জিমি, জিমি – বাঁচা, বাঁচা

Jimmy

বাকুর এয়ারপোর্ট বেশি বড় নয়, তাই হন্যে হয়ে মিনিট ১৫ খোঁজাখুঁজি করার পর যখন কাউকে ট্যাগবোর্ড নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখলাম না তখনই বুঝেছি কপালে হয়রানি আছে। এদিকে স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি অপেক্ষারত ট্যাক্সি ড্রাইভারদের নোলা সকসক করছে, আড়চোখে তাকিয়ে মনে হল একদল জটলা পাকিয়ে এদিকপানেই তাকিয়ে এবং ফিসফিস করে কিছু বলছে। হাইলি টেনসনের চোটে হ্যালুসিনেট করে থাকতে পারি, কিন্তু তখন কি আর অতসব ভাবার টাইম আছে।

এমন সময়ে পিঠে টোকা। দেখি এক বিশালবপু এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি অফিসার, অসম্ভব মোটা এক গোঁফ এবং শৈলেন দাশগুপ্তের থেকেও বুশি ভুরূ। সিকিউরিটি ক্লীয়ারেন্স করে বেরিয়ে আসার পরেও পাসপোর্ট দেখতে চাওয়ার কি যৌক্তিকতা সেটা বুঝলাম না, একটু ব্যাজার মুখেই দিলাম। ভাগ্যিস, ভাগ্যিস! দু মিনিটের মধ্যে সেই ঘন বনানীর মধ্যে থেকে সূর্যরশ্মি তাপিতের হৃদয়ে পরম ভরসা যোগাতে লাগল অর্থাৎ কিনা চোখের মণি ঝিকমিক ঝিকমিক করতে লাগল, এবং দিব্যি একটা হাসির আভা ফুটে উঠল। তারপরেই অবিকল দ্রিঘাঞ্চু স্টাইলে বললেন “ইন্ডিয়াঃ?”

আমি মাথা নাড়তেই পরের প্রশ্ন “জিমিঃ, জিমিঃ?”

এইবারে একটু সমস্যায় পড়তে হল, আজেরি ভাষায় জিমিটা কি ধরণের সম্বোধন হতে পারে ভেবে  কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। বিসর্গগূলো যে নেহাতই ভানুর ভাষায় পিলারের কাজ করছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কিন্তু জিমি কি? জানি হতে পারে না, তাও একবার ভাবলাম হাসি মুখেই নিগার জাতীয় কোনো গালাগালি দিচ্ছে না তো! আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখেই বোধহয় দেখি জনা দুয়েক ট্যাক্সি ড্রাইভার গুটি গুটী পায়ে এগিয়ে এসেছে।

শৈলেনবাবু তাঁদের কি যেন বলতেই দেখলাম দুজনের মুখেই অনাবিল হাসি। তারপর একজন আমার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে বলল “ডিস্কো ড্যান্স?” এত স্যুররিয়াল অবস্থায় জীবনে পড়তে হয়নি, কিন্তু জিমি ভরসা, তক্ষুনি জলের মতন পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। কোন ভারতীয় ডিস্কো ড্যান্স থুড়ি ড্যান্সারকে জানবে না? এখনো মনে আছে ১৯৯১-এ ডিডিতে এক বুধবার দুপুরে সিনেমাটা দিয়েছিল, পরেরদিন খবরের কাগজগুলো জানাল রাজ্য জুড়ে ছাত্র উপস্থিতি ৬০-৭০% কমে গেছিল; হেডমাস্টার মশাইরা ছাত্রকূলের অধঃপতনের হার দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন।

হায়, জিমি-মাহাত্ম্য কি জিনিস তাঁরা জানলেন না, সাধে বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। ওদের মতনই ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশে যখন আবার বোঝালাম জিমি আর আমি শুধু এক দেশ নয়, এক শহরের বাসিন্দা (বাঙ্গালী কলকাতা ছাড়লেও কলকাতা কি বাঙ্গালী কে ছাড়ে?), রীতিমতন জামাই আদর শুরু হয়ে গেল। চোখের পলকে এসে গেল হালাল-ডিসকাউন্ট, বিদেশী মুরগীদের বেলায় ফেয়ার মিটারে আড়াই প্যাঁচ মারাটা দস্তুর নয়; রীতিমতন পেন্সিল কাটার ভোঁতা ছুরি দিয়ে ঘষে ঘষে কাটাটাই নিয়ম। কিন্তু জিমির দেশোয়ালী ভাই বলে কথা, ১৫% এর বেশি ভাড়া নিল না বলেই মনে হল।

