সত্যি রূপকথা

— “তুমি কি রাজা?”

রিনরিনে গলাটা এমন আচম্বিতে বেজে উঠল যে বেশ হকচকিয়ে গিয়েই মাথা ঘোরালাম। দেখলাম এক ক্ষুদে স্বর্ণকেশিনী ভারী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও কম অবাক হলাম না, “না তো, আমার তো মুকুটই নেই একটাও!”। বোধ হয় বিশ্বাস হল না। তার দৃষ্টি অনুসরণ করতে গিয়ে খেয়াল পড়ল কনভোকেশনের গাউনটা হাতে ধরে রয়েছি। ফেরত দিতেই এসেছিলাম কিন্তু দোকান আজ বন্ধ, বাস আসতেও দেরি তাই চুপটি করে বসেছিলাম অ্যান্ডারসন পার্কে। দেখছিলাম এক কিন্ডারগার্টেন টিচার একটা বিশাল প্যারাম্বুলেটরে জনা পাঁচেক কুচোকে একসঙ্গে চড়িয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক মনে হল গাছ থেকে টুপ টুপ করে ফুল পেড়ে সাজিতে রেখে দোলাতে দোলাতে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে এক টুকরো কখন ছিটকে আমার পাশটিতে এসে পড়েছে বুঝতেই পারিনি। গাউনের রহস্য ফাঁস না করে আমি প্রশ্ন ফেরত পাঠালাম, “তোমার পাশের জন নিশ্চয় রাজপুত্র?” রাজপুত্রের চোখ বেজায় নীল, আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে আবার প্রাণপণে নকুলদানার মতন আঙ্গুলগুলো চুষতে শুরু করেছে সে। “দুৎ, তুমি কিচ্ছু জান না। ও রাজপুত্র কেন হবে? ও তো ইথান, মোটে আট মাস হল জন্মেছে।” “তাতে কি, রাজপুত্র কি ছোট্ট হতে পারে না?” ভারী চিন্তিত দেখলাম, কি ভাবে রিফিউট করা যায় সেই নিয়েই ভাবছে বোধ হয়। কিছু ভেবে না পেয়ে ভারী লাজুক গলায় বলল, “আর আমার নাম নোলা, আমার তিন বছর বয়স।”  “ও বাবা, তোমার তো অনেক বয়স গো।” “তা ঠিক, ইথানটা খুব বাঁদর তো, ওকে শাসন করার জন্য বয়স্ক লোক দরকার।” “বাঁদর বুঝি? কেন, কেন?” “ও তো পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ছাড়া কিছু চোষে না, একটু বারণ করলেই খুব কাঁদে।” “হায় হায়, আর এখন যে বড় হাতের দিকে ওর নজর?” “পার্কে ঘুরতে এসেছে তো জুতো পরে, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওর পা খুঁজে পায়নি।” বলে খুব হাসতে লাগল। আড়চোখে দেখলাম রাজপুত্র নিজের আঙ্গুল ছেড়ে নোলার কড়ে আঙ্গুলের দিকে নজর দিয়েছে।

“জানো তো, আমি একটুও কান্নাকাটি করতাম না ছোটবেলায়। খুব লক্ষ্মী মেয়ে ছিলাম, ইথানটার মতন না।”  রাজপুত্র এর মধ্যে একটা বিশাল গোল্ডেন রিট্রিভার কে দেখে খুব আহ্লাদিত হয়ে বেঞ্চ থেকে নেমে পড়তে যাচ্ছিল, নোলা আবার টেনেহিঁচড়ে তাকে তুলে সোজা কোলের মধ্যে বসিয়েছে। অত্ত ছোট্ট সিংহাসন তো,  মোটেও পছন্দ হল না ব্যাপারটা। সে তার নিজের ভাষায় প্রতিবাদ জানাল “অয়,  অয়, অয়য়য়য়য়”। “ও শুধু আমার কথা শোনে, আর কারোর কথা শোনে না।” “তাহলে তুমি নিশ্চয় ম্যাজিক জানো?” কিরকম একটা দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে বলল “না, একটা কায়দা আছে। তুমি কি লক্ষ্মী ছেলে? তাহলে বলতে পারি।” অনেক ভেবেটেবে দেখলাম নোলার কাছে সত্যি কথাটাই বলা যাক, “খুব লক্ষ্মী, তোমার থেকেও”; “তাহলে শোনো! আচ্ছা, আর কাউকে বলবে না কিন্তু। ঠিক তো?” “হ্যাঁ হ্যাঁ, পাক্কা প্রমিস”। “যেই ইথান কাঁদবে, অমনি তুমি ওর পায়ের পাতায় একটা চুমু খেয়ে নিলেই ওর কান্না বন্ধ হয়ে যাবে।” আমি তো শুনে যাকে বলে চমৎকৃত, “হ্যাঁ গো, বড়দের জন্যও এটা সত্যি?” “দুর বোকা, বড়রা কাঁদে না।” প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম হঠাৎ দেখি রাজপুত্র আমার হাত নিয়ে পড়েছে। আঁতকে উঠে সরে বসতেই দেখি বিশাল হাঁ করল, বোধহয় রাজকীয় কান্নার পূর্বাভাস।  “এই এই, এবার কি হবে? পায়ের পাতায় তো চুমু খাওয়া যাবে না, জুতো পরে তো!”

“নাহ, তুমি কিচ্ছু জান না। জুতো পরে থাকলে ওর ভুঁড়িতে মুখ লাগিয়ে আওয়াজ করতে হবে, সবসময় কি পায়ের পাতায় চুমু খেতে আছে নাকি?” “এহ রাম রাম! ভুঁড়ি আছে?” “বাহ, থাকবে না? ভুঁড়ি না থাকলে ও ইথান হবে কি করে?” তাও ঠিক।

আমার এত অজ্ঞতা দেখেই কিনা কে জানে,  প্রাজ্ঞ মহিলা এবার তাঁর ভুঁড়িওলা পুতুলটিকে নিয়ে উঠে পড়লেন। যেতে যেতে ঘুরে তাকিয়ে বললেন “বাই বাই, তুমি কিন্তু চোখ বন্ধ করে থাকো। ইথানকে টাটা করলেই ও ভ্যাঁ করে।” চোখ বন্ধ করেই ছিলাম, কয়েক সেকন্ড পর ভাবলাম আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে একটু দেখি। অবাক কান্ড,  পার্ক পুরো ভোঁভাঁ। কোন গাছে আবার ফিরে গেল কে জানে।

পাগলা সাহেবের খবর

Image

(উৎস – ‘লজিকমিক্স‘)

নিজেই বলে গেছিলেন “God, prevent me from sanity”; কথায় বলে পাগল আর জিনিয়াসে অল্পই তফাত হয়; সে দিক থেকে দেখলেও হয়ত পাগল বলা যায়। তবে এই ব্লগের টাইটল টা বোধহয় একজন গুণমুগ্ধ আদার ব্যাপারীর ভালোবাসার প্রতিফলন। ম্যাথেমেটিকাল লজিক নিয়ে আমার অবসেশন বহুদিনের, মুশকিল হল নিজের সীমিত জ্ঞানে এ প্যাশন নিয়ে চলার ঝক্কি অনেক। তাই রাসেলের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা’ বছর ছয়েক ধরে পড়ে চলেছি (আপনারাও চেষ্টা করতে পারেন)! যাই হোক, এ চর্চা সূত্রেই পাগলা সাহেবের নাম প্রথম শুনি; ইনি ছিলেন আবার বারট্রান্ড রাসেলের প্রিয় ছাত্র, যদিও সম্পর্কটা পরে একটু অম্লমধুর হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এনার কাজ এবং মানুষটিকে নিয়ে বিশদে জানার ইচ্ছে হল ‘লজিকমিক্স’ পড়ে (এ এক অনবদ্য বই, লেখা এবং রেখা নিয়ে আপনার যদি বিন্দুমাত্রও উৎসাহ থাকে তাহলে কিনে ফেলুন, ঠকবেন না।); আর জানার ইচ্ছে না হওয়াটাই অস্বাভাবিক, এত বর্ণময় চরিত্র ফিকশনেও চট করে খুঁজে পাবেন না – সোনার চামচ মুখে দিয়েই জন্মেছিলেন অথচ আজীবন চেষ্টা করে গেছেন পারিবারিক খ্যাতি এবং ধনসম্পত্তির থেকে  দূরে থাকার; এক বছর আগে লেখা শেষ করেছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দর্শনগ্রন্থগুলির একটি অথচ তার পর পরই ভিয়েনার এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হয়ে দিন কাটাচ্ছেন এবং দিব্যি আনন্দে আছেন; আবার কিছু দিন পর কেমব্রিজের প্রফেসর হিসাবে বিস্তর খ্যাতি (এবং কিছুটা কুখ্যাতি) কুড়োচ্ছেন অথচ প্রফেসরশিপটাই ছেড়ে দিলেন শুধু লেখালেখিটা মন দিয়ে করবেন বলে। এনাকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে, বিখ্যাত কিছু পেইন্টিং-এর ইন্সপিরেশনাল সোর্স ইনি, এনার কাজ নিয়ে তৈরী হয়েছে ধ্রুপদী সঙ্গীত এমনকি ব্লকবাস্টার থ্রিলারের প্রোটাগনিস্টদেরও দেখা গেছে এনার কাজের সূত্র ধরেই রহস্য সমাধান করতে।

