X – এক অজ্ঞাত রাশি

করিডোরে পনের মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে, X বা Y কেউই বেরোচ্ছেন না ঘর থেকে। ভাবলাম “এখনো যন্ত্রণার শেষ হল না?”  বিশদে যাওয়ার আগে এই অজ্ঞাত রাশি নিয়ে কিছু বলা দরকার অবশ্য!

X =  উত্তপ্ত কটাহ, আমার জীবন ভাজা ভাজা করাই এ কড়াইয়ের কাজ
Y =  f (X)

কিন্তু X এর মতন আনপ্রেডিক্টেবল ভেরিয়বল পাওয়া দুষ্কর! শুধু গরম কড়াই হলেও কিছু স্ট্র্যাটেজাইজ করা যায়, কিন্তু ওনার সঙ্গে চলা মানে প্রায় ওয়াল স্ট্রীটের রাস্তায় হাঁটা, কখন যে মেজাজের স্টক উঠছে আর কখন যে নামছে, ঈশ্বর-ও জানেন না। এই আজকে বললেন “ওয়াহ, ওয়াহ – কি মডেলটাই বানিয়েছ বাবা, বাকিদের ভাত মারা গেল” (প্রসঙ্গত, এটা সারক্যাস্টিক উক্তি নয়, সেটুকু বাঁচোয়া!) আর কালকে সেই মডেলের প্রোপোজিশন নিয়ে দু-এক কথা বলতেই কটমট করে তাকিয়ে বলবেন “নিজের ভালো চাও তো এ লাইন ছাড়, এ হওয়ার নয়”।

কিন্তু শুধু কথা শোনাতেই যদি সমস্যা শেষ হত তা হলে তো অনেক আগেই যবনিকা পতন! কিন্তু নিচের নাট্যাঙ্কগুলোর হত কি?

অঙ্ক ১ –  প্রথম বার প্রোপোসাল পড়ে শোনাচ্ছি কমিটি মেম্বারদের। দশ মিনিটের মাথায় X তেড়ে এলেন, “তোমরা ইকোনমিক্সের ছাত্ররা কি ভাবো বলো তো নিজেদের? র‍্যান্ডম ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম, ট্রেম্বলিং হ্যান্ড, উইনার্স কার্স ছুঁড়ে  যাচ্ছ, একবারও এক্সপ্লেন করছ না। এ কি চালবাজি, অ্যাঁ?” তখনো নভিস তো, আমি বললাম “আসলে ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টে না থাকলেও আপনারাও তো গেম থিয়োরিস্ট, তাই এই টার্মগুলো যে এক্সপ্লেন করতে হবে ভাবিনি।” ভদ্রলোক পাক্কা এক মিনিট আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর বললেন “আমরা কি জানি সেটা নিয়ে তোমার ভাবার কোনো অধিকার নেই, তুমি কি জানো সেটাই প্রশ্ন।” এক ঘর লোকের সামনে ভারি বিব্রতকর অবস্থা, শীর্ষেন্দুর ভাষায় যাকে বোধহয় বলে এক গাল মাছি। যাই হোক, দুদিন ধরে খেটেখুটে প্রত্যেকটা ছোটবড়, রেলেভান্ট-ইররেলেভান্ট সব টার্মিনোলজি নিয়ে সাতকাহন গাইলাম। আবার প্রেসেন্টেশন দেওয়া, পাঁচ মিনিট-ও কাটল না। X চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, “কাট দ্য ক্র্যাপ ম্যান। বিজনেস স্কুলে থাকতে হলে প্রেসেন্টেশন স্কিলস দরকার হয়, তোমার সেসব নেই। এই এত্ত কথা, যেগুলো দুধের শিশু-ও জানে, সেসব নিয়ে এই সময় নষ্টের মানে কি?” বেরিয়ে গেলেন, আমি হতভম্ব। এক ঝলক দেখে মনে হল কমিটির বাকি মেম্বাররাও তাই, তবে সেসব থোড়াই পি-এইচ-ডি স্টুডেন্টের সামনে দেখাবেন।

