ডাকিনী ও সিদ্ধপুরুষ

(বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয় থেকে তিব্বতে যাওয়ার পথে অতীশ দীপঙ্করকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল একাধিক অতিলৌকিক রহস্যর, সেসব গল্পের খোঁজ হয়ত ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’র পাঠকরা ধীরে ধীরে পাবেন। আজকে রইল প্রথম উপাখ্যানটি, ছাপার অক্ষরে এটি প্রথম বেরোয় ‘টগবগ’ পত্রিকার সরল দে সংখ্যায় (২০১৬)। সঙ্গের অনবদ্য ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী সুমিত রায়। )

tb-dakini-1

এক

জয়শীল কটমট করে তাকালেন, “কী নাম বললি? বায়চং?”

বায়চং হাতে ধরা কমলা লেবুটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।

“ফের মিথ্যে কথা। এই ছোঁড়া, এই, তাকা এদিকে”।

বায়চং জয়শীলের দিকে মুখটা ঘোরাতে দেখা গেল ওর কপালটা বেশ ফুলে রয়েছে, একটা স্পষ্ট কালশিটে দাগও দেখা যাচ্ছে। সেই দেখে বীরভদ্র মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন, “দেখেছেন কান্ড! আহা রে, কোন পাষন্ড দুধের শিশুটাকে এমন করে মেরেছে”।

জয়শীল কড়া গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কালশিটে দেখে তিনিও এখন থেমে গেলেন। বীরভদ্রকে বললেন, “তাঁবুর মধ্যে ওষুধ আছে। দাঁড়ান, নিয়ে আসি”।

জয়শীলকে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে বায়চং-ও গুটি গুটি পায়ে সেদিকেই রওনা দিচ্ছিল। ওর ছেঁড়া কামিজের খুঁট ধরে বীরভদ্র আটকালেন, “সত্যিই তোর নাম বায়চং?”

বায়চং পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বলল, “হুঁ, আর আমার বোনের নাম ডেকি”।

“বোঝো! তোর বাবা মা কেমনতর নাম দিয়েছে রে? ছেলের নাম ছেলে আর মেয়ের নাম মেয়ে?”

“আমার বাবা মা নেই তো”, বলেই চুপ কর গেল বায়চং।

বীরভদ্রও শুনে চুপটি করে বসে রইলেন, খেয়াল রইল না হাতের মগে মাখন চা ঠান্ডা হয়ে আসছে। অনেক অনেক দূরে লাংটাং পাহাড়ের চুড়োয় সোনা রঙ ধরতে শুরু করেছে। কতদিন পর গাঢ় কুয়াশার বদলে মিঠে রোদ দিয়ে দিনটা শুরু হল, কিন্তু মনটা কিরকম চুপসে রয়েছে।

জয়শীল এদিকে তাঁবুর মধ্যে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে “সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বোমানাংসি জানতাম্, দেবাভাগং যথা পূর্বে সং জানানা উপাসতে”। জয়শীল বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে সংস্কৃত চর্চা করেছেন, যিনি স্তোত্রপাঠ করছেন তাঁর কাছেই বেদ – বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করেছেন। এ স্তোত্রের মানে তাই তিনি জানেন – সবাইকে একসঙ্গে চলতে বলে হচ্ছে, বলা হচ্ছে একই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে।

“ভালো হোক, মঙ্গল হোক, শান্তি বিরাজ করুক”, বলতে বলতে জয়শীলের গুরু বেরিয়ে এসেছেন। এই কথাগুলোর মানে জয়শীল অনেকদিন বুঝতে পারতেন না। এ ভাষা গুরুর মাতৃভাষা। বিক্রমশীলেরও পূর্ব দিকে তাঁর দেশ, সেখানেই নাকি এ ভাষায় মানুষে কথা বলে, সে ভাষার নাম বাংলা। জয়শীল অভ্যস্ত না হলেও বাংলা ভাষা শুনতে তাঁর বেশ লাগে। বীরভদ্রও প্রায়ই বলে থাকেন এ ভাষার মাধুর্যের কথা।

