পণ্ডিতপ্রবর

Image

(স্থিরচিত্র উৎস – The Telegraph, Kolkata)

কাকতালীয়ই হয়ত কিন্তু বিস্মৃতপ্রায় মানুষটিকে হঠাৎ এক মাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার খবরের পাতায় আসতে দেখে একটু চমকেই গেছিলাম। গতকালই দেখলাম অমর্ত্য সেন বলেছেন ওনার প্রেসিডেন্সিতে পড়তে আসার পেছনে মূল কারণ ছিলেন সুখময়; মাসের গোড়ার দিকে আবার টেলিগ্রাফের ‘ওপিনিয়ন’ পাতায় ছিল সুখময়ের আকস্মিক উপস্থিতি।  আর তার পরেও যেহেতু গোটা মাসটাই সারা দেশ সরগরম থাকল ভাগবতী-সেন তরজা নিয়ে (আমার মতে অবশ্য এটা তরজা নয়, এক পক্ষই আক্রমণ শাণিয়ে গেল), সুখময়ের নাম এদিক সেদিকে বেশ কয়েকবার ছিটকে আসতে দেখলাম – যতই হোক, ষাট দশকের দিল্লী স্কুলের হোলি ট্রিনিটিকে এক সারিতে বসানোর সুযোগ কেই বা ছাড়তে চায়, কারণ থাকুক বা না থাকুক।

সুখময় চক্রবর্তী নামটার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯০ সালে্, সে বছরে্রই অগস্টে চলে গেছেন তিনি। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন ছেড়ে এসে সদ্য ভর্তি হয়েছি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টে, ক্লাস ফাইভে। নতুন স্কুলের  অনেক কিছুই সমীহ জাগিয়েছিল প্রথম দর্শনেই, আর তার মধ্যে অন্যতম ছিল দোতলার দেওয়ালে টাঙ্গানো একটা লম্বা বাদামী রঙের দামী কাঠের বোর্ড। তাতে সাদা অক্ষরে শুরুর বছরগুলো থেকে যে সমস্ত হীরের টুকরোরা স্কুল ফাইন্যাল, হায়ার সেকন্ডারী (এগারো ক্লাসের পর), মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে র‍্যাঙ্ক নিয়ে এসেছে, তাদের নাম লেখা। আর প্রথম কলামেই জ্বলজ্বল করতে দেখেছিলাম সুখময়ের নাম, স্কুল ফাইন্যালে সেকন্ড হয়েছিলেন, সালটা সম্ভবত ১৯৪৮। কিন্তু ওটুকুই যা দেখা, আট বছর পড়েছি স্কুলে, একটিবারের জন্যও কোনো শিক্ষক বা প্রাক্তন ছাত্রের মুখে সুখময়কে নিয়ে কিছু শুনিনি। অথচ, অন্য অনেক স্কুলের থেকে আমাদের স্কুল প্রাক্তনীদের ঢের বেশি মনে রেখেছে। কিন্তু সত্যজিৎ, শম্ভু মিত্র , রাহুল দেব বর্মণ দের মাঝে সুখময়কে মনে করিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না। চল্লিশের শেষের দিকে যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের স্বভাবতই দেখার কোনো সুযোগই ছিল না। আমরা তাই বয়স্ক শিক্ষকদের মুখে যে সমস্ত বিস্ময়বালকদের কথা শুনতাম, তাঁরা খুব বেশি হলে ষাটের দশকে বেরিয়েছেন। তাই রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব প্রসাদরঞ্জন রায় যে কিরকম চৌখস ছাত্র ছিলেন সে নিয়ে আমরা এখনো বিস্তর ট্রিভিয়া মিশ্রিত আলোচনায় বসে যেতে পারি, কিন্তু সুখময়ের সে সৌভাগ্যটা হয়নি। ভাবতে পারেন আমরা না জানি, আমাদের আগের জেনারেশন জেনেছিল নিশ্চয়। আমিও তাই ভেবেছিলাম কিন্তু হায়ার সেকন্ডারি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও যতবার স্কুলের অ্যালুমনি মীট গুলোতে আসতাম, কারোর মুখেই সুখময়ের নাম শুনিনি -ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই কোনো দশকের ছাত্ররাই জানতে পারেননি কি অসীম এক প্রতিভার উন্মেষ হতে দেখেছে আমাদের স্কুল।