সেটা সমস্যা নয়, সমস্যা এল অন্য দিক থেকে। বাকুর এয়ারপোর্ট থেকে ডাউনটাউন মিনিট কুড়ি-পঁচিশ তো লেগেই যায়। সেই সময়ে আমার ট্যাক্সি ড্রাইভার সম্পূর্ণ নাকের জলে, চোখের জলে হয়ে গেলেন। তাঁর ঠাকুমা কিভাবে টিভির পর্দায় ডিস্কোরত জিমির মুখে হাত বোলাতে বোলাতে ‘আমার গোপাল, আমার গোপাল’ বলতেন সে আখ্যান বড় মর্মস্পর্শী। শোক থেকেই আসে ক্রোধ, সুতরাং তারপরেই বেচারী হলিউডওলাদের নিয়ে বড়ই মুখ খারাপ করলেন, আমাদের কিং খান-ও কথা প্রসঙ্গে এসে পড়লেন। কিং খান কে নিয়ে অবশ্য ক্রোধের থেকেও হাহুতাশ টা বেশী, “কাঁহা রাজা ভোজ, কাঁহা গঙ্গু তেলি”। যাই হোক, শাপশাপান্ত কমার পর আবার ব্যাক টু “হাউ গ্রীন ওয়জ মাই ভ্যালি”। যা বুঝলাম, বাড়িতে ফেস্টিভিটি লেগে থাকলেই নাকি চালানো হত ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, আর দাদু-ঠাকুমা-জেঠুর শাশুড়ী-পিসির বড় জা, এহেন সমস্ত সিনিয়র সিটিজেন হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নাচতে শুরু করতেন। আর আকাশে বাতাসে শুধুই ‘জিমি, জিমি’। ইন ফ্যাক্ট, পেটে পানি একটু বেশি পড়লে শেষের সেই মর্মন্তুদ “Jimmy, I hate you Jimmy”-সঙ্গে সবাই ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করতেন।

সেই শুরু, বাকি বাকু সফরে আর কোনো কিছু নিয়েই ভাবতে হয়নি। হোটেলওলা তো ডিসকাউন্ট দিলেনই, জিমি পুজোয় ভেট চড়াতে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি রাখলেন না, দিনে রাতে অনেক কিছু বৈধ-অবৈধ উপাচার নিয়ে আসার জন্য ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন। সেমিনার দেওয়ার আগেই ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ এলাহি খাওয়ালেন, তারপর টানাটানি দিওয়ালি পার্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। চলেই যেতাম নেহাত শেষ মুহূর্তে মনে পড়ল জিমির মতন ইলেকট্রিক কর্ড ছাড়াই ইলেকট্রিক গীটার বাজানো সম্ভব নয়। ইন ফ্যাক্ট, জিমির মতন কোনোকিছু করাই নশ্বর জীবদের সাধ্যাতীত। অমিতাভ পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে এক তলায় আসতে পারেন কিন্তু এক তলা থেকে সামারসল্ট খেয়ে পাঁচ  তলায়? ও শুধুই জিমির পক্ষে সম্ভব। আর হ্যাঁ, জিমির দয়ায় ফেরার পথে এক্সট্রা ব্যাগেজের-ও ব্যবস্থা হয়ে গেল।

তাই নেক্সট টাইম জিমিকে আঙ্গুল দিয়ে দেওয়াল ফুটো করতে দেখলেই মনে রাখবেন “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু…..ইত্যাদি।”

Advertisements

14 thoughts on “জিমি, জিমি – বাঁচা, বাঁচা

  1. বাঃ চমৎকার লেখা। হিন্দি সিনেমার ইনফ্লুএন্স পৃথিবীর সর্বত্র।

    Like

  2. Suddha says:

    haan, JNUte maas koyek aage ek bhadromohila Disco Dancer niye paper porchhilen. sekhane ei Tajik Jimmy aar nicher video’tar ullekh chhilo

    echharao, US’e amar shesh baariwali chhilen ek Rushdeshiyo mohila. tini galpo korechhilen 80r dashok’er shesh theke shuru kore 90er ekta samay porjonto prochur Rush shishu’r naam rakha hoto Jimmy!

    Like

  3. ঋষিরাজ – নাহ ডিস্কো শিখতে চায়নি কারণ এসব এখন বিয়েবাড়িতেই বাজে, আর বিয়েবাড়ির টিপিক্যাল নাচ হল হাত ধরাধরি করে গোল গোল ঘোরা 🙂

    সই – একদম খাঁটি সত্যি কথা। আমার রাশিয়ান বন্ধুরা এমনকি জীতেন্দ্র কেও চেনে!

    Like

  4. Moumita Sen says:

    Amar o similar avigyata hoi Russia te…Sakhalin e chhilam bes kichhudin.sekhane coleaguer maa theke shuru kore anya coleague -er partner saba mukhei jimmy r disco dancer…sakhalin er ekmatro ebong boro mall ti teo bolywood song bajto majhe majhei..aro valo avigyata hoyechhilo pratham din TV dekhte bose…20 ta russian chanel er por ‘Zee cinema’ dekhte peye khub i khushi hoyechhilam…tar upor dekhi ‘Abhimann ‘ cholchhe..byas … chaliye rekhe unpacking korchhi…5 mins por hathat kheyal holo dialogue guli chena to noy i… bodhogamyo noi…tarpor abiskar korlam russian e dub kore dekhano hochhe…Zee er hindi serialgulio naki dub kore dekhano hoi…ebong sei sab serial er jonopriyota asadharon….segulo niye regular discussion o hoi…infact serial na dekhar fole ei sab alochonai ami nehat i bekub hoye bose thaktam…

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s