থ্রিলারের রেফারেন্সটার আবার  আলাদা একটা তাৎপর্য আছে! এনার প্রফেশন নিয়ে বাংলায় এক শব্দে কিছু বলতে গেলে অধ্যাপক, বিদ্বজন, দার্শনিক কোনো কিছুই খাটবে না, বলা উচিত ‘সত্যান্বেষী’। আক্ষরিক অর্থেই সত্যের সন্ধান করে গেছেন সারা জীবন। গাণিতিক বাস্তব বলে আলাদা কিছু থাকতে পারে, এ কথা কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না।  ঋণাত্মক একের বর্গমূল যে শুধু গণিতের জগতেই বাস্তব, এহেন প্রপোজিশন ছিল এনার দুচোখের বিষ। বাস্তব জগত একটাই, গণিত তার বাইরে নয়। কিন্তু কিভাবে সেটা মেলান যায়? বোঝাই যাচ্ছে সে বড় সহজ কম্ম নয়, কারণ মেলানোর জন্য দরকার ‘চরম সত্য’। আর সেকাজ করার জন্য দরকার দার্শনিক তত্ব, মুশকিল এটাই যে সে তত্বও এর আগে কেউ দিয়ে যান নি। তাই থিয়োরি বলুন এবং তার অ্যাপ্লিকেশন, দুয়েরই গুরুভার বহন করতে হয়েছে এনাকে – এবং সে ভার বইতে গিয়ে মূল্য কম চোকাতে হয়নি। তাঁকে উন্মাদ বলা হয়েছে (এবং খুব একটা ভালোবেসে নয়), বলা হয়েছে তিনি বাড়বাড়ি রকমের আত্মম্ভরিতায় ভোগেন,  অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর ছাত্রদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে তিনি ধংস করেছেন নিজের অতি অ্যাগ্রেসিভ লজিক খাটিয়ে, তাঁর গুরু মন্তব্য করেছেন ছাত্রের লেখা কোনো বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে পড়ে বোঝা সম্ভব নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যক্তিগত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অভিযোগের সারবত্তা নিশ্চয় আছে কিন্তু পেশাগত খুঁত বার করে তাঁকে সমালোচনা করার জায়গাটা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনেক অভিযোগের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল সহজ জিনিসকে অনর্থক কঠিন করে দেখানো। স্বয়ং বারট্রান্ড রাসেল যেখানে দু’শ পাতা নিয়েছেন এক প্লাস এক দুই প্রমাণ করার জন্য সেখানে এটা বোঝাটা কষ্টকর নয় যে ম্যাথেমেটিকাল লজিকে আপাতসহজকে কঠিণ করে দেখানোটাই দস্তুর; কারণ সহজ ব্যাপারটা সবসময়েই ইম্পোজড, ধ্রুবসত্য ভেবে চ্যালেঞ্জ করি না বলেই বোধহয় মনে হয় সহজ। সাম্প্রতিক কালে এনার কাজ ধরে এগোতে গিয়েই কম্পিউটার সায়েন্টিস্টরা দেখেছেন কম্পিউটারকে পদার্থবিদ্যা বা জ্যোতির্বিদ্যা বোঝানর তুলনায় রূপকথা বোঝানো অনেক জটিল ব্যাপার। অথচ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে ভাবার সময়ে প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন রূপকথা দিয়ে শুরু করেই নিশ্চয় পদার্থবিদ্যায় যাওয়া উচিত।

গাণিতিক বাস্তব এবং দৃশ্যমান বাস্তবকে মেলানোর চেষ্টা নিঃসন্দেহে কঠিণ কাজ, বুদ্ধিজীবীদের পক্ষেও লজিকাল ফ্লো টাকে সবসময় অনুসরণ করা সম্ভব হয় না, তাই হয়ত এত সমালোচনা। কিন্তু এই প্রচেষ্টাটাই একটা মহৎ কাজ। এবং খুঁটিয়ে ভাবলে কিন্তু দেখা যাবে কাজটা সাধ্যাতীত নয়।

এইচ-জি-ওয়েলস এর সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘টাইম মেশিন’ এর শুরুটা মনে আছে? টাইম ট্রাভেলার আক্ষেপ করছেন যে জ্যামিতি আমাদের স্কুল-কলেজে শেখাচ্ছে, সেটা কতটা ভুল। বলা হচ্ছে চতুর্থ ডাইমেনশন অর্থাৎ সময়কে বাকি তিন ডাইমেনশনের সঙ্গে একত্রে ভাবতে পারা সম্ভব নয়। তাই আমরা বস্তুগত জীবনে তিনটে ডাইমেনশন নিয়েই মাথা ঘামাই। অথচ সামান্য গাণিতিক লজিক এ ফ্যালাসির সমাধান ঘটাতে পারে। আমরা কি এমন একটা কিউবের কথা ভাবতে পারি যেটা এক সেকন্ডের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে? না, পারি না। আমার চোখের সামনে টেবলের ওপর একটা কিউবকে দেখতে পাচ্ছি শুধু তার তিনটে ডাইমেনশন আছে বলে নয়, সেটা চতুর্থ ডাইমেনশন অর্থাৎ সময়ের রেফারেন্সেও দিব্যি থেকে যাচ্ছে বলে।

আরেকটা উদাহরণ দি – ঋণাত্মক রাশির সঙ্গে ঋণাত্মক রাশির গুণনে ধনাত্মক রাশি তৈরী হয়। স্কুলে কি ভাবে পড়ে এসেছেন ভাবুন একবার। এমন ভাবে পড়ানো হত (এবং এখনো হয়) যে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, এ একটা গাণিতিক বাস্তব। কিন্তু আমাদের নিজস্ব জগতে এর অস্তিত্ব বুঝতে পারা মুশকিল। কেন দুটো ঋণাত্মক রাশিকে গুণ করলে একটা ধনাত্মক রাশি তৈরী হবে? এ কি ম্যাজিক নাকি? অথচ গাণিতিক লজিক দিয়ে ভাবলে একটা সুষ্ঠু ব্যাখ্যা নিয়ে আসা অসম্ভব নয়।  গণিতবিদ ইজরায়েল গেলফান্ড এর সহজ একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন –  পাঁচ ডলার করে তিনবার যদি আপনাকে ফাইন দিতে হয়, তাহলে আপনার ফাইন হল মোট পনের ডলার এবং যেহেতু আপনার পকেট থেকে গেল তাই এটা একটা ঋণাত্মক রাশি। কিন্তু কোনো কারণে যদি ফাইন নেওয়ার কেউ না থাকে, তাহলে তিনবারই আপনাকে ফাইন দিতে হল না ; আরেক অর্থে কতবার ফাইন দিলেন? নেগেটিভে তিনবার। তাহলে কিন্তু আপনার পকেটেই থেকে গেল পনেরো ডলার, অর্থাৎ একটি ধনাত্মক রাশি।

এবার কি মনে হচ্ছে না যে গাণিতিক বাস্তব-ও  আমাদের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই থাকতে পারে?  হয়ত, হয়ত না। কিন্তু এটা নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছেন বলেই লুডউইগ উইটজেনস্টেইন আমার ধন্যবাদার্হ। আবার লিখতে হবে ওনাকে নিয়ে, আজকের জন্য আপাতত এটুকুই।

পুনশ্চঃ উইটজেনস্টেইনের কাজ নিয়ে যে থ্রিলারটার কথা বলছিলাম, সেটাও বেশ উপভোগ্য। লেখক নিজেও গণিতবিদ। আর ওনার পি-এইচ-ডি টপিক? কেন, ম্যাথেমেটিকাল লজিক!

