বৌদিদিদের সন্ধানে

কয়েকদিন আগে বুদ্ধদেব গুহর ‘হলুদ বসন্ত’ পড়ছিলাম, যা লিখে তাঁর প্রেম সিরিজের জয়যাত্রার শুরু। এ উপন্যাস পড়ে সন্তোষকুমার ঘোষ বলেছিলেন “নীলাঙ্গুরীয়’র পর বাংলা কথা সাহিত্যে এমনতর প্রেমের উপন্যাস খুব কমই লেখা হয়েছে”। এসব কমপ্লিমেন্ট নিয়ে বিতর্কের মধ্যে যাচ্ছি না, তবে উপন্যাসটা পড়ে থাকলে জানাবেন কেমন লেগেছিল। আর যাঁরা পড়েননি অথচ বুদ্ধদেব গুহ পড়তে ভালোবাসেন তাঁদেরকে বলব ‘হলুদ বসন্ত’ আর তার ঠিক পরেই লেখা ‘খেলা যখন’ এই দুটোই পড়ে ফেলতে, বেশ ভণিতাবিহীন টান টান লেখা এবং যুবক বুদ্ধদেবের বেপরোয়া ভাবটা বেশ বোঝা যায়; আর হ্যাঁ, ‘খেলা যখন’ লেখা হয়েছে ঋতু গুহ আর ওনার রিলেশনশিপ নিয়ে, সেটা অ্যাডেড ইনসেন্টিভ হতে পারে।

একটু ধান ভানতে শিবের গীত হল, কিন্তু ব্লগই তো লিখছি, আড্ডাটাই মূল উদ্দেশ্য। এনিওয়ে, হলুদ বসন্ত পড়তে গিয়ে দেখলাম এক জায়গায় নায়কের জবানীতে বুদ্ধদেব বলছেন “দোলের দিন প্রতিটি লোকই হেরে যাবার জন্য মনে মনে প্রস্তুত থাকে। রূপসী বৌদিও যে কোনও অবাধ্য দেওরের কাছে হেরে যাবার জন্য মনেপ্রাণে হন্যে হয়ে থাকে।” আমি বুদ্ধদেবের প্রায় সমস্ত লেখাই পড়েছি, হঠাৎ মনে পড়ল রূপসী বৌদিদের প্রতি বুদ্ধদেবের এই আলাদা টানটা আরো বেশ কয়েকবার দেখতে পেয়েছি, যেমন ওনার ‘পুজোর সময়’ উপন্যাসের এক চরিত্র ভগাদা, উপন্যাসের নায়ক চাঁদুকে ফিসফিস করে জানিয়েছিলেন……কি জানিয়েছিলেন? পড়েই ফেলুন বরং, আগে থেকে বলে দিয়ে আপনার পড়ার আনন্দ মাটি করতে চাই না। তো বুদ্ধদেব একা নন, বৌদিদের নিয়ে এই রহস্যের বাতাবরণ আরো অনেকেই তৈরী করে গেছেন। একটা গল্পের উল্লেখ করতে চাই এখানে, রতন ভট্টাচার্যের ‘কৃষ্ণকীর্তন’, ১৯৬১ সালে দেশে বেরিয়েছিল। দেশ সুবর্ণজয়ন্তী গল্পসঙ্কলনে পেয়ে যাবেন। গল্পের শেষটা একটু তুলে দি,

“সেই স্তব্ধতায় রানীবৌদির চোখের দিকে তাকিয়ে রমেন হাসল। ‘রানীবৌদি, কাল সারারাত  ঘুমুইনি।’ রানীবৌদি চোখ নামিয়ে বললেন ‘জানি!’।  রমেন অবাক হয়ে বললে ‘জান? কি করে জানলে?’ ‘কাল সারারাত রকে বসে ছিলুম।’।  এটাও পড়ে ফেলতে পারেন; এই নিদ্রাবিহীন রাত্রিযাপনের একটা ছোট্ট বর্ণনা আছে, বেশ দাগ কেটে যায়।

পয়েন্টটা হল বৌদিদের  নিয়ে বাঙ্গালী যুবকের আগ্রহ আজকের নয় কিন্তু  সে আগ্রহ যেন ক্রমশই অনুভূতি রহিত ঔৎসুক্যে পরিণত হচ্ছে। অনলাইন ফোরামে ফোরামে আলোচনার বহর দেখে মনে হচ্ছে শব্দটির যৌন টিপ্পুনি ব্যতীত অন্য কোনো কনোটেশনই নেই। বিশ্বাস না হলে বাংলায় একবার শব্দটা টাইপ করে গুগলে সার্চ  করে দেখতে পারেন,  তখন অবশ্য আঁতকে উঠে বলবেন না আগে কেন সতর্ক করিনি।  মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে ‘বৌদি’ শব্দটা মেয়েদের জন্য বড়ই ‘আন্- কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  মাঝ কুড়ি থেকে মধ্য চল্লিশ, ‘বৌদি’ বলে ডাকলে ভুরুটি কুঁচকোবেই।  দুয়ের ফলাফলে বাংলা থেকে বন্ধুপ্রতিম, আড্ডাবাজ, প্রশ্রয়দাত্রী বৌদিরা বেবাক উধাও হয়ে গেছেন। দেবরকুল এর কুফল এক্ষুনি টের পাচ্ছে না হয়ত কিন্তু একদিন না একদিন ঠ্যালা বুঝবেই। বেকার দেওরকে হাতখরচ, প্রেমিক দেওরকে সাহস, বাপে তাড়ানো-মায়ে খেদানো দেওরকে প্রশ্রয় যোগানোর জন্য কেউ থাকছেন না, এ ভাবতেই বেশ আতঙ্ক হয়। অনাগতকালের যুবারা কাদেরকে হারাচ্ছেন একবার মনে করিয়ে দেওয়া ভালো!

১) নারায়ণী

2

মা মরা ছেলেদের চিরকালের ভরসা, নিজের মাও এতটা ভালোবাসতেন না হয়ত। ভালোবাসার খাতিরে নারায়ণীরা নিজেদের মাকে অবধি বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারেন যাতে ক্ষুদে দেওরের গায়ে আঁচটি না লাগে। তবে হ্যাঁ, বেশি বাঁদরামিতে মেজাজ গরম হতে পারে, তখন টানা তিন-চার দিন স্পীকটি নট! মাতৃসমা বৌদিরা যেরকম হন আর কি!