জয়শীল মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন, “সুপ্রভাত”।

দীপঙ্কর মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন, এতদিনে বকাঝকার ফল পাওয়া গেছে। জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই দীপঙ্করকে দেখলেই ‘প্রভু’ না লাগিয়ে কথা বলতেন না। বীরভদ্র তো বিক্রমশীলায় কতবছর ধরে তাঁর কাছে বৌদ্ধশাস্ত্রের পাঠ নিয়েছেন, প্রভু বলার বদ অভ্যাসটা বেশ চলে গেছিল। দীপঙ্করকে তিব্বতে নিয়ে যাবেন বলে জয়শীল আসা মাত্রই জয়শীলের দেখাদেখি বীরভদ্রও আবার প্রভু বলতে শুরু করেছিলেন। শেষে খানিকটা বাধ্য হয়েই তাঁকে বলতে হয়েছে ফের প্রভু ডাক শুনলে নেপাল মাঝরাস্তা থেকেই ফের বিক্রমশীলার দিকে রওনা দেবেন।

“সুপ্রভাত জয়শীল, রোদ দেখে মন ভালো হয়েছে তো?”

“আপনি যেদিন জানিয়েছিলেন যে আমাদের সঙ্গে তিব্বতে আসবেন সেই দিন থেকেই আমার মনে অসীম সুখ, এক দিনের জন্যও তাতে বাধা পড়েনি”।

দীপঙ্কর জানেন এ শুধু ভক্তির প্রলাপ নয়, জয়শীল হৃদয় থেকে কথাগুলো বলছেন। এত ভালোবাসাকে তিনি তো ছাড়, স্বয়ং বুদ্ধও ফেরাতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।

জয়শীল বিনীত স্বরে বললেন, “কিন্তু প্রভু, আজ সকালে একটা সমস্যা এসে উপস্থিত হয়েছে”।

“জয়শীল!”

ভুল বুঝতে পেরেই জয়শীল করুণ গলায় বললেন, “ক্ষমা করুন।কিন্তু ভাববাচ্যে সম্বোধন করা এখনো ঠিক আয়ত্তে আসেনি”।

দীপঙ্কর রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন, “আচ্ছা, বলো বলো। আজ আবার কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছ তুমি?”

জয়শীল জানালেন সকাল সকাল তাঁদের ঘোড়াদের ঘাস দিতে গিয়ে দেখেন একটি বাচ্চা ছেলে, বছর ছয় কি সাত তার বয়স, ঘোড়াদের জন্য রাখা একটা খড়ের গাদায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে। সে কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে কিছুই বলছে না, অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর শুধু জানিয়েছে তার নাম বায়চং। জয়শীল ওকে একটা লেবু আর চা দিয়েছেন, কিন্তু সে মুখে কিছুই তুলছে না”।

“আমার ধারণা নামটাও বানানো। বায়চং মানেই ছোট ছেলে, বানানোর সময় মাথায় আর কিছু আসে নি তাই ওই শব্দটাই বলে দিয়েছে”।

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “নাও হতে পারে। পাহাড়ি গ্রাম, সব থেকে কাছের ছোট শহরটায় যেতে হলেও হয়ত পাঁচ ছ দিন ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে। নাম রাখাটাই বাহুল্যের ব্যাপার এদের কাছে”।

জয়শীল একটু ইতস্তত করে বললেন, “আর…আর ছেলেটির শরীরে নির্যাতনের কিছু চিহ্ন আছে”।

“সে কি কথা!”, দীপঙ্কর চমকে উঠলেন, “কে মেরেছে কিছু বলেছে নাকি?”

