হৃদয়ের গভীর উৎসবে (পর্ব ১ – জলের উজ্জ্বল শস্য)

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

(অধুনাবিলুপ্ত বাঙ্গালনামার সম্পাদকের অনুরোধে লিখতে শুরু করেছিলাম এই সিরিজ; নব অবতারে বাঙ্গালনামার আবির্ভূত হওয়ার কথা ছিল ‘পারাপার’ নামে কিন্তু ব্লগ থেকে পার্মানেন্ট ওয়েবসাইটে পাড়ি দেওয়ার আগেই পারাপার চলে গেছে পরপারে। দুর্ভাগ্য আমাদের। সৃষ্টি বা গুরুচন্ডালী তে পাঠাতে গিয়েও মনে হল লেখাটা একটা স্তরে গিয়ে সত্যিই বড় ব্যক্তিগত হয়ে পড়েছে, নতুন ব্লগ যখন শুরু হয়েছে তখন এখানে কন্টিনিউ করাই হয়ত বাঞ্ছনীয়।)

এখানে আকাশ নীল – নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল

ফুটে থাকে হিম শাদা  – রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;

আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ

–  জীবনানন্দ দাশ (রূপসী বাংলা, ২৯)

রূপসী বাংলাকে শুধু জীবনানন্দ নন আরো কতশত বাঙালী সাহিত্যিক দেখে গেছেন, সেই অপার সৌন্দর্যকে অনুভব করেছেন নিজের হৃদয় দিয়ে, অন্তরের টানকে বড় মায়াবী ভাষায় ভাসিয়ে দিয়েছেন অক্ষরের চেনা চৌহদ্দিতে। তাঁদেরকে অনেককেই হয়ত চেনার সুযোগ করে উঠতে পারিনি, চিনলেও সময় হয়নি সব লেখা পড়ার বা পড়লেও বুঝিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে সে লেখা কখন হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমির প্রতিটি রূপসী সন্ধ্যা, কালবোশেখী দুপুর অথবা নরম সবুজ ভোরের এক আশ্চর্য মরমী উপাখ্যান। সময়ের কাছে হেরে যাওয়ার আগে এই একটা শেষ প্রচেষ্টা – হারিয়ে যাওয়া সেই বাংলা, চোখে না দেখা সেই বাংলাকে কাছে পাওয়ার।  এ আবেগ, অনুভূতির প্রাবল্য সবই একান্তভাবে আমার কিন্তু লেখার প্রতিটি পর্বেই না দেখা বাংলাকে অসীম মমতায় চিনিয়েছেন কোনো এক পূর্বসূরি। এ পর্বে শুধুই জলের কাব্য, তাও গদ্যকাব্য – বাংলার জলের উজ্জ্বল ও চেনাঅচেনা শস্য কে নিয়ে।

আল্লার অমূল্য ধন কি বলেন দ্যাহি? এক সানকি মোটা ভাত সঙ্গে সুঁটকির বর্তা (ভর্তা) – আর সে কি বর্তা, কি তার রূপ, কি তার দেখনদারী!  উনুনে এক আঁটি শোলার কাঠি দিয়ে যে গনগনে পারা আগুন হয় সে না পেলে এ ধন কাজে লাগে না। তারপর চাই অনেকগুলো লাল টুকটুকে চাটগাঁই লংকা, ও লংকা না বাটলে সোমত্ত সুঁটকির অঙ্গে রং লাগে না গো। সুঁটকি পুড়বে শোলার আগুনে আর লংকা পেষাই হবে পাথরে তবে না জাগবে ক্ষুধাকাম! এ কি আসনপিঁড়ি হয়ে বসলাম আর গিললাম, না হে বাপু! পোড়া সুঁটকি মড় মড় করে ভেঙ্গে সানকিতে ঢেলে তারপর পেঁয়াজ,নুন আর লংকাবাটা দিয়ে মাখার পালা, আহা! আর ওদিকে ভাতের ফ্যানের সোঁদা সোঁদা গন্ধ, এতেও যদি মন আকুল না হয় তবে আর হয় কিসে?