২) কমলা

3

অনার্স না পেলেও কমলা বৌদিরা গিফট দেবেন, কারণ তাঁদের দেওরদের থেকে ইন্টেলিজেন্ট ছেলেপুলে পৃথিবীতে নেই, পরীক্ষকরা বোঝেননি তো হয়েছেটা কি? তবে বাড়ির বাকি সবাই চাকরী এবং টাকা দেখে আহ্লাদিত হলেও, কমলা বৌদিদের মনে শান্তি নাই থাকতে পারে। কারণ, টাকা আনলেও সোমনাথরা মন মরা হয়ে আছে; শ্বাপদসঙ্কুল জন অরণ্যে লড়াই যে কত কঠিণ ব্যাপার, সে শুধু কমলা বৌদিরাই  বোঝেন।

৩) চারুলতা
4
কে মাথার দিব্যি দিয়েছে যে বৌদিদের সর্বদা বয়োজ্যেষ্ঠা হতেই হবে? চারু্রা সমবয়স্কা, বৌঠান বলে ডাকলেও এনারা অমলদের সঙ্গে বসে বাগান বানানোর প্ল্যান করবেন, বায়না করবেন বাগান সংলগ্ন ঝিলে নীলপদ্ম এনে দিতে হবে বলে। এনাদের ছেলেমানুষীটা একটু বেশি কিন্তু দেবর অন্ত প্রাণ। তাদের জন্য জুতো সেলাই থেকে কবিতা পাঠ সব করতে পারেন। এর বেশি কিছু চাইবেন না, ওসব নাটক-নভেলে হয়।

৪)

5

বৌদিদের নাম জানা না থাকলেই বা কি? সময় সময় ওনারা সার্বজনীন বৌদি, শ্যাম হোক কি লালু – ভালোবাসায় কিছু ফারাক পড়ে না।  পাড়াতুতো দেওরদের বেজায় প্রশ্রয় দেন,  দরকার পড়লে তাদের হয়ে মিথ্যা কথা বলেন; সময় সময় পাড়ার মেয়েদের ম্যানেজ করার জন্যও এহেন বৌদিই ভরসা, বিটলে বুদ্ধি যোগানে সিদ্ধহস্ত। বোরিং পতিদেবতাটির থেকে দুষ্টু দেওরদের সঙ্গে সময় কাটানোতেই বেশী আগ্রহ।

৫) তপতী

6

এনারা একটু ন্যাগিং বৌদি, দেওররা যতই খ্যাঁচম্যাচ করুক না কেন, তাদের ভূতভবিষ্যৎ সব জেনে তবে শান্তি। কিন্তু দেওরদের ব্যবহারে এনারা রাগ করেন না, করেন খালি তাঁদের কাছে খবর চেপে গেলে – সে ভালো কি খারাপ যে খবরই হোক না কেন। ভালো চাকরি দুম করে ছেড়ে দেওয়ার খবর শুনে শুরুতে একটু কিন্তু কিন্তু করলেও, চাকরি ছাড়ার কারণটা জোরদার দেখাতে পারলে গয়না টয়না বেচে কবিতার ম্যাগাজিন ছাপানোর খরচ যোগাতে পিছপা হবেন না এনারা।

তাই বলছিলাম – বৌদিদিরা ফিরে আসুন, অবিলম্বে! আপনারা না ফিরলে শেষমেশ রইবেন কেবল সবিতা

পণ্ডিতপ্রবর

Image

(স্থিরচিত্র উৎস – The Telegraph, Kolkata)

কাকতালীয়ই হয়ত কিন্তু বিস্মৃতপ্রায় মানুষটিকে হঠাৎ এক মাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার খবরের পাতায় আসতে দেখে একটু চমকেই গেছিলাম। গতকালই দেখলাম অমর্ত্য সেন বলেছেন ওনার প্রেসিডেন্সিতে পড়তে আসার পেছনে মূল কারণ ছিলেন সুখময়; মাসের গোড়ার দিকে আবার টেলিগ্রাফের ‘ওপিনিয়ন’ পাতায় ছিল সুখময়ের আকস্মিক উপস্থিতি।  আর তার পরেও যেহেতু গোটা মাসটাই সারা দেশ সরগরম থাকল ভাগবতী-সেন তরজা নিয়ে (আমার মতে অবশ্য এটা তরজা নয়, এক পক্ষই আক্রমণ শাণিয়ে গেল), সুখময়ের নাম এদিক সেদিকে বেশ কয়েকবার ছিটকে আসতে দেখলাম – যতই হোক, ষাট দশকের দিল্লী স্কুলের হোলি ট্রিনিটিকে এক সারিতে বসানোর সুযোগ কেই বা ছাড়তে চায়, কারণ থাকুক বা না থাকুক।

সুখময় চক্রবর্তী নামটার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯০ সালে্, সে বছরে্রই অগস্টে চলে গেছেন তিনি। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন ছেড়ে এসে সদ্য ভর্তি হয়েছি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টে, ক্লাস ফাইভে। নতুন স্কুলের  অনেক কিছুই সমীহ জাগিয়েছিল প্রথম দর্শনেই, আর তার মধ্যে অন্যতম ছিল দোতলার দেওয়ালে টাঙ্গানো একটা লম্বা বাদামী রঙের দামী কাঠের বোর্ড। তাতে সাদা অক্ষরে শুরুর বছরগুলো থেকে যে সমস্ত হীরের টুকরোরা স্কুল ফাইন্যাল, হায়ার সেকন্ডারী (এগারো ক্লাসের পর), মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে র‍্যাঙ্ক নিয়ে এসেছে, তাদের নাম লেখা। আর প্রথম কলামেই জ্বলজ্বল করতে দেখেছিলাম সুখময়ের নাম, স্কুল ফাইন্যালে সেকন্ড হয়েছিলেন, সালটা সম্ভবত ১৯৪৮। কিন্তু ওটুকুই যা দেখা, আট বছর পড়েছি স্কুলে, একটিবারের জন্যও কোনো শিক্ষক বা প্রাক্তন ছাত্রের মুখে সুখময়কে নিয়ে কিছু শুনিনি। অথচ, অন্য অনেক স্কুলের থেকে আমাদের স্কুল প্রাক্তনীদের ঢের বেশি মনে রেখেছে। কিন্তু সত্যজিৎ, শম্ভু মিত্র , রাহুল দেব বর্মণ দের মাঝে সুখময়কে মনে করিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না। চল্লিশের শেষের দিকে যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের স্বভাবতই দেখার কোনো সুযোগই ছিল না। আমরা তাই বয়স্ক শিক্ষকদের মুখে যে সমস্ত বিস্ময়বালকদের কথা শুনতাম, তাঁরা খুব বেশি হলে ষাটের দশকে বেরিয়েছেন। তাই রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব প্রসাদরঞ্জন রায় যে কিরকম চৌখস ছাত্র ছিলেন সে নিয়ে আমরা এখনো বিস্তর ট্রিভিয়া মিশ্রিত আলোচনায় বসে যেতে পারি, কিন্তু সুখময়ের সে সৌভাগ্যটা হয়নি। ভাবতে পারেন আমরা না জানি, আমাদের আগের জেনারেশন জেনেছিল নিশ্চয়। আমিও তাই ভেবেছিলাম কিন্তু হায়ার সেকন্ডারি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও যতবার স্কুলের অ্যালুমনি মীট গুলোতে আসতাম, কারোর মুখেই সুখময়ের নাম শুনিনি -ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই কোনো দশকের ছাত্ররাই জানতে পারেননি কি অসীম এক প্রতিভার উন্মেষ হতে দেখেছে আমাদের স্কুল।