“না প্রভু, আমি ওর কপালের কালশিটে দেখেই দৌড়ে এসেছি ওষুধ নিয়ে যেতে। বীরভদ্র অবশ্য আছেন ছেলেটির সঙ্গে”।

দীপঙ্কর এতই চিন্তায় পড়ে গেছেন যে জয়শীলের ‘প্রভু’ ডাকটি আর কানে পৌঁছল না।

জয়শীলকে নিয়ে দীপঙ্কর ছেলেটিকে দেখার জন্য চললেন। মাঝরাস্তাতেই বীরভদ্রদের সঙ্গে দেখা, বীরভদ্র ছেলেটির হাত ধরে এদিক পানেই নিয়ে আসছেন।

দীপঙ্করকে দেখা মাত্র একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। ছেলেটি বীরভদ্রের হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে তীরবেগে দীপঙ্করের পায়ে এসে লুটিয়ে পড়ল। জয়শীল বা দীপঙ্কর হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই সে প্রাণপণে দীপঙ্করের পায়ে মাথা ঠুকতে লাগল।

জয়শীল বীরভদ্রের দিকে তাকালেন। দুজনেই স্তম্ভিত, কি বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। বীরভদ্র গলাটা একটু খাঁকরিয়ে বললেন, “আপনি চলে আসার কিছুক্ষণ পর থেকেই এমন ফোঁপাতে শুরু করল ভাবলাম এদিকেই নিয়ে আসি”।

দীপঙ্করের চোখও ভিজে এসেছে। তিনি বায়চংকে মাটি থেকে তুলে ধরেছেন। ওর মাথায়, কপালে হাতে বোলাচ্ছেন।

বায়চং এর চোখের জল থামছে না মোটেই। সে অস্ফূট স্বরে বারবার কি যেন কথা বলে চলেছে।

জয়শীল বায়চংকে ভোলাবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, শুনলেন ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলে চলেছে “ঠাকুর, তুমি আমার বোনকে এনে দাও”।

দীপঙ্করও শুনতে পেয়েছেন।

বায়চং কে কোলে তুলে নিয়ে তিনি তাঁবুর দিকে রওনা দিলেন, পেছনে জয়শীল এবং বীরভদ্র।

 

দুই

জয়শীল একটু চিন্তিত স্বরে বললেন, “আমাদের সঙ্গের লোকেরা সবাই এগিয়ে গেছে। এখন বায়চং এর গ্রামে ফেরত গিয়ে ওকে দিয়ে আসতেই তো দিন দুই লাগবে। তারপর আবার এই এক পথে ফেরা। মানে কম করে চারটে দিন নষ্ট।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে জয়শীলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সে সামান্য কিছু খাবার খেয়ে এখন ঘুমোচ্ছে। বায়চং এর কামিজটা খোলার পরে দেখা গেছে তার পিঠেও অসংখ্য কালচে লাল দাগ।

“আমরা যখন ওদের গ্রাম থেকে রওনা দিই তখনই তাহলে আমাদের পিছু পিছু এসেছে।“, বীরভদ্র নিজের মন্ডিত মুস্তকে হাত বোলাচ্ছিলেন, চিন্তায় পড়েছেন তিনিও।

দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকালেন, “আমরা কিন্তু এসেছি ঘোড়ায় চড়ে। অতটুকুন ছেলে নিশ্চয় ঘোড়ায় চড়তে পারে না। আর ঘোড়া পাবেই বা কী করে?”

“তাই তো”, বীরভদ্র তড়িঘড়ি উঠে বসলেন…… “তাহলে কি, তাহলে কি…”

মাথা নাড়লেন দীপঙ্কর, “হ্যাঁ, ও কারোর সঙ্গে এসেছে। কিন্তু কে সে? আর আমাদের সামনে সে দেখাই বা দিচ্ছে না কেন?”

জয়শীল বললেন, “ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখা যাক”।

হাত ওঠালেন দীপঙ্কর, “থাক্ জয়শীল, ওকে ঘুমোতে দাও। ওর শরীরের অবস্থা দেখেছ? শুধু এই দু’দিনের পরিশ্রমে নয়, বহুদিনের নির্যাতনে ও অবসন্ন। বরং এখনো অবধি ও আমাদের যা বলেছে সেটুকু নিয়ে ভাবা যাক”।

বীরভদ্র বললেন, “ওর বোনকে কোনো ডাইনীবুড়ি ধরে নিয়ে গেছে, এটুকুই তো শুধু বলেছে। ডাইনীবুড়ি, অ্যাঁ?”

