চ – দাড়িওয়ালা তরুণ তুর্কীকে বৃথাই গালমন্দ করা, আজকেই জানা গেল ক্যাম্পাসের এক প্রান্তে অবস্থিত ফ্যাকাল্টি ক্লাব কাম রেস্তোরাঁটির নাম ‘হাঙ্গার’, অনেক রাত অবধি খোলা থাকে!