মাছ, মাছ, মাছ – মানুষও মাছ। মাছ নেই তো মানুষও নেই। প্রকাণ্ড কারে কয় বাপ্ ? প্রকাণ্ড হল মাচানের নিচে শোলপোনার ঝাঁক যেটা ফুটকরী ছাড়তে ছাড়তে ধানক্ষেতের দিকে এগোচ্ছে। সুখী কে? ওই যে মেঘনার প্রকান্ড ঢাঁইন মাছটা, নদীর ওপর ভেসে ভেসে জোনাকি খায় আর অলস বিশাল শরীরে ভেসে ভেসে বেড়ায়। মানুষ হল পুঁটি মাছ, নৌকো- নৌকোয় দূর থেকে দূরে ভেসে যায়, ছোটো থেকে ছোটো হতে হতে। তবে এক হিসেবে মানুষ হল দুচ্ছাই, কোনো বৈচিত্তির নেই; সেই একই কাঙালপনা আর কাঙালপানা, সেই একই হারু-বীরু, হারাণ-নারাণ – কে থাকল, কে না তাতে কি এসে যায়। উদোর নাম বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই বা কি? মাছ নিয়ে কেউ বলুক দেখি সেকথা? ওই যে ছোটো বড় এলকোনা, ডারকীনা মাছ নদীর ওপর লাফাচ্ছে, কোন মিঞার পো বলে ওগুলোকে ঢাঁইন-বাইন!মানুষকে সুখীও করে ওই মাছ, যদি দয়া হয়। আউশ ধানের মোটা ভাত, সর্ষের তেল দিয়ে বেতের ডগা সিদ্ধ আর বেগুন দিয়ে ডিমভরা রুপোরুপো ইলিশ – এ সবে মিলে হল পরিবার। কলাপাতা পড়ল তো সবে মিলে পরিবার, কলাপাতা উঠল তো রইলে কেবল তুমি। বাবুদের গেরস্থবাড়ি যাও, দেখবে একই চিত্র – শীতের সকালের আরাম-আমোদ মানেই বাজারে সোনালী পাবদা, বড় কালবয়েশ, টাটকা বাগদা।

সুন্দর কি, সুন্দর কে? ওই যে সোনালি বালির চর পেরিয়ে তিরতিরে নদীর জলে ছোট্টো ছোট্টো মালিনী মাছ ঘুরে বেড়ায়, কোন কন্যের ডাঁটো শরীর ওর থেকেও সুন্দর? ও সুন্দর তো অনাদিকালের, দেখবে তো দেখবেই! জিন ভর করলেও চোখের পাতা পড়ে, এ কিসের ভর? ও মাছ মরলে জলের ঘোলাটে অন্ধকারে ফেলে রাখতে নেই, তরমুজ পাতার ছাউনি বানিয়ে কবর দিতে হয়। জলের উপর-নিচে বড় গহীন সম্পর্ক; কে জানে তার কথা? বাঁশের ঝাড় থেকে যখন পাতা ঝরে ঝরে পড়ে আর তার নিচেই দীঘল বাঁশপাতা মাছ এঁকেবঁকে ঘুরতে থাকে তখন মনে হয় জলটা আয়না – ওপর দেখে নিচে, নিচ দেখে ওপর। কে জানে কবে কে এত জাদু দেখে মজে গিয়ে মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করেছিল, সে সব এখনো চলে। জলের গল্প বড় বালাই, সে ছাড়া জীবন চলে না কো। জল জীবন, জীবন জল – সেই জীবনের আখ্যান। সপ্তডিঙা মধুকরও আছে, আবার আছে বড় কাছিমের গল্প, গজার মাছের গল্প। গজার মাছ কি যে সে মাছ? কালো লম্বা থামের মতন চেহারা, সিন্দুরগোলা রঙের মাথা। ঘাই মেরে যখন সোজা ছুটে আসবে, মনে হবে জলের দানব  জল তোলপাড় করে আসছে, সেই দানবের গায়ে আবার সাপের চক্র আঁকা। গল্প একে নিয়ে হবে না তো কি মানবজীবনের তুচ্ছ যাত্রাপালা  নিয়ে হবে? তবে বেগার যাত্রা এ তল্লাটে বিশেষ হয় না বটে, মানুষগুলো নিতান্তই সরল। গোধূলি আলো জলে পড়ে যখন জল রাঙিয়ে দ্যায়, জ্যোৎস্নায় যখন মাঠঘাট ভেসে যায় এই  মানুষগুলোই বড় অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। সে বড় অনাবিল, অকৃত্রিম বিস্ময়। ওদের চাহিদাও যে কিছু নেই; নদীর ধারে বসে বঁড়শীতে বেলে চিংড়ি ধরতে ধরতে কাটিয়ে দিতে পারে গোটা বেলাটা, জলের ধারে ফিঙ্গের আনাগোনা দেখেই বড় খুশী হয়ে থাকলো মনটা। আবার হয়ত বেলে মাছ ধরার জন্য আরশোলা পচিয়ে  বঁড়শীতে মাখিয়ে সেই যে মাঝ গাঙে এসে বসল তো দিনরাত কাবার! অবশ্য সময় সময় জলের রূপ দেখে নয়, ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে গিয়েও সময়জ্ঞান থাকে না। পুকুরের ছুটকো মাছগুলো বড় বেশি জ্বালায়; ট্যাংরা বলো কি পুঁটি, একটু হিশহাশ্ ফিসফাস্ শুনলেই দে ডুব; শ্যাওলার ঘন নরম আস্তরণের মধ্যে সেই যে সেঁধোলো আর বেরোবেই না। ছুটকোদের আবার পচা আরশোলা দিলে হবে না, এদের চাই পিঁপড়ের ডিম। সে ত হবেই, এক এক জলের এক এক বায়নাক্কা, সেই জলের জীবদেরও তাই। জল তো আর শুধু জল নয়, এদিকে ধরো ধানক্ষেতও জল। ধানক্ষেত পেরিয়ে পড়বে একের পর এক খাল, সেই পেরিয়ে পেরিয়ে যেতে তো বেশ দেরি। বেলার দিকে আসবে সেই বিশাল বিল (কেন যে লোকে খালবিল বলে? কত আলাদা চরিত্র দুটোর) – আর বিল পেরোতে পারলেই নিশ্চিন্ত, তারপরেই অকূল মেঘনা। জল-আকাশের সীমা ঘুচিয়ে তাক লাগিয়ে দ্যায়, দেখে দেখে আর আশ মেটে না। আর পুকুর, ঝিল এসব তো রইলই। যে কথা বলছিলাম, জলের চরিত্তির না জানলে আর তার বাসিন্দাদের জানবে ক্যামনে? কোথায়  জল রূপোলী, কোথায় জল টলটলে কালো, কার জল রহস্যময়ী , কার জল অগভীর সে না জানলে তোমারি মরণ। জলাবাংলার মানুষ তুমি, নিজে মাছ না চিনলে চলে কেমন করে? কদিন-ই বা গ্রামের হাট থেকে বড় টাকামাছ কিনে আনবে? জল না চিনলে মাটিই বা চিনবে কে আর জানবে কি করে কোন ভেজা মাটির বুকে লুকিয়ে আছে কচ্ছপের লালচে সাদা  ডিম? কি সোয়াদ্, কি  সোয়াদ্! মাছ ধরারও কত কায়দা। কোথাও শুধু গামছাতেই হবে, কোথাও চাই বঁড়শী (বঁড়শীর-ও কত ভেদাভেদ, রাজা বঁড়শীর সঙ্গে লাগান থাকে আশি হাতের মতন টোম সুতো। চারখানা তার মুখ, একসঙ্গে বিঁধবে মাছের মাথায়, মুখে, ঠোঁটে আর গলায়। সে বঁড়শীর গলায় আবার লাগানো থাকবে দুটো দুটো করে সীসের মারবেল) কোথাও দরকার বড় জাল; আবার হিজল গাছের নিচে কোমরজলে দাঁড়িয়ে চিংড়ি, ট্যাংরা ধরার জন্য চাই চাঁই  – বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি ফাঁদ।