দীপঙ্কর উঠে পায়চারি করছিলেন। বীরভদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সব কথা যে ওর মুখ থেকেই বেরোবে তা তো নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা অনুক্ত থাকে, বুদ্ধি খাটিয়ে শুনে নিতে হয়”।

এবারে বীরভদ্র একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। জয়শীলের দিকে আড়চোখে তাকালেন, জয়শীলও মাথা নাড়ছেন, বোঝেন নি।

“দেখো, ও নিজের চোখে দেখেছে কেউ বা কারা ওর বোনকে ধরে নিয়ে গেছে। সে ডাইনী কি অন্য কিছু সে প্রশ্নে এখন যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু কথাটা হল নিজের চোখে দেখেছে মানে তখন ভাই বোন একসঙ্গেই ছিল। তাই যদি হবে, শুধু মেয়েটিকেই ধরে নিয়ে গেল কেন?ওকেও তো ধরতে পারত”।

বীরভদ্র ঘন ঘন মাথা নাড়তে লাগলেন, দীপঙ্কর খাঁটি কথা বলেছেন। অবশ্য সর্বদাই তাই বলে থাকেন।

জয়শীলের মনে অবশ্য শান্তি নেই। বহু বছরের সাধ্যসাধনার ফলে দীপঙ্কর তিব্বতে যেতে রাজি হয়েছেন। যতক্ষণ না দীপঙ্করকে নিয়ে তিব্বতের রাজদরবারে হাজির হচ্ছেন জয়শীলের মনে শান্তি নেই। এমনিতেই বিপদসংকুল পথ, তারপর দীপঙ্কর নিজের মতন করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে চলতে চান। ফলে জনা পঁয়ত্রিশ সহচরকে আগে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। এমনিতেই দুশ্চিন্তার শেষ নেই, তার ওপর এই উটকো ঝামেলা।

দীপঙ্কর জয়শীল কি ভাবছেন সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন। জয়শীলকে বললেন, “গুরু কলপের কথা শুনিয়েছিলাম না তোমাকে। সবাই যখন তাঁকে পাগল বলে খেপাত, কলপ বিড়বিড় করে কী বলতেন মনে আছে?”

জয়শীল নতমস্তকে ঘাড় নাড়লেন, “আত্ম ও পর এই দ্বৈতভাব থেকেই জন্ম হয় দুঃখের”। জয়শীলের মুখটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, “আমি আসলে……”।

“তোমার চিন্তা নেই জয়শীল। তিব্বতে আমরা ঠিকই পৌঁছব, জ্ঞানের চর্চা ঠিকই শুরু হবে। কিন্তু পথের মানুষকে না চিনে গেলে সে জ্ঞানে কি লাভ বলো তো?”

জয়শীল পালাতে পারলে বাঁচেন, এমন সময় বীরভদ্র একটু গলা খাঁকারি দিলেন। জয়শীল এবং দীপঙ্কর বীরভদ্রের দিকে তাকাতে তিনি ইশারায় বিছানার দিকে দেখালেন।

বায়চং উঠে বসেছে, এক দৃষ্টিতে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

দীপঙ্কর ওর পাশে বসে মাথায় হাত দিলেন।

“এবার আমরা যাব বায়চং, তোমার বোনকে ফিরিয়ে আনতে”।

বায়চং এর চোখ ঝিকমিকিয়ে উঠল, পারলে তখনই দৌড়ে বেরোয়।

দীপঙ্কর ওকে শান্ত করে পাশে বসালেন, কিছুক্ষণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কে মেরেছে তোমাকে?”

বায়চং যেন একটু ঘাবড়ে গেল। সবার দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে দীপঙ্করকেই প্রশ্ন করল, “মেরেছে?”

“হ্যাঁ। তোমার কপাল, পিঠে এই দাগগুলো কে করে দিয়েছে?”