হৃদয়ের গভীর উৎসবে (পর্ব ১ – জলের উজ্জ্বল শস্য)

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

(অধুনাবিলুপ্ত বাঙ্গালনামার সম্পাদকের অনুরোধে লিখতে শুরু করেছিলাম এই সিরিজ; নব অবতারে বাঙ্গালনামার আবির্ভূত হওয়ার কথা ছিল ‘পারাপার’ নামে কিন্তু ব্লগ থেকে পার্মানেন্ট ওয়েবসাইটে পাড়ি দেওয়ার আগেই পারাপার চলে গেছে পরপারে। দুর্ভাগ্য আমাদের। সৃষ্টি বা গুরুচন্ডালী তে পাঠাতে গিয়েও মনে হল লেখাটা একটা স্তরে গিয়ে সত্যিই বড় ব্যক্তিগত হয়ে পড়েছে, নতুন ব্লগ যখন শুরু হয়েছে তখন এখানে কন্টিনিউ করাই হয়ত বাঞ্ছনীয়।)

এখানে আকাশ নীল – নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল

ফুটে থাকে হিম শাদা  – রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;

আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ

–  জীবনানন্দ দাশ (রূপসী বাংলা, ২৯)

রূপসী বাংলাকে শুধু জীবনানন্দ নন আরো কতশত বাঙালী সাহিত্যিক দেখে গেছেন, সেই অপার সৌন্দর্যকে অনুভব করেছেন নিজের হৃদয় দিয়ে, অন্তরের টানকে বড় মায়াবী ভাষায় ভাসিয়ে দিয়েছেন অক্ষরের চেনা চৌহদ্দিতে। তাঁদেরকে অনেককেই হয়ত চেনার সুযোগ করে উঠতে পারিনি, চিনলেও সময় হয়নি সব লেখা পড়ার বা পড়লেও বুঝিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে সে লেখা কখন হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমির প্রতিটি রূপসী সন্ধ্যা, কালবোশেখী দুপুর অথবা নরম সবুজ ভোরের এক আশ্চর্য মরমী উপাখ্যান। সময়ের কাছে হেরে যাওয়ার আগে এই একটা শেষ প্রচেষ্টা – হারিয়ে যাওয়া সেই বাংলা, চোখে না দেখা সেই বাংলাকে কাছে পাওয়ার।  এ আবেগ, অনুভূতির প্রাবল্য সবই একান্তভাবে আমার কিন্তু লেখার প্রতিটি পর্বেই না দেখা বাংলাকে অসীম মমতায় চিনিয়েছেন কোনো এক পূর্বসূরি। এ পর্বে শুধুই জলের কাব্য, তাও গদ্যকাব্য – বাংলার জলের উজ্জ্বল ও চেনাঅচেনা শস্য কে নিয়ে।

আল্লার অমূল্য ধন কি বলেন দ্যাহি? এক সানকি মোটা ভাত সঙ্গে সুঁটকির বর্তা (ভর্তা) – আর সে কি বর্তা, কি তার রূপ, কি তার দেখনদারী!  উনুনে এক আঁটি শোলার কাঠি দিয়ে যে গনগনে পারা আগুন হয় সে না পেলে এ ধন কাজে লাগে না। তারপর চাই অনেকগুলো লাল টুকটুকে চাটগাঁই লংকা, ও লংকা না বাটলে সোমত্ত সুঁটকির অঙ্গে রং লাগে না গো। সুঁটকি পুড়বে শোলার আগুনে আর লংকা পেষাই হবে পাথরে তবে না জাগবে ক্ষুধাকাম! এ কি আসনপিঁড়ি হয়ে বসলাম আর গিললাম, না হে বাপু! পোড়া সুঁটকি মড় মড় করে ভেঙ্গে সানকিতে ঢেলে তারপর পেঁয়াজ,নুন আর লংকাবাটা দিয়ে মাখার পালা, আহা! আর ওদিকে ভাতের ফ্যানের সোঁদা সোঁদা গন্ধ, এতেও যদি মন আকুল না হয় তবে আর হয় কিসে?

মাছ, মাছ, মাছ – মানুষও মাছ। মাছ নেই তো মানুষও নেই। প্রকাণ্ড কারে কয় বাপ্ ? প্রকাণ্ড হল মাচানের নিচে শোলপোনার ঝাঁক যেটা ফুটকরী ছাড়তে ছাড়তে ধানক্ষেতের দিকে এগোচ্ছে। সুখী কে? ওই যে মেঘনার প্রকান্ড ঢাঁইন মাছটা, নদীর ওপর ভেসে ভেসে জোনাকি খায় আর অলস বিশাল শরীরে ভেসে ভেসে বেড়ায়। মানুষ হল পুঁটি মাছ, নৌকো- নৌকোয় দূর থেকে দূরে ভেসে যায়, ছোটো থেকে ছোটো হতে হতে। তবে এক হিসেবে মানুষ হল দুচ্ছাই, কোনো বৈচিত্তির নেই; সেই একই কাঙালপনা আর কাঙালপানা, সেই একই হারু-বীরু, হারাণ-নারাণ – কে থাকল, কে না তাতে কি এসে যায়। উদোর নাম বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই বা কি? মাছ নিয়ে কেউ বলুক দেখি সেকথা? ওই যে ছোটো বড় এলকোনা, ডারকীনা মাছ নদীর ওপর লাফাচ্ছে, কোন মিঞার পো বলে ওগুলোকে ঢাঁইন-বাইন!মানুষকে সুখীও করে ওই মাছ, যদি দয়া হয়। আউশ ধানের মোটা ভাত, সর্ষের তেল দিয়ে বেতের ডগা সিদ্ধ আর বেগুন দিয়ে ডিমভরা রুপোরুপো ইলিশ – এ সবে মিলে হল পরিবার। কলাপাতা পড়ল তো সবে মিলে পরিবার, কলাপাতা উঠল তো রইলে কেবল তুমি। বাবুদের গেরস্থবাড়ি যাও, দেখবে একই চিত্র – শীতের সকালের আরাম-আমোদ মানেই বাজারে সোনালী পাবদা, বড় কালবয়েশ, টাটকা বাগদা।

সুন্দর কি, সুন্দর কে? ওই যে সোনালি বালির চর পেরিয়ে তিরতিরে নদীর জলে ছোট্টো ছোট্টো মালিনী মাছ ঘুরে বেড়ায়, কোন কন্যের ডাঁটো শরীর ওর থেকেও সুন্দর? ও সুন্দর তো অনাদিকালের, দেখবে তো দেখবেই! জিন ভর করলেও চোখের পাতা পড়ে, এ কিসের ভর? ও মাছ মরলে জলের ঘোলাটে অন্ধকারে ফেলে রাখতে নেই, তরমুজ পাতার ছাউনি বানিয়ে কবর দিতে হয়। জলের উপর-নিচে বড় গহীন সম্পর্ক; কে জানে তার কথা? বাঁশের ঝাড় থেকে যখন পাতা ঝরে ঝরে পড়ে আর তার নিচেই দীঘল বাঁশপাতা মাছ এঁকেবঁকে ঘুরতে থাকে তখন মনে হয় জলটা আয়না – ওপর দেখে নিচে, নিচ দেখে ওপর। কে জানে কবে কে এত জাদু দেখে মজে গিয়ে মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করেছিল, সে সব এখনো চলে। জলের গল্প বড় বালাই, সে ছাড়া জীবন চলে না কো। জল জীবন, জীবন জল – সেই জীবনের আখ্যান। সপ্তডিঙা মধুকরও আছে, আবার আছে বড় কাছিমের গল্প, গজার মাছের গল্প। গজার মাছ কি যে সে মাছ? কালো লম্বা থামের মতন চেহারা, সিন্দুরগোলা রঙের মাথা। ঘাই মেরে যখন সোজা ছুটে আসবে, মনে হবে জলের দানব  জল তোলপাড় করে আসছে, সেই দানবের গায়ে আবার সাপের চক্র আঁকা। গল্প একে নিয়ে হবে না তো কি মানবজীবনের তুচ্ছ যাত্রাপালা  নিয়ে হবে? তবে বেগার যাত্রা এ তল্লাটে বিশেষ হয় না বটে, মানুষগুলো নিতান্তই সরল। গোধূলি আলো জলে পড়ে যখন জল রাঙিয়ে দ্যায়, জ্যোৎস্নায় যখন মাঠঘাট ভেসে যায় এই  মানুষগুলোই বড় অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। সে বড় অনাবিল, অকৃত্রিম বিস্ময়। ওদের চাহিদাও যে কিছু নেই; নদীর ধারে বসে বঁড়শীতে বেলে চিংড়ি ধরতে ধরতে কাটিয়ে দিতে পারে গোটা বেলাটা, জলের ধারে ফিঙ্গের আনাগোনা দেখেই বড় খুশী হয়ে থাকলো মনটা। আবার হয়ত বেলে মাছ ধরার জন্য আরশোলা পচিয়ে  বঁড়শীতে মাখিয়ে সেই যে মাঝ গাঙে এসে বসল তো দিনরাত কাবার! অবশ্য সময় সময় জলের রূপ দেখে নয়, ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে গিয়েও সময়জ্ঞান থাকে না। পুকুরের ছুটকো মাছগুলো বড় বেশি জ্বালায়; ট্যাংরা বলো কি পুঁটি, একটু হিশহাশ্ ফিসফাস্ শুনলেই দে ডুব; শ্যাওলার ঘন নরম আস্তরণের মধ্যে সেই যে সেঁধোলো আর বেরোবেই না। ছুটকোদের আবার পচা আরশোলা দিলে হবে না, এদের চাই পিঁপড়ের ডিম। সে ত হবেই, এক এক জলের এক এক বায়নাক্কা, সেই জলের জীবদেরও তাই। জল তো আর শুধু জল নয়, এদিকে ধরো ধানক্ষেতও জল। ধানক্ষেত পেরিয়ে পড়বে একের পর এক খাল, সেই পেরিয়ে পেরিয়ে যেতে তো বেশ দেরি। বেলার দিকে আসবে সেই বিশাল বিল (কেন যে লোকে খালবিল বলে? কত আলাদা চরিত্র দুটোর) – আর বিল পেরোতে পারলেই নিশ্চিন্ত, তারপরেই অকূল মেঘনা। জল-আকাশের সীমা ঘুচিয়ে তাক লাগিয়ে দ্যায়, দেখে দেখে আর আশ মেটে না। আর পুকুর, ঝিল এসব তো রইলই। যে কথা বলছিলাম, জলের চরিত্তির না জানলে আর তার বাসিন্দাদের জানবে ক্যামনে? কোথায়  জল রূপোলী, কোথায় জল টলটলে কালো, কার জল রহস্যময়ী , কার জল অগভীর সে না জানলে তোমারি মরণ। জলাবাংলার মানুষ তুমি, নিজে মাছ না চিনলে চলে কেমন করে? কদিন-ই বা গ্রামের হাট থেকে বড় টাকামাছ কিনে আনবে? জল না চিনলে মাটিই বা চিনবে কে আর জানবে কি করে কোন ভেজা মাটির বুকে লুকিয়ে আছে কচ্ছপের লালচে সাদা  ডিম? কি সোয়াদ্, কি  সোয়াদ্! মাছ ধরারও কত কায়দা। কোথাও শুধু গামছাতেই হবে, কোথাও চাই বঁড়শী (বঁড়শীর-ও কত ভেদাভেদ, রাজা বঁড়শীর সঙ্গে লাগান থাকে আশি হাতের মতন টোম সুতো। চারখানা তার মুখ, একসঙ্গে বিঁধবে মাছের মাথায়, মুখে, ঠোঁটে আর গলায়। সে বঁড়শীর গলায় আবার লাগানো থাকবে দুটো দুটো করে সীসের মারবেল) কোথাও দরকার বড় জাল; আবার হিজল গাছের নিচে কোমরজলে দাঁড়িয়ে চিংড়ি, ট্যাংরা ধরার জন্য চাই চাঁই  – বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি ফাঁদ।

