দিদিমণি

ছেলেটার চোখ রীতিমতন ছলছল করছে, আর সেটাই স্বাভাবিক কারণ ঠাকুমা যে তাঁর আদরের নাতিকে কড়া ধমক দিতে পারেন এরকমটা কোনোদিন আন্দাজ করতে পারেনি। অঙ্ক ভুল হলে বাবার হাত থেকে খাতা যখন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বারান্দায় পড়ে, তখন বেতো পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এই ঠাকুমাকেই তো দৌড়ে আসতে হয়। মিত্র লাইব্রেরী থেকে জেঠু লীলা মজুমদারের নতুন বই কিনে আনতে ভুলে গেলে অভিমান কমানোর জন্য এই ঠাকুমাই তো ফ্রেঞ্চটোস্ট বানিয়ে মুখের কাছে ধরে বলেন “লক্ষ্মী বাবা আমার, স্যান্ডউইচ টা খেয়ে নে” (এই ভুলটা কেন যে কেউ ভাঙ্গিয়ে দিল না কোনোদিন কে জানে!)। তো সেই ঠাকুমা বকতে শুরু করলে চোখে অন্ধকার দেখারই কথ। ঠাকুমা মানে বড় মিষ্টি একটা ব্যাপার, ছোট্টখাটো চেহারায়, কুঁচকে যাওয়া চামড়ায়, শাড়ীর আঁচলের কোণা থেকে ঝুলতে থাকা এক গুচ্ছ চাবির রুনঝুন আওয়াজে সব পেয়েছির ছেলেবেলা। কিন্তু তিনি কুপিত হলে বাঁচায় কে? চোখ ছাপিয়ে জল বেরনোর উপক্রম হচ্ছিল, এমন সময় দরজায় এসে তিনি দাঁড়ালেন আর ছেলেটা স্পষ্ট দেখতে পেল তিনি চোখ দিয়ে হাসছেন, অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আর যেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “কি হল মাসিমা, বকছেন কেন অপুকে?” অমনি ওর মনে পড়ে গেল জানলার গরাদ ধরে টারজান টারজান খেলার সময়ে যখন পাশের বাড়ীর দাদা-দিদিরা ওকে দেখে বেজায় হাসছিল, ইনিই তখন ওদেরকে সরিয়ে দিয়ে গল্প করতে শুরু করেছিলেন। পাক্কা এক ঘন্টা ধরে গল্প হয়েছিল, আর ওর মতনই সারাটা সময় ধরে উনিও গরাদ ধরেই দাঁড়িয়েছিলেন।  ঠাকুমা ততক্ষণে  জানিয়েছেন আজ দুপুরে কি করে চোর বমাল সমেত হাতে নাতে ধরা পড়েছে। দুপুরবেলাটা সাধারণত ঠাকুমার একটা তন্দ্রা আসেই, সেদিন এমন প্যাচপেচে গরম যে বাধ্য হয়ে ‘কুট্টি ঘরে’ গেছিলেন বড়ি আর আচারগুলো কাজের লোক ঠিকঠাক তুলে রেখেছে কিনা দেখার জন্য । গিয়ে দেখেন গুণধর নাতি মেঝেতে বসে, টুঁ শব্দটি না করে সেদিনই ডাকে আসা নবকল্লোল পড়ে চলেছে। চোখ দিয়ে যিনি হাসছিলেন, তিনি বেশ বড় বড় চোখ করেই শুনছিলেন ঘটনাটা কিন্তু ‘নবকল্লোল’ শোনামাত্রই হইহই করে হেসে উঠলেন। আর সারাটা ঘর পানের মশলার কি সুন্দর একটা গন্ধে ভরে গেল। ঠাকুমার অবশ্য মোটেও আমোদ পান নি, “তুমি আর হেসো না বাপু, বাপের জন্মে কেউ শুনেছে সদ্য ক্লাস টু-এ ওঠা ছেলে নবকল্লোল পড়ছে?” তিনি  ভারী মিষ্টি করে হেসে বললেন “আচ্ছা, আমি দেখছি কি করা যায়।” বলে ওর হাত ধরে নিয়ে গেলেন পাশেই পড়ার ঘরে। আর তক্ষুণি বোঝা গেল ইনিই নতুন দিদিমণি, যাঁর কথা বাবা গত সপ্তাহেই বলে রেখেছে। অত বকুনি খাওয়ার পরেও মনটা ভারী খুশী খুশী লাগছিল অপুর।