অঙ্ক ২ – মিনমিন করে বললাম “তিন মাসে আগে বলেছিলেন এবারে জব মার্কেটে গেলেও যেতে পারি। তো অফিসিয়াল জব মার্কেটের নোটিফিকেশন এসে গেছে। আপনার একটা চিঠি লাগবে।”  কোন একটা পেপার রিভিউ করছিলেন, লাল কালির খোঁচায় তার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সেটা হাতে নিয়েই আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ, তারপর শুধু বললেন “বসো।” বসলাম, একটা বিশাল দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমি অসম্ভব ডিসাপয়েন্টেড। তোমাকে যা যা করতে বলেছিলাম একটাও করেছ তিন মাসে?” এতদিনে জেনে গেছি যে এ অবস্থায় চুপ থাকাই শ্রেয়। আরেক সিনিয়র প্রফেসর Z খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন ওনার ধারণা মডেলিং অ্যাপ্রোচটা ভুল, সেটা ঠিক করা দরকার। তিন মাস ধরে X তাঁকে কনভিন্স করতে পারেন নি, স্বভাবতই সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর। হল না সেবার জব মার্কেটে যাওয়া।

অঙ্ক ৩ – ডিউকের বিজনেস স্কুল দুবার ইন্টারভিউ নিয়ে ক্যাম্পাস ভিসিটের অফার দিয়েছে। স্বভাবতই বেজায় খুশি, ডিপার্টমেন্টেও হঠাৎ খুব কদর বেড়ে গেছে, শুধু X কিছু বলছেন না। যাওয়ার আগের দিন সকালবেলা চোখের সামনে দিয়ে গটগট করে হেঁটে বেড়িয়ে গেলেন, একটা কথাও বললেন না। আমি ধরে নিয়েছি যে ওনার আমাকে নিয়ে এতই কম আশা, এটাকে একটা নিছক দুর্ঘটনা হিসাবেই দেখছেন।  বিকালে আচম্বিত এক ফোন। “শোনো, ওই এক গাল দাড়ি নিয়ে যেও না। আর ভালো টাই আছে? নাহলে আমার কাছে ঘুরে যাও।” তারপরেই ফোন রেখে দিলেন দুম করে। আমি পড়লাম বিপদে, টাই চাইব না চাইব না? মানে এমনিতে আমার দরকার নেই, কিন্তু না চাইলে আবার উনি কি ভাববেন? গেম কি আর রিয়াল লাইফেও কম খেলতে হয়!

এই সবই ভাবছিলাম, এমন সময় পিঠে টোকা। দেখি Y বেরিয়ে এসেছেন, খুব গম্ভীর গলায় বললেন ” X বললেন ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরেও যা কাজ করার দরকার ছিল, তার আসলটাই করা হয়নি। ভেতরে চলো।” শুনেই হিসেব শুরু হয়ে গেছে, এক্ষুনি কি ঝাড়টা পড়বে সেটার থেকেও বেশি চিন্তা আর কতদিন লাগবে।

ঢুকলাম, দেখি X দাঁড়িয়ে! আর, আর, আর………

এক হাতে শ্যাম্পেনের বোতল, অন্য হাতে গ্লাস – এবং সব থেকে বড় কথা মুখে একটা আলতো হাসি, যেটা কখনো দেখিনি। বললেন “অভিনন্দন ডক্টর চ্যাটার্জ্জী, আজ থেকে আমরা কলীগ। ইউ উইল বী ডিয়ারলি মিসড। ”

কি বলব, গলাটা কিরকম ধরা ধরা লাগল। আর শ্যাম্পেন পেটে পড়ার আগেই মুখ দিয়ে বেরোল “ইস্তানবুল আসবেন তো?”

Advertisements