“কেউ না”।

জয়শীল বীরভদ্রের কানে কানে বললেন, “নাম বলতে ভয় পাচ্ছে বোধহয়”। বলেই বায়চং এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় কি তোমার? নিশ্চিন্তে বলো, কে মেরেছে তোমাকে”।

বায়চং এর সেই এক কথা, “কেউ না”।

জয়শীল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, দীপঙ্কর হাত তুলে থামালেন। ওর কপালের কালশিটে দাগটিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “তাহলে এই দাগটা হল কী করে?”

দীপঙ্করের কথায় বায়চং এর যেন খেয়াল হল। আপন মনে ফুলে যাওয়া জায়গাটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ওহ, ওটা? চোন ডুই…”।

“চোন ডুই কে?”

“চোন ডুই? চোন ডুই আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে থাকি যে”।

বীরভদ্র এবারে কৌতূহলী হয়ে বললেন, “তোমার বন্ধু তোমাকে মেরেছে?”

“না মারেনি তো। ও যে কাঠের তক্তা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল”।

বীরভদ্র আরো অবাক, “আর তুমি? তুমি কী করছিলে?”

“আমি তাতে মাথা ঠুকছিলাম”।

দীপঙ্করও হতবাক। বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি কাঠের তক্তায় মাথা ঠুকছিলে? কেন?”

“সব্বাইকে ঠুকতে হয় ”।

দীপঙ্কর তাঁর শিষ্যদের দিকে তাকালেন, তাঁরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জয়শীল একটু অস্থির গলায় বললেন, “ঠুকতে হয় মানে? কেন ঠুকতে হয়? কে ঠুকতে বলে?”

এত প্রশ্ন শুনেই কি কে জানে, বায়চং এর মুখে কথা নেই।

দীপঙ্কর আরো একবার জয়শীলকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পিঠে যেরকম দাগ আছে, চোন ডুই এর পিঠেও সেরকম দাগ আছে বুঝি?”

বায়চং এর মুখে এবার হাসি ফুটল। “তুমি জানো? আছে তো। আমিই করে দিয়েছি তো আমার চামড়ার টুকরো দিয়ে, আমার চামড়ার টুকরোয় চোন ডুই এর চামড়ার টুকরোর থেকেও জোরে আওয়াজ হয়”।

দীপঙ্করের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হচ্ছিল, আর কিছু না বলে তিনি উঠে পড়লেন। “জয়শীল, এবারে বেরিয়ে পড়া দরকার। আর বায়চং তোমার সঙ্গে থাকবে”।

জয়শীল আর বীরভদ্র ঘোড়াগুলিকে নিয়ে আসতে গেলেন, দীপঙ্কর বায়চংকে নিয়ে তাঁবুর বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঘোড়াতে ওঠার আগে দীপঙ্করের মনে হল বায়চং এর চোখ দুটো যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তিন

বায়চং এর গ্রামে দীপঙ্কররা দু’দিন আগেই রাত কাটিয়ে গেছিলেন। গাঁওবুড়ো তো বটেই, গ্রামের বাকি লোকেরাও প্রচুর যত্নআত্তি করেছিল। এইবার কিন্তু গ্রামে পৌঁছে আবহাওয়াটা অন্য রকম লাগল। চট্ করে কেউ সামনে আসতে চাইছে না, অথচ দু’দিন আগেই দীপঙ্করকে প্রণাম করার জন্য চড়াই উতরাই জুড়ে সার দিয়ে অপেক্ষা করছিল লোকেরা। গাঁওবুড়ো তো বায়চংকে দেখে এই মারে কি সেই মারে। বায়চং তাতে আরো ভয় পেয়ে জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। দীপঙ্কর ক্রোধান্বিত হচ্ছেন বুঝতে পেতে গাঁওবুড়ো বায়চং এর গায়ে হাত তুলল না বটে কিন্তু সমানে গজগজ করে যেতে লাগল।

দীপঙ্কর গাঁওবুড়োকে ইশারায় ঘরের মধ্যে ঢুকতে বললেন।

“আপনি কী জানেন এর বোন কোথায়?”

