(সেই) রহস্যজনক ফেল্ট হ্যাট

5

বুঝতেই পারছেন হাড়-হিম করা ঘটনা ঘটতে চলেছে। অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী ঘরে ঢুকে পড়েছে, সন্তর্পণে আলো জ্বালিয়ে দেখে নিচ্ছে শিকারের বদলে অন্য কেউ শুয়ে আছে কিনা। চারদিক নিশ্চুপ, তীব্র এক্সপেক্টেশন্স নিয়ে ঘরের চার দেওয়াল অপেক্ষা করছে রক্ত ছিটকে আসে কিনা। এরকম টানটান উত্তেজনার মধ্যেই আমাদের দর্শকের চোখে পড়ল পার্ক সার্কাসের ভ্যাপসা গরমেও খুনী ফেল্ট হ্যাট পরে এসেছে, এমনকি ওভারকোটাটা ছাড়তেও রাজি হয়নি। এদিকে যিনি খুন হতে চলেছেন, তিনি দিব্যি একটা ঘুম দিচ্ছেন। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তিনি কি পরে আছেন একবার দেখুন, ধুতি আর হাফহাতা গেঞ্জি। গুপ্তশ্রী প্রোডাকশন্সের প্রথম নিবেদন ‘নিশাচর’ (১৯৭১) যারা দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয় মনে পড়ে যাবে হত্যাকারী  কে,  মনে পড়বে রাতের অন্ধকারে কলকাতার রাস্তায় ‘কার-চেজ’ এর কথা। আরো মনে পড়বে হাতে গোনা যে কয়েকটি বাংলা সিনেমাতে শম্ভু মিত্র অভিনয় করেছিলেন, এটি তার মধ্যে অন্যতম। আর সঙ্গে সঙ্গে হয়ত এটাও মনে পড়বে যে ওপরের দৃশ্যটি ঠিক খুনের দৃশ্য নয়, ওটা একটা ধোঁকার টাটি, দর্শকের জন্য টোপ।

এই টোপ ফেলার জন্য যথাযথ অ্যাম্বিয়েন্স তৈরী করাটা দরকার। সেই সুবাদেই চল্লিশ থেকে সত্তরের দশক অবধি যখনই ডিটেকটিভ/মিস্ট্রি সিনেমা তৈরী হয়েছে টলিউডে, ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোটের কম্বিনেশন ছিল একেবারে অপরিহার্য। হলিউড noir কি ইউরোপীয়ান থ্রিলা্র এমনকি অ্যালান ফারস্টের উপন্যাসের প্রচ্ছদতেও ( দেখুন, এখানে এবং এখানে)  ফেল্ট হ্যাটের ছড়াছাড়ি কিন্তু বাংলা সিনেমায় ফেল্ট হ্যাটের আবির্ভাব সবসময়েই ভারী রহস্যজনক, এবং সে রহস্য সমাধান অনেকসময়ই আমাদের ক্ষমতার বাইরে।

নিচের দৃশ্যটিই ভাবুন!

4

ছোট্টো জায়গা রত্নগড়ে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। রাতবিরেতে জলার ধার থেকে ভেসে আসছে রক্ত জল করে দেওয়া খিলখিল হাসি, সেই জলার ধার দিয়েই ল্যান্ডো গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার সময় খুন হয়ে গেছেন সেখানকার মহারাজ, মৃত্যুর সময়ে আবার তাঁর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল; সারা মুখে লেগে ছিল এক ভয়াবহ আতঙ্কের ছাপ। চার পুরুষ আগের এক লম্পট মহারাজকে হঠাৎ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, লোকে দেখেছে তাঁর সারা গায়ে আগুন জ্বলছে। আর তাঁর লালসার আগুনে যে মেয়েটি পুড়ে মারা যায় সেই নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে জলায়। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে নাকি ? আলবত, দেওয়ার মতনই ব্যাপার। কিন্তু রহস্য কি শুধু জলার পেত্নীতেই পেলেন?

জিঘাংসু জলার অশরীরী ততোধিক অশরীরী গলায় (কে গেয়েছে বলুন তো? এটা একটা হিন্ট!) গৌরীপ্রসন্নের কথায় “আমি মরীচিকা, আমি মরুমায়া” গেয়ে চলেছে, এরকম নয় যে ব্যাকগ্রাউন্ডে জিওরজি লিগেটির ‘রিক্যুয়েম‘ বা বাখের ‘টোক্কাটা‘ বাজছে। অথচ রত্নগড়ে কি বলব মশাই, দেশী পোষাক কেউ পরে না। রাজবাড়ির লোকজনদের কথা আলাদা, তাঁরা ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোট কেন, স্লীপিং গাউন থেকে শুরু করে ব্রীচেস, সবই পরতে পারেন। কিন্তু ধরুন রত্নগড়ের পুরুষানুক্রমে নির্যাতিত প্রজাদের সুস্থ করার ভার যে ডাক্তারের তিনিও ফেল্ট হ্যাট ছাড়া কিছু পড়েন না (অবশ্য এটা ঠিক যে কমল মিত্রকে ধুতি-পাঞ্জাবী বলুন কি স্যুট-বুট, যাতেই দেখি মনে হয় এক্ষুনি হেঁকে উঠবেন ‘বেরিয়ে যাও’, ফেল্ট হ্যাটে দেখে একটু ভরসা হচ্ছিল!); আবার পাতি কলকাতা থেকে যে ডিটেকটিভরা রহস্য সমাধানে এলেন, স্টেশনে নামা ইস্তক তাঁদের পরনেও ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোট। অথচ কলকাতায় দিব্যি শার্ট-প্যান্ট পরেই ঘুরছিলেন, ওভারকোটের তলায় জামার অস্থানে এখনো ঘামের দাগ অথচ মাথায় ফেল্ট হ্যাট।

