M

M অক্ষরটার সঙ্গে রহস্য-রোমাঞ্চর একটা গভীর সম্পর্ক আছে! M নম্বর ওয়ানকে তো প্রায় সবাই চেনেন, দোসরা M কে এখনো না চিনে থাকলে আপনি জানেনও না কি হারাচ্ছেন। আমি আবার এক তৃতীয় M কে চিনি, যাঁর কার্যকলাপ কোনো অংশে কম রোমাঞ্চকর নয় – আজকে একটু সেই গপ্পোই হোক।

পি-এইচ-ডি ছাত্র হিসাবে মাঝে মাঝেই বেশ কিছু উঞ্ছবৃত্তির কাজ করতে হয়েছে, সেরকম একটা কাজ ছিল স্ট্যাটিসটিকস ডিপার্টমেন্টে গ্রেডারের কাজ। প্রতি হপ্তায় প্রায় দুশো ভাবী এঞ্জিনীয়ারের অ্যাসাইনমেন্ট চেক করতে করতে পিলে চমকে যেত; যেই ভাবতাম এরাই আরেকটা টুইন টাওয়ার বা গোল্ডেন গেট ব্রীজ বানাতে চলেছে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে কয়েকটা হার্টবীট মিস হওয়ার যোগাড়। ওই হৃৎকম্পটুকু ছাড়া কাজটা বলতে গেলে বেশ বোরিং, নেহাত কিছু এক্সট্রা টাকা পাওয়া যেত, তাই করা। প্রথম বছরটা এ ফ্রন্টে নিতান্তই পানসে কেটেছে। ২০০৮ এর শুরুতে জানতে পারলাম কোর্সটা এবার থেকে পড়াবেন প্রফেসর M, তখনো অবিশ্যি কোনো আইডীয়া ছিল না ভবিষ্যৎ-এর এক্সাইটিং দিনগুলো নিয়ে।

ক্লাস শুরু হওয়ার এক মাস আগে একটি বৈদ্যুতিন পত্র পেলাম M এর থেকে, দেখা করাটা আবশ্যিক। গিয়ে দেখি এক অসম্ভব ছটফটে মানুষ, আমাকে দেখেই অবশ্য এক গাল হাসলেন। তারপরেই আচম্বিতে প্রশ্ন “চোর ধরার ট্রেনিং আছে?” এরকম একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলে যে কারোরই ভেবড়ে যাওয়ার কথা, আমিও ব্যতিক্রম নই। তো-তো করছি দেখে খুব গম্ভীর মুখে বললেন, “পারবে তো বলো, নাহলে অন্য কাউকে দেখি।” উপরি টাকাগুলো ফস্কে যায় দেখে মরিয়া হয়ে বলে দিলাম পারব। আবার এক গাল হাসি, ‘এই তো চাই, এই তো চাই’ বলতে বলতে দেখি ফস করে একটা বিশাল ফোল্ডার খুলে ফেলেছেন। তাতে অলরেডী তিনটে মিডটার্মের প্রশ্ন তৈরী হয়ে বসে আছে, প্রত্যেকটার আবার চারটে করে ভার্সন। আমাকে বললেন “একশ আশিটা স্টুডেন্টের জন্য চারটে ভার্সন কি ঠিক ঠেকছে?” চারটেই আমার বেশ বেশি ঠেকছিল, সেটা বলতেই আঁতকে উঠলেন। খুব প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝালেন যে আন্ডারগ্র্যাজুয়েটদের মত ধড়িবাজ স্পেসিমেন পৃথিবীতে খুব কমই আছে এবং M-এর জীবন তাদের চৌর্যবৃত্তি বন্ধ করার নিমিত্তে উৎসর্গীকৃত।  চুরিবিদ্যা যে মহাবিদ্যা, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই এবং চারখানা ভার্সন-ও অ্যাপারেন্টলি বালির বাঁধের বেশী কিছু নাই হতে পারে।

সপ্তাহ তিনেক পরে আবার ডাক পড়ল, ঘরে গিয়ে দেখি খুব মন দিয়ে সবার হোমওয়ার্কের গ্রেড দেখছেন। আমাকে দেখেই প্রায় লাফ দিয়ে উঠলেন; তারপর খানিকটা সহানুভূতির গলায় বললেন “দেখেছ, তোমাকে নতুন পেয়ে কিরকম বোকাটা বানালো?” আমি যথারীতি ক্লুলেস। ভ্যাবলার  মতন তাকিয়ে আছি দেখে বললেন “দেখো, দেখো – গ্রেড ডিস্ট্রিবিউশনটা দেখো! কি ভয়ঙ্কর নেগেটিভলি স্কিউড, মোড আর মিডিয়ান মীনের থেকে কত্তটা বেশী!”  মোদ্দা কথা হল, ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যায়। আমারও একটু সন্দেহ হল, আফটার অল রজত কি অলিভিয়ারা শুধু ভারতবর্ষেই জন্মাবে, এরকম প্রোব্যাবিলিটি কত? রজত ছিল স্কুলের ব্যাচমেট – মাধ্যমিকের ইতিহাস পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে ওর কান্না দেখে রীতিমতন ঘাবড়ে গেছিলাম সবাই; পরে জানা গেল প্রাণপাত করে টুকে আনা নোটগুলোর সূচীপত্রটা নাকি কে লাস্ট মোমেন্টে ঝেড়ে দিয়েছে। এখন শের শাহ জামার কলারে বসে  রাজত্ব করছেন নাকি অশোকের সঙ্গে হিপ-পকেটে সহবাস, সেসব পরীক্ষার টেনশনে মনে রাখাই দায়। অলিভিয়া আবার শুধু পরীক্ষার দিনগুলোতে পরত সালওয়ার-কামিজ। আর আমরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতাম ওড়নার ভাঁজ থেকে একে একে বেরিয়ে আসছেন অ্যাডাম স্মিথ, জন কেইন্স, পল স্যামুয়েলসন রা। যাই হোক, M গভীর অ্যানালিসিস করতে বসলেন, ভাবনাচিন্তা করে নিদান দিলেন শুধু বইয়ের অঙ্ক করতে দেওয়া হচ্ছে বলে টোকাটুকি বাড়ছে। অন্য প্রফেসররা এতদিন তাই করে এসেছেন, কিন্তু M কে ধোঁকা দেওয়া অত সহজ নয়।

