Ligne Claire, কলকাতা স্টাইল

আশি কি নব্বই দশকের প্রি-টিন/টিনএজারদের কাছে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর ধন্যবাদ প্রাপ্য; যতই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ‘বাজারী গোষ্ঠী’ কি ‘বাজারী পত্রিকা’ বলে তুলোধোনা করুক না কেন, একথা অনস্বীকার্য যে আনন্দমেলা এদের সবার জন্যই সুখপাঠ্য কিশোর সাহিত্যের একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়ে গেছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়; রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত ঘরের হাজার হাজার বাবা-মার ঘোর আপত্তি কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চমৎকার কিছু বিদেশী কমিকসের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দেওয়ার আপাত-ধৃষ্টতা  দেখানোর জন্যও আনন্দমেলা ধন্যবাদার্হ। এবং এটা বলা বাহুল্য যে বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে টিনটিনকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে একমাত্র কারণ হল আনন্দমেলা (এবং নীরেন চক্কোত্তি মশাই, বাংলায় এখন টিনটিন পড়তে একটু অস্বস্তিই হয় কিন্তু কুট্টুস এখনো স্নোয়ি হয়ে উঠতে পারল না আমার কাছে!)।

টিনটিনকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই (বা হয়ত আছে, কিন্তু আপাতত থাক) – গল্পের বাঁধুনি, চরিত্রের বৈচিত্র্য, দুরন্ত সব পটভূমিকা ,  সুপারডুপার হিট হওয়ার কোন উপাদানটা নেই বলুন তো? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে এ সব কিছুর সঙ্গে ‘লিনেউ ক্লেয়ার’ (Ligne Claire) স্টাইলটাও  সাফল্যের একটা অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হিসাবে দেখা উচিত। টিনটিনের স্রষ্টা আরজে বা হার্জেই (কিন্তু হার্জ নয়) এই স্টাইলের প্রবর্তক; স্পষ্ট, কাটা কাটা রেখায় একটা ইউনিফর্মিটি এনে দেওয়ার প্রচেষ্টা (শেডস? নৈব নৈব চ!) শিল্প-সমালোচক দের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছিল জানি না কিন্তু কমিক্স-প্রেমী ছেলেবুড়ো যে এই স্টাইল দেখে বেজায় আহ্লাদিত হয়েছিলেন সেটা না বললেও চলে। ফ্রেঞ্চ এবং বেলজিয়ান আর্টিস্টরাই মূলত আরজের দেখাদেখি এই স্টাইলটা আয়ত্ত করেন। টিনটিন ছাড়াও অন্য বেশ কিছু জনপ্রিয় ইউরোপিয়ান  কমিকসে  আমরা এই ধরণের কাজ পেয়েছি। এই মুহূর্তে মাথায় আসছে ‘ব্লেক এবং মর্টিমার’ এর কথা।

Blake et Mortimer 2

মজার ব্যাপার হল সাত বছর বয়সে প্রথমবার টিনটিন পড়তে গিয়ে Ligne Claire ব্যাপারটা সেরকম ভাবে কোনো ছাপই ফেলেনি মনে, কারণ গল্প এতই টানটান ছিল এবং চরিত্রগুলো এতই বর্ণময় যে কমিকস পড়ছি এরকমটা মনেই হয়নি, মনে হচ্ছিল যেন ফেলুদার মতনই ঝরঝরে কোনো গোয়েন্দা কাহিনী বা অ্যাডভেঞ্চার পড়ছি। অথচ তার এক বছর বাদেই এই Ligne Claire স্টাইলটি প্রথমবারের জন্য চোখে পড়ে, যখন হাতে এসে পৌঁছয় তিন ভলিউমে ‘The adventures of Timpa’।