এই ভুলে যাওয়াটাই কি তাহলে সুখময়ের জন্য চিরকালীন ভবিতব্য হয়ে রইল? সুখময়ের মৃত্যুর পর আমরা অস্বাভাবিক দ্রুততায় ভুলে গেছি ওনাকে। সত্যি কথা বলতে কি, আশির প্রায় গোড়ার দিক থেকেই সুখময় মূলত শারীরিক কারণে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছিলেন। অথচ স্কুল ফাইন্যালে ওনাকে টপকে যিনি ফার্স্ট হয়েছিলেন তিনি তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। হ্যাঁ, অমর্ত্য বরাবরই ফার্স্ট হয়ে এসেছেন স্কুল ফাইন্যাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যাল্যের পরীক্ষা অবধি, সুখময় সবসময়ই দ্বিতীয়  কিন্তু অমর্ত্যর থেকে বোধহয় ভালো কেউ জানবেন না যে সুখময়ের প্রগাঢ় পান্ডিত্যকে মার্কস, র‍্যাঙ্ক দিয়ে যাচাই করার চেষ্টাটাই বাতুলতা। অমর্ত্য দার্শনিক, অসাধারণ শিক্ষক, শ্রেষ্টতম গবেষক আর সুখময়? তাঁর কিন্তু একটাই আইডেন্টিটি, তিনি চিরকালের পণ্ডিত। সে পান্ডিত্যের ছটা সারা পৃথিবী জুড়েই ছড়িয়েছিল এক সময় কিন্তু  ইউনিভার্সিটির চত্ত্বর ছেড়ে যে মুহূর্তে সুখময় ঢুকে গেলেন প্ল্যানিং কমিশনে, কিছুটা হলেও একটা গণ্ডীর মধ্যে সীমিত হয়ে গেল তাঁর কাজ এবং কাজের অভিমুখ । সুখময় নিশ্চিত ভাবেই বিশ্বজোড়া খ্যাতির জন্য লালায়িত ছিলেন না কিন্তু শুধু দেশে থেকে দেশের জন্য কাজ করে গেলেন বলেই হয়ত এই বিস্মৃতি ওনার প্রাপ্য হয়ে রইল। অশোক মিত্র তাঁর অতীব সুপাঠ্য ‘আপিলা চাপিলা’তে তাই লিখেছিলেন “অথচ তাকে অনুরোধ-উপরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে যোজনা কমিশনে বসিয়ে দেওয়া হল। বিবেকভারাতুর সুখময়, যে কর্তব্য তার পক্ষে অযথা কালহেলন, তাতে নিবিষ্ট হয়ে রইলো জীবনের শেষ দশ-বারো বছর। কে জানে, যদি এই পর্বের অবর্ণনীয় পরিশ্রম থেকে সে মুক্ত থাকতে পারতো, সম্ভবত আরও ঢের দিন  তার জীবনায় প্রলম্বিত হতো, পৃথিবী ও দেশ তার কাছ থেকে প্রভূত আরও জ্ঞানের উপচার আহরণের সুযোগ পেত।”

ময়মনসিংহের রায়চৌধুরীদের মতন অত খ্যাতি না থাকলেও, চক্রবর্তীরাও বেশ বিখ্যাত ছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য। কিন্তু অমর্ত্যর মতনই সুখময়েরও প্রাথমিক পড়াশোনা ঢাকাতেই। তারপর কলকাতার বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়, সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি। প্রেসিডেন্সিতে থাকাকালীনই যে উনি প্রায় জীবন্ত  এনসাইক্লোপীডিয়া সুলভ খ্যাতি লাভ করেছিলেন সেকথা উৎসাহীদের অনেকেরই মনে পড়বে।  অর্থনীতিবিদ  ধীরেশ ভট্টাচার্য্য সুখময়ের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন গণিতে তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ। অর্থনীতির শিক্ষকদের থেকেও তাঁকে বেশি দেখতে পাওয়া যেত প্রেসিডেন্সির গণিতের শিক্ষক নন্দলাল ঘোষের সঙ্গে; দুরূহ গণিতের বই নিয়ে এত রাত অবধি জেগে থাকতেন যে প্রত্যেক দিনের প্রথম ইকোনমিক্স ক্লাসে আসতে অবধারিত ভাবে দশ মিনিট দেরি হতই। আর তাই হয়ত প্রেসিডেন্সি থেকে বেরোনর পরেই সুখময় মেন্টর হিসাবে বেছে নেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে।  আই-এস-আইতে কাজ করার সময়েই সুখময় প্রথমবারের জন্য সান্নিধ্যে আসেন বিখ্যাত ডাচ অর্থনীতিবিদ ইয়ান টিনবার্গেনের। এনার কাছেই কাজ করে কয়েক বছর আগে পি-এইচ-ডি ডিগ্রী পেয়েছেন অশোক মিত্র, প্রায় এক দশক পর ইনিই হবেন অর্থনীতির প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের একজন। টিনবার্গেন সুখময়ের প্রজ্ঞায় এতটাই অভিভুত হয়ে পড়েন যে কলকাতায় থাকতে থাকতেই ফেলোশিপের বন্দোবস্ত করে সুখময়কে নিয়ে যান বিশ্ববিখ্যাত ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত নেদারল্যান্ড ইন্সটিটিউট অফ ইকোনমিক্স-এ। প্রায় দু’শ মাইল দূরে বসে অমর্ত্য তখন কেমব্রিজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন, জিতে নিয়েছেন অর্থনীতির শ্রেষ্ট ছাত্র হিসাবে অ্যাডাম স্মিথ পুরস্কার (পরের দু’বছরেও এই পুরস্কার যায় আরো দুই ভারতীয় ছাত্রের হাতে, তাঁদের নাম? জগদীশ ভাগবতী এবং মনমোহন সিং)। আর সুখময়? তিনিও অভাবনীয় কাজ করেছেন, একে অবিশ্বাস্য বললেও অত্যুক্তি হয় না। এক বছরেরও কম সময়ে তিনি জমা দিয়েছেন তাঁর থিসিস। সেই থিসিস থেকেই সুখময়ের প্রথম বই ‘The logic of investment planning’ (North Holland Publishing Company, 1959)। তারপর দু’বছর এম-আই-টি তে কাটিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়, পড়াতে শুরু করেন প্রেসিডেন্সীতে। দু’বছরের মাথায়  বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ কে-এন-রাজ, সুখময়কে ‘শঙ্করলাল প্রফেসরশিপ ইন ম্যাথেমেটিকাল ইকোনমিক্স’ দিয়ে নিয়ে আসেন দিল্লী স্কুল অফ ইকোনমিক্সে। তখনকার দিনে যা অচিন্ত্যনীয় তাই করেছিলেন কে-এন-রাজ, একই বছরে তিন তরুণতম অর্থনীতিবিদকে ফুল প্রফেসরশিপ দিয়ে নিয়ে এনেছিলেন দিল্লীতে, সুখময়ের সঙ্গে ওই সময়েই যোগ দেন অমর্ত্য এবং জগদীশ, বাকিটা ইতিহাস।  এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে এরা দিল্লী স্কুলকে গড়ে তুলেছিলেন ভারতে অর্থনীতিচর্চার পীঠস্থান হিসাবে, তারপর ১৯৬৮ তে জগদীশ চলে যান এম-আই-টি তে, আরো তিন বছর পর অমর্ত্য যান লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে।