অতঃ কিম? ঠিক হল পড়ানো হবে এক বই থেকে, আর প্রবলেমস দেওয়া হবে অন্য আরেক বই থেকে। বেটারা নির্ঘাত সলিউশন ম্যানুয়াল যোগাড় করেছে।  খাটুনির চোটে দামড়া বাচ্চাদের মুখ গেল শুকিয়ে আর গ্রেডারের ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাচি অবস্থা। সেই কোয়ার্টার দিব্যি চলল, M এর ফুর্তি দেখে কে! গ্রেড ডিস্ট্রিবিউশন-ও দিব্যি বেল শেপড হচ্ছে, স্টুডেন্টরাও শাপ-শাপান্ত করছে – M এর জন্য সোনায় সোহাগা।

গোল বাঁধল পরের কোয়ার্টার-এ গিয়ে। হতভাগারা আবার বেশী বেশী নম্বর পেতে শুরু করল। M এর ভুরূ গেল কুঁচকে, লাঞ্চ করতে ভুলে যেতে লাগলেন, TA আর গ্রেডারদের সঙ্গে মীটিং এর পর মীটিং হতে লাগল।  শেষে ভদ্রলোক প্রত্যেক লেকচারের শেষে মুখে মুখে প্রবলেম তৈরী করে দিতে লাগলেন, বইয়ের অঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও ডিউ থাকল। চলল সে সিস্টেম মাস ছয়েক। তারপর আবার গ্রেড ডিস্ট্রিবিউশন দেখে তেনার মুখ গেল শুকিয়ে। এরা কারা রে? আবার ফুল মার্ক্স পাচ্ছে! তড়িঘড়ি মীটিং বসল, পাক্কা চার ঘন্টা আলাপ আলোচনার পর ঠিক হল একটা বিশাল কোয়েশ্চন ব্যাঙ্ক তৈরী হবে, সেখান থেকে আলাদা আলাদা কোয়ার্টারে র‍্যান্ডমলি প্রশ্ন তুলে দেওয়া হবে। মুশকিল হল ঘন্টা বাঁধার লোক আর পাওয়া যায় না। M ডিপার্টমেন্টে গ্র্যান্ট চাইলেন, বলা বাহুল্য সে গ্র্যান্ট মিলল না। American TA রা সপ্তাহে কুড়ি ঘন্টার বেশী কাজ হয়ে যাচ্ছে বলে প্রায় মুখের ওপরেই বলল করতে পারবে না। এরকম পরিস্থিতিতে সাধারণত গোবেচারা ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা শহীদ হয়। কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয় আর কি, আমিও পত্রপাঠ ইস্তফা দিলাম।

বছরখানেক পর হঠাৎই রাস্তায় দেখা। সেই আগের মতনই একগাল হাসলেন। তারপর খুব প্রাউডলি ঘোষণা করলেন “প্র্যাব, চীটিং সমস্যার ফাইনালি সমাধান হয়েছে, এবং এবারে পার্মানেন্ট ব্যবস্থা।” নিজের নামকে বেমক্কা খন্ডবিখন্ড হতে দেখেও রাগ হল না, কৌতূহলের চোটেই অস্থির। “কি কান্ড, বলুন বলুন প্লীজ কি করলেন”। M হাসলেন, এবারে বিজয়ীর হাসি “সব কোশ্চেন তুলে দিয়েছি ওয়েবসাইটে, উত্তর সমেত – এবার কি করবি পাজিগুলো? হুঁ হুঁ বাবা।”  আমি হাঁ হয়ে আছি দেখে যাওয়ার আগে বলে গেলেন “চিন্তা নেই, ডিস্ট্রিবিউশন এখনো বেল শেপড।”

গ্রেডার না থেকেও ভারী চিন্তায় পড়ে গেছি সেই থেকে।

Advertisements

একটি কল্পনার অপমৃত্যু

2013_FEST_Kalpana_440X300

ফিল্মবোদ্ধা অধ্যাপক যে মুহূর্তে বললেন “Enjoy the historical antecedent of the present day Bollywood movies”, তক্ষুনি বুঝেছি দিনটা ভালো যাবে না। গেল-ও না শেষ পর্যন্ত; পেছনের আমেরিকান ভদ্রলোক সশব্দে দশবার হাই তোলার পরেও বা সামনের সারির বাঙ্গালী ভদ্রমহিলা তিন চার বার ঢলে ওনার সঙ্গীর ঘাড়ে পড়ে যাবার পরেও প্রায় মরিয়া হয়ে আশা রাখছিলাম কিন্তু সে গুড়ে বালি। পূর্বাভাষ কিন্তু খারাপ ছিল না – এক্সটেন্ডেড উইকএন্ড, ‘তসভীর’-এর দৌলতে ফ্রী টিকিট সেসব তো ছিলই, IPTA এবং উদয় শঙ্করের সম্পর্ক নিয়ে একটা লেখা গত সপ্তাহেই পড়ার দরুণ প্রবল একটা এক্সপেকটেশন-ও তৈরী হয়েছিল। যবে থেকে SIFF জানিয়েছে ২০১৩-র ফিল্মোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ উদয় শঙ্করের ‘কল্পনা‘ (১৯৪৮), উৎসাহের অন্ত ছিল না, এবং কল্পনারও।