গাঁওবুড়ো মহা বিরক্ত হয়ে তাকাল বায়চং এর দিকে, তারপর দীপঙ্করকে বলল, “কী বলি বলুন, এই ছেলে মেয়ে দুটো দিন রাত্তির টোটো করে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝেই কোথায় কোথায় রাত কাটিয়ে আসে, খবর পাওয়া যায় না। ওদের মামা আমাকে দিন চারেক আগে বলেছিল বটে মেয়েটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে খবর পেয়ে আমি জনা কয়েক জোয়ানকে পাঠিয়েছিলাম খুঁজে দেখতে, তারাও কিছু পায়নি। পাহাড়ের রাজ্য, ভয় হচ্ছে কোনো খাদে না পড়ে গিয়ে থাকে”।

বীরভদ্র বলে উঠলেন, “ও যে বলছিল ডাইনি ধরে নিয়ে গেছে”।

গাঁওবুড়ো আকাশ থেকে পড়ল, “ডাইনি? না না, আমাদের গ্রামে ওসব কিছু নেই”। বলতে বলতে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে বায়চং এর গাল, “তুই হতভাগা কী গল্পকথা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিস রে?”

দীপঙ্কর এবার গাঁওবুড়োর হাতটা ধরে ফেলেছেন, কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন।

গাঁওবুড়ো চোখ নামিয়ে নিল, বায়চংকেও আর কিছু বলল না।

দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাদের জন্য আর একটা রাত থাকার বন্দোবস্ত করতে পারবেন?বায়চংকে আমরা কথা দিয়েছি ওর বোনকে ফিরিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব, তাই অন্তত কাল বিকাল অবধি থাকাটা প্রয়োজন”।

“অবশ্যই, অবশ্যই”, মাথা নাড়তে লাগল গাঁওবুড়ো।

এবারে যদিও দীপঙ্করকে দেখতে লোকজন ভিড় করে আসেনি, দীপঙ্কর তাও চাইছিলেন লোকজনে মুখোমুখি না হতে। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে বায়চং আর জয়শীলকে নিয়ে তিনি বেরোলেন। বায়চং বলেছে বিকালসন্ধ্যা নাগাদ দুই ভাইবোনে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল, সেই সময়েই নাকি ডেকিকে অপহরণ করা হয়েছে।

দীপঙ্করদের আস্তানাটা গাঁওবুড়োর বাড়ির পিছনেই। বায়চং এর মামা সারা দিন কোনো খবর নিতে আসে নি, দীপঙ্কর তাও বীরভদ্রকে বলে গেলেন মামা এলে যেন দীপঙ্কররা ফিরে আসা না পর্যন্ত তাকে বসিয়ে রাখা হয়।

পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন দীপঙ্কররা, পাশেই অতল খাদ। একটু দূরে তাকালেই মেঘ আর কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। ক্রোশখানেক হাঁটার পর দেখা গেল রাস্তাটা আচম্বিতেই অতি সরু হয়ে পাহাড়ের পাশ দিয়ে বেঁকে গেছে, যার ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই খাদের মুখের শুরু। বায়চং জয়শীলের হাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরে চেপে দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপঙ্কর কিছুটা এগিয়ে গেছিলেন, পেছনে পায়ের আওয়াজ না পেয়ে ফিরে এসে দেখলেন বায়চং আর এক পাও নড়ছে না।

“এখান থেকেই তোমার বোনকে নিয়ে গেছে, বায়চং?” প্রশ্ন করলেন জয়শীল।

“হ,হ্যাঁ”, বায়চং এর গলাটা কাঁপছে।

জয়শীল আরো কয়েকটা প্রশ্ন করার পর বোঝা গেল যে মুহূর্তে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে এসে এই বাঁকের মুখে বায়চং আর ডেকি পৌঁছয় তখনই বায়চং এর ডাইনি ডেকিকে তুলে নিয়ে যায়।

এবারে দীপঙ্কর জিজ্ঞাসা করলেন, “তুলে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং চুপ, কোনো উত্তর নেই।

“তুমি দেখতে পাওনি?”