আর একইরকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুখময় থেকে যান দিল্লী স্কুলেই, প্রশান্তচন্দ্রের সুযোগ্য ছাত্র হিসাবে দায়িত্ব নেন পঞ্চম যোজনা কমিশনের। ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুরোধ ফেলতে পারেন নি সুখময়, কর্মজীবন বলতে গেলে দেশের কাজেই উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। আর সে গুরুদায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মেলে ইন্দিরার মৃত্যুর পরই। স্পষ্টবক্তা অশোক মিত্র অবশ্য সুখময়ের পরম সুহৃদ হলেও প্রশ্ন তুলেছিলেন জরুরী অবস্থার সময়েও সুখময়ের ইন্দিরার প্রতি আনুগত্য নিয়ে। যাঁরা সুখময়কে প্রকৃত  চিনতেন তাঁরাই হয়ত বলতে পারবেন আনুগত্যটা কাজের প্রতি ছিল নাকি ইন্দিরার প্রতি।  জরুরী অবস্থার সময় প্রতিবাদের দরকার নিশ্চয় ছিল আবার এটাও ঠিক মাত্র ৫৭ বছর বয়সে সুখময় চলে গেছিলেন দেশের কাজ করতে করতেই।

ভবিষ্যৎ বিচার করবে বলে ছেড়ে দেওয়া যেত হয়ত কিন্তু ভবিষ্যৎ কি আদৌ মনে রাখবে?  অমর্ত্য সেন – জগদীশ ভাগবতী কেউই ভারতে থাকেন না বলে এঁদের দায়বদ্ধতা নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন তারাই তো হয় মনেও রাখেন নি বা জানবার প্রয়োজন বোধ করেন নি সুখময় এবং সুখময়ের কাজকে। আগে গ্রোথ না আগে ডেভেলপমেন্ট এ প্রশ্নের জবাব পেতে হয়ত অমর্ত্য-জগদীশদের থেকেও বেশি প্রয়োজন সুখময়দের। তত্ত্বের অপরিসীম গুরুত্ব, কিন্তু সে তত্ত্ব প্রয়োগ করে কাজের কাজটা করার ল্যাঠাও যে বড্ড বেশী।

(তথ্যঋণ – আশোক মিত্র, ধীরেশ ভট্টাচার্য, মনমোহন অগরওয়াল, বাদল মুখার্জী এবং ভি. পন্ডিত)

(সেই) রহস্যজনক ফেল্ট হ্যাট

5

বুঝতেই পারছেন হাড়-হিম করা ঘটনা ঘটতে চলেছে। অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী ঘরে ঢুকে পড়েছে, সন্তর্পণে আলো জ্বালিয়ে দেখে নিচ্ছে শিকারের বদলে অন্য কেউ শুয়ে আছে কিনা। চারদিক নিশ্চুপ, তীব্র এক্সপেক্টেশন্স নিয়ে ঘরের চার দেওয়াল অপেক্ষা করছে রক্ত ছিটকে আসে কিনা। এরকম টানটান উত্তেজনার মধ্যেই আমাদের দর্শকের চোখে পড়ল পার্ক সার্কাসের ভ্যাপসা গরমেও খুনী ফেল্ট হ্যাট পরে এসেছে, এমনকি ওভারকোটাটা ছাড়তেও রাজি হয়নি। এদিকে যিনি খুন হতে চলেছেন, তিনি দিব্যি একটা ঘুম দিচ্ছেন। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তিনি কি পরে আছেন একবার দেখুন, ধুতি আর হাফহাতা গেঞ্জি। গুপ্তশ্রী প্রোডাকশন্সের প্রথম নিবেদন ‘নিশাচর’ (১৯৭১) যারা দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয় মনে পড়ে যাবে হত্যাকারী  কে,  মনে পড়বে রাতের অন্ধকারে কলকাতার রাস্তায় ‘কার-চেজ’ এর কথা। আরো মনে পড়বে হাতে গোনা যে কয়েকটি বাংলা সিনেমাতে শম্ভু মিত্র অভিনয় করেছিলেন, এটি তার মধ্যে অন্যতম। আর সঙ্গে সঙ্গে হয়ত এটাও মনে পড়বে যে ওপরের দৃশ্যটি ঠিক খুনের দৃশ্য নয়, ওটা একটা ধোঁকার টাটি, দর্শকের জন্য টোপ।

এই টোপ ফেলার জন্য যথাযথ অ্যাম্বিয়েন্স তৈরী করাটা দরকার। সেই সুবাদেই চল্লিশ থেকে সত্তরের দশক অবধি যখনই ডিটেকটিভ/মিস্ট্রি সিনেমা তৈরী হয়েছে টলিউডে, ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোটের কম্বিনেশন ছিল একেবারে অপরিহার্য। হলিউড noir কি ইউরোপীয়ান থ্রিলা্র এমনকি অ্যালান ফারস্টের উপন্যাসের প্রচ্ছদতেও ( দেখুন, এখানে এবং এখানে)  ফেল্ট হ্যাটের ছড়াছাড়ি কিন্তু বাংলা সিনেমায় ফেল্ট হ্যাটের আবির্ভাব সবসময়েই ভারী রহস্যজনক, এবং সে রহস্য সমাধান অনেকসময়ই আমাদের ক্ষমতার বাইরে।

নিচের দৃশ্যটিই ভাবুন!