আর মাছ কি শুধু কিনে সুখ না ধরে সুখ? বিলিয়ে দেয়ার সুখ নেই?সে সুখ বড় সুখ – যে দেয় তার চোখে সুখ, যে নেয় তার চোখে সুখ। তবে সবাইকে আবার সব দিতে পারবেনি, বামুনদের একবার বাণ মাছ দিয়ে দেখ দিকিন কি হয়! কিম্বা ভাদ্র মাসে যে কাউকে নলা মাছ? কেউ খাবে না, এক কাঠা ধানে এক গলুই মাছ দিলেও কেউ নেবে না ও মাছ। আর শুধু বামুনঠাকুর কেন, মেছো ভূতের কথা ভাববে না? বা মাছখেকো শঙ্খিণী? হাসলে হবে না, যাও না একবার ওনাদের চটিয়ে; রাতের জোয়ারে বেরোলে সরপুঁটি ধরবে বলে, তিনদিন পর ফিরল তোমার লাশ। কিছু হয়ত গল্পকথা আবার কিছু সত্যি – জলজঙ্গলের দেশে কোনটা সত্যি আর কোনটা গল্প সে বোঝা ভার। মানুষ আবার একটু বাড়িয়েচড়িয়ে বলতে ভালবাসে; তিন কোশ দূর থেকে হয়ত শুনছ নদীতে কুমীর এসেছে, গিয়ে দেখলে বোয়াল মাছ। তবে সেরকম বোয়াল পড়লে কুমীর বলে ভুলও হতে পারে। প্রকাণ্ড মুখটা শুধু হাঁ করে বসে থাকে, জোয়ারের সময় শিঙি, পুঁটি, ট্যাংরা যা আসবে গিলে নেবে। খাদ্য-খাদক সম্পর্কও যে কতরকমের; এই দেখলে একটা শোলমাছ একটা বৈচামাছ মুখে পুরে ডুবসাঁতার দিল, পরক্ষণেই হয়ত ওই বাচ্ছাটাকে শাসন করার জন্য শুঁড় নেড়ে হাজির একটা ঢাঁইন মাছ। দে ছুট, দে ছুট। ছুটতে ছুটতে হয়ত গিয়ে পড়ল ওই বোয়াল মাছের খপ্পরে।

এ বড় আজব খেলা, মানুষ আর কতটুকুই বা দেখে। অত রঙ্গ সইবে কি করে? পাঁচটা বই তো ইন্দ্রিয় নেই, ডাঙার সব কথাই জেনে উঠতে পারল না তা জলের গহীনে কি চলে! তাও দেখ দিকিন কি সাধ তার এ চিরন্তন রূপরস-মধুগন্ধের কণাটুকুও পাওয়ার জন্য। জলপিপি-জলপায়রা, শালুক-পাতিশালুক, চিনিচাঁপা-ভাঁটফুল নিয়েই তো তার জগৎ, অফুরান-অপরূপ-অনাঘ্রাত।

বোম ফেলেছে জাপানি!

Image

(Reference: http://flavorwire.com/309836/a-peek-at-the-yayoi-kusama-illustrated-alices-adventures-in-wonderland/5)

চেনা চেনা না লাগলে সেই বহু পুরনো (এবং বিখ্যাত) ছড়াটা শোনানো প্রয়োজন,
“সা রে গা মা পা ধা নি,
বোম ফেলেছে জাপানি;
বোমের ভেতর কেউটে সাপ,
ব্রিটিশ বলে বাপ রে বাপ!”

কনটেক্সটা বুঝলেন তো? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাতিবাগানের কাছে সেই যে বোম ফেলেছিল জাপানীরা (সে বোম অবশ্য ফাটেনি), সেই প্রসঙ্গেই! বাঙ্গালী তো, একটু রঙ চড়িয়ে বলতে আমরা বরাবরই ভালোবাসি, আর সেটা এমন কিছু দোষেরও নয় বরং বেশ ক্রীয়েটিভ ব্যাপার!

হাতিবাগানের বোম না ফাটলেও, জাপানিদের বোমা ইন জেনারাল ফাটে এবং সে বিস্ফোরণে আপনার, আমার ম্যাদামারা, ক্লিশেস-এ চাপা পড়া ব্রেনের মহানির্বাণ ঘটবেই, উনাগি সুশির দিব্যি!

ইয়াওই কুসামার কথাই ধরুন। ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ তো কত বারই পড়েছি আমরা, ম্যাড হ্যাটারই বলুন কি চেশায়ার ক্যাট, কতদিন ধরেই তো তাদের দেখে আসছি (আদি ভার্সনের জন্য এখানে একবার ঢুঁ মারতে পারেন), কিন্তু কুসামা যে বিস্ফোরণটি ঘটালেন তার তুলনা মেলা ভার। ছোটবেলা থেকেই কুসামা যাই দেখুন না কেন, ছোট্ট রঙ্গীন বুদ্বুদ ঠিক ভেসে উঠবে। তো চোখের এহেন সমস্যাকে যে শিল্পের কাজেও লাগানো যেতে পারে, সে কথা কেউ ভেবেছিলেন আগে? অথচ দেখুন, কি মোক্ষম একটা কাজ করেছেন ভদ্রলোক, এই ইলাস্ট্রেশনস দেখার পর অ্যালিসের জগত কি আপনার কাছে একইরকম থেকে যেতে পারে?