যাঁরা বাংলা ডিটেকটিভ সিনেমার পোকা তারা বলতে পারেন “আহা, শুধু ওভারকোট কেন? আমরা কি বর্ষাতিও দেখাইনি?”

8

হক কথা, কিন্তু ‘চুপি চুপি আসে’ তে বৃষ্টির রীতিমতন একটা ভূমিকা আছে, এতটাই যে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে নাম অবধি দেখানো যায় । প্রেমেন্দ্র মিত্রের উপন্যাসটা পড়লে অবশ্য আরেকটু ভালো বোঝা যায় যে বৃষ্টি না হলে হাইলি গপ্পোটাই বলা যেত না।  কিন্তু ‘কুহেলী’ তে কি বলবেন বলুন?

9

অজিতেশ টেনিদার ঘোড়ামামার মতন সেজেও রক্ষা পান নি, দেখুন কি পরে আছেন। ওই দাড়িগোঁফের জঙ্গল নিয়েই যে বেচারী অস্থির হয়ে পড়ছিলেন সে কথা জানায় কে। অথচ সুমিতা সান্যাল দিব্যি স্লীভলেস ব্লাউজ পরে “আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, আজ আমাদের ছুটি- আ হা, হা হা হা” গেয়ে চলেছেন। লিংগ-বৈষম্য কি আর ফিল্ম ইন্ডাট্রিতেও কম? অথচ জানেন নিশ্চয় অজিতেশের রোলটাও টোপ! আর টোপকেই যদি সাহেব সাজানো হয়, আসল ভিলেন কি পাইনের জঙ্গলে ধুতি পরে ঘুরে বেড়াবে?

6

পাইনের জঙ্গল নিয্যস ছিল মশাই, লাস্ট সিনে যে পরিচালক প্রায় তুলসীমঞ্চ বানিয়ে দেবেন সেটাকে এটা আর কেই বা ভেবেছিল বলুন। ওটা খানিকটা পোস্টমর্ডার্ন ট্রিটমেন্ট ভেবে শান্তি পেতে পারেন অবশ্য।

এখনো খুঁতখুঁত করছে তো মন? ভাবছেন আসল সিনেমার কথাটাই তো উঠল না, সেখানে তো ধুতি পাঞ্জাবী পরে শ্যাম লাহা আর নৃপতিকেই দেখে এসেছি আমরা।  অপরাধীকেও প্রথম দর্শনে না-মানুষ বলেই মনে হয়েছিল , কিন্তু ফেল্ট হ্যাট তো চোখে পড়েনি!  হ্যাঁ, ‘হানাবাড়ি’ তে চমকের পর চমক, সেখানে বিশালাকৃতি গোরিলাও আছে, আবার অ্যাংলো ন্যাদা-পাগলাও আছে।

10

আর এত কিছু চমকের মধ্যে ভাবছেন যে পরিচালক থ্রিলের আসল এলিমেন্টটা কে ভুলে মেরে দিয়েছেন?  তাও কি হয়? 🙂

7

একেই বলে ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ বা চন্দ্রিলের ভাষায় “আহা, লাস্ট সিনে স্লো মোশনে ইয়া ঢিসুম ছাড়ে গুরু”! ফেল্ট হ্যাটধারীকে চিনলেন না? আরে উনিই তো ডিটেকটিভ, তবে অজিতেশের মতন খারাপ ভাগ্য ওনার নয়। ন্যাদা-পাগলা সেজে থাকার সময় অন্তত ফেল্ট হ্যাটটা পড়তে হয়নি।

কিন্তু চুপি চুপি একটা কথা বলে যাই, ফেল্ট হ্যাটটা এখনো মিস করি। কলোনিয়াল হ্যাংওভার কি আর সহজে কাটে? গৌতম ঘোষ স্টেশন চত্বরে দু’হাত ছড়িয়ে ‘হাংরি’ আওড়াতে আওড়াতে প্রায় ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু বাইশে হোক বা না হোক, শ্রাবণ মাসের রাত্রে বৃষ্টির ধারালো ফোঁটার মধ্যে আবছা হয়ে যাওয়া গ্যাসলাইটের আলোয় ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোটের অবয়বের মতন রহস্যজনক ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না । সে খুনীও হতে পারে, গোয়েন্দাও, কিছু যায় আসে না – মনে থেকে যায় শুধু সেই রহস্যজনক ফেল্ট হ্যাট।

Advertisements