4

ছোট্টো জায়গা রত্নগড়ে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। রাতবিরেতে জলার ধার থেকে ভেসে আসছে রক্ত জল করে দেওয়া খিলখিল হাসি, সেই জলার ধার দিয়েই ল্যান্ডো গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার সময় খুন হয়ে গেছেন সেখানকার মহারাজ, মৃত্যুর সময়ে আবার তাঁর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল; সারা মুখে লেগে ছিল এক ভয়াবহ আতঙ্কের ছাপ। চার পুরুষ আগের এক লম্পট মহারাজকে হঠাৎ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, লোকে দেখেছে তাঁর সারা গায়ে আগুন জ্বলছে। আর তাঁর লালসার আগুনে যে মেয়েটি পুড়ে মারা যায় সেই নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে জলায়। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে নাকি ? আলবত, দেওয়ার মতনই ব্যাপার। কিন্তু রহস্য কি শুধু জলার পেত্নীতেই পেলেন?

জিঘাংসু জলার অশরীরী ততোধিক অশরীরী গলায় (কে গেয়েছে বলুন তো? এটা একটা হিন্ট!) গৌরীপ্রসন্নের কথায় “আমি মরীচিকা, আমি মরুমায়া” গেয়ে চলেছে, এরকম নয় যে ব্যাকগ্রাউন্ডে জিওরজি লিগেটির ‘রিক্যুয়েম‘ বা বাখের ‘টোক্কাটা‘ বাজছে। অথচ রত্নগড়ে কি বলব মশাই, দেশী পোষাক কেউ পরে না। রাজবাড়ির লোকজনদের কথা আলাদা, তাঁরা ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোট কেন, স্লীপিং গাউন থেকে শুরু করে ব্রীচেস, সবই পরতে পারেন। কিন্তু ধরুন রত্নগড়ের পুরুষানুক্রমে নির্যাতিত প্রজাদের সুস্থ করার ভার যে ডাক্তারের তিনিও ফেল্ট হ্যাট ছাড়া কিছু পড়েন না (অবশ্য এটা ঠিক যে কমল মিত্রকে ধুতি-পাঞ্জাবী বলুন কি স্যুট-বুট, যাতেই দেখি মনে হয় এক্ষুনি হেঁকে উঠবেন ‘বেরিয়ে যাও’, ফেল্ট হ্যাটে দেখে একটু ভরসা হচ্ছিল!); আবার পাতি কলকাতা থেকে যে ডিটেকটিভরা রহস্য সমাধানে এলেন, স্টেশনে নামা ইস্তক তাঁদের পরনেও ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোট। অথচ কলকাতায় দিব্যি শার্ট-প্যান্ট পরেই ঘুরছিলেন, ওভারকোটের তলায় জামার অস্থানে এখনো ঘামের দাগ অথচ মাথায় ফেল্ট হ্যাট।

যাঁরা বাংলা ডিটেকটিভ সিনেমার পোকা তারা বলতে পারেন “আহা, শুধু ওভারকোট কেন? আমরা কি বর্ষাতিও দেখাইনি?”

8

হক কথা, কিন্তু ‘চুপি চুপি আসে’ তে বৃষ্টির রীতিমতন একটা ভূমিকা আছে, এতটাই যে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে নাম অবধি দেখানো যায় । প্রেমেন্দ্র মিত্রের উপন্যাসটা পড়লে অবশ্য আরেকটু ভালো বোঝা যায় যে বৃষ্টি না হলে হাইলি গপ্পোটাই বলা যেত না।  কিন্তু ‘কুহেলী’ তে কি বলবেন বলুন?

9

অজিতেশ টেনিদার ঘোড়ামামার মতন সেজেও রক্ষা পান নি, দেখুন কি পরে আছেন। ওই দাড়িগোঁফের জঙ্গল নিয়েই যে বেচারী অস্থির হয়ে পড়ছিলেন সে কথা জানায় কে। অথচ সুমিতা সান্যাল দিব্যি স্লীভলেস ব্লাউজ পরে “আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, আজ আমাদের ছুটি- আ হা, হা হা হা” গেয়ে চলেছেন। লিংগ-বৈষম্য কি আর ফিল্ম ইন্ডাট্রিতেও কম? অথচ জানেন নিশ্চয় অজিতেশের রোলটাও টোপ! আর টোপকেই যদি সাহেব সাজানো হয়, আসল ভিলেন কি পাইনের জঙ্গলে ধুতি পরে ঘুরে বেড়াবে?

6

পাইনের জঙ্গল নিয্যস ছিল মশাই, লাস্ট সিনে যে পরিচালক প্রায় তুলসীমঞ্চ বানিয়ে দেবেন সেটাকে এটা আর কেই বা ভেবেছিল বলুন। ওটা খানিকটা পোস্টমর্ডার্ন ট্রিটমেন্ট ভেবে শান্তি পেতে পারেন অবশ্য।

এখনো খুঁতখুঁত করছে তো মন? ভাবছেন আসল সিনেমার কথাটাই তো উঠল না, সেখানে তো ধুতি পাঞ্জাবী পরে শ্যাম লাহা আর নৃপতিকেই দেখে এসেছি আমরা।  অপরাধীকেও প্রথম দর্শনে না-মানুষ বলেই মনে হয়েছিল , কিন্তু ফেল্ট হ্যাট তো চোখে পড়েনি!  হ্যাঁ, ‘হানাবাড়ি’ তে চমকের পর চমক, সেখানে বিশালাকৃতি গোরিলাও আছে, আবার অ্যাংলো ন্যাদা-পাগলাও আছে।

10

আর এত কিছু চমকের মধ্যে ভাবছেন যে পরিচালক থ্রিলের আসল এলিমেন্টটা কে ভুলে মেরে দিয়েছেন?  তাও কি হয়? 🙂

7

একেই বলে ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ বা চন্দ্রিলের ভাষায় “আহা, লাস্ট সিনে স্লো মোশনে ইয়া ঢিসুম ছাড়ে গুরু”! ফেল্ট হ্যাটধারীকে চিনলেন না? আরে উনিই তো ডিটেকটিভ, তবে অজিতেশের মতন খারাপ ভাগ্য ওনার নয়। ন্যাদা-পাগলা সেজে থাকার সময় অন্তত ফেল্ট হ্যাটটা পড়তে হয়নি।

