গুরু গুরু!

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

মুখের ছাঁদের কথা বাদ দিলেও দুজনেই জন্মেছেন সেপ্টেম্বরে, দুজনের জীবনেই শেষ বেশ কিছু বছরে দ্বিতীয়া এক নারী অসামান্য ভূমিকা নিয়েছেন, দুজনকেই মিহি গোঁফেও দুর্দান্ত ভালো দেখতে লাগে (মনে পড়ে ‘হোটেল স্নো-ফক্স’?) , দুজনেই নিজের নিজের টার্ফ ছেড়ে অন্যত্র খেলতে গিয়ে বিশেষ সুবিধা করতে পারেন নি ইত্যাদি ইত্যাদি  এবং

দুজনকেই পর্দায় (ম্যাক্সি হোক কি মিনি) দেখলে একটা বাক্যবন্ধই মাথায় আসে – ‘গুরু, গুরু’!

স্ক্রিপ্টের খাতিরে মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি কে একবার বলতে হয়েছিল “আমি ইউরোপের সব থেকে রূপবান পুরুষদের একজন” (অ্যান এত্তারো দি চিয়েলো, ১৯৫৯ ) – নেহাত সমাপতন নয় বুঝতেই পারছেন, খুব কায়দা করেই কথাটা ঢোকানো হয়েছে। সেযুগে যা হত আর কি, লোকজন সেক্স অ্যাপীল ট্যাপীলের কথা শুনেছে, ব্রিজেট বারদো কি সুপ্রিয়া কে নিয়ে সেসব ভাবলেও নায়কদের জন্য থাকত একটা সম্ভ্রম মেশানো তারিফ! কি রূপ দেখেছ?! পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে এই দেহজ সৌন্দর্যকে  খানিকটা প্লেটোনিক অ্যাঙ্গল থেকেই দেখে এসেছেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য কি ভয়ঙ্কর টেক্সটবুক পুরুষালী? আদপেই নয়, নায়কদের-ও যে একটা প্রশংসনীয় কমনীয়তা থাকতে পারে সেটা বোঝানোর জন্য বোধহয় সবসেরা উদাহরণ উত্তম এবং মারচেল্লো।  হয়ত সেজন্যই রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেও দুজনে অত্যন্ত সফল।

লা দোলচে ভিটা যখন প্রথমবার দেখি, সিনেম্যাটিক কনটেন্ট নিয়ে একটু বেশী তন্ময় হয়ে ছিলাম কিন্তু তাও যেন কিছু একটা পেটে এসেও মুখ থেকে বেরোচ্ছিল না। সাবকন্সাস কোথাও যেন একটা হিন্ট ড্রপ করে যাচ্ছে, অথচ সেটা আমি ধরতে পারছি না। বলা বাহুল্য যে একটু অস্বস্তি রেখেই সিনেমা দেখার কাজটা সাঙ্গ করতে হয়েছিল। ভুলেও গেছিলাম কিন্তু তার প্রায় মাস ছয়েক পরে ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল‘ দেখার সৌভাগ্য ঘটে, এবং যে মুহূর্তে সিসিলির দুপুরের ঘামে ভেজা ব্যারনের আবির্ভাব পর্দায়, তৎক্ষণাৎ সমস্ত অস্বস্তি উধাও। চোখের সামনে উত্তমকে দেখলাম,  বলছিলাম না মিহি গোঁফের উত্তম আর মারচেল্লোকে নিয়ে কুম্ভমেলা টাইপ চিত্রনাট্য হাইলি লিখে ফেলা যায়। এবং তক্ষুনি মনে পড়ল, কেন লা দোলচে ভিটা দেখার সময় অন্তরাত্মা স্বস্তিতে ছিল না। ওই ম্যানারিজম, ওই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, ওই অভূতপূর্ব স্মার্টনেস দেখেও কি করে নায়কের অরিন্দমের কথা প্রথমবারেই মনে পড়েনি সেটা একটা রহস্যই বটে (নায়কের ক্ষেত্রে তো বটেই, পুরনো ইউরোপীয়ান সিনেমাতেও দোলচে ভিটার মাস্ত্রোইয়ান্নির মতন স্মার্ট প্রোটাগনিস্ট বার করতে হলে বেশ কষ্ট পেতে হবে)। সানগ্লাস, ব্ল্যাক স্যুট, সাইড প্রোফাইল,  একাকীত্ব, পরাবাস্তবিক অভিজ্ঞতা, যেদিক থেকেই দেখি না কেন  মারচেল্লো রুবিনি (হ্যাঁ, চরিত্রের নামও নায়কের নামেই) আর অরিন্দমের মধ্যে তুলনা আসতে বাধ্য! আর আপনি যদি দুজনেরই পরম ভক্ত হন, এহেন তুলনার অভিজ্ঞতা অতীব সুখপ্রদ।

সার্থক উত্তমভক্তদের জন্য আবার ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল’ অন্য আরেক রোমাঞ্চ জাগাতে পারে – কল্পনাশ্রিত। সাটল রোম্যান্টিক কমেডি করার সৌভাগ্য উত্তমের হয়নি, চিত্রনাট্যও বেশী দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারেনি কোনোদিন (যদিও তারপরেও অধম, মধ্যম এবং সৌমিত্রদের ক্ষমতার অযুত যোজন দূর দিয়ে উত্তমের পারফরম্যান্স চোখ জুড়িয়ে দিয়ে গেছে, মন ভরিয়ে দিয়ে গেছে) – যদি সেই সুযোগ মিলত, কেমন হত? সিসিলির হিউমিড দুপুর না হয়ে শ্যামবাজারের প্যাচপেচে বিকালই হোক,  পড়তি ব্যারনের জায়গায় না হয় বিশ্বম্ভর রায়ের মতন ঝরতি বনেদীই হোক,  ফার্স্ট কাজিনের সঙ্গে বিবাহোত্তর অবৈধ প্রেম যদি বাঙ্গালী আবহে গুরুপাচ্য হয়ে যায়, ‘চন্দ্রবিন্দু’র পিসতুতো ভাই সেজেই না হয় প্রেমটা হোক (তবে ‘বিবাহোত্তর’ ব্যাপারটা মাস্ট!) –  কেমন লাগত উত্তমকে?

সে উত্তর আমি দিতে পারি কিন্তু কেন দেব? হাতের কাছেই যখন সে সুযোগ রয়েছে নিজেই একবার দেখে ফেলুন। আগে দেখে থাকলেও আবার দেখুন। এই পোস্টটা পড়ার পর সিসিলির জমিদারবাড়িতেও দেখবেন উত্তমকেই খুঁজে পাবেন, কোনো অসুবিধা হবে না।

খালি একটা কথা – মারচেল্লোর একটা মুদ্রাদোষ আছে (মানে এই সিনেমাটায়), ঘটনাপ্রবাহ নিজের মনোমতন না চললে কখনোসখনো জিভটা দাঁতের মধ্যে ঢুকিয়ে একটু স্মিচ্ শব্দ করে থাকেন। আপনার চেতনায় চুনী রাঙ্গা হতে পারে, পান্না হতে পারে সবুজ, উত্তমকে একটা বাঙ্গালী মুদ্রাদোষ ধরিয়ে দিতে আর কতক্ষণ? না হয় টিপিক্যাল উত্তমসুলভ মুদ্রাদোষটাই দিলেন – চোখ দিয়ে হাসতে হাসতে মাঝে মাঝেই অস্ফুটে বলে উঠছেন “ব্যাটাচ্ছেলে!”

 আর শেষপাতে –  অনন্য মাস্ত্রোইয়ান্নি!

Advertisements