দিকশূন্যপুরে

প্রমিত গেছিল। প্রমিত নীললোহিতের থেকেও বেশি বাঙ্গালী, ভরসার কথা সেটাই – অত্ত বোহেমিয়ানা বাঙ্গালী ধাতে সয় না। কিন্তু প্রমিতের সঙ্গে দেখা করাটাও কঠিন ব্যাপার। আপনি সিয়াটল কি সান ফ্রান্সিস্কো তে থাকলে চান্স বেশি, কলকাতা কি কৃষ্ণনগরে থাকলে দেখা নির্ঘাত নাই হতে পারে। এসব ব্যাপারকে আজকাল আর আয়রনি বলে ভাবি না, এটাই জাগতিক নিয়ম।

অথচ প্রমিত  দক্ষিণ কলকাতায় আপনার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। আপনার মতনই উত্তরের ভেঙ্গে পড়া ঘরবাড়ি দেখলেই ক্যামেরা ধরা হাত নিশপিশ করতে থাকে ওর-ও। আপনার মতই রোগাটে চেহারা অথচ হাল্কা ভুঁড়ির আভাস। দেখলে মনে হয় কলেজ ছেড়ে বেশিদিন বেরোয়নি, যদিও সামনের দিকের চুল একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। বলছিলাম না, বড্ড বাঙ্গালী! তাই বোধহয় একটা প্রেমও চায়। না না, ‘প্রেম’ কথাটা শুনতে যতটা নাটুকে, ততটা নাটকীয়তার সঙ্গে প্রেম করতে চায় না। আবার ঠিক নিষিদ্ধ আপেল গ্রহণ করার মতন করেও নয়, এক্সপেরিয়েন্স করা যাকে বলে ও ঠিক সেটাই করতে চায়। একটু খেলাচ্ছলে, কিছুটা দায়িত্ব নিয়ে আর বাকিটা ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিয়ে।

তা নীললোহিতের দিকশূন্যপুরে এরকম বাঙ্গালী তো যেতে পারে না। যারা যায়, তাদের জীবন নিজেদের মতন করেই ঘটনাবহুল। তারা তকমাহীন শিল্পী, তারা অনেকটা ভবঘুরে, তারা ইউটোপিয়ায় বেজায় বিশ্বাস করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এদের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারি না, বলতে সঙ্কোচ নেই যে কোথায় যেন একটা অবিশ্বাসও রয়ে যায়। আর তাই প্রমিতকে যেতে দেখে মনে হল আমিও পারি; যেই দেখলাম ও পৌঁছতে পেরেছে, সন্দেহটা অনেক কমে গেল। আর প্রমিতকে ভারী ভাল লাগল, মনে হল বন্ধু হই।

কিন্তু এরকম এক চরিত্র দিকশূন্যপুরের মতন জায়গায় গেলে সেখানকার  ‘ইকুইলিব্রিয়াম’ নষ্ট হতে বাধ্য। হলও তাই। শুরুতেই বেমালুম বলে দিল জায়গাটায় আসল নাম ‘মালিনী’; এমনকি ওর সঙ্গে আলাপ হলেই দেখবেন শুধু নাম নয়, গোটা পথনির্দেশিকাটাই আপনাকে দিয়ে দেবে। আশা করব একদিন না একদিন ওর সঙ্গে দেখা হবেই, তাও বলে রাখি জায়গাটা নদীয়ায়, নাজিরপুরের কাছেই। তবে হ্যাঁ, যদি আশা করে থাকেন যে বন্দনাদি কি রূপসার মতন সুন্দরী, স্মার্ট,  অবসাদনন্দিনীরা আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন, তাহলে ভুল করবেন। ওনারা অপেক্ষা করেন নীললোহিতের জন্য, আর তাই ওনারা বাস্তবিক কল্পনা। ওনাদের প্রমিত পাবে না; ও বা আপনি বা আমি পাব কাল্পনিক বাস্তবদের। তাদের নাম ডলি হতে পারে বা পলি, কিছু এসে যায় না, বড় বিশেষত্বহীন নাম। ক্ষয়াটে চেহারার কিছু মেয়ে, কিন্তু তারা ভালোবাসার জন্য মুখিয়ে আছে। না, প্লেটোনিক নয়, অ্যাবসট্রাক্ট নয়, আবার জান্তব শরীরীও নয়, এ ‘প্রেম’ বড় বাঙ্গালী আর তাই বড় পরিচিত। হয়ত তাই প্রমিতের কম্ফরট-বৃত্তে এরা অনায়াসে ঢুকে পড়ে। আর তাই আবারো প্রমিতকে মনে হয় কাছের বন্ধু, যাকে টিজ করলে ইনডিফারেন্স দেখাবে না আবার অকারণ মুখ খারাপও করবে না, একটু করুণ মুখে হেসে বলবে ‘চাটিস না মাইরী।’।