কিন্তু চুপি চুপি একটা কথা বলে যাই, ফেল্ট হ্যাটটা এখনো মিস করি। কলোনিয়াল হ্যাংওভার কি আর সহজে কাটে? গৌতম ঘোষ স্টেশন চত্বরে দু’হাত ছড়িয়ে ‘হাংরি’ আওড়াতে আওড়াতে প্রায় ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু বাইশে হোক বা না হোক, শ্রাবণ মাসের রাত্রে বৃষ্টির ধারালো ফোঁটার মধ্যে আবছা হয়ে যাওয়া গ্যাসলাইটের আলোয় ফেল্ট হ্যাট আর ওভারকোটের অবয়বের মতন রহস্যজনক ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না । সে খুনীও হতে পারে, গোয়েন্দাও, কিছু যায় আসে না – মনে থেকে যায় শুধু সেই রহস্যজনক ফেল্ট হ্যাট।

অবশেষে

mgdy1

ত্রয়োদশ সন্তান জন্মানোর পর পিতৃদেব নাম রেখেছিলেন ‘পরিশেষ’, চতুর্দশ সন্তান আসবে কি না সে নিয়ে বিশেষ ভাবিত ছিলেন না কিন্তু জনৈক আত্মীয়ের প্রশ্নে জানিয়েছিলেন যদি এসেই যায় (এবং পুত্রসন্তান হয়) তাহলে তার নাম রাখা হবে ‘অবশেষ’। পরিশেষ দু’বছর পরেই মারা যায় এবং অতঃপর অবশেষের আবির্ভাব। কিন্তু অবশেষ নামটা চলল না, মা ডাকতে লাগলেন চাঁদ, বাবা ডাকতে লাগলেন ‘বাবু’ এবং কদাচিৎ সবার সামনে ভালো নামের দরকার পড়লে ‘ষষ্টী’ নামে ডাকা হতে লাগল। চোদ্দজনের মধ্যে মাত্র চার জন বাঁচায় হয়ত এ নামটাই ছিল অনিবার্য। চাঁদ কিন্তু এটাকে নেহাত সৌভাগ্য বলে ভাবতে পারেনি, মোটামুটি যেদিন থেকে নরনারীর সম্পর্ক ভাসাভাসা হলেও বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই ভেবেছে “চোদ্দওওওও! এও হয়?”

হত তো কতকিছুই। কিন্তু সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন আর ক’জন তোলে? তুললেও সেসব পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে রাখা? কিন্তু চাঁদ একটু অন্যরকমের ছেলে, এঁচোড়ে পাকা বললে কিছুটা বোঝানো যায় হয়ত কিন্তু সত্যের অপলাপও কিছুটা হয়। যেমন ধরুন ছোটোবেলায় কাজের লোকের হাতে যৌন নিগ্রহ নিয়ে ভারী খুল্লমখুল্লা লিখেছে সে, বিশেষ রাখঢাক নেই কিন্তু একইসঙ্গে এটাও লিখতে কসুর করেনি যে পাঁচজন মধ্য তিরিশের লোকের সঙ্গে কাজের খাতিরে একটা কুঠুরি ঘরে গাদাগাদি করে শুয়ে অন্তত এক বছর ধরে ব্রহ্মচর্য পালন করাটাও নেহাত মানবিক নয়।

আসলে বাঙ্গালীর জীবনের যাবতীয় অসংগতি নিয়েই  চাঁদের সমস্যা, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দিয়েও কেউ থামাতে পারবেন না ওকে। ওর বাবা যে বিস্তর পড়াশোনা করে, একটা এঞ্জিনীয়ারিং ডিগ্রী নিয়েও সারাটা জীবন একটা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন বই আর কিছু দেখলেন না, এটা নিয়েও যেমন ওর প্রশ্ন থেকে যায় তেমনি ওর মা যখন বৌদিকে হাল্কা করে কথা শোনানোর ছলে বলেন “মেয়েদের ক্ষমতা অনেক, গর্ভনিরোধকের দরকার সচেতন মেয়েদের পড়ে না” সেটাও একটা মস্ত প্রহসন হয়ে ধরা পড়ে ওর কানে। হয়ত তাই বাড়ির আচারবিচার নিয়ে একটা গভীর সন্দেহ বেশ ছোটো থেকেই রয়ে যায়। তাই মা যতই বোঝান ব্রাহ্মণ সন্তান হয়ে জন্মানোর জন্য চাঁদের এক্সট্রা ব্রাউনি পয়েন্ট বাঁধা, সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি ও। নিজের কাকা নিয়ম করে যোগসাধনা করলেও ওর সবসময় মনে হয়েছে এ মুক্তিসাধনের প্রয়াস বড়ই ব্যক্তিগত, কেউ কাউকে শেখাতে পারে না; আর যে দাবী করে যে শেখাতে পারে তবে সে নিতান্তই ভন্ড। এহেন পরিস্থিতিতে মিশনারি স্কুলের ফাদার আর হাউসমাস্টাররা ওকে একটা নতুন জগতের সন্ধান দিতে চান, ক্রিশ্চিয়ানিটির আপাত-সফিস্টিকেশন মনে ধরে, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করে ‘dogmatic denunciation of idols’-এ। কিন্তু এতক্ষণে হয়ত বুঝতে পেরেছেন চাঁদের সিক্সথ সেন্সটাও মারাত্মক! মিশনারি স্কুলের ঘড়ির কাঁটা ধরা শৃঙ্খলা আর  অবিশ্বাস্য নিয়ামানুবর্তিতার মধ্যেই কোথায় যেন ও খুঁজে পেয়েছে একটা গোঁড়ামির আভাস; দীক্ষাগুরুরা কখন যেন হয়ে গেছেন অনর্থক কিছু পিউরিটান, ক্রিশ্চিয়ানিটির মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে মনে। ধর্ম হিসাবে কিন্তু খারাপ লাগেনি কিন্তু যে মুহূর্তে মনে হয়েছে অসংখ্য রীতিনীতি যেন তেন প্রকারে চাপিয়ে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য তখনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে মন।