আর মাছ কি শুধু কিনে সুখ না ধরে সুখ? বিলিয়ে দেয়ার সুখ নেই?সে সুখ বড় সুখ – যে দেয় তার চোখে সুখ, যে নেয় তার চোখে সুখ। তবে সবাইকে আবার সব দিতে পারবেনি, বামুনদের একবার বাণ মাছ দিয়ে দেখ দিকিন কি হয়! কিম্বা ভাদ্র মাসে যে কাউকে নলা মাছ? কেউ খাবে না, এক কাঠা ধানে এক গলুই মাছ দিলেও কেউ নেবে না ও মাছ। আর শুধু বামুনঠাকুর কেন, মেছো ভূতের কথা ভাববে না? বা মাছখেকো শঙ্খিণী? হাসলে হবে না, যাও না একবার ওনাদের চটিয়ে; রাতের জোয়ারে বেরোলে সরপুঁটি ধরবে বলে, তিনদিন পর ফিরল তোমার লাশ। কিছু হয়ত গল্পকথা আবার কিছু সত্যি – জলজঙ্গলের দেশে কোনটা সত্যি আর কোনটা গল্প সে বোঝা ভার। মানুষ আবার একটু বাড়িয়েচড়িয়ে বলতে ভালবাসে; তিন কোশ দূর থেকে হয়ত শুনছ নদীতে কুমীর এসেছে, গিয়ে দেখলে বোয়াল মাছ। তবে সেরকম বোয়াল পড়লে কুমীর বলে ভুলও হতে পারে। প্রকাণ্ড মুখটা শুধু হাঁ করে বসে থাকে, জোয়ারের সময় শিঙি, পুঁটি, ট্যাংরা যা আসবে গিলে নেবে। খাদ্য-খাদক সম্পর্কও যে কতরকমের; এই দেখলে একটা শোলমাছ একটা বৈচামাছ মুখে পুরে ডুবসাঁতার দিল, পরক্ষণেই হয়ত ওই বাচ্ছাটাকে শাসন করার জন্য শুঁড় নেড়ে হাজির একটা ঢাঁইন মাছ। দে ছুট, দে ছুট। ছুটতে ছুটতে হয়ত গিয়ে পড়ল ওই বোয়াল মাছের খপ্পরে।

এ বড় আজব খেলা, মানুষ আর কতটুকুই বা দেখে। অত রঙ্গ সইবে কি করে? পাঁচটা বই তো ইন্দ্রিয় নেই, ডাঙার সব কথাই জেনে উঠতে পারল না তা জলের গহীনে কি চলে! তাও দেখ দিকিন কি সাধ তার এ চিরন্তন রূপরস-মধুগন্ধের কণাটুকুও পাওয়ার জন্য। জলপিপি-জলপায়রা, শালুক-পাতিশালুক, চিনিচাঁপা-ভাঁটফুল নিয়েই তো তার জগৎ, অফুরান-অপরূপ-অনাঘ্রাত।

Advertisements