কেইগো হিগাশিনোই বা কম যান কিসে? প্রথম তিন পাতার মধ্যে বলে দিলেন খুনী কে, অথচ পরের সাড়ে তিনশ পাতা ধরে এমন ভয়ঙ্কর সাসপেন্স তৈরী করলেন যে রাতের ঘুম, সকালের বাহ্য, দুপুরের ফেসবুকিং – সব মাঠে মারা গেল। ‘The Devotion of Suspect X‘ এর মতন বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা উপন্যাস হাতে গুনে পাবেন। জাপানে তো ব্লকবাস্টার স্টেটাস পেয়েছিলই, ২০১১ তে রাজভাষায় অনুবাদের পরে যাকে বলে ইন্টারন্যাশনাল সেনসেশন তাই ফেলে দিয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানী কাম ডিটেকটিভ, মানাবু ইয়ুকাওয়া কে ভালো না লেগে আপনার উপায় নেই। ডিটেকটিভ গল্পের মধ্যেও মানবিক অনুভূতিগুলো এত সূক্ষ্ম ভাবে নিয়ে এসেছেন হিগাশিনো, মুগ্ধতার রেশ পড়ে ফেলার বহুক্ষণ পড়েও থেকে যায়। অবশ্য সাটল ব্যাপারস্যাপারগুলো জাপানীরা এত চমৎকার করে থাকেন যে এ নিয়ে বেশী বলাটাই বাহুল্য! অজস্র উদাহরণ, তারই মধ্যে রিসেন্টলি দেখা আর পড়া দুটো রেফারেন্স রাখলাম, আপনারা চোখ বোলালে ভারী খুশি হব।

একটা গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক বারেবারে শুনে যাচ্ছি এরকম ঘটনা আমার সাথে মাঝেমাঝেই হয়, আপনাদের সাথেও হয় নিশ্চয়। কিন্তু শুধু একটা সুরের জন্য একটা সিনেমার ট্রেলার বারে বারে দেখছি? সাম্প্রতিক অতীতে একবারই ঘটেছে, জুন মিয়াকের ‘লিলিজ ইন দ্য ভ্যালি‘ শোনা ইস্তক ‘পিনা‘র ট্রেলার বোধহয় শ’শ’ বার দেখে ফেলেছি। পিনা বশের ঐশ্বরীয় কোরিওগ্রাফি বা উইম ওয়েন্ডারসের অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফির নমুনা দেখার পরেও, ‘পিনা’ নিয়ে উন্মাদনাটা প্রথম জাগিয়ে তোলেন জুন। হন্টিং কথাটা বহুব্যবহারে জীর্ণ সে কথা মানছি কিন্তু আর কিই বা বলা যায় একে!

তাই বলছিলাম, ভালো তো অনেক কিছুই লাগে – কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কিছু পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ভরসা বলতে ওই জাপানী বিস্ফোরণ, প্রতিভার।

আর হ্যাঁ, জুন মিয়াকে কে ভালো লেগে থাকলে এটাও মিস করবেন না – https://www.youtube.com/watch?v=xPlFFsAJQKM! এত ভালো ফাঙ্কি জ্যাজ শোনাবার লোক আর কই?

দ্য ক্যালকুলাস অ্যাফেয়ার

— “এত করে বলছি, তাও কথাটা রাখবে না? অন্তত আমাদের এতদিনের সম্পর্কের কথাটা তো ভাবো। ”
— “মানছি। কিন্তু সত্যি বলছি, যা পেতে পারো বলে ভাবছ, তা আমার কাছে নেই।”
—“সেই, সে কথা তো বলবেই। যখন আক্কেল দাঁত নিয়ে ব্যথায় কাতর, তখন কে দেখেছিল? যখন ফ্রীতে গাদা গাদা লিস্টেরাইন আর ফ্লসের দরকার পড়ে, তখন কার কাছে ছোটো? আর আজ আমার এত বড় বিপদ, তুমি পাশে থাকবে কেন?”
—“সত্যি, সত্যি, সত্যি – তিন সত্যি করে বলছি।”
—“আমি বিশ্বাস করি না, আর তুমি বলার কে হও? কি যোগ্যতা আছে তোমার এ নিয়ে কথা বলার?”
—“তা ঠিক, তবে মিথ্যে আশ্বাস দিয়েই বা কি লাভ বলো?”
—“যাক, এসব ইমোশনাল ভ্যানতাড়ায় চিঁড়ে ভিজবে না এ আমি জানতাম। আসল কথায় আসি। দেখা দিলেই একশ ডলার দেব। আর বাকি সময়টার জন্য আরো একশ।”
—“ছি ছি! টাকার কথা আসছে কেন? কি বিপদ।”
—“নাহ, আসবে না, ন্যাকা! আর কি চাও? ফ্রী ব্রেকফাস্ট? পাবে। ফ্রী লাঞ্চ? তাও পাবে।”

—“শোনো, শোনো……”
—“না, আমি আর শুনতে পারছি না (ফোঁপানি)। তুমি এত হৃদয়হীন কেন? তোমাকে সত্যি বন্ধু বলে ভেবেছিলাম। ওদিকে দেখ, মাইক, শেলবী, ক্যামিল সব্বাই কাউকে না কাউকে যোগাড় করে ফেলেছে। শুধু বাকি রয়ে গেছি আমি, কারণ কি জান? কারণ আমি তোমার ওপর ভরসা করেছিলাম। আর তুমি? আমার সবথেকে বিপদের দিনে ফিরেও তাকাচ্ছ না।”
—“আরে খেলে যা, ডক্টর জেকবস কে জিজ্ঞাসা করে দেখো। এই তো তিন মাস আগেই রেগুলার চেকআপে গেছিলাম। কিচ্ছুটি পান নি।”
—“পুরো ঢপ। জেকবস তোমাকে দেখলেই আমাদের ক্লাস শুদ্ধ সবাইকে ধরে নিয়ে আসেন, আজ অবধি অন্যথা হয়নি।”
—“মাইরী বলছি। ফাস্ট ফুড খাই না, কোক খাই না, প্রসেসড মীট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি প্রত্যেকবার খাওয়ার পর কুলকুচি করি। জেকবস তাই শেষ বার একটা কাষ্ঠহাসি উপহার দিলেন, এত উন্নতি দেখে মনে মনে বেজায় চটেছেন।”
—“যাক, তোমার গল্পকথা শোনার সময় আমার নেই। আমি আসি, আর আমার সঙ্গে দেখা করার কোনোদিন চেষ্টা করবে না।”
—-“শোনো, শোনো – ক্যালকুলাস ছাড়া অন্য কিছু থাকলে চলবে না? লাস্ট কয়েকদিন ধরে খালি মনে হচ্ছে কয়েক দানা খাবার পেটে যাওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ওতে কিছু হেল্প হবে?”

বিব্রতকর নীরবতা

—“হ্যালো, হ্যালো?”
—“(ফোঁপানি) আমি ((ফোঁপানি) জানতাম (ফোঁপানি) তুমি আমাকে (ফোঁপানি) ফিরিয়ে দেবে না।”
—“তাহলে চলবে?”
—“রুট ক্যানাল, রুট ক্যানাল……ইয়েএএএএ! খুব ভালোবাসি।”
—“সেকি, সেকি! না না…হ্যালো, হ্যালো!”

আর না না, এক্ষুনি মেল পেলাম – শ্যারনের ডেন্টিস্ট্রির ফাইনাল পরীক্ষায় আমাকেই সিলেক্ট করা হয়েছে ওর পেশেন্ট হিসাবে। ডেন্টাল স্কুলের ডীন অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন, আর সঙ্গে একটা ফর্ম –  নিজের প্রাণ থুড়ি দাঁত যে সজ্ঞানে চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি পরিকল্পে ধার দিচ্ছি, সেটা কনফার্ম করার জন্য।

জুন মাসের ঠান্ডাতেও টের পেলাম কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে।

হত্যা হাহাকারে – ২

Image

নেসবোর আর একটি বিশেষত্ব হল, পাঠককে ভিকটিমের ভয় ও যন্ত্রণার সঙ্গে ফার্স্ট-হ্যান্ড পরিচিতি দেওয়া। ২০১২ তে বেরনো ‘দ্য লেপার্ড’ এর কথাই ধরুন,

“Don’t touch the wire.”

If she pulled it, the ridges might retract into the ball, and she would be spared the pain. Ger thoughts ran in the same circles. How long had she been there?  Two hours? Eight hours? Twenty minutes? ………..

Yes, it was a game, a brutal game. And she had to play. The pain was intolerable, her throat was swelling; soon, she would suffocate.  She tried to scream again, but it subsided into a sob, and she blinked and blinked, without producing any further tears……

She pulled the wire.