চেনা চেনা ঠেকছে, মনে হচ্ছে ‘রেবেল উইদাউট এ কজ’? ভুল করলেন। এটুকু নিতান্তই ভূমিকা, বাকিটা জন্য পড়ে ফেলতে হবে বইটা। পাবেন যৌনতা, পাবেন অবদমিত যৌনতা, পাবেন উন্নাসিকতা, পাবেন জ্ঞান আর এতকিছুর পরেও পাবেন ষাট দশকের কলকাতা আর তার উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনের অকপট মূল্যায়ন। শুধু জেমস ডীন নয়, চাঁদের মধ্যে খুঁজে পেতে পারেন বাবুবৃত্তান্তের সমর সেনকে, পেয়ে যেতে পারেন নীরদ সির স্বভাবসিদ্ধ অনায়াস দাম্ভিকতাকে। তফাত একটাই, চাঁদ আক্ষরিক অর্থেই ‘আননোন ইন্ডিয়ান’,  ওর লেখাটা বই হয়ে নাই বেরোতে পারত, থেকে যেতেই পারত ডায়েরীর পাতায়। তাই বেশী বিশ্লেষণের স্কোপ এখানে কম; এগুলো আমার-ও কথা হতে পারত ভেবে পড়ে ফেলুন। চাঁদের যে সত্তা দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন, তার টুকরোটাকরা আমাদের মধ্যেও রয়ে গেছে যে –  তাই প্রবাসী হন কি নিজভূমে পরবাসী, মেলাতে পারবেন নিজের সঙ্গে, ওর মতন অ্যাগ্রেসিভ না হয়েও। .

mgdy3

mgdy2

পুনশ্চ –  ষষ্ঠীব্রতর ‘My god died young’  এখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলেও এককালে বেজায় নাম করেছিল। আর ওনার দ্বিতীয় বইটা রীতিমতন ঔৎসুক্য জাগিয়েছিল শিরোনামের জন্য , ‘Confessions of an Indian woman eater’।  সত্তরের দশকের বইপড়ুয়াদের শুধোবেন, অনেকে নিশ্চয় এখনো মনে রেখেছেন – সফট-পর্ন লেখক হিসাবেই সই। না বলতে পারা কথাগুলো কেউ তো বলেছিল, অবশেষে!

ফ্রোদো

অন্ধকার ব্যাপারটা এমনিতেই না-পসন্দ, আর আজকে যেন কিরকম বেশি করে চেপে বসেছে, বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও এক ইঞ্চি আলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। তার মধ্যে আবার কানটা ভারি ভোঁভোঁ করছে, অনেকক্ষণ ধরে কান ঝাড়া দিয়েও বিশেষ লাভ হয় নি। লোহার ঝুপড়িটার মধ্যে খাবার আর জল দুটোই আছে অবিশ্যি, কিন্তু কোনোটাই খেতে ইচ্ছে করছে না। রাগ আর অভিমান দুটোই একসঙ্গে হলে কারই বা আর খাওয়াদাওয়া করতে ভালো লাগে? দুঃখের চোটে সেই যে গুটিশুটি মেরে শুয়েছে, আর ওঠার নামগন্ধ করেনি। সেটা অবশ্য একদিক থেকে ভালোই, শুরুতে একটু লাফাঝাঁপি করতে গিয়ে মাথায় কয়েকবার ঠোক্কর খেয়েছে। তাতে চিল চিৎকার করেও কোনো লাভ হয়নি, কেউ আসেনি। যেমন নিকষ অন্ধকার ছিল তেমনটিই রয়ে গেছে। মুশকিল হল শুরুর রাগটা চলে গিয়ে এখন একটু একটু ভয় হচ্ছে।  না, একটু একটু না, বড্ড ভয় করছে। অন্যান্য দিন ভয় করলেই প্রাণপণে গন্ধ শুঁকতে আরম্ভ করে, আজকে ছাই কোনো গন্ধও আসছে না নাকে। এরকমটা তো অন্য দিন হয় না। আজকে যে কিচ্ছুটি বুঝতে পারছে না।

ভয়ের চোটেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ কাছ থেকে এমন কুঁইকুঁই আওয়াজ শুরু হল যে কহতব্য নয়। আর এতক্ষণ পর স্পষ্ট একটু আলো দেখা গেল, দুটো ভারি ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ কাছেই কোথাও জ্বলজ্বল করতে লাগল। একটু পরেই আওয়াজটা কিরকম কান্নার মতন শোনাতে লাগল, নিশ্চয় বেজায় ভয় পেয়েছে। চোখ দুটো ওর দিকেই ঠায় তাকিয়ে আছে নাকি? তাকিয়ে থেকেই বা লাভ কি, বেরোনোর জো নেই! আরও খানিকক্ষণ চলল আওয়াজটা, তারপর কিরকম ফ্যাঁসফ্যাঁসে হয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে থেমে গেল। আওয়াজটা থেমে যেতে খুব রাগ হল, আবার, আবার – খাবার যা ছিল সব উলটে ফেলে দিল। আর তারপরেই ভয়টা এমন জাঁকিয়ে বসল,  বলার নয়। অন্ধকারটা মনে হল খাঁচার ভেতর ঢুকে পড়েছে, দু থাবায় মুখ ঢেকে প্রাণপণে লুকিয়ে পড়তে চেষ্টা করল। আর স্পষ্ট টের পেল ও কাঁদছে, চাইছে না কিন্তু কাঁদছে।

তখনও জানে না আরেক জন্ম পর, দুটো নরম হাত ওকে টেনে বার করবে সেই লোহার খাঁচা থেকে। অনেকটা মমতা, অনেকটা ভালোবাসা নিয়ে সেই জোড়া হাত ওকে নিয়ে আসবে বুকের কাছে। আর নরম নাকটা দিয়ে সেই নরম হাতের মালকিনকে চেনার সময় টের পাবে পাশ থেকে আরেকবার ভেসে আসছে সেই চেনা কুঁইকুঁই আওয়াজ। সেই দুটো ক্ষুদে চোখও যে খুঁজে পেয়েছে আরেক জোড়া মায়াবী হাত।

পুনশ্চ – এগারো সপ্তাহের ছোট্ট ফ্রোদো আজ প্লেনে করে পৌঁছেছে। আপনিও যদি কোনো কালে দু’হাতে ফ্রোদোদের লোহার খাঁচা থেকে বার করে থাকেন,  এ লেখা আপনার।

দিকশূন্যপুরে

প্রমিত গেছিল। প্রমিত নীললোহিতের থেকেও বেশি বাঙ্গালী, ভরসার কথা সেটাই – অত্ত বোহেমিয়ানা বাঙ্গালী ধাতে সয় না। কিন্তু প্রমিতের সঙ্গে দেখা করাটাও কঠিন ব্যাপার। আপনি সিয়াটল কি সান ফ্রান্সিস্কো তে থাকলে চান্স বেশি, কলকাতা কি কৃষ্ণনগরে থাকলে দেখা নির্ঘাত নাই হতে পারে। এসব ব্যাপারকে আজকাল আর আয়রনি বলে ভাবি না, এটাই জাগতিক নিয়ম।

