অথ পি-এইচ-ডি কথা

যাঁদের পি-এইচ-ডি করতে হয়নি তাঁরা আমার ঈর্ষার পাত্র এবং তাঁদের বিচক্ষণতার জন্য বেজায় শ্রদ্ধাও করি বটে। কিন্তু একটা জিনিস তাঁরা নিয্যস মিস করে গেছেন, গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের আড্ডার আসরের সেই সব হাড় হিম করা ভয়াল গপ্পো, তার কাছে কোথায় লাগে স্টিফেন কিং কিম্বা হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় (এনার ভুতুড়ে গপ্পো না পড়ে থাকলে সত্ত্বর কলেজ স্ট্রীটের চাচার ফুটপাথে দেখুন, ছেঁড়াখোঁড়া এক-দু কপি পেলেও পেয়ে যেতে পারেন।) । আর এসব গপ্পের মাহাত্ম্যই এমন যে দিল্লীর কাঠফাটা দুপুরে ৪৭ ডিগ্রীতেই পড়ুন কি উইনিপেগের মাইনাস ৪৭ এর সন্ধ্যাবেলায়, এফেক্টের তারতম্য হবে না। কুলকুল করে ঘামবেন, হার্টবিট বেড়ে যাবে আর গপ্পের প্র্যোটাগনিস্টের চরম নিয়তির কথা ভেবে থেকে থেকে শিউরে উঠবেন।

রফিক ভাইয়ের কথাই ধরুন, অনেক সাধ নিয়ে বিদেশে এসেছিলেন মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে গবেষণা করবেন বলে। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর বিশ্বব্যাঙ্কের কাদের যেন পটিয়েপাটিয়ে বিস্তর ডেটা-ফেটা যোগাড় করে ফেলে ডিপার্টমেন্টে  রীতিমতন হৈচৈ ফেলে দিলেন। উইমেন এম্পাওয়ারমেন্টের প্রোপোনেন্টদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে কিসব নতুন থিয়োরী বার করতে চলেছেন শোনা গেল, যার মোদ্দা বক্তব্য হল সবই ক্যাপিটালিস্ট চক্রান্ত। সে থিয়োরী নিয়ে আবার কমিউনিস্টদের থেকে ক্যাপিটালিস্টরা বেশী উৎসাহ দেখাতে লাগলেন। সব ঠিক, এদিকে রফিক ভাইয়ের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হচ্ছে। কিছুতেই ভাঙ্গেন না, শেষে কলেজ ইনে পাঁচ পেগের পর কেঁদে ফেললেন – অ্যাডভাইসর বলেছেন বেলম্যান ইকুয়েশন চাই-ই চাই, অন্য কোনো কিছুতে হবে না। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক লোন দেবে কি দেবে না, লোকে টাকা চাইবে কি চাইবে না, ইউনুস সাহেব নোবেল পাবেন কি পাবেন না সবই ডিপেন্ড করছে ওই বেলম্যানের ওপর। বললে বিশ্বাস করবেন না, দু বছরের কোর্সওয়ার্ক শেষ করার পর ঝাড়া আরো পাঁচটি বছর লাগল ওই বেলম্যান ইকুয়েশন নামাতে। তদ্দিনে গ্রামীণ, মাইক্রো এসব আধা শব্দ শুনলেই রফিক ভাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছেন , তার ওপর ব্যাঙ্ক আর ক্রেডিট নিয়েও লোকে কথা বলবে ওনার সামনে এ ভাবাই যায় না।