timpa6

আশির মাঝামাঝি ইন্দ্রজাল কমিকসের জন্য ‘টিম্পা’ চরিত্রটি সৃষ্টি করেন জাহাঙ্গীর কেরাওয়ালা।  ফ্যান্টম (অরণ্যদেব), ম্যানড্রেক, রিপ কার্বি, ফ্ল্যাশ গর্ডন জাতীয় মূল কমিকসের শেষে চার-পাঁচ পাতা বরাদ্দ থাকত টিম্পার জন্য (ঠিক যেমন একটি বা দুটি পাতা বরাদ্দ থাকত হেনরি(গুণধর/গাবলু), চকি ইত্যাদি চরিত্রগুলির জন্য)। সোজা বাংলায় টিম্পা হল টিনটিনের স্পিন-অফ ক্যারাক্টার, সারা পৃথিবী জুড়ে এরকম চরিত্রের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু তারপরেও টিম্পার জন্য অনেক কলকাত্তাইয়া কমিকস-প্রেমীর মনেই আলাদা একটা জায়গা আছে, কারণ ইন্দ্রজাল কমিকস সর্বভারতীয় হলেও টিম্পা কিন্তু এই কলকাতারই ছেলে। ওর বাবা ইনস্পেকটর দত্ত   কলকাতা পুলিশে কাজ করেন, সেই সুবাদে বহু সময়েই টিম্পার বাড়িতেই রহস্যের জাল ঘনীভূত হতে থাকে। আর সেই জাল ছাড়ানোর কাজে টিম্পা ওর দাদু  এবং কুকুর রেক্সিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে কখনো মুর্শিদাবাদ, কখনো শিলিগুড়ি আবার কখনো বা আন্দামানে (আন্দমানে অবশ্য ওকে গুন্ডার দল জোর করে তুলে নিয়ে যায়)। টিম্পা চরিত্রটি জনপ্রিয় হওয়ার পরে পারস পাবলিশারস তিনটি পূর্নাঙ্গ বই বার করে – ‘The adventures of Timpa – The Legacy of The Gods’ , ‘The adventures of Timpa – Operation Rescue’ এবং ‘The adventures of Timpa – Red Hooded Gang’।। প্রথম বইটির গ্রাফিক আর্টের দায়িত্বে ছিলেন অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরে আনন্দমেলার কমিকসের পাতায় ফেলুদাকে নিয়ে আসেন। পরের দুটো বইয়ে কাজ করেছিলেন সর্বজিত সেন।

টিনটিনের তুলনায় টিম্পাতে অনেক বেশী ‘স্পীচ বাবল’ থাকত এবং প্রত্যেকটি বাবলে লেখার পরিমাণও যথাযথর থেকে বেশ বেশী; টিনটিন পড়ে যাদের কমিকসে হাতেখড়ি তাদের কাছে স্বভাবতই কথার এত প্রাচুর্য  তালভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি আর হয়ত সে কারণেই শুরুর দিকে গল্পের থেকেও বেশী নজর দিতাম ছবিতে। ‘The adventures of Timpa’-র হাত ধরেই প্রথম কমিকস খুঁটিয়ে দেখা শুরু। আট বছর বয়সে অবশ্যই Ligne Claire স্টাইল নিয়ে সম্যক ধারণা ছিল না কিন্তু ওই যে বাহুল্যবিহীন আঁকা, ভারী পছন্দ হয়েছিল প্রথম থেকেই। আর এই স্টাইলে রঙের ব্যবহারটাও বেশ ক্রিসপ, মুচমুচে হয়ে দেখা দেয়, সেটাও ভালো লাগার একটা কারণ বটে।  পরে মন বসিয়ে গল্পগুলো পড়েও ফেলেছিলাম, দিব্যি লেগেছিল তখন। ‘The Legacy of The Gods’ থেকেই প্রথম এরিক ভন দানিকেনের দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ জাতীয় থিয়োরিগুলো জানতে পারি, ‘Red Hooded Gang’ আবার লেখা হয়েছিল ৮৪ সালে কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া পর পর কিছু দুঃসাহসিক ব্যাঙ্ক ডাকাতি নিয়ে। আর ‘Operation Rescue’-এই সব থেকে ক্লোজলি অনুসরণ করা  হয়েছে টিনটিনকে, তাই অ্যাডভেঞ্চারের মাত্রা কিঞ্চিত বেশী – এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে কপিকলে ঝুলতে ঝুলতে গিয়ে দুর্গের ভেতরে জেলব্রেক, তাও এ অসাধ্য ঘটনা ঘটিয়েছিলেন কিন্তু টিম্পার দাদু! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে টিনটিনের মতনই টিম্পাতেও প্রোটাগনিস্টের থেকে অন্য চরিত্রগুলি বেশী ইন্টারেস্টিং। ‘Operation Rescue’  এ গ্রাফিক আর্টের দিক থেকেও টিনটিনের সঙ্গে মিলটা চোখে পড়ার মতন, নিচের প্যানেল গুলো দেখলে হয়ত কিছুটা   বোঝা যাবে।