অথচ প্রমিত  দক্ষিণ কলকাতায় আপনার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। আপনার মতনই উত্তরের ভেঙ্গে পড়া ঘরবাড়ি দেখলেই ক্যামেরা ধরা হাত নিশপিশ করতে থাকে ওর-ও। আপনার মতই রোগাটে চেহারা অথচ হাল্কা ভুঁড়ির আভাস। দেখলে মনে হয় কলেজ ছেড়ে বেশিদিন বেরোয়নি, যদিও সামনের দিকের চুল একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। বলছিলাম না, বড্ড বাঙ্গালী! তাই বোধহয় একটা প্রেমও চায়। না না, ‘প্রেম’ কথাটা শুনতে যতটা নাটুকে, ততটা নাটকীয়তার সঙ্গে প্রেম করতে চায় না। আবার ঠিক নিষিদ্ধ আপেল গ্রহণ করার মতন করেও নয়, এক্সপেরিয়েন্স করা যাকে বলে ও ঠিক সেটাই করতে চায়। একটু খেলাচ্ছলে, কিছুটা দায়িত্ব নিয়ে আর বাকিটা ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিয়ে।

তা নীললোহিতের দিকশূন্যপুরে এরকম বাঙ্গালী তো যেতে পারে না। যারা যায়, তাদের জীবন নিজেদের মতন করেই ঘটনাবহুল। তারা তকমাহীন শিল্পী, তারা অনেকটা ভবঘুরে, তারা ইউটোপিয়ায় বেজায় বিশ্বাস করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এদের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারি না, বলতে সঙ্কোচ নেই যে কোথায় যেন একটা অবিশ্বাসও রয়ে যায়। আর তাই প্রমিতকে যেতে দেখে মনে হল আমিও পারি; যেই দেখলাম ও পৌঁছতে পেরেছে, সন্দেহটা অনেক কমে গেল। আর প্রমিতকে ভারী ভাল লাগল, মনে হল বন্ধু হই।

কিন্তু এরকম এক চরিত্র দিকশূন্যপুরের মতন জায়গায় গেলে সেখানকার  ‘ইকুইলিব্রিয়াম’ নষ্ট হতে বাধ্য। হলও তাই। শুরুতেই বেমালুম বলে দিল জায়গাটায় আসল নাম ‘মালিনী’; এমনকি ওর সঙ্গে আলাপ হলেই দেখবেন শুধু নাম নয়, গোটা পথনির্দেশিকাটাই আপনাকে দিয়ে দেবে। আশা করব একদিন না একদিন ওর সঙ্গে দেখা হবেই, তাও বলে রাখি জায়গাটা নদীয়ায়, নাজিরপুরের কাছেই। তবে হ্যাঁ, যদি আশা করে থাকেন যে বন্দনাদি কি রূপসার মতন সুন্দরী, স্মার্ট,  অবসাদনন্দিনীরা আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন, তাহলে ভুল করবেন। ওনারা অপেক্ষা করেন নীললোহিতের জন্য, আর তাই ওনারা বাস্তবিক কল্পনা। ওনাদের প্রমিত পাবে না; ও বা আপনি বা আমি পাব কাল্পনিক বাস্তবদের। তাদের নাম ডলি হতে পারে বা পলি, কিছু এসে যায় না, বড় বিশেষত্বহীন নাম। ক্ষয়াটে চেহারার কিছু মেয়ে, কিন্তু তারা ভালোবাসার জন্য মুখিয়ে আছে। না, প্লেটোনিক নয়, অ্যাবসট্রাক্ট নয়, আবার জান্তব শরীরীও নয়, এ ‘প্রেম’ বড় বাঙ্গালী আর তাই বড় পরিচিত। হয়ত তাই প্রমিতের কম্ফরট-বৃত্তে এরা অনায়াসে ঢুকে পড়ে। আর তাই আবারো প্রমিতকে মনে হয় কাছের বন্ধু, যাকে টিজ করলে ইনডিফারেন্স দেখাবে না আবার অকারণ মুখ খারাপও করবে না, একটু করুণ মুখে হেসে বলবে ‘চাটিস না মাইরী।’।

প্রমিত একটা মকুমেন্টারি বানিয়েছে রিসেন্টলি, ওর দিকশূন্যপুরের অভিজ্ঞতা নিয়ে। যদিও ওর কাছে জায়গাটা দিকশূন্যপুরে নয়, বইটই নিয়ে ও বেশি মাথা ঘামায় না; ওর কাজ ক্যামেরা নিয়ে। পারলে দেখবেন, না ভুল বললাম যে ভাবেই হোক দেখবেন। ওর নিজের গল্প তো রইলই তার সঙ্গে দেখবেন কতদিন পর বাঙ্গালীর ক্যামেরায় কি চমৎকার কালবৈশাখী ধরা পড়েছে, দেখবেন কতদিন পর দরজার দোর ধরা অকৃত্রিম কান্না আপনার মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, সেকন্ডের জন্য হলেও। তা বলে আবার ভাববেন না অনর্থক ইমোশনের ঘনঘটা, প্রেমের সন্ধানে থাকলেও অযথা প্যানপ্যানানি ওর না-পসন্দ। ও দেখতে চায় raw জীবন। সে জীবন অনেক কিছুই করতে পারে – হাসাতে, কাঁদাতে, চাটতে, খ্যাঁকখ্যাঁক করতে; প্রমিতের হাতে নেই সেসব। তাই কম্প্রোমাইজের স্কোপটাও নেই, ওর মকুমেন্টারিতে বস্তির এক চিলতে রাস্তা (যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি যেতে পারে না) দেখে আপনি বিহ্বল হলেও ও নাচার, কোনো সান্ত্বনাবাক্য পাবেন না, পাবেন না অযথা বাক্যক্ষয়।

ইউটিউবে একটা ট্রেলার দিয়েছে দেখলাম। সেটুকুই তুলে দিতে পারি, আর কি? তবে ট্রেলারটা পদের নয়, বিশেষ কিছু নাই বুঝতে পারেন। আরেকটু ভালো করে বোঝার জন্য ট্রাইপড এন্টারটেনমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন – https://www.facebook.com/tripodonline। আর যোগাযোগ হলে একটু বলে দেবেন, ‘ব্যক্তিগত’তে আকার নেই। অকারণ নিটপিকিং নয়, এন্ড ক্রেডিটে তালভঙ্গ হতে দেখলে কারই বা ভালো লাগে?  আর বন্ধুর কাজ হলে বলাটা কর্তব্য।

BB

(উৎস – http://seattlebengalifilmfestival.com/bakita-byaktigoto.html)