নেসবোর আগেও বহু বিদেশী এবং হাতে গোনা কিছু দেশী লেখক এ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই সেখানে হু-ডান-ইটের ছোঁয়া; পাঠক যখন অন্ধকার ঘরের এক কোণ লুকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছেন তখন প্রায় সবসময়ই ক্লাইম্যাক্স মুহূর্ত, উত্তেজনা তুঙ্গে – কে, কেন, কোথায় ইত্যাদি। নেসবো ভুলেও সে পথে যান না। অপরাধী ও তার শিকারের সাক্ষাতের মুহূর্তগুলি খুব ম্যাটার অফ দ্য ফ্যাক্ট হয়ে আসে। যন্ত্রণাই যে নিয়তি, অস্তিত্বরক্ষা যে নিছকই একটা চান্স গেম সেকথা লেখক অনায়াসে বুঝিয়ে দেন, সেখানে অনাবশ্যক উত্তেজনার কোনো স্থান নেই। আর তাই প্রতিটি অক্ষর পাঠকমনে দাগ কেটে যায়।

হ্যারি হোল সিরিজে এখনো অবধি দশটা বই বেরিয়েছে, সাম্প্রতিকতম বইটি হল ‘পোলিটি’, নরওয়েজিয়ান ভাষায় যার অর্থ পুলিশ – এর ইংরেজী অনুবাদ সম্ভবত এ বছরের সেপ্টেম্বরে বেরোবে। দশটির মধ্যে সাত নম্বর ‘স্নোম্যান’ আক্ষরিক অর্থে গেম চেঞ্জার, নেসবো এবং হ্যারি দুজনকেই বিশ্বজোড়া পরিচিতি দিয়েছে এ বই।  ‘স্নোম্যান’এর পর ইংরেজীতে অনূদিত হয়েছে আরো দুটি বই ‘দ্য লেপার্ড’ (২০১২) এবং ‘ফ্যান্টম’ (২০১৩)। দুটিই ব্লকবাস্টার এবং আশার কথা এই যে বডি কাউন্টে কোনো কমতি পড়ছে না, মেরুদন্ডে ঠান্ডা স্রোত অব্যাহত। সর্বোপরি প্লট এতটাই জমে উঠছে যে প্রত্যেকবারেই আশঙ্কা হয় শেষটায় গিয়ে ভারী নিরাশ হতে হবে কিন্তু নেসবো সহায়। ইদানীং আবার লেখক আমদানি করছেন সম্পূর্ণ অচেনা কিছু মারণাস্ত্রের। সেসব অস্ত্রের বর্ণনাই রক্ত জল করার জন্য যথেষ্ট। ‘ফ্যান্টম’-এ বর্ণিত ‘দ্য বীটল’ এর কথা বলি।

The method had originally been Russian and used on informers. First of all, the informer’s ear was nailed to the floor beneath a roof beam. Then six long nails were hammered halfway into a brick, the brick was tied to a rope slung around the beam and the informer held the rope end between his teeth. The point – and the symbolism – was that so long as the informer kept his mouth shut he was alive.

মুখ খোলার পরিণতি? কল্পনা করতে পারেন তবে আরো ভালো হয় যদি হ্যারির মুখ থেকেই সেটা শোনা যায়। যতই নৃশংসতা থাকুক, ভদ্রলোক জানেন গল্প কিভাবে জমাতে হয়।

হত্যা হাহাকারে – ১

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

বোম্বাইয়ের বোম্বেটেতে তোপশে বলেছিল “খ-য়ে হ্রস্বউ আর ন – এই দুটো পর পর জুড়লে যেন আপনা থেকেই শিউরে উঠতে হয়।” ১৯৭০-৮০ তেও হয়ত শিউরে উঠতাম, কিন্তু ২০০০ পরবর্তী ডিটেকটিভ ফিকশনে এত ডার্ক শেডস, মামুলি দু’একটা খুনে পাঠক সমাজের নিতান্তই মন ভরছে না। আর লেখকরা পাঠকদের মনোবাঞ্ছা পূরণে যে সব প্যাঁচ-পয়জার দেখাচ্ছেন তার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে রিভিউয়ারদের রীতিমতন বডি-কাউন্ট রাখতে হচ্ছে! বিশ্বাস না হলে এই দেখুন

কিন্তু নিছক সংখ্যার থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল প্লটলাইন। আর সেখানেই বর্তমান লেখকদের বেশ কয়েকজন অসাধারণ মুন্সীয়ানার পরিচয় দিচ্ছেন। আমি অবশ্য এখানে প্লট বলতে খুনের অব্যবহিত আগে কি ঘটছে তার কথাই বলছি। সত্যি কথা বলতে কি এই একটা জায়গায় আমি সত্যজিৎ-শরদিন্দুর থেকে নীহাররঞ্জন কে এগিয়ে রাখব। ফেলুদা-ব্যোমকেশের তুলনায় কিরীটীর গ্রে সেলস যে বেশ খানিকটা কম সে নিয়ে কারই বা সন্দেহ আছে, কিন্তু খুনের সময়গুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে নীহাররঞ্জন যে ভয়াল বিভীষিকার আমদানি করতেন, তার সঙ্গে কম্পিট করার সাধ্য প্রায় কারোর নেই। এবং যদি একটু মন দিয়ে ভাবেন  তাহলে দেখবেন যে সত্যজিৎ-শরদিন্দুদের লেখায় অধিকাংশ সময়েই পাঠক কিন্তু অকুস্থলে হাজির থাকে না। ফেলুদা বা ব্যোমকেশের মাধ্যমেই সে খবর পায়।

যাই হোক, আজকে অবশ্য যাকে নিয়ে লিখছি তিনি বঙ্গভূমির কেউ নন, তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ডিটেকটিভ ফিকশন বললেই এখনো আমাদের সেই ড্র্যাগন-ট্যাটু ওলা মেয়েটির কথা মনে পড়ে যে শুধু আগুন নিয়েই খেলেনি, রীতিমতন বোলতার চাকে খোঁচাও মেরেছিল। যে মেয়ে আগুন নিয়ে খেলে (আক্ষরিক অর্থে হোক বা না হোক), তাকে আমি বেজায় ডরাই। তার কথা অন্য আরেকদিন বলব। কিন্তু তার আখ্যানকে শুধু ডিটেকটিভ ফিকশন হিসাবেই দেখলে বেজায় ভুল হবে, ওটা রীতিমতন একটা অ্যানথ্রোপলজিকাল ও সোসিওলজিকাল দলিল। হয়ত এত ডার্ক শেডসের জন্যই তথাকথিত ডিটেকটিভ ফিকশনেও সামাজিক সমস্যাগুলির এত প্রাধান্য, এবং যে ভাবে সেগুলোকে ধরে কাটাছেঁড়া করা হয়, তাতে সময় সময় বেশ সন্দেহ লাগে যে ‘স্যানিটি’-র আটপৌরে ডেফিনিশনটা এখনো অক্ষত আছে কিনা। জো নেসবোর বইগুলো পড়ার সময়েও এই সন্দেহটা আসেই, কিন্তু ইনি বীভৎসরসে এতটাই পারদর্শী যে আপনার হিম হয়ে যাওয়া হাড় থেকে থেকে মনে করিয়ে দেবে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। জো নেসবো গত দু বছর ধরে বারে বারে আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া সত্ত্বেও দৌড়ে বেরিয়েছি অন্ধকার, বরফে ঢাকা নরওয়ের অলিতে গলিতে। সদা বিষণ্ণ, প্রায় সুইসাইডাল  প্রোটাগনিস্ট হ্যারি হোলকে নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছে রইল, আজকে থাক।

” Is this what you are looking for?”
She had neither seen nor heard a thing. But in front of her sat a figure, crouched down. It. Sylvia scrambled back, but the figure followed with the hatchet held out to her. …….. “I want  you to eat snow”, the voice said, getting up and briefly holding the side where the jacket had been slashed open.
“What?” Sylvia exclaimed, in spite of herself.
“I want you to eat snow until you piss yourself.” The figure stood slightly outside the radius of the steel wire, tilted its head and watched Sylvia. “Until your stomach is so frozen and full that it can’t melt the snow any longer. Until it’s ice inside. Until you’ve  become your true self. Something that can’t feel.” (Snowman, 2010)

ভুলেও ভাববেন না এ নিছক টর্চার-পর্ন ; আর লিঙ্গ সত্যিই এখানে কোনো ফ্যাক্টর নয়। স্পয়লার দিতে চাই না কিন্তু এটুকু বলাই যায় যে এই আধিভৌতিক ছায়ামূর্তির-ও (লক্ষ্য করুন সর্বনামের ব্যাবহার – But in front of her sat a figure, crouched down. It.) একটা কনভিকশন আছে – Until you’ve  become your true self, ওটাই মূল উপজীব্য!

(চলবে)

X – এক অজ্ঞাত রাশি

করিডোরে পনের মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে, X বা Y কেউই বেরোচ্ছেন না ঘর থেকে। ভাবলাম “এখনো যন্ত্রণার শেষ হল না?”  বিশদে যাওয়ার আগে এই অজ্ঞাত রাশি নিয়ে কিছু বলা দরকার অবশ্য!