timpa3

timpa4

timpa5

ইন্দ্রজাল কমিকস আশির দশকের শেষে উঠে যাওয়ার পর দারা, বাহাদুরের মতন নিখাদ ভারতীয় কমিকসগুলোর মতনই টিম্পা-ও বন্ধ হয়ে যায়। স্রষ্টা জাহাঙ্গীর কেরাওয়ালা-ও কলকাতা ছেড়ে চলে যান পুনেতে। দু’দশক পর টিম্পা আবার ফিরেছে; Orient Blackswan নতুন করে বার করেছে টিম্পার তিনটে বই, বার করতে চলেছে কিছু অপ্রকাশিত কাজ-ও। দেখা যাক নতুন প্রজন্মের কাছে কলকাত্তাইয়া টিনটিন আদৌ পাত্তা পায় কিনা।

দিদিমণি

ছেলেটার চোখ রীতিমতন ছলছল করছে, আর সেটাই স্বাভাবিক কারণ ঠাকুমা যে তাঁর আদরের নাতিকে কড়া ধমক দিতে পারেন এরকমটা কোনোদিন আন্দাজ করতে পারেনি। অঙ্ক ভুল হলে বাবার হাত থেকে খাতা যখন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বারান্দায় পড়ে, তখন বেতো পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এই ঠাকুমাকেই তো দৌড়ে আসতে হয়। মিত্র লাইব্রেরী থেকে জেঠু লীলা মজুমদারের নতুন বই কিনে আনতে ভুলে গেলে অভিমান কমানোর জন্য এই ঠাকুমাই তো ফ্রেঞ্চটোস্ট বানিয়ে মুখের কাছে ধরে বলেন “লক্ষ্মী বাবা আমার, স্যান্ডউইচ টা খেয়ে নে” (এই ভুলটা কেন যে কেউ ভাঙ্গিয়ে দিল না কোনোদিন কে জানে!)। তো সেই ঠাকুমা বকতে শুরু করলে চোখে অন্ধকার দেখারই কথ। ঠাকুমা মানে বড় মিষ্টি একটা ব্যাপার, ছোট্টখাটো চেহারায়, কুঁচকে যাওয়া চামড়ায়, শাড়ীর আঁচলের কোণা থেকে ঝুলতে থাকা এক গুচ্ছ চাবির রুনঝুন আওয়াজে সব পেয়েছির ছেলেবেলা। কিন্তু তিনি কুপিত হলে বাঁচায় কে? চোখ ছাপিয়ে জল বেরনোর উপক্রম হচ্ছিল, এমন সময় দরজায় এসে তিনি দাঁড়ালেন আর ছেলেটা স্পষ্ট দেখতে পেল তিনি চোখ দিয়ে হাসছেন, অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আর যেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “কি হল মাসিমা, বকছেন কেন অপুকে?” অমনি ওর মনে পড়ে গেল জানলার গরাদ ধরে টারজান টারজান খেলার সময়ে যখন পাশের বাড়ীর দাদা-দিদিরা ওকে দেখে বেজায় হাসছিল, ইনিই তখন ওদেরকে সরিয়ে দিয়ে গল্প করতে শুরু করেছিলেন। পাক্কা এক ঘন্টা ধরে গল্প হয়েছিল, আর ওর মতনই সারাটা সময় ধরে উনিও গরাদ ধরেই দাঁড়িয়েছিলেন।  ঠাকুমা ততক্ষণে  জানিয়েছেন আজ দুপুরে কি করে চোর বমাল সমেত হাতে নাতে ধরা পড়েছে। দুপুরবেলাটা সাধারণত ঠাকুমার একটা তন্দ্রা আসেই, সেদিন এমন প্যাচপেচে গরম যে বাধ্য হয়ে ‘কুট্টি ঘরে’ গেছিলেন বড়ি আর আচারগুলো কাজের লোক ঠিকঠাক তুলে রেখেছে কিনা দেখার জন্য । গিয়ে দেখেন গুণধর নাতি মেঝেতে বসে, টুঁ শব্দটি না করে সেদিনই ডাকে আসা নবকল্লোল পড়ে চলেছে। চোখ দিয়ে যিনি হাসছিলেন, তিনি বেশ বড় বড় চোখ করেই শুনছিলেন ঘটনাটা কিন্তু ‘নবকল্লোল’ শোনামাত্রই হইহই করে হেসে উঠলেন। আর সারাটা ঘর পানের মশলার কি সুন্দর একটা গন্ধে ভরে গেল। ঠাকুমার অবশ্য মোটেও আমোদ পান নি, “তুমি আর হেসো না বাপু, বাপের জন্মে কেউ শুনেছে সদ্য ক্লাস টু-এ ওঠা ছেলে নবকল্লোল পড়ছে?” তিনি  ভারী মিষ্টি করে হেসে বললেন “আচ্ছা, আমি দেখছি কি করা যায়।” বলে ওর হাত ধরে নিয়ে গেলেন পাশেই পড়ার ঘরে। আর তক্ষুণি বোঝা গেল ইনিই নতুন দিদিমণি, যাঁর কথা বাবা গত সপ্তাহেই বলে রেখেছে। অত বকুনি খাওয়ার পরেও মনটা ভারী খুশী খুশী লাগছিল অপুর।