প্রমিত একটা মকুমেন্টারি বানিয়েছে রিসেন্টলি, ওর দিকশূন্যপুরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। যদিও ওর কাছে জায়গাটা দিকশূন্যপুরে নয়, বইটই নিয়ে ও বেশি মাথা ঘামায় না; ওর কাজ ক্যামেরা নিয়ে। পারলে দেখবেন, না ভুল বললাম যে ভাবেই হোক দেখবেন। ওর নিজের গল্প তো রইলই তার সঙ্গে দেখবেন কতদিন পর বাঙ্গালীর ক্যামেরায় কি চমৎকার কালবৈশাখী ধরা পড়েছে, দেখবেন কতদিন পর দরজার দোর ধরা অকৃত্রিম কান্না আপনার মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, সেকন্ডের জন্য হলেও। তা বলে আবার ভাববেন না অনর্থক ইমোশনের ঘনঘটা, প্রেমের সন্ধানে থাকলেও অযথা প্যানপ্যানানি ওর না-পসন্দ। ও দেখতে চায় raw জীবন। সে জীবন অনেক কিছুই করতে পারে – হাসাতে, কাঁদাতে, চাটতে, খ্যাঁকখ্যাঁক করতে; প্রমিতের হাতে নেই সেসব। তাই কম্প্রোমাইজের স্কোপটাও নেই, ওর মকুমেন্টারিতে বস্তির এক চিলতে রাস্তা (যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি যেতে পারে না) দেখে আপনি বিহ্বল হলেও ও নাচার, কোনো সান্ত্বনাবাক্য পাবেন না, পাবেন না অযথা বাক্যক্ষয়।

ইউটিউবে একটা ট্রেলার দিয়েছে দেখলাম। সেটুকুই তুলে দিতে পারি, আর কি? তবে ট্রেলারটা পদের নয়, বিশেষ কিছু নাই বুঝতে পারেন। আরেকটু ভালো করে বোঝার জন্য ট্রাইপড এন্টারটেনমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন – https://www.facebook.com/tripodonline। আর যোগাযোগ হলে একটু বলে দেবেন, ‘ব্যক্তিগত’তে আকার নেই। অকারণ নিটপিকিং নয়, এন্ড ক্রেডিটে তালভঙ্গ হতে দেখলে কারই বা ভালো লাগে?  আর বন্ধুর কাজ হলে বলাটা কর্তব্য।

BB

(উৎস – http://seattlebengalifilmfestival.com/bakita-byaktigoto.html)

Advertisements

3 thoughts on “দিকশূন্যপুরে

  1. Pradipta Bhattacharyya says:

    gramer naam ta Mohini, Malini noy. Byaktigato te kothao aakar deoa hoyni. Pramit Mockumunentary banayni, documentary baniechhe. Egulo baade lekhata khub e bhalo.

    Like

  2. আরে কি সৌভাগ্য! প্রথম এবং তৃতীয় ত্রুটি দুটোর জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত; তবে আকারের ব্যাপারটা শুধু আমি নই, আমার এক বন্ধুও দেখেছে। কি জানি, ওটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আলাদা করে কোনো স্লাইডে ঢোকানো হয়েছিল কিনা। আর সেটা না হয়ে থাকলে ওটার জন্যও দুঃখপ্রকাশ করছি।

    এরকম আরো অনেক সিনেমা বানান, শুধু এটুকুই বলতে পারি যে বহু লোক সোৎসাহে অপেক্ষা করে থাকবে। আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইল।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s