অবশেষে

mgdy1

ত্রয়োদশ সন্তান জন্মানোর পর পিতৃদেব নাম রেখেছিলেন ‘পরিশেষ’, চতুর্দশ সন্তান আসবে কি না সে নিয়ে বিশেষ ভাবিত ছিলেন না কিন্তু জনৈক আত্মীয়ের প্রশ্নে জানিয়েছিলেন যদি এসেই যায় (এবং পুত্রসন্তান হয়) তাহলে তার নাম রাখা হবে ‘অবশেষ’। পরিশেষ দু’বছর পরেই মারা যায় এবং অতঃপর অবশেষের আবির্ভাব। কিন্তু অবশেষ নামটা চলল না, মা ডাকতে লাগলেন চাঁদ, বাবা ডাকতে লাগলেন ‘বাবু’ এবং কদাচিৎ সবার সামনে ভালো নামের দরকার পড়লে ‘ষষ্টী’ নামে ডাকা হতে লাগল। চোদ্দজনের মধ্যে মাত্র চার জন বাঁচায় হয়ত এ নামটাই ছিল অনিবার্য। চাঁদ কিন্তু এটাকে নেহাত সৌভাগ্য বলে ভাবতে পারেনি, মোটামুটি যেদিন থেকে নরনারীর সম্পর্ক ভাসাভাসা হলেও বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই ভেবেছে “চোদ্দওওওও! এও হয়?”

হত তো কতকিছুই। কিন্তু সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন আর ক’জন তোলে? তুললেও সেসব পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে রাখা? কিন্তু চাঁদ একটু অন্যরকমের ছেলে, এঁচোড়ে পাকা বললে কিছুটা বোঝানো যায় হয়ত কিন্তু সত্যের অপলাপও কিছুটা হয়। যেমন ধরুন ছোটোবেলায় কাজের লোকের হাতে যৌন নিগ্রহ নিয়ে ভারী খুল্লমখুল্লা লিখেছে সে, বিশেষ রাখঢাক নেই কিন্তু একইসঙ্গে এটাও লিখতে কসুর করেনি যে পাঁচজন মধ্য তিরিশের লোকের সঙ্গে কাজের খাতিরে একটা কুঠুরি ঘরে গাদাগাদি করে শুয়ে অন্তত এক বছর ধরে ব্রহ্মচর্য পালন করাটাও নেহাত মানবিক নয়।

আসলে বাঙ্গালীর জীবনের যাবতীয় অসংগতি নিয়েই  চাঁদের সমস্যা, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দিয়েও কেউ থামাতে পারবেন না ওকে। ওর বাবা যে বিস্তর পড়াশোনা করে, একটা এঞ্জিনীয়ারিং ডিগ্রী নিয়েও সারাটা জীবন একটা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন বই আর কিছু দেখলেন না, এটা নিয়েও যেমন ওর প্রশ্ন থেকে যায় তেমনি ওর মা যখন বৌদিকে হাল্কা করে কথা শোনানোর ছলে বলেন “মেয়েদের ক্ষমতা অনেক, গর্ভনিরোধকের দরকার সচেতন মেয়েদের পড়ে না” সেটাও একটা মস্ত প্রহসন হয়ে ধরা পড়ে ওর কানে। হয়ত তাই বাড়ির আচারবিচার নিয়ে একটা গভীর সন্দেহ বেশ ছোটো থেকেই রয়ে যায়। তাই মা যতই বোঝান ব্রাহ্মণ সন্তান হয়ে জন্মানোর জন্য চাঁদের এক্সট্রা ব্রাউনি পয়েন্ট বাঁধা, সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি ও। নিজের কাকা নিয়ম করে যোগসাধনা করলেও ওর সবসময় মনে হয়েছে এ মুক্তিসাধনের প্রয়াস বড়ই ব্যক্তিগত, কেউ কাউকে শেখাতে পারে না; আর যে দাবী করে যে শেখাতে পারে তবে সে নিতান্তই ভন্ড। এহেন পরিস্থিতিতে মিশনারি স্কুলের ফাদার আর হাউসমাস্টাররা ওকে একটা নতুন জগতের সন্ধান দিতে চান, ক্রিশ্চিয়ানিটির আপাত-সফিস্টিকেশন মনে ধরে, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করে ‘dogmatic denunciation of idols’-এ। কিন্তু এতক্ষণে হয়ত বুঝতে পেরেছেন চাঁদের সিক্সথ সেন্সটাও মারাত্মক! মিশনারি স্কুলের ঘড়ির কাঁটা ধরা শৃঙ্খলা আর  অবিশ্বাস্য নিয়ামানুবর্তিতার মধ্যেই কোথায় যেন ও খুঁজে পেয়েছে একটা গোঁড়ামির আভাস; দীক্ষাগুরুরা কখন যেন হয়ে গেছেন অনর্থক কিছু পিউরিটান, ক্রিশ্চিয়ানিটির মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে মনে। ধর্ম হিসাবে কিন্তু খারাপ লাগেনি কিন্তু যে মুহূর্তে মনে হয়েছে অসংখ্য রীতিনীতি যেন তেন প্রকারে চাপিয়ে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য তখনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে মন।

চেনা চেনা ঠেকছে, মনে হচ্ছে ‘রেবেল উইদাউট এ কজ’? ভুল করলেন। এটুকু নিতান্তই ভূমিকা, বাকিটা জন্য পড়ে ফেলতে হবে বইটা। পাবেন যৌনতা, পাবেন অবদমিত যৌনতা, পাবেন উন্নাসিকতা, পাবেন জ্ঞান আর এতকিছুর পরেও পাবেন ষাট দশকের কলকাতা আর তার উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনের অকপট মূল্যায়ন। শুধু জেমস ডীন নয়, চাঁদের মধ্যে খুঁজে পেতে পারেন বাবুবৃত্তান্তের সমর সেনকে, পেয়ে যেতে পারেন নীরদ সির স্বভাবসিদ্ধ অনায়াস দাম্ভিকতাকে। তফাত একটাই, চাঁদ আক্ষরিক অর্থেই ‘আননোন ইন্ডিয়ান’,  ওর লেখাটা বই হয়ে নাই বেরোতে পারত, থেকে যেতেই পারত ডায়েরীর পাতায়। তাই বেশী বিশ্লেষণের স্কোপ এখানে কম; এগুলো আমার-ও কথা হতে পারত ভেবে পড়ে ফেলুন। চাঁদের যে সত্তা দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন, তার টুকরোটাকরা আমাদের মধ্যেও রয়ে গেছে যে –  তাই প্রবাসী হন কি নিজভূমে পরবাসী, মেলাতে পারবেন নিজের সঙ্গে, ওর মতন অ্যাগ্রেসিভ না হয়েও। .

mgdy3

mgdy2

পুনশ্চ –  ষষ্ঠীব্রতর ‘My god died young’  এখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলেও এককালে বেজায় নাম করেছিল। আর ওনার দ্বিতীয় বইটা রীতিমতন ঔৎসুক্য জাগিয়েছিল শিরোনামের জন্য , ‘Confessions of an Indian woman eater’।  সত্তরের দশকের বইপড়ুয়াদের শুধোবেন, অনেকে নিশ্চয় এখনো মনে রেখেছেন – সফট-পর্ন লেখক হিসাবেই সই। না বলতে পারা কথাগুলো কেউ তো বলেছিল, অবশেষে!

Advertisements

5 thoughts on “অবশেষে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s