সত্যি রূপকথা

— “তুমি কি রাজা?”

রিনরিনে গলাটা এমন আচম্বিতে বেজে উঠল যে বেশ হকচকিয়ে গিয়েই মাথা ঘোরালাম। দেখলাম এক ক্ষুদে স্বর্ণকেশিনী ভারী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও কম অবাক হলাম না, “না তো, আমার তো মুকুটই নেই একটাও!”। বোধ হয় বিশ্বাস হল না। তার দৃষ্টি অনুসরণ করতে গিয়ে খেয়াল পড়ল কনভোকেশনের গাউনটা হাতে ধরে রয়েছি। ফেরত দিতেই এসেছিলাম কিন্তু দোকান আজ বন্ধ, বাস আসতেও দেরি তাই চুপটি করে বসেছিলাম অ্যান্ডারসন পার্কে। দেখছিলাম এক কিন্ডারগার্টেন টিচার একটা বিশাল প্যারাম্বুলেটরে জনা পাঁচেক কুচোকে একসঙ্গে চড়িয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক মনে হল গাছ থেকে টুপ টুপ করে ফুল পেড়ে সাজিতে রেখে দোলাতে দোলাতে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে এক টুকরো কখন ছিটকে আমার পাশটিতে এসে পড়েছে বুঝতেই পারিনি। গাউনের রহস্য ফাঁস না করে আমি প্রশ্ন ফেরত পাঠালাম, “তোমার পাশের জন নিশ্চয় রাজপুত্র?” রাজপুত্রের চোখ বেজায় নীল, আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে আবার প্রাণপণে নকুলদানার মতন আঙ্গুলগুলো চুষতে শুরু করেছে সে। “দুৎ, তুমি কিচ্ছু জান না। ও রাজপুত্র কেন হবে? ও তো ইথান, মোটে আট মাস হল জন্মেছে।” “তাতে কি, রাজপুত্র কি ছোট্ট হতে পারে না?” ভারী চিন্তিত দেখলাম, কি ভাবে রিফিউট করা যায় সেই নিয়েই ভাবছে বোধ হয়। কিছু ভেবে না পেয়ে ভারী লাজুক গলায় বলল, “আর আমার নাম নোলা, আমার তিন বছর বয়স।”  “ও বাবা, তোমার তো অনেক বয়স গো।” “তা ঠিক, ইথানটা খুব বাঁদর তো, ওকে শাসন করার জন্য বয়স্ক লোক দরকার।” “বাঁদর বুঝি? কেন, কেন?” “ও তো পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ছাড়া কিছু চোষে না, একটু বারণ করলেই খুব কাঁদে।” “হায় হায়, আর এখন যে বড় হাতের দিকে ওর নজর?” “পার্কে ঘুরতে এসেছে তো জুতো পরে, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওর পা খুঁজে পায়নি।” বলে খুব হাসতে লাগল। আড়চোখে দেখলাম রাজপুত্র নিজের আঙ্গুল ছেড়ে নোলার কড়ে আঙ্গুলের দিকে নজর দিয়েছে।

“জানো তো, আমি একটুও কান্নাকাটি করতাম না ছোটবেলায়। খুব লক্ষ্মী মেয়ে ছিলাম, ইথানটার মতন না।”  রাজপুত্র এর মধ্যে একটা বিশাল গোল্ডেন রিট্রিভার কে দেখে খুব আহ্লাদিত হয়ে বেঞ্চ থেকে নেমে পড়তে যাচ্ছিল, নোলা আবার টেনেহিঁচড়ে তাকে তুলে সোজা কোলের মধ্যে বসিয়েছে। অত্ত ছোট্ট সিংহাসন তো,  মোটেও পছন্দ হল না ব্যাপারটা। সে তার নিজের ভাষায় প্রতিবাদ জানাল “অয়,  অয়, অয়য়য়য়য়”। “ও শুধু আমার কথা শোনে, আর কারোর কথা শোনে না।” “তাহলে তুমি নিশ্চয় ম্যাজিক জানো?” কিরকম একটা দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে বলল “না, একটা কায়দা আছে। তুমি কি লক্ষ্মী ছেলে? তাহলে বলতে পারি।” অনেক ভেবেটেবে দেখলাম নোলার কাছে সত্যি কথাটাই বলা যাক, “খুব লক্ষ্মী, তোমার থেকেও”; “তাহলে শোনো! আচ্ছা, আর কাউকে বলবে না কিন্তু। ঠিক তো?” “হ্যাঁ হ্যাঁ, পাক্কা প্রমিস”। “যেই ইথান কাঁদবে, অমনি তুমি ওর পায়ের পাতায় একটা চুমু খেয়ে নিলেই ওর কান্না বন্ধ হয়ে যাবে।” আমি তো শুনে যাকে বলে চমৎকৃত, “হ্যাঁ গো, বড়দের জন্যও এটা সত্যি?” “দুর বোকা, বড়রা কাঁদে না।” প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম হঠাৎ দেখি রাজপুত্র আমার হাত নিয়ে পড়েছে। আঁতকে উঠে সরে বসতেই দেখি বিশাল হাঁ করল, বোধহয় রাজকীয় কান্নার পূর্বাভাস।  “এই এই, এবার কি হবে? পায়ের পাতায় তো চুমু খাওয়া যাবে না, জুতো পরে তো!”

“নাহ, তুমি কিচ্ছু জান না। জুতো পরে থাকলে ওর ভুঁড়িতে মুখ লাগিয়ে আওয়াজ করতে হবে, সবসময় কি পায়ের পাতায় চুমু খেতে আছে নাকি?” “এহ রাম রাম! ভুঁড়ি আছে?” “বাহ, থাকবে না? ভুঁড়ি না থাকলে ও ইথান হবে কি করে?” তাও ঠিক।

আমার এত অজ্ঞতা দেখেই কিনা কে জানে,  প্রাজ্ঞ মহিলা এবার তাঁর ভুঁড়িওলা পুতুলটিকে নিয়ে উঠে পড়লেন। যেতে যেতে ঘুরে তাকিয়ে বললেন “বাই বাই, তুমি কিন্তু চোখ বন্ধ করে থাকো। ইথানকে টাটা করলেই ও ভ্যাঁ করে।” চোখ বন্ধ করেই ছিলাম, কয়েক সেকন্ড পর ভাবলাম আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে একটু দেখি। অবাক কান্ড,  পার্ক পুরো ভোঁভাঁ। কোন গাছে আবার ফিরে গেল কে জানে।