ওকে চেয়ারে বসিয়ে উনি বসলেন মাটিতে। আর সাত বছরের চঞ্চল হাঁটুগুলোর ওপর একটা আশ্বাসের হাত, আর একটা প্রশ্রয়ের হাত রেখে বললেন “আমি যদি তোমায় প্রত্যেক সপ্তায় একটা করে নতুন বই দি, তুমি আর নবকল্লোল পড়বে না তো?” বাধ্য ঘাড়টা নড়তেই ভারী খুশী হয়ে উনি গাল দুটো টিপে দিলেন। আর সেই শুরু হল এক অসমবয়সী বন্ধুত্বর। দিদিমণির বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, আর ওর বয়স সাত – কিন্তু তাতে কি  এসে যায়? উনি মন দিয়ে ওর লেখা প্রথম উপন্যাস পড়লেন। ৮৬-র আনন্দমেলাতে দু’পর্বে বেরনো উপন্যাস ‘মাঠের রাজা’ পড়ে ভারী ইন্সপায়ারড হয়ে ও-ও লিখে ফেলেছিল ‘মাঠের সম্রাট’ – আসলটা ফুটবল নিয়ে, আর ওর লেখাটা ক্রিকেট নিয়ে। প্রথম কে পড়বে? অফ কোর্স দিদিমণি, যিনি চোখ দিয়ে অত সুন্দর করে হাসেন আর অত সুগন্ধি পান-মশলা খান তিনি এ সুযোগ পাবেন না তো পাবেটা কে? খুব মন দিয়ে পড়লেন, প্রচুর উৎসাহ দিলেন আর এটাও মনে করিয়ে দিলেন – মাঠের সম্রাট নামটা দেখে মনে হচ্ছে না এটা অপুর নিজের দেওয়া নাম আর উপন্যাসের মধ্যে পাঁচ পাতা জুড়ে স্কোরকার্ড না থাকলেই ভালো হয়। উনি ‘নৃত্য’ দিয়ে বাক্যরচনা করানোর সময় উদয়শঙ্করের গল্প বললেন, অপু আবার সেটাই স্কুলের পরীক্ষায় লিখে এসে প্রচুর বাহবা পেল। উনি প্রথম সুকুমার দে সরকারের বই পড়ালেন, আর সেই জল-জঙ্গল-জন্তুর আশ্চর্য জগতের সন্ধান পেয়ে অপু ভাবল এরকম বন্ধুটি পৃথিবীতে আর কারোর নেই। উনি পায়েস রেঁধে এনে ওর জন্মদিনে খাওয়ালেন, পঞ্চাশ বছরেও কেন বিয়ে করেননি এহেন পাকা প্রশ্ন শুনেও হেসে কুটিপাটি হলেন আর প্রমিস করলেন শীতটা ভালোমতন পড়লেই ওকে নিয়ে চিড়িয়াখানা বেড়াতে যাবেন, শুধু ওরা দু’জন। অন্য কেউ হলে অপুর মোটেই বিশ্বাস হত না যে বাবা সেটা অ্যালাও করবেন কিন্তু দিদিমণি বলেছেন যখন সে কথার নড়চড় হবে না , এ কথা সে বিলক্ষণ জানে।

তখনো কলকাতায় ভালো শীত পড়ত, রাত্রিবেলা ও আর ওর বোন সদ্য বানানো, রঙ্গীন কভার দেওয়া নরম লেপের মধ্যে ঠাকুমার মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত, সে কথা মনে পড়লে মনে হয় ওরকম আরাম আর কিচ্ছুটিতে যেন পায়নি। শীতকালে বাবাকেও যেন একটু কম রাগী মনে হত, অঙ্ক ভুল হলেও হেসে বুঝিয়ে আবার করাত। হাওড়া, বালি, চন্দননগর, দিল্লী থেকে পিসীরা চলে আসত  – গল্পগুজব, হইচই, নিত্যি নতুন খাওয়ার মধ্যে শীতকাল ম’ম করে জাঁকিয়ে বসছিল। কিন্তু এর মধ্যেও চিড়িয়াখানার প্ল্যানের কথা অপু ভোলেনি। মুশকিল এই যে ডিসেম্বরের তিন সপ্তাহ দিদিমণি এলেন না, শোনা গেল কোথায় বেড়াতে গেছেন। অন্য সময় হলে হয়ত একটু বেশীই মন খারাপ হত, শীতের মাহাত্ম্যেই কিনা কে জানে ততটাও হল না। একবার অবশ্য ভেবে একটু অবাক হয়েছিল যে তিন সপ্তাহের জন্য দিদিমণি বেড়াতে চলে গেলেন অথচ ওকে কিছু না বলে, এটা কেমনতর কথা! কিন্তু সেটুকু মন খারাপ-ও টিঁকে থাকল না। তারপর সব ভালো কিছুর মতনই উইন্টার ভেকেশন-ও শেষ হল, আর দিদিমণির কথা ভীষণ মনে পড়তে শুরু করল। প্রশ্নের ঠেলায় ঠাকুমা জেরবার হয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর কাছেও খবর ছিল না।