সিনেমাটা দেখতে গিয়ে মনে হল মূল সমস্যা মার্কেটিং পরিভাষায় যাকে বলে ‘কিচেন সিঙ্ক প্রবলেম’। লিঙ্গ বৈষম্য, তোতাকাহিনী, সাম্প্রদায়িকতা, শিল্পী স্বাধীনতা, মদ্যপান – চোখ বুজে যে কোনো একটা সমস্যার (যা স্বাধীনতার সময় থেকে কখনো না কখনো ‘হট টপিক’ হয়েছে) নাম করুন, ‘কল্পনা’য় পেয়ে যাবেন। তার সঙ্গে আছে প্রবল ন্যাশনালিসম (সময়টা খেয়াল করুন, হতেই হত) এবং ধর্মসচেতনতা। আবার IPTA-র ইনফ্লুয়েন্সের দরুণই কিনা কে জানে, শ্রেণীবৈষম্য ব্যাপারটাকেও পরিচালক যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কল্পনা শুধুই উদয় শঙ্করের, সেটা বোঝানোরও দরকার ছিল – তাই কম্যুনিস্টদের নিয়ে একটু লঘুরসের-ও আমদানি করতে হয়েছে। তাই কল্পনা যে ১৬০ মিনিট ধরে লতিয়ে লতিয়ে উঠেছে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ইন ফ্যাক্ট, পাঁচ বছরের ট্রিভিয়াটা না জানা থাকলে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এডিটিং ব্যাপারটা ডিরেক্টর সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন।

ঋত্বিক সেই বলেছিলেন না “আমাকে সিনেমার থেকে বেটার একটা মিডিয়াম দাও, সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব” (বা প্রায় ওই ধরণের কিছু, ভার্বেটিম এক্ষুনি মনে পড়ছে না) , কল্পনা দেখতে গিয়ে বারেবারেই সেটা মনে পড়ল। ‘কল্পনা’র দরকার ছিল কারণ সিনেমার থেকে বেটার কোনো মিডিয়াম এক্ষেত্রে হতে পারত না – একজন শিল্পীর ব্যক্তিসত্ত্বা এবং শ্রেণীসত্ত্বার চাহিদা, সংযোগ, অন্তর্দ্বন্দ্ব সব কিছুকে একটা স্পেসিফিক আর্ট ফর্মের সাহায্যে দর্শকদের সামনে পেশ করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার? সেদিক থেকে উদয় শঙ্করের সাহস, জেদ ও মনোবল অতুলনীয়। সিনেমা এখানে নিতান্তই একটা মিডিয়াম, ছবি আঁকার তুলি বলতে পারেন। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, উদয় শঙ্কর কমার্শিয়াল সাকসেস আশা করেছিলেন এবং তাই জন্য ওই তুলিকেই আবার সাবজেক্ট-ও বানিয়েছেন। মুশকিল হয়ে গেছে সেখানেই – অত্যন্ত দুর্বল একটি চিত্রনাট্য, অস্বাভাবিক অতি-অভিনয় (আমি স্থান ও কালকে যথাযথ ডিসকাউন্ট দিয়েই বলছি), আড়ষ্ট সংলাপ, সমস্যা কি আর একটা? উদয় শঙ্কর নিজেও এই জাঁতাকলের শিকার, নাচের দৃশ্যগুলিতে তিনি অসামান্য রকম এলিগ্যান্ট, সার্থক তাঁর পৌরুষ; একটি শব্দও সেখানে মনে হবে বাহুল্য এতটাই সরব তিনি তাঁর নিরুচ্চার পার্সোনায় । অথচ যেই তিনি চিত্রনাট্য আরোপিত সংলাপ বলছেন, তখনি গুলিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি কে আর পুরুষ কে।

সাদা এখানে বড়ই সাদা, কালো এখানে বেজায় কালো – গ্রে এরিয়া বিশেষ নেই, তাই গ্রে সেলের ব্যবহার অন্তত দর্শকদের বেশী করতে হয়নি। IPTA-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার পরেও উদয় শঙ্কর কেন একটা নিও-রীয়ালিস্ট চিত্রনাট্য গড়ে তুলতে পারলেন না, সেটা একটা রহস্য। হতে পারে, পুরো প্রোজেক্টের পরিপ্রেক্ষিতে  ব্যক্তি উদয় শঙ্করকে নিয়ে আসাটা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যে জন্যই হয়ত মূল চরিত্রের নামও উদয়ন।

কিন্তু এহ বাহ্য, আমি হতাশ হলাম মূলত ঐতিহাসিক অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স হেতু। বিমল রায় এর চার-পাঁচ বছর পর থেকেই বানাতে শুরু করবেন অসামান্য কিছু সিনেমা, প্রায় একই শৈল্পিক পরিমন্ডল থেকে এসে ভারতীয় সিনেমাকে একটা অন্য মাত্রা দেবেন। কল্পনা করেছিলাম, ‘কল্পনা’ হয়ত দেখাবে বীজবপনের ক্ষেত্রটি, চেনাবে বৌদ্ধিক আবহটিকে। ভেবেছিলাম ১৯৪৮ সালের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হয়ত এক আপাত-অচেনা synchronicity, কারণ ভিত্তোরিও দে সিকা এই বছরেই নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটাবেন ‘বাইসাইকল থীভস্’ বানিয়ে।

‘যাক, যা গেছে তা যাক’!