X =  উত্তপ্ত কটাহ, আমার জীবন ভাজা ভাজা করাই এ কড়াইয়ের কাজ
Y =  f (X)

কিন্তু X এর মতন আনপ্রেডিক্টেবল ভেরিয়বল পাওয়া দুষ্কর! শুধু গরম কড়াই হলেও কিছু স্ট্র্যাটেজাইজ করা যায়, কিন্তু ওনার সঙ্গে চলা মানে প্রায় ওয়াল স্ট্রীটের রাস্তায় হাঁটা, কখন যে মেজাজের স্টক উঠছে আর কখন যে নামছে, ঈশ্বর-ও জানেন না। এই আজকে বললেন “ওয়াহ, ওয়াহ – কি মডেলটাই বানিয়েছ বাবা, বাকিদের ভাত মারা গেল” (প্রসঙ্গত, এটা সারক্যাস্টিক উক্তি নয়, সেটুকু বাঁচোয়া!) আর কালকে সেই মডেলের প্রোপোজিশন নিয়ে দু-এক কথা বলতেই কটমট করে তাকিয়ে বলবেন “নিজের ভালো চাও তো এ লাইন ছাড়, এ হওয়ার নয়”।

কিন্তু শুধু কথা শোনাতেই যদি সমস্যা শেষ হত তা হলে তো অনেক আগেই যবনিকা পতন! কিন্তু নিচের নাট্যাঙ্কগুলোর হত কি?

অঙ্ক ১ –  প্রথম বার প্রোপোসাল পড়ে শোনাচ্ছি কমিটি মেম্বারদের। দশ মিনিটের মাথায় X তেড়ে এলেন, “তোমরা ইকোনমিক্সের ছাত্ররা কি ভাবো বলো তো নিজেদের? র‍্যান্ডম ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম, ট্রেম্বলিং হ্যান্ড, উইনার্স কার্স ছুঁড়ে  যাচ্ছ, একবারও এক্সপ্লেন করছ না। এ কি চালবাজি, অ্যাঁ?” তখনো নভিস তো, আমি বললাম “আসলে ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টে না থাকলেও আপনারাও তো গেম থিয়োরিস্ট, তাই এই টার্মগুলো যে এক্সপ্লেন করতে হবে ভাবিনি।” ভদ্রলোক পাক্কা এক মিনিট আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর বললেন “আমরা কি জানি সেটা নিয়ে তোমার ভাবার কোনো অধিকার নেই, তুমি কি জানো সেটাই প্রশ্ন।” এক ঘর লোকের সামনে ভারি বিব্রতকর অবস্থা, শীর্ষেন্দুর ভাষায় যাকে বোধহয় বলে এক গাল মাছি। যাই হোক, দুদিন ধরে খেটেখুটে প্রত্যেকটা ছোটবড়, রেলেভান্ট-ইররেলেভান্ট সব টার্মিনোলজি নিয়ে সাতকাহন গাইলাম। আবার প্রেসেন্টেশন দেওয়া, পাঁচ মিনিট-ও কাটল না। X চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, “কাট দ্য ক্র্যাপ ম্যান। বিজনেস স্কুলে থাকতে হলে প্রেসেন্টেশন স্কিলস দরকার হয়, তোমার সেসব নেই। এই এত্ত কথা, যেগুলো দুধের শিশু-ও জানে, সেসব নিয়ে এই সময় নষ্টের মানে কি?” বেরিয়ে গেলেন, আমি হতভম্ব। এক ঝলক দেখে মনে হল কমিটির বাকি মেম্বাররাও তাই, তবে সেসব থোড়াই পি-এইচ-ডি স্টুডেন্টের সামনে দেখাবেন।

অঙ্ক ২ – মিনমিন করে বললাম “তিন মাসে আগে বলেছিলেন এবারে জব মার্কেটে গেলেও যেতে পারি। তো অফিসিয়াল জব মার্কেটের নোটিফিকেশন এসে গেছে। আপনার একটা চিঠি লাগবে।”  কোন একটা পেপার রিভিউ করছিলেন, লাল কালির খোঁচায় তার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সেটা হাতে নিয়েই আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ, তারপর শুধু বললেন “বসো।” বসলাম, একটা বিশাল দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমি অসম্ভব ডিসাপয়েন্টেড। তোমাকে যা যা করতে বলেছিলাম একটাও করেছ তিন মাসে?” এতদিনে জেনে গেছি যে এ অবস্থায় চুপ থাকাই শ্রেয়। আরেক সিনিয়র প্রফেসর Z খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন ওনার ধারণা মডেলিং অ্যাপ্রোচটা ভুল, সেটা ঠিক করা দরকার। তিন মাস ধরে X তাঁকে কনভিন্স করতে পারেন নি, স্বভাবতই সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর। হল না সেবার জব মার্কেটে যাওয়া।

অঙ্ক ৩ – ডিউকের বিজনেস স্কুল দুবার ইন্টারভিউ নিয়ে ক্যাম্পাস ভিসিটের অফার দিয়েছে। স্বভাবতই বেজায় খুশি, ডিপার্টমেন্টেও হঠাৎ খুব কদর বেড়ে গেছে, শুধু X কিছু বলছেন না। যাওয়ার আগের দিন সকালবেলা চোখের সামনে দিয়ে গটগট করে হেঁটে বেড়িয়ে গেলেন, একটা কথাও বললেন না। আমি ধরে নিয়েছি যে ওনার আমাকে নিয়ে এতই কম আশা, এটাকে একটা নিছক দুর্ঘটনা হিসাবেই দেখছেন।  বিকালে আচম্বিত এক ফোন। “শোনো, ওই এক গাল দাড়ি নিয়ে যেও না। আর ভালো টাই আছে? নাহলে আমার কাছে ঘুরে যাও।” তারপরেই ফোন রেখে দিলেন দুম করে। আমি পড়লাম বিপদে, টাই চাইব না চাইব না? মানে এমনিতে আমার দরকার নেই, কিন্তু না চাইলে আবার উনি কি ভাববেন? গেম কি আর রিয়াল লাইফেও কম খেলতে হয়!

এই সবই ভাবছিলাম, এমন সময় পিঠে টোকা। দেখি Y বেরিয়ে এসেছেন, খুব গম্ভীর গলায় বললেন ” X বললেন ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরেও যা কাজ করার দরকার ছিল, তার আসলটাই করা হয়নি। ভেতরে চলো।” শুনেই হিসেব শুরু হয়ে গেছে, এক্ষুনি কি ঝাড়টা পড়বে সেটার থেকেও বেশি চিন্তা আর কতদিন লাগবে।

ঢুকলাম, দেখি X দাঁড়িয়ে! আর, আর, আর………

এক হাতে শ্যাম্পেনের বোতল, অন্য হাতে গ্লাস – এবং সব থেকে বড় কথা মুখে একটা আলতো হাসি, যেটা কখনো দেখিনি। বললেন “অভিনন্দন ডক্টর চ্যাটার্জ্জী, আজ থেকে আমরা কলীগ। ইউ উইল বী ডিয়ারলি মিসড। ”

কি বলব, গলাটা কিরকম ধরা ধরা লাগল। আর শ্যাম্পেন পেটে পড়ার আগেই মুখ দিয়ে বেরোল “ইস্তানবুল আসবেন তো?”

গুরু গুরু!

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

মুখের ছাঁদের কথা বাদ দিলেও দুজনেই জন্মেছেন সেপ্টেম্বরে, দুজনের জীবনেই শেষ বেশ কিছু বছরে দ্বিতীয়া এক নারী অসামান্য ভূমিকা নিয়েছেন, দুজনকেই মিহি গোঁফেও দুর্দান্ত ভালো দেখতে লাগে (মনে পড়ে ‘হোটেল স্নো-ফক্স’?) , দুজনেই নিজের নিজের টার্ফ ছেড়ে অন্যত্র খেলতে গিয়ে বিশেষ সুবিধা করতে পারেন নি ইত্যাদি ইত্যাদি  এবং

দুজনকেই পর্দায় (ম্যাক্সি হোক কি মিনি) দেখলে একটা বাক্যবন্ধই মাথায় আসে – ‘গুরু, গুরু’!