তারপর একদিন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ দিদিমণি এলেন, ইউজুয়াল বিকাল পাঁচটার বদলে।  একটা বইয়ের বদলে একটা আস্ত প্যাকেট, আর সেই প্যাকেট খুলে অনেক অনেক মণিমুক্তো বার করতে থাকলেন কিচ্ছুটি না বলে। প্রথমবারের জন্য হাসছিলেন না, অত সুন্দর চোখ খুলে রেখেও। তারপর বইগুলো একসঙ্গে হাতে তুলে দিয়ে বললেন “সব কটা পড়বে কিন্তু, আর তারপর আমাকে চিঠি লিখে জানাবে কেমন লেগেছে- হ্যাঁ ?” এত অবাস্তব কথা শোনার সময়েও  খেয়াল পড়ল সবসময়ের মতন এখনো পান-মশলার সেই আশ্চর্য সুন্দর গন্ধটা ঘরজুড়ে  ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিনকে আর পড়ালেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার, মন খারাপের রেশটা যেন সারা সন্ধ্যা জুড়ে বাড়ির সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, কোনদিন যা হয় না সেটাই হল – খাবার টেবলে বিশেষ কথাবার্তাই হল না। অথচ ও  জানত ঠাকুমা ছাড়া আর কারোর সঙ্গে দিদিমণির কথাই হত না।

কেন পঞ্চাশ বছরে একটা স্কুলে পড়ানোর চাকরী নিয়ে বরোদা চলে গেছিলেন সে এক রহস্য। কেন উনি চলে যাওয়ার পরে পাশের বাড়ির লোকেদের মুখে একদিনের জন্যও ওঁর কথা আর শোনেনি, সেটাও রহস্য। বাড়ি ছাড়ার দশ বছর পর ওখানে ফিরে গিয়ে যখন দেখল সেই বাড়ি ভেঙ্গে ফ্ল্যাট উঠেছে অথচ দিদিমণির কথা কেউ মনে করতে পারল না, সেটাও একটা রহস্য।

সাত বছরের ছেলে যদি কথা না রাখে তাহলে কি নিয়তি নিষ্ঠুরতা করে? হয়ত তাই,  কিন্তু নবকল্লোল আর সে পড়েনি, অন্তত পরের দশ বছরের জন্য। কিন্তু দিদিমণি ফিরে আসেন নি, বড় হয়ে খেয়াল পড়েছিল নামটাই তো কোনোদিন জানে নি, কিন্তু ততদিনে বাড়ির লোকেরা কেনই বা মনে রাখবে? পঁচিশ বছরে চেহারাটাও মুছে গেছে, শুধু ভরসা একটা জায়গাতেই – সেই পান মশলার গন্ধে। কোনোদিন হয়ত সেই গন্ধটা নিখুঁত ফিরে পাওয়া যাবে, আর Olfactory Bulb থেকে বেরিয়ে আসবে অনেকটা ভালোবাসা, অনেকটা স্নেহ।

Advertisements

5 thoughts on “দিদিমণি

  1. SHUVRA DEY says:

    Galpo-ta poray khub bhalo laaglo. Nostalgia meshano ek adbhut bishonnota jeno sheeter bhorer kuasha-r maton montake ashte-prishte bendhe phello. Ei rokom kato jana-ajana galpo moner bhetor apna thekei unki marlo aar ekbar. Apnar lekhoni-ke dhanyabad. Aaro kichhu bhalo lehar ashai roilaam bandhu

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s