‘ন্যাকড়াবাজী’ এবং

বিয়ের পর পর-ই এক মুখরা প্রতিবেশিনী মাকে বেশ একটু কথা শুনিয়েছিলেন মায়ের বাড়ির তত্ত্বটা ঠিক জমেনি বলে। মা স্বভাবতই দুঃখিত, এদিকে শ্বশুরবাড়ি সাদা বাংলায় যাকে বলে একদম ‘কুল’, অথচ পাড়া-পড়শীর ঘুম হচ্ছে না। মনের দুঃখটা এক দেওরের সঙ্গে শেয়ার করে ফেলতেই, সে বলে উঠল “ওসব ন্যাকড়াবাজী একদম বাদ দিন বৌদি।”; মা কোনোদিনই নববধূ সুলভ আচার-আচরণে বিশ্বাস করতেন না। তাও একটু তা না না করে বলেই ফেললেন “ও আবার কি অসভ্য কথা ঠাকুরপো?”। কাকা তাতে বেজায় চমকালেন, বৌদি বকে দিয়েছেন বলে নয় – প্রথমত, বৌদি ‘ন্যাকড়াবাজী’ কথাটাই জানেন না দেখে আর দ্বিতীয়ত, ওই শব্দের মানেটা বোঝাতে হবে শুনে। ন্যাকড়াবাজী হল ন্যাকড়াবাজী, তার আবার মানে কি? কাকা তো তড়িঘড়ি কেটে পড়লেন, মা পড়লেন মহা সমস্যায়। হাওড়ার ঘটিদের বিস্তর ট্রেডমার্কড ‘সোয়্যার ওয়ার্ডস’ আছে বলে শুনেছিলেন বটে বিয়ের আগে কিন্তু মানে গুলো তো জানতে হবে , না কি? ভরসা করে সেদিন সন্ধ্যাবেলা জেঠিমা অর্থাৎ মার বড় জাকে জিজ্ঞাসা করে ফেললেন; শুনে জেঠিমার কি হাসি। তারপর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “তুই পারিস লা! ওসব পুরুষমানুষী কথায় তোর কি?” ফল হল বিপরীত, পুরুষমানুষরা যে অনেক কিছুর সঙ্গে একাধিক শব্দেরও স্বত্ব নিয়ে বসে আছে সেটা ভেবেই মার পিত্তি জ্বলে গেল। রেবেকা ওয়েস্ট কে নিয়ে মায়ের কোনো আইডিয়াই ছিল না তবে স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন যে ওসব পুরুষমানুষী আধিপত্য মুখ বুঝে সহ্য করা আর পাপোষ হয়ে থাকা একই ব্যাপার। জেঠিমা বেচারি পড়লেন মহা ফাঁপরে, শেষে মিনমিন করে বললেন “চটিস কেন, দাঁড়া বিন্তিকে শুধোই।” বিন্তি হল মা-জেঠিমার পাঁচ ননদের সেজ জন, মার সমবয়সীই বলা যায়। সেও সব শুনে হেসে খুন, তারপর চারদিক একবার দেখে নিয়ে বলল “মোটেই ওটা পুরুষমানুষী কথা নয়, বরং অমনি কিছু বলতে হলে ওটাকে মেয়েমানুষী কথাই বলা উচিত।” শুনে মার গালে হাত, জেঠিমা পুরো থ! বলে কি বেটি, অ্যাদ্দিনে একথাটা জানলাম না। মা একটু গলা খাঁকরানি দিয়ে বললেন, “মানে, যা ভাবছি কি তাই?”, বিন্তি ফচকে হেসে বলল “আবার কি!”। কিন্তু মানে টা কি দাঁড়াল? বিন্তির বক্তব্য ওসব তত্ত্ব-ফত্ত্ব নিয়ে পুরুষেরা মাথা ঘামায় না, তাই ওহেন অ্যানালজী। মা ভারী বিব্রত হলেন কিন্তু মনে মনে খুশি, অর্থটা তো উদ্ধার হয়েছে।

কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে মার মেন্টাল পীস আবার উধাও। বড় পিসেমশাই আবার হাওড়ারই মানুষ, তাই তার সঙ্গে শালাদের ভারী জমে, কারণ কমন লিঙ্গো বেজায় বেশী। রবিবারের সন্ধ্যাতে তাসের আড্ডায় বেশ কাঁদো কাঁদো মুখে ঘোষণা করলেন এবার পুজোয় আর একসাথে মীরাট যাওয়া যাবে না (মীরাটে আমার ঠাকুমার বাপের বাড়ি, দু’বছর অন্তর চ্যাটার্জ্জী গুষ্টি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস পুজো কাটাতে সেখানে যান), পুজোর দিন গুলো বাদ দিয়ে বস কিছুতেই ছুটি দিতে চাইছেন না, বহু অর্ডার ধরা বাকি। বাড়িতে রীতিমতন হৈচৈ শুরু হয়ে গেল, বিস্তর অনুযোগ-উপযোগে পিসেমশাইয়ের মুড চেঞ্জ হয়ে গেল।  রণহুঙ্কারে জানালেন বসের ন্যাকড়াবাজী সহ্য করার বান্দা তিনি নন, ছুটি আদায় করেই ছাড়বেন। তুমুল সেলিব্রেশন, এদিকে মার মুখ ভারী; বিন্তির থিয়োরী তাহলে কেটে গেল।