এই ভুলে যাওয়াটাই কি তাহলে সুখময়ের জন্য চিরকালীন ভবিতব্য হয়ে রইল? সুখময়ের মৃত্যুর পর আমরা অস্বাভাবিক দ্রুততায় ভুলে গেছি ওনাকে। সত্যি কথা বলতে কি, আশির প্রায় গোড়ার দিক থেকেই সুখময় মূলত শারীরিক কারণে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছিলেন। অথচ স্কুল ফাইন্যালে ওনাকে টপকে যিনি ফার্স্ট হয়েছিলেন তিনি তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। হ্যাঁ, অমর্ত্য বরাবরই ফার্স্ট হয়ে এসেছেন স্কুল ফাইন্যাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যাল্যের পরীক্ষা অবধি, সুখময় সবসময়ই দ্বিতীয়  কিন্তু অমর্ত্যর থেকে বোধহয় ভালো কেউ জানবেন না যে সুখময়ের প্রগাঢ় পান্ডিত্যকে মার্কস, র‍্যাঙ্ক দিয়ে যাচাই করার চেষ্টাটাই বাতুলতা। অমর্ত্য দার্শনিক, অসাধারণ শিক্ষক, শ্রেষ্টতম গবেষক আর সুখময়? তাঁর কিন্তু একটাই আইডেন্টিটি, তিনি চিরকালের পণ্ডিত। সে পান্ডিত্যের ছটা সারা পৃথিবী জুড়েই ছড়িয়েছিল এক সময় কিন্তু  ইউনিভার্সিটির চত্ত্বর ছেড়ে যে মুহূর্তে সুখময় ঢুকে গেলেন প্ল্যানিং কমিশনে, কিছুটা হলেও একটা গণ্ডীর মধ্যে সীমিত হয়ে গেল তাঁর কাজ এবং কাজের অভিমুখ । সুখময় নিশ্চিত ভাবেই বিশ্বজোড়া খ্যাতির জন্য লালায়িত ছিলেন না কিন্তু শুধু দেশে থেকে দেশের জন্য কাজ করে গেলেন বলেই হয়ত এই বিস্মৃতি ওনার প্রাপ্য হয়ে রইল। অশোক মিত্র তাঁর অতীব সুপাঠ্য ‘আপিলা চাপিলা’তে তাই লিখেছিলেন “অথচ তাকে অনুরোধ-উপরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে যোজনা কমিশনে বসিয়ে দেওয়া হল। বিবেকভারাতুর সুখময়, যে কর্তব্য তার পক্ষে অযথা কালহেলন, তাতে নিবিষ্ট হয়ে রইলো জীবনের শেষ দশ-বারো বছর। কে জানে, যদি এই পর্বের অবর্ণনীয় পরিশ্রম থেকে সে মুক্ত থাকতে পারতো, সম্ভবত আরও ঢের দিন  তার জীবনায় প্রলম্বিত হতো, পৃথিবী ও দেশ তার কাছ থেকে প্রভূত আরও জ্ঞানের উপচার আহরণের সুযোগ পেত।”