সন্দীপন আবার কাশ্মীর নিয়ে ভাবছিল বহুদিন ধরেই, পলিটিক্যাল ইকোনমি রিলেটেড রিসার্চ। ওর সুপারভাইসর আবার বয়সে নবীন, প্রবল উৎসাহ এবং প্রায়ই সন্দীপনকে পাব-এ নিয়ে যান গবেষণায় উৎসাহ পাবে বলে। কি বলব মশাই, এত ভালো একটা সম্পর্ক কেটে গেলে শুধু একটা গামার জন্য। গামা বুঝেছেন তো, সেই দু-হাত তুলে নৃত্যরত গ্রীক অক্ষর। কাশ্মীরের সঙ্গে গ্রীসের যদিও একটা বেশ প্রাচীন সম্পর্ক আছে, সন্দীপনের গামা কিন্তু সে নিয়ে কিছু বলছে না। গামা নেহাত-ই একটা প্যারামিটার, সন্দীপনের বক্তব্য ওটার ভ্যালু  ১/২ এর বেশী হলেই পাকিস্তানী অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়বে ভারতে। সুপারভাইসর বলছেন – অসম্ভব, ১/৪ এর থেকে সামান্য কম ভ্যালু নিলেই ভারত এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে যে পাকিস্তান দূরস্থান, চায়না অবধি কিছু করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ওর সঙ্গে যদি আবার আলফা প্যারামিটার টা ২ এর বেশী হয়ে যায়, দলাই লামা কিছু একটা বক্তব্য রাখতে পারেন। সে সাঙ্ঘাতিক ভজকট ব্যাপার, মোদ্দা কথা হল গামা নিয়ে এই গজকচ্ছপের লড়াইয়ে সন্দীপনকে ইউনিভার্সিটি তো চেঞ্জ করতে হলই, এখন শুনছি কাশ্মীর ছেড়ে নন্দীগ্রামের দিকে মন দিয়েছে। পি-এইচ-ডি এখনো শেষ হয়নি কারণ ল্যাম্বডার এস্টিমেট টা কিছুতে মেলাতে পারছে না। মডেল স্পষ্টতই বলছে ল্যাম্বডা ০.৫ আর ০.৭ এর মধ্যে থাকলেই নন্দীগ্রামে কিষনজীর পারম্যানান্টলি ঢুকে পড়ার কথা, এদিকে ওটা ০.৫৫ হলেই রাজ্যে পরিবর্তন সুনিশ্চিত। বোধহয় বাউন্ডারী কন্ডিশন ঢোকাতে ভুলে গেছে, কে জানে।

তবে সব থেকে ভয়াবহ গল্পের নায়ক ছিল অনির্বাণ দা। মেক্যানিকাল এঞ্জিনীয়ারিং পাস করে বহুদিন ধরে ভাবছে ইউ-এস-এ তে আসবে, জি-আর-ই দিয়ে রেডী। এমনকি ক্যোম্পানির কাজে ঘুরতে এলেই ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ভিসিট দিয়ে বেড়াত ; খালি ফান্ডিং আর আসে না, ওয়াল স্ট্রীট পুরো জ্বালিয়ে রেখে দিয়েছে। যাই হোক, একদিন ফান্ডিং এল, আমেরিকার দক্ষিণপ্রান্তের এক ইউনিভার্সিটি থেকে। যিনি টাকা দেবেন, তিনি এক বছরের বেশী দিতে পারবেন কিনা সেটা বলতে পারছেন না, তবে কন্টিনিউ করার ভালোই চান্স আছে। অনির্বাণ দাকে আর কে পায়, দমদমে মাসি-পিসি-হবু শাশুড়ী সবাইকে কাঁদাতে কাঁদাতে চলে তো এল। এসে শুনল বায়োমেক্যানিকাল ল্যাবে ওর কাজ। ল্যাব ঘুরতে গিয়ে দেখে হরি হরি, ল্যাব কোথায়? এ তো আস্তাবল! মানে সত্যিই আস্তাবল, তিন চার খানা তাগড়াই ঘোড়া ওকে দেখেই নাকি ভারী খুশী হয়ে তাকিয়েছিল। সকালবেলা এই অবধি শুনে বেরিয়ে গেছিলাম। রাত্রে ফিরে দেখি ঘরে আক্ষরিক অর্থে পিনড্রপ সাইলেন্স। কৌস্তভ আর মনপ্রীত দুজনেই বাডওয়েইসারের দিব্যি গেলে বলল অনির্বাণ দা কে নাকি ফুঁপিয়ে কাঁদতেও দেখেছে। একটু দোনোমনো করছিলাম, এমন সময় দেখলাম নিজেই বেরিয়ে এল। এক হাতে রিটার্ন টিকেটের প্রিন্টআউট, আর এক হাতে ওর অ্যাডভাইসরের দেওয়া প্রোজেক্ট প্রোপোসাল। নিজের চোখে দেখলাম সেই প্রোজেক্টের টাইটল – Stallion Semen Cryopreservation : thaw protocol and its relation to fertility, ঘোড়াদের ওকে দেখে খুশী হওয়ার দস্তুরমতন কারণ আছে বই কি!

ও  হ্যাঁ, তনভী-র গল্পটা তো মাস্ট! বেচারী ওর পোটেনশিয়াল অ্যাডভাইসরের কুকুরকে ‘she’র জায়গায় ‘it’ বলে ফেলেছিল। তারপর? যাকগে পরে কোনো একদিন, এর থেকে বেশী ভয় একদিনে না দেখানোই ভালো।

Advertisements

3 thoughts on “অথ পি-এইচ-ডি কথা

  1. debasis mukhopadhyay says:

    Apni to bes Roshik Lok moshai , Apnake to Cultivate korte hochhe . Isssssss Tatada ke khub miss korchhi . Apnar songeo nischoi alap chhilo ?

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s