অনেক ভাবনাচিন্তা করে ঠিক করলেন তাহলে বাবাকেই জিজ্ঞাসা করা যাক। বাবা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন “সে কি, তোমাদের ঝাড়গ্রামে ও কথা কেউ বলে না? সাধে আর নামের মধ্যেই গ্রাম!”  মা ফোঁস করে উঠলেন “খবর্দার, ঝাড়গ্রাম নিয়ে কিছু বলবে না। আর আমি জন্মেছি ঝাড়গ্রামে কিন্তু বড় হয়েছি কালীঘাটে, সে তো জানোই। ওখানেও এরম অসভ্য কথাবার্তা শুনিনি বাপু।” বাবাও রাগলেন, হাওড়ার শব্দকে অসভ্যও বলবে, আবার কৌতূহলও বেজায়, বড়ই কনসিসটেন্সির অভাব। যাই হোক, সম্মুখ সমরের মধ্যেই দিব্যি বোঝা গেল যে ন্যাকড়াবাজী অর্থে অনর্থক রোয়াবী ব্যাপারটাকেই মীন করেছিলেন পিসেমশাই। যতই যুদ্ধু চলুক, পতিবাক্য পরম বাক্য মেনে নিয়ে মা নিশ্চিন্ত ছিলেন যদ্দিন না পাশের বাড়ির খিটকেল কুন্ডুদের পারিবারিক ঝগড়ায় কান পড়ে গেল। কুন্ডুমশাই দোজবরে কিন্তু মোটেও সুগার ড্যাডি সুলভ আদিখ্যেতা নেই। পাড়ার সবাইকে সাক্ষী রেখে নিত্যি রাত দুটোর সময় জানান দিতে লাগলেন, পণ বিশেষ কম পড়েছে; শ্বশুরবাড়িকে বহুত সময় দিয়েছেন আর এসব ‘ন্যাকড়াবাজী’ চলবে না। তখন তো আর পাড়ায় পাড়ায় নারী সমিতি ছিল না, মা জেঠিমাকেই জিজ্ঞাসা করলেন ঝাঁটা, বেলনী, আশুতোষ দেবের ডিকশনারী এসব নিয়ে হামলা চালানো সমুচিত কিনা। ভাগ্য ভালো, হাওড়ার মস্তানরা বিশ্ববিখ্যাত এবং বেজায় বৌদি-নেওটা, কুন্ডু-গিন্নী অল্পদিনেই তাদের বেশ হাত করেছিলেন। তাদের জন্য মাকে আর হামলা চালাতে হয়নি, কুন্ডু-বুড়োও চুপ।

কিন্তু প্রধান সমস্যাটা তো সেটা নয়। কুন্ডুর শ্বশুর তো আর মেয়ের স্বার্থ বন্ধক রেখে দোজবরে জামাইয়ের ওপর রোয়াবী দেখাবে না, তাহলে মানেটা কি দাঁড়াল? বছর তিরিশেক হয়ে গেল, সে রহস্য এখনো সমাধান হয়নি। মা মাঝে মাঝে ছেড়ে দিতেন হাল, আবার নতুন উদ্যমে শুরু হত ভাষাচর্চা। কলকাতায় পারমানেন্টলি চলে আসার পরেই আস্তে আস্তে সে উৎসাহে ভাটা পড়ল। তবে ইদানীং আমার এটিমোলজিক্যাল ইন্টারেস্ট আছে শুনে আমার ওপর ভারটা পড়েছে।

ভ্লাদিমির নবোকভ একটা শব্দ বানিয়েছিলেন ‘উপ্সিল্যম্বডা’ বলে, নেহাতই ফাজলামি আর কি। কোনো মানে নেই, অনেক নবোকভ-বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন ওটা গ্রীক অক্ষরদ্বয় ‘উপসাইলন’ এবং ‘ল্যাম্বডা’ কে মিলিয়ে বানানো শব্দ। কিন্তু মজা হল, যে যার মতন মানে ধরে নিয়ে সেন্টেন্সে ওটা ইউজ করতে পারে (যেরকম খানিকটা দেখা যায় ‘ডিক্টেটর’-এর রাজত্বে –

Doctor: [Aladeen rewrote the language so his name means both “positive” and “negative”] Do you want the Aladeen news or the Aladeen news?
Patient: The Aladeen news?
Doctor: You’re HIV-Aladeen.)
ন্যাকড়াবাজী নিয়ে আমার ‘সাম্প্রতিকতম্’ থিয়োরী এটাই – এবার দেখার কথা মা মানে কিনা।

জিমি, জিমি – বাঁচা, বাঁচা

Jimmy

বাকুর এয়ারপোর্ট বেশি বড় নয়, তাই হন্যে হয়ে মিনিট ১৫ খোঁজাখুঁজি করার পর যখন কাউকে ট্যাগবোর্ড নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখলাম না তখনই বুঝেছি কপালে হয়রানি আছে। এদিকে স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি অপেক্ষারত ট্যাক্সি ড্রাইভারদের নোলা সকসক করছে, আড়চোখে তাকিয়ে মনে হল একদল জটলা পাকিয়ে এদিকপানেই তাকিয়ে এবং ফিসফিস করে কিছু বলছে। হাইলি টেনসনের চোটে হ্যালুসিনেট করে থাকতে পারি, কিন্তু তখন কি আর অতসব ভাবার টাইম আছে।