ময়মনসিংহের রায়চৌধুরীদের মতন অত খ্যাতি না থাকলেও, চক্রবর্তীরাও বেশ বিখ্যাত ছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য। কিন্তু অমর্ত্যর মতনই সুখময়েরও প্রাথমিক পড়াশোনা ঢাকাতেই। তারপর কলকাতার বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়, সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি। প্রেসিডেন্সিতে থাকাকালীনই যে উনি প্রায় জীবন্ত  এনসাইক্লোপীডিয়া সুলভ খ্যাতি লাভ করেছিলেন সেকথা উৎসাহীদের অনেকেরই মনে পড়বে।  অর্থনীতিবিদ  ধীরেশ ভট্টাচার্য্য সুখময়ের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন গণিতে তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ। অর্থনীতির শিক্ষকদের থেকেও তাঁকে বেশি দেখতে পাওয়া যেত প্রেসিডেন্সির গণিতের শিক্ষক নন্দলাল ঘোষের সঙ্গে; দুরূহ গণিতের বই নিয়ে এত রাত অবধি জেগে থাকতেন যে প্রত্যেক দিনের প্রথম ইকোনমিক্স ক্লাসে আসতে অবধারিত ভাবে দশ মিনিট দেরি হতই। আর তাই হয়ত প্রেসিডেন্সি থেকে বেরোনর পরেই সুখময় মেন্টর হিসাবে বেছে নেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে।  আই-এস-আইতে কাজ করার সময়েই সুখময় প্রথমবারের জন্য সান্নিধ্যে আসেন বিখ্যাত ডাচ অর্থনীতিবিদ ইয়ান টিনবার্গেনের। এনার কাছেই কাজ করে কয়েক বছর আগে পি-এইচ-ডি ডিগ্রী পেয়েছেন অশোক মিত্র, প্রায় এক দশক পর ইনিই হবেন অর্থনীতির প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের একজন। টিনবার্গেন সুখময়ের প্রজ্ঞায় এতটাই অভিভুত হয়ে পড়েন যে কলকাতায় থাকতে থাকতেই ফেলোশিপের বন্দোবস্ত করে সুখময়কে নিয়ে যান বিশ্ববিখ্যাত ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত নেদারল্যান্ড ইন্সটিটিউট অফ ইকোনমিক্স-এ। প্রায় দু’শ মাইল দূরে বসে অমর্ত্য তখন কেমব্রিজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন, জিতে নিয়েছেন অর্থনীতির শ্রেষ্ট ছাত্র হিসাবে অ্যাডাম স্মিথ পুরস্কার (পরের দু’বছরেও এই পুরস্কার যায় আরো দুই ভারতীয় ছাত্রের হাতে, তাঁদের নাম? জগদীশ ভাগবতী এবং মনমোহন সিং)। আর সুখময়? তিনিও অভাবনীয় কাজ করেছেন, একে অবিশ্বাস্য বললেও অত্যুক্তি হয় না। এক বছরেরও কম সময়ে তিনি জমা দিয়েছেন তাঁর থিসিস। সেই থিসিস থেকেই সুখময়ের প্রথম বই ‘The logic of investment planning’ (North Holland Publishing Company, 1959)। তারপর দু’বছর এম-আই-টি তে কাটিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়, পড়াতে শুরু করেন প্রেসিডেন্সীতে। দু’বছরের মাথায়  বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ কে-এন-রাজ, সুখময়কে ‘শঙ্করলাল প্রফেসরশিপ ইন ম্যাথেমেটিকাল ইকোনমিক্স’ দিয়ে নিয়ে আসেন দিল্লী স্কুল অফ ইকোনমিক্সে। তখনকার দিনে যা অচিন্ত্যনীয় তাই করেছিলেন কে-এন-রাজ, একই বছরে তিন তরুণতম অর্থনীতিবিদকে ফুল প্রফেসরশিপ দিয়ে নিয়ে এনেছিলেন দিল্লীতে, সুখময়ের সঙ্গে ওই সময়েই যোগ দেন অমর্ত্য এবং জগদীশ, বাকিটা ইতিহাস।  এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে এরা দিল্লী স্কুলকে গড়ে তুলেছিলেন ভারতে অর্থনীতিচর্চার পীঠস্থান হিসাবে, তারপর ১৯৬৮ তে জগদীশ চলে যান এম-আই-টি তে, আরো তিন বছর পর অমর্ত্য যান লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে।

আর একইরকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুখময় থেকে যান দিল্লী স্কুলেই, প্রশান্তচন্দ্রের সুযোগ্য ছাত্র হিসাবে দায়িত্ব নেন পঞ্চম যোজনা কমিশনের। ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুরোধ ফেলতে পারেন নি সুখময়, কর্মজীবন বলতে গেলে দেশের কাজেই উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। আর সে গুরুদায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মেলে ইন্দিরার মৃত্যুর পরই। স্পষ্টবক্তা অশোক মিত্র অবশ্য সুখময়ের পরম সুহৃদ হলেও প্রশ্ন তুলেছিলেন জরুরী অবস্থার সময়েও সুখময়ের ইন্দিরার প্রতি আনুগত্য নিয়ে। যাঁরা সুখময়কে প্রকৃত  চিনতেন তাঁরাই হয়ত বলতে পারবেন আনুগত্যটা কাজের প্রতি ছিল নাকি ইন্দিরার প্রতি।  জরুরী অবস্থার সময় প্রতিবাদের দরকার নিশ্চয় ছিল আবার এটাও ঠিক মাত্র ৫৭ বছর বয়সে সুখময় চলে গেছিলেন দেশের কাজ করতে করতেই।

ভবিষ্যৎ বিচার করবে বলে ছেড়ে দেওয়া যেত হয়ত কিন্তু ভবিষ্যৎ কি আদৌ মনে রাখবে?  অমর্ত্য সেন – জগদীশ ভাগবতী কেউই ভারতে থাকেন না বলে এঁদের দায়বদ্ধতা নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন তারাই তো হয় মনেও রাখেন নি বা জানবার প্রয়োজন বোধ করেন নি সুখময় এবং সুখময়ের কাজকে। আগে গ্রোথ না আগে ডেভেলপমেন্ট এ প্রশ্নের জবাব পেতে হয়ত অমর্ত্য-জগদীশদের থেকেও বেশি প্রয়োজন সুখময়দের। তত্ত্বের অপরিসীম গুরুত্ব, কিন্তু সে তত্ত্ব প্রয়োগ করে কাজের কাজটা করার ল্যাঠাও যে বড্ড বেশী।

(তথ্যঋণ – আশোক মিত্র, ধীরেশ ভট্টাচার্য, মনমোহন অগরওয়াল, বাদল মুখার্জী এবং ভি. পন্ডিত)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s