স্ক্রিপ্টের খাতিরে মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি কে একবার বলতে হয়েছিল “আমি ইউরোপের সব থেকে রূপবান পুরুষদের একজন” (অ্যান এত্তারো দি চিয়েলো, ১৯৫৯ ) – নেহাত সমাপতন নয় বুঝতেই পারছেন, খুব কায়দা করেই কথাটা ঢোকানো হয়েছে। সেযুগে যা হত আর কি, লোকজন সেক্স অ্যাপীল ট্যাপীলের কথা শুনেছে, ব্রিজেট বারদো কি সুপ্রিয়া কে নিয়ে সেসব ভাবলেও নায়কদের জন্য থাকত একটা সম্ভ্রম মেশানো তারিফ! কি রূপ দেখেছ?! পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে এই দেহজ সৌন্দর্যকে  খানিকটা প্লেটোনিক অ্যাঙ্গল থেকেই দেখে এসেছেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য কি ভয়ঙ্কর টেক্সটবুক পুরুষালী? আদপেই নয়, নায়কদের-ও যে একটা প্রশংসনীয় কমনীয়তা থাকতে পারে সেটা বোঝানোর জন্য বোধহয় সবসেরা উদাহরণ উত্তম এবং মারচেল্লো।  হয়ত সেজন্যই রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেও দুজনে অত্যন্ত সফল।

লা দোলচে ভিটা যখন প্রথমবার দেখি, সিনেম্যাটিক কনটেন্ট নিয়ে একটু বেশী তন্ময় হয়ে ছিলাম কিন্তু তাও যেন কিছু একটা পেটে এসেও মুখ থেকে বেরোচ্ছিল না। সাবকন্সাস কোথাও যেন একটা হিন্ট ড্রপ করে যাচ্ছে, অথচ সেটা আমি ধরতে পারছি না। বলা বাহুল্য যে একটু অস্বস্তি রেখেই সিনেমা দেখার কাজটা সাঙ্গ করতে হয়েছিল। ভুলেও গেছিলাম কিন্তু তার প্রায় মাস ছয়েক পরে ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল‘ দেখার সৌভাগ্য ঘটে, এবং যে মুহূর্তে সিসিলির দুপুরের ঘামে ভেজা ব্যারনের আবির্ভাব পর্দায়, তৎক্ষণাৎ সমস্ত অস্বস্তি উধাও। চোখের সামনে উত্তমকে দেখলাম,  বলছিলাম না মিহি গোঁফের উত্তম আর মারচেল্লোকে নিয়ে কুম্ভমেলা টাইপ চিত্রনাট্য হাইলি লিখে ফেলা যায়। এবং তক্ষুনি মনে পড়ল, কেন লা দোলচে ভিটা দেখার সময় অন্তরাত্মা স্বস্তিতে ছিল না। ওই ম্যানারিজম, ওই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, ওই অভূতপূর্ব স্মার্টনেস দেখেও কি করে নায়কের অরিন্দমের কথা প্রথমবারেই মনে পড়েনি সেটা একটা রহস্যই বটে (নায়কের ক্ষেত্রে তো বটেই, পুরনো ইউরোপীয়ান সিনেমাতেও দোলচে ভিটার মাস্ত্রোইয়ান্নির মতন স্মার্ট প্রোটাগনিস্ট বার করতে হলে বেশ কষ্ট পেতে হবে)। সানগ্লাস, ব্ল্যাক স্যুট, সাইড প্রোফাইল,  একাকীত্ব, পরাবাস্তবিক অভিজ্ঞতা, যেদিক থেকেই দেখি না কেন  মারচেল্লো রুবিনি (হ্যাঁ, চরিত্রের নামও নায়কের নামেই) আর অরিন্দমের মধ্যে তুলনা আসতে বাধ্য! আর আপনি যদি দুজনেরই পরম ভক্ত হন, এহেন তুলনার অভিজ্ঞতা অতীব সুখপ্রদ।

সার্থক উত্তমভক্তদের জন্য আবার ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল’ অন্য আরেক রোমাঞ্চ জাগাতে পারে – কল্পনাশ্রিত। সাটল রোম্যান্টিক কমেডি করার সৌভাগ্য উত্তমের হয়নি, চিত্রনাট্যও বেশী দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারেনি কোনোদিন (যদিও তারপরেও অধম, মধ্যম এবং সৌমিত্রদের ক্ষমতার অযুত যোজন দূর দিয়ে উত্তমের পারফরম্যান্স চোখ জুড়িয়ে দিয়ে গেছে, মন ভরিয়ে দিয়ে গেছে) – যদি সেই সুযোগ মিলত, কেমন হত? সিসিলির হিউমিড দুপুর না হয়ে শ্যামবাজারের প্যাচপেচে বিকালই হোক,  পড়তি ব্যারনের জায়গায় না হয় বিশ্বম্ভর রায়ের মতন ঝরতি বনেদীই হোক,  ফার্স্ট কাজিনের সঙ্গে বিবাহোত্তর অবৈধ প্রেম যদি বাঙ্গালী আবহে গুরুপাচ্য হয়ে যায়, ‘চন্দ্রবিন্দু’র পিসতুতো ভাই সেজেই না হয় প্রেমটা হোক (তবে ‘বিবাহোত্তর’ ব্যাপারটা মাস্ট!) –  কেমন লাগত উত্তমকে?

সে উত্তর আমি দিতে পারি কিন্তু কেন দেব? হাতের কাছেই যখন সে সুযোগ রয়েছে নিজেই একবার দেখে ফেলুন। আগে দেখে থাকলেও আবার দেখুন। এই পোস্টটা পড়ার পর সিসিলির জমিদারবাড়িতেও দেখবেন উত্তমকেই খুঁজে পাবেন, কোনো অসুবিধা হবে না।

খালি একটা কথা – মারচেল্লোর একটা মুদ্রাদোষ আছে (মানে এই সিনেমাটায়), ঘটনাপ্রবাহ নিজের মনোমতন না চললে কখনোসখনো জিভটা দাঁতের মধ্যে ঢুকিয়ে একটু স্মিচ্ শব্দ করে থাকেন। আপনার চেতনায় চুনী রাঙ্গা হতে পারে, পান্না হতে পারে সবুজ, উত্তমকে একটা বাঙ্গালী মুদ্রাদোষ ধরিয়ে দিতে আর কতক্ষণ? না হয় টিপিক্যাল উত্তমসুলভ মুদ্রাদোষটাই দিলেন – চোখ দিয়ে হাসতে হাসতে মাঝে মাঝেই অস্ফুটে বলে উঠছেন “ব্যাটাচ্ছেলে!”

 আর শেষপাতে –  অনন্য মাস্ত্রোইয়ান্নি!

হরর স্টোরি, শেষবার

বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ঘুম না এলেই বেশ কিছু চিন্তা নিয়ম করে মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। নিজের মৃত্যু সম্পর্কিত চিন্তাটা বহুদিন ধরেই সেগুলোর মধ্যে প্রধান, হয়ত সব থেকে যুক্তিযুক্ত-ও। আমিটাই নেই, আর সব কিছু আছে এ কি ভাবা যায়? সব কিছু তো সব কিছু কারণ আমি তাই বলেছি , আমি নিজে দেখেছি, আমিই ডিফাইন করেছি। আমিই যদি চলে যাই, সেই সব কিছুরও কি আমার সাথে চলে যাওয়াই উচিত নয়? কই তা তো হয় না, নাকি তাই হয়? লোকে বলে বটে তা হয় না, কিন্তু চলে যাওয়ার পর কে আর দেখতে যাচ্ছে! একটা ভয় বড় বেশী করে চেপে ধরত , কখন চলে গেলাম যদি নিজেই জানতে না পারি। মানে একটা অ্যাটাক হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি, আধো-ঘুম আধো-জাগরণের মধ্যে অ্যাগোনির থেকেও টেনশনটা বেশি হচ্ছে, এরকম একটা ব্যাপার আমার কাছে বেশি কম্ফরটেবল – যতই আয়রনিক শুনতে লাগুক না কেন। কিন্তু কিচ্ছু বুঝলাম না, আর চলে গেলাম এর থেকে ক্রূর মৃত্যু আর কি হতে পারে? অত প্রশান্তির মৃত্যুকে আমি ভয় পাই, খুব। ওর থেকে বেশী রিক্ত, নিঃসঙ্গ অবস্থায় চলে যাওয়া যায় না।

নিঃসঙ্গ আমি নই, কারণ আমি চিন্তা করতে পারি। নিঃসঙ্গ আমি নই, কারণ আমি প্রবল মাত্রায় সেলফ-কনসাস। নিঃসঙ্গ আমি নই, কারণ  যখন স্বপ্প দেখতাম তখনো জানতাম যে স্বপ্ন দেখছি। আর তাই যাওয়ার সময় জ্ঞানটুকুও থাকল না, এ বড় ভীতিপ্রদ ব্যাপার আমার কাছে।

স্বপ্ন দেখতাম কেন বলছি? কারণ আর চোখে ঘুম নেই। শুতে যাই নিয়ম করে, উঠেও পড়ি নিয়ম করে – কিন্তু ওইটুকুই। জীবনের সব অতৃপ্তিকে জড়ো করে রেহাই পেতে চেয়েছি ঘুমের থেকে, সে বড় কঠিণ পরীক্ষা। কিন্তু পেরেছিলাম।

কিন্তু আজ আর পারছি না। জীবন সততই অতৃপ্ত নয়, কোথাও যেন পরিপূর্ণতা পাবেই। আর তাই সেই ভয়টা ফিরে এসেছে, কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারছি না।

স্পষ্ট বুঝতে পারছি ঘুম আসছে, মনে হয় না স্বপ্ন বোঝার সময় থাকবে। কিন্তু নিঃসঙ্গ আমি এখনো নই।

Image (উৎস – গুগল ইমেজেস)