এমন সময়ে পিঠে টোকা। দেখি এক বিশালবপু এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি অফিসার, অসম্ভব মোটা এক গোঁফ এবং শৈলেন দাশগুপ্তের থেকেও বুশি ভুরূ। সিকিউরিটি ক্লীয়ারেন্স করে বেরিয়ে আসার পরেও পাসপোর্ট দেখতে চাওয়ার কি যৌক্তিকতা সেটা বুঝলাম না, একটু ব্যাজার মুখেই দিলাম। ভাগ্যিস, ভাগ্যিস! দু মিনিটের মধ্যে সেই ঘন বনানীর মধ্যে থেকে সূর্যরশ্মি তাপিতের হৃদয়ে পরম ভরসা যোগাতে লাগল অর্থাৎ কিনা চোখের মণি ঝিকমিক ঝিকমিক করতে লাগল, এবং দিব্যি একটা হাসির আভা ফুটে উঠল। তারপরেই অবিকল দ্রিঘাঞ্চু স্টাইলে বললেন “ইন্ডিয়াঃ?”

আমি মাথা নাড়তেই পরের প্রশ্ন “জিমিঃ, জিমিঃ?”

এইবারে একটু সমস্যায় পড়তে হল, আজেরি ভাষায় জিমিটা কি ধরণের সম্বোধন হতে পারে ভেবে  কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। বিসর্গগূলো যে নেহাতই ভানুর ভাষায় পিলারের কাজ করছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কিন্তু জিমি কি? জানি হতে পারে না, তাও একবার ভাবলাম হাসি মুখেই নিগার জাতীয় কোনো গালাগালি দিচ্ছে না তো! আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখেই বোধহয় দেখি জনা দুয়েক ট্যাক্সি ড্রাইভার গুটি গুটী পায়ে এগিয়ে এসেছে।

শৈলেনবাবু তাঁদের কি যেন বলতেই দেখলাম দুজনের মুখেই অনাবিল হাসি। তারপর একজন আমার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে বলল “ডিস্কো ড্যান্স?” এত স্যুররিয়াল অবস্থায় জীবনে পড়তে হয়নি, কিন্তু জিমি ভরসা, তক্ষুনি জলের মতন পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। কোন ভারতীয় ডিস্কো ড্যান্স থুড়ি ড্যান্সারকে জানবে না? এখনো মনে আছে ১৯৯১-এ ডিডিতে এক বুধবার দুপুরে সিনেমাটা দিয়েছিল, পরেরদিন খবরের কাগজগুলো জানাল রাজ্য জুড়ে ছাত্র উপস্থিতি ৬০-৭০% কমে গেছিল; হেডমাস্টার মশাইরা ছাত্রকূলের অধঃপতনের হার দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন।

হায়, জিমি-মাহাত্ম্য কি জিনিস তাঁরা জানলেন না, সাধে বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। ওদের মতনই ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশে যখন আবার বোঝালাম জিমি আর আমি শুধু এক দেশ নয়, এক শহরের বাসিন্দা (বাঙ্গালী কলকাতা ছাড়লেও কলকাতা কি বাঙ্গালী কে ছাড়ে?), রীতিমতন জামাই আদর শুরু হয়ে গেল। চোখের পলকে এসে গেল হালাল-ডিসকাউন্ট, বিদেশী মুরগীদের বেলায় ফেয়ার মিটারে আড়াই প্যাঁচ মারাটা দস্তুর নয়; রীতিমতন পেন্সিল কাটার ভোঁতা ছুরি দিয়ে ঘষে ঘষে কাটাটাই নিয়ম। কিন্তু জিমির দেশোয়ালী ভাই বলে কথা, ১৫% এর বেশি ভাড়া নিল না বলেই মনে হল।

সেটা সমস্যা নয়, সমস্যা এল অন্য দিক থেকে। বাকুর এয়ারপোর্ট থেকে ডাউনটাউন মিনিট কুড়ি-পঁচিশ তো লেগেই যায়। সেই সময়ে আমার ট্যাক্সি ড্রাইভার সম্পূর্ণ নাকের জলে, চোখের জলে হয়ে গেলেন। তাঁর ঠাকুমা কিভাবে টিভির পর্দায় ডিস্কোরত জিমির মুখে হাত বোলাতে বোলাতে ‘আমার গোপাল, আমার গোপাল’ বলতেন সে আখ্যান বড় মর্মস্পর্শী। শোক থেকেই আসে ক্রোধ, সুতরাং তারপরেই বেচারী হলিউডওলাদের নিয়ে বড়ই মুখ খারাপ করলেন, আমাদের কিং খান-ও কথা প্রসঙ্গে এসে পড়লেন। কিং খান কে নিয়ে অবশ্য ক্রোধের থেকেও হাহুতাশ টা বেশী, “কাঁহা রাজা ভোজ, কাঁহা গঙ্গু তেলি”। যাই হোক, শাপশাপান্ত কমার পর আবার ব্যাক টু “হাউ গ্রীন ওয়জ মাই ভ্যালি”। যা বুঝলাম, বাড়িতে ফেস্টিভিটি লেগে থাকলেই নাকি চালানো হত ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, আর দাদু-ঠাকুমা-জেঠুর শাশুড়ী-পিসির বড় জা, এহেন সমস্ত সিনিয়র সিটিজেন হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নাচতে শুরু করতেন। আর আকাশে বাতাসে শুধুই ‘জিমি, জিমি’। ইন ফ্যাক্ট, পেটে পানি একটু বেশি পড়লে শেষের সেই মর্মন্তুদ “Jimmy, I hate you Jimmy”-সঙ্গে সবাই ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করতেন।