ওকে চেয়ারে বসিয়ে উনি বসলেন মাটিতে। আর সাত বছরের চঞ্চল হাঁটুগুলোর ওপর একটা আশ্বাসের হাত, আর একটা প্রশ্রয়ের হাত রেখে বললেন “আমি যদি তোমায় প্রত্যেক সপ্তায় একটা করে নতুন বই দি, তুমি আর নবকল্লোল পড়বে না তো?” বাধ্য ঘাড়টা নড়তেই ভারী খুশী হয়ে উনি গাল দুটো টিপে দিলেন। আর সেই শুরু হল এক অসমবয়সী বন্ধুত্বর। দিদিমণির বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, আর ওর বয়স সাত – কিন্তু তাতে কি  এসে যায়? উনি মন দিয়ে ওর লেখা প্রথম উপন্যাস পড়লেন। ৮৬-র আনন্দমেলাতে দু’পর্বে বেরনো উপন্যাস ‘মাঠের রাজা’ পড়ে ভারী ইন্সপায়ারড হয়ে ও-ও লিখে ফেলেছিল ‘মাঠের সম্রাট’ – আসলটা ফুটবল নিয়ে, আর ওর লেখাটা ক্রিকেট নিয়ে। প্রথম কে পড়বে? অফ কোর্স দিদিমণি, যিনি চোখ দিয়ে অত সুন্দর করে হাসেন আর অত সুগন্ধি পান-মশলা খান তিনি এ সুযোগ পাবেন না তো পাবেটা কে? খুব মন দিয়ে পড়লেন, প্রচুর উৎসাহ দিলেন আর এটাও মনে করিয়ে দিলেন – মাঠের সম্রাট নামটা দেখে মনে হচ্ছে না এটা অপুর নিজের দেওয়া নাম আর উপন্যাসের মধ্যে পাঁচ পাতা জুড়ে স্কোরকার্ড না থাকলেই ভালো হয়। উনি ‘নৃত্য’ দিয়ে বাক্যরচনা করানোর সময় উদয়শঙ্করের গল্প বললেন, অপু আবার সেটাই স্কুলের পরীক্ষায় লিখে এসে প্রচুর বাহবা পেল। উনি প্রথম সুকুমার দে সরকারের বই পড়ালেন, আর সেই জল-জঙ্গল-জন্তুর আশ্চর্য জগতের সন্ধান পেয়ে অপু ভাবল এরকম বন্ধুটি পৃথিবীতে আর কারোর নেই। উনি পায়েস রেঁধে এনে ওর জন্মদিনে খাওয়ালেন, পঞ্চাশ বছরেও কেন বিয়ে করেননি এহেন পাকা প্রশ্ন শুনেও হেসে কুটিপাটি হলেন আর প্রমিস করলেন শীতটা ভালোমতন পড়লেই ওকে নিয়ে চিড়িয়াখানা বেড়াতে যাবেন, শুধু ওরা দু’জন। অন্য কেউ হলে অপুর মোটেই বিশ্বাস হত না যে বাবা সেটা অ্যালাও করবেন কিন্তু দিদিমণি বলেছেন যখন সে কথার নড়চড় হবে না , এ কথা সে বিলক্ষণ জানে।

তখনো কলকাতায় ভালো শীত পড়ত, রাত্রিবেলা ও আর ওর বোন সদ্য বানানো, রঙ্গীন কভার দেওয়া নরম লেপের মধ্যে ঠাকুমার মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত, সে কথা মনে পড়লে মনে হয় ওরকম আরাম আর কিচ্ছুটিতে যেন পায়নি। শীতকালে বাবাকেও যেন একটু কম রাগী মনে হত, অঙ্ক ভুল হলেও হেসে বুঝিয়ে আবার করাত। হাওড়া, বালি, চন্দননগর, দিল্লী থেকে পিসীরা চলে আসত  – গল্পগুজব, হইচই, নিত্যি নতুন খাওয়ার মধ্যে শীতকাল ম’ম করে জাঁকিয়ে বসছিল। কিন্তু এর মধ্যেও চিড়িয়াখানার প্ল্যানের কথা অপু ভোলেনি। মুশকিল এই যে ডিসেম্বরের তিন সপ্তাহ দিদিমণি এলেন না, শোনা গেল কোথায় বেড়াতে গেছেন। অন্য সময় হলে হয়ত একটু বেশীই মন খারাপ হত, শীতের মাহাত্ম্যেই কিনা কে জানে ততটাও হল না। একবার অবশ্য ভেবে একটু অবাক হয়েছিল যে তিন সপ্তাহের জন্য দিদিমণি বেড়াতে চলে গেলেন অথচ ওকে কিছু না বলে, এটা কেমনতর কথা! কিন্তু সেটুকু মন খারাপ-ও টিঁকে থাকল না। তারপর সব ভালো কিছুর মতনই উইন্টার ভেকেশন-ও শেষ হল, আর দিদিমণির কথা ভীষণ মনে পড়তে শুরু করল। প্রশ্নের ঠেলায় ঠাকুমা জেরবার হয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর কাছেও খবর ছিল না।

তারপর একদিন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ দিদিমণি এলেন, ইউজুয়াল বিকাল পাঁচটার বদলে।  একটা বইয়ের বদলে একটা আস্ত প্যাকেট, আর সেই প্যাকেট খুলে অনেক অনেক মণিমুক্তো বার করতে থাকলেন কিচ্ছুটি না বলে। প্রথমবারের জন্য হাসছিলেন না, অত সুন্দর চোখ খুলে রেখেও। তারপর বইগুলো একসঙ্গে হাতে তুলে দিয়ে বললেন “সব কটা পড়বে কিন্তু, আর তারপর আমাকে চিঠি লিখে জানাবে কেমন লেগেছে- হ্যাঁ ?” এত অবাস্তব কথা শোনার সময়েও  খেয়াল পড়ল সবসময়ের মতন এখনো পান-মশলার সেই আশ্চর্য সুন্দর গন্ধটা ঘরজুড়ে  ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিনকে আর পড়ালেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার, মন খারাপের রেশটা যেন সারা সন্ধ্যা জুড়ে বাড়ির সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, কোনদিন যা হয় না সেটাই হল – খাবার টেবলে বিশেষ কথাবার্তাই হল না। অথচ ও  জানত ঠাকুমা ছাড়া আর কারোর সঙ্গে দিদিমণির কথাই হত না।

কেন পঞ্চাশ বছরে একটা স্কুলে পড়ানোর চাকরী নিয়ে বরোদা চলে গেছিলেন সে এক রহস্য। কেন উনি চলে যাওয়ার পরে পাশের বাড়ির লোকেদের মুখে একদিনের জন্যও ওঁর কথা আর শোনেনি, সেটাও রহস্য। বাড়ি ছাড়ার দশ বছর পর ওখানে ফিরে গিয়ে যখন দেখল সেই বাড়ি ভেঙ্গে ফ্ল্যাট উঠেছে অথচ দিদিমণির কথা কেউ মনে করতে পারল না, সেটাও একটা রহস্য।

সাত বছরের ছেলে যদি কথা না রাখে তাহলে কি নিয়তি নিষ্ঠুরতা করে? হয়ত তাই,  কিন্তু নবকল্লোল আর সে পড়েনি, অন্তত পরের দশ বছরের জন্য। কিন্তু দিদিমণি ফিরে আসেন নি, বড় হয়ে খেয়াল পড়েছিল নামটাই তো কোনোদিন জানে নি, কিন্তু ততদিনে বাড়ির লোকেরা কেনই বা মনে রাখবে? পঁচিশ বছরে চেহারাটাও মুছে গেছে, শুধু ভরসা একটা জায়গাতেই – সেই পান মশলার গন্ধে। কোনোদিন হয়ত সেই গন্ধটা নিখুঁত ফিরে পাওয়া যাবে, আর Olfactory Bulb থেকে বেরিয়ে আসবে অনেকটা ভালোবাসা, অনেকটা স্নেহ।