সেই শুরু, বাকি বাকু সফরে আর কোনো কিছু নিয়েই ভাবতে হয়নি। হোটেলওলা তো ডিসকাউন্ট দিলেনই, জিমি পুজোয় ভেট চড়াতে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি রাখলেন না, দিনে রাতে অনেক কিছু বৈধ-অবৈধ উপাচার নিয়ে আসার জন্য ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন। সেমিনার দেওয়ার আগেই ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ এলাহি খাওয়ালেন, তারপর টানাটানি দিওয়ালি পার্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। চলেই যেতাম নেহাত শেষ মুহূর্তে মনে পড়ল জিমির মতন ইলেকট্রিক কর্ড ছাড়াই ইলেকট্রিক গীটার বাজানো সম্ভব নয়। ইন ফ্যাক্ট, জিমির মতন কোনোকিছু করাই নশ্বর জীবদের সাধ্যাতীত। অমিতাভ পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে এক তলায় আসতে পারেন কিন্তু এক তলা থেকে সামারসল্ট খেয়ে পাঁচ  তলায়? ও শুধুই জিমির পক্ষে সম্ভব। আর হ্যাঁ, জিমির দয়ায় ফেরার পথে এক্সট্রা ব্যাগেজের-ও ব্যবস্থা হয়ে গেল।

তাই নেক্সট টাইম জিমিকে আঙ্গুল দিয়ে দেওয়াল ফুটো করতে দেখলেই মনে রাখবেন “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু…..ইত্যাদি।”

অথ পি-এইচ-ডি কথা

যাঁদের পি-এইচ-ডি করতে হয়নি তাঁরা আমার ঈর্ষার পাত্র এবং তাঁদের বিচক্ষণতার জন্য বেজায় শ্রদ্ধাও করি বটে। কিন্তু একটা জিনিস তাঁরা নিয্যস মিস করে গেছেন, গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের আড্ডার আসরের সেই সব হাড় হিম করা ভয়াল গপ্পো, তার কাছে কোথায় লাগে স্টিফেন কিং কিম্বা হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় (এনার ভুতুড়ে গপ্পো না পড়ে থাকলে সত্ত্বর কলেজ স্ট্রীটের চাচার ফুটপাথে দেখুন, ছেঁড়াখোঁড়া এক-দু কপি পেলেও পেয়ে যেতে পারেন।) । আর এসব গপ্পের মাহাত্ম্যই এমন যে দিল্লীর কাঠফাটা দুপুরে ৪৭ ডিগ্রীতেই পড়ুন কি উইনিপেগের মাইনাস ৪৭ এর সন্ধ্যাবেলায়, এফেক্টের তারতম্য হবে না। কুলকুল করে ঘামবেন, হার্টবিট বেড়ে যাবে আর গপ্পের প্র্যোটাগনিস্টের চরম নিয়তির কথা ভেবে থেকে থেকে শিউরে উঠবেন।

রফিক ভাইয়ের কথাই ধরুন, অনেক সাধ নিয়ে বিদেশে এসেছিলেন মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে গবেষণা করবেন বলে। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর বিশ্বব্যাঙ্কের কাদের যেন পটিয়েপাটিয়ে বিস্তর ডেটা-ফেটা যোগাড় করে ফেলে ডিপার্টমেন্টে  রীতিমতন হৈচৈ ফেলে দিলেন। উইমেন এম্পাওয়ারমেন্টের প্রোপোনেন্টদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে কিসব নতুন থিয়োরী বার করতে চলেছেন শোনা গেল, যার মোদ্দা বক্তব্য হল সবই ক্যাপিটালিস্ট চক্রান্ত। সে থিয়োরী নিয়ে আবার কমিউনিস্টদের থেকে ক্যাপিটালিস্টরা বেশী উৎসাহ দেখাতে লাগলেন। সব ঠিক, এদিকে রফিক ভাইয়ের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হচ্ছে। কিছুতেই ভাঙ্গেন না, শেষে কলেজ ইনে পাঁচ পেগের পর কেঁদে ফেললেন – অ্যাডভাইসর বলেছেন বেলম্যান ইকুয়েশন চাই-ই চাই, অন্য কোনো কিছুতে হবে না। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক লোন দেবে কি দেবে না, লোকে টাকা চাইবে কি চাইবে না, ইউনুস সাহেব নোবেল পাবেন কি পাবেন না সবই ডিপেন্ড করছে ওই বেলম্যানের ওপর। বললে বিশ্বাস করবেন না, দু বছরের কোর্সওয়ার্ক শেষ করার পর ঝাড়া আরো পাঁচটি বছর লাগল ওই বেলম্যান ইকুয়েশন নামাতে। তদ্দিনে গ্রামীণ, মাইক্রো এসব আধা শব্দ শুনলেই রফিক ভাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছেন , তার ওপর ব্যাঙ্ক আর ক্রেডিট নিয়েও লোকে কথা বলবে ওনার সামনে এ ভাবাই যায় না।

সন্দীপন আবার কাশ্মীর নিয়ে ভাবছিল বহুদিন ধরেই, পলিটিক্যাল ইকোনমি রিলেটেড রিসার্চ। ওর সুপারভাইসর আবার বয়সে নবীন, প্রবল উৎসাহ এবং প্রায়ই সন্দীপনকে পাব-এ নিয়ে যান গবেষণায় উৎসাহ পাবে বলে। কি বলব মশাই, এত ভালো একটা সম্পর্ক কেটে গেলে শুধু একটা গামার জন্য। গামা বুঝেছেন তো, সেই দু-হাত তুলে নৃত্যরত গ্রীক অক্ষর। কাশ্মীরের সঙ্গে গ্রীসের যদিও একটা বেশ প্রাচীন সম্পর্ক আছে, সন্দীপনের গামা কিন্তু সে নিয়ে কিছু বলছে না। গামা নেহাত-ই একটা প্যারামিটার, সন্দীপনের বক্তব্য ওটার ভ্যালু  ১/২ এর বেশী হলেই পাকিস্তানী অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়বে ভারতে। সুপারভাইসর বলছেন – অসম্ভব, ১/৪ এর থেকে সামান্য কম ভ্যালু নিলেই ভারত এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে যে পাকিস্তান দূরস্থান, চায়না অবধি কিছু করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ওর সঙ্গে যদি আবার আলফা প্যারামিটার টা ২ এর বেশী হয়ে যায়, দলাই লামা কিছু একটা বক্তব্য রাখতে পারেন। সে সাঙ্ঘাতিক ভজকট ব্যাপার, মোদ্দা কথা হল গামা নিয়ে এই গজকচ্ছপের লড়াইয়ে সন্দীপনকে ইউনিভার্সিটি তো চেঞ্জ করতে হলই, এখন শুনছি কাশ্মীর ছেড়ে নন্দীগ্রামের দিকে মন দিয়েছে। পি-এইচ-ডি এখনো শেষ হয়নি কারণ ল্যাম্বডার এস্টিমেট টা কিছুতে মেলাতে পারছে না। মডেল স্পষ্টতই বলছে ল্যাম্বডা ০.৫ আর ০.৭ এর মধ্যে থাকলেই নন্দীগ্রামে কিষনজীর পারম্যানান্টলি ঢুকে পড়ার কথা, এদিকে ওটা ০.৫৫ হলেই রাজ্যে পরিবর্তন সুনিশ্চিত। বোধহয় বাউন্ডারী কন্ডিশন ঢোকাতে ভুলে গেছে, কে জানে।

তবে সব থেকে ভয়াবহ গল্পের নায়ক ছিল অনির্বাণ দা। মেক্যানিকাল এঞ্জিনীয়ারিং পাস করে বহুদিন ধরে ভাবছে ইউ-এস-এ তে আসবে, জি-আর-ই দিয়ে রেডী। এমনকি ক্যোম্পানির কাজে ঘুরতে এলেই ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ভিসিট দিয়ে বেড়াত ; খালি ফান্ডিং আর আসে না, ওয়াল স্ট্রীট পুরো জ্বালিয়ে রেখে দিয়েছে। যাই হোক, একদিন ফান্ডিং এল, আমেরিকার দক্ষিণপ্রান্তের এক ইউনিভার্সিটি থেকে। যিনি টাকা দেবেন, তিনি এক বছরের বেশী দিতে পারবেন কিনা সেটা বলতে পারছেন না, তবে কন্টিনিউ করার ভালোই চান্স আছে। অনির্বাণ দাকে আর কে পায়, দমদমে মাসি-পিসি-হবু শাশুড়ী সবাইকে কাঁদাতে কাঁদাতে চলে তো এল। এসে শুনল বায়োমেক্যানিকাল ল্যাবে ওর কাজ। ল্যাব ঘুরতে গিয়ে দেখে হরি হরি, ল্যাব কোথায়? এ তো আস্তাবল! মানে সত্যিই আস্তাবল, তিন চার খানা তাগড়াই ঘোড়া ওকে দেখেই নাকি ভারী খুশী হয়ে তাকিয়েছিল। সকালবেলা এই অবধি শুনে বেরিয়ে গেছিলাম। রাত্রে ফিরে দেখি ঘরে আক্ষরিক অর্থে পিনড্রপ সাইলেন্স। কৌস্তভ আর মনপ্রীত দুজনেই বাডওয়েইসারের দিব্যি গেলে বলল অনির্বাণ দা কে নাকি ফুঁপিয়ে কাঁদতেও দেখেছে। একটু দোনোমনো করছিলাম, এমন সময় দেখলাম নিজেই বেরিয়ে এল। এক হাতে রিটার্ন টিকেটের প্রিন্টআউট, আর এক হাতে ওর অ্যাডভাইসরের দেওয়া প্রোজেক্ট প্রোপোসাল। নিজের চোখে দেখলাম সেই প্রোজেক্টের টাইটল – Stallion Semen Cryopreservation : thaw protocol and its relation to fertility, ঘোড়াদের ওকে দেখে খুশী হওয়ার দস্তুরমতন কারণ আছে বই কি!

ও  হ্যাঁ, তনভী-র গল্পটা তো মাস্ট! বেচারী ওর পোটেনশিয়াল অ্যাডভাইসরের কুকুরকে ‘she’র জায়গায় ‘it’ বলে ফেলেছিল। তারপর? যাকগে পরে কোনো একদিন, এর থেকে বেশী ভয় একদিনে না দেখানোই ভালো।