মাথা নাড়ে বায়চং, দেখতে পেয়েছে।

“তাহলে বলো, ডেকিকে নিয়ে কোনদিকে গেল সে?”

বায়চং এর তর্জনী আস্তে আস্তে উঠছে, তার আঙ্গুল এখন সোজা খাদের দিকে ধরা।

জয়শীল হতভম্ব হয়ে বললেন, “এর অর্থ কী? ডাইনি মেয়েটি কে নিয়ে সোজা খাদে নেমে গেছে?”

দীপঙ্করের কপালে চিন্তার ভাঁজ, “তুমি ঠিক দেখেছ বায়চং? খাদের দিকেই গেছিল সে?”

বায়চং মাথা দোলায়, সে ঠিকই দেখেছে।

জয়শীল দীপঙ্করের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন, “যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলি। ছেলেটি স্পষ্টতই কল্পনার রাজ্যে বাস করছে”।

দীপঙ্কর কিছু উত্তর না দিয়ে খাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। জয়শীল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় পাহাড়ের ওদিক থেকে একটা গুঞ্জন শোনা গেল। তারপরেই পাহাড়ের বাঁক ধরে সারি ধরে বেরিয়ে আসতে লাগল এক দঙ্গল ছেলে, তারা সবাই কাঠ কুড়িয়ে ফিরছে, একসঙ্গে বলে চলেছে, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”। বায়চং তাড়াতাড়ি রাস্তা তাদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দীপঙ্করের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জয়শীল দেখলেন দীপঙ্করের মুখে হাসি ফুটে উঠছে।

সবার শেষে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বয়সের একটি ছেলে। বায়চং তাকে দেখতে পেয়ে ‘চোন ডুই’ বলে ডেকে উঠল। চোন ডুই কিন্তু একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল। বায়চং তাতেও দমেনি, দৌড়ে তার কাছে যাওয়া মাত্র চোন ডুই ধাক্কা মেরে ফেলে দিল বায়চংকে।

ছেলেরা চলে গেছে। বায়চং জয়শীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে কাঁদছে। দীপঙ্করের মুখের হাসিও অনেকক্ষণ মিলিয়ে গেছে। দীপঙ্কর পাহাড়ের বাঁকের কাছে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছেন বারবার। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, “পাহাড়ের ওদিকে আরেকটু হাঁটলেই গভীর জঙ্গল। ছেলেরা বোধহয় জঙ্গল থেকেই কাঠ কুড়িয়ে আনছিল”।

জয়শীল বললেন, “এখন তবে কী করণীয়?”

“চলো ফেরা যাক”, বলতে বলতে হঠাৎ থেমে বায়চংকে প্রশ্ন করলেন, “ডাইনি কী পরে ছিল মনে পড়ছে তোমার?”

“কালো…কালো…”, বলতে বলতে যেন একটু শিউরেই উঠল বায়চং।

দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেখা গেল, দীপঙ্কর ঠিকই অনুমান করেছিলেন। ওনারা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই বায়চং এর মামা লোসাং এসে উপস্থিত, বীরভদ্র দীপঙ্করের নির্দেশ মতন বসিয়েই রেখেছেন তাকে। মামা অবশ্য একা নয়, সঙ্গে একটি বন্ধুও আছে।

বন্ধুটি বেশ বলিষ্ঠ প্রকৃতির, তবে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতন তার বেশভূষা এবং মাথাটিও সম্পূর্ণ ভাবেই মুন্ডিত। দীপঙ্করকে দেখেই সে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

“জয়স্তু”, দীপঙ্কর দুজনকেই আশীর্বাদ প্রদান করে আসন গ্রহণ করলেন।

“আপনার ভাগ্নীর কোনো সন্ধান পেলেন?”

বায়চং এর মামার মুখে স্পষ্টতই একটি বিষণ্ণতার ছাপ পড়ল। মামার বন্ধু দেচানও হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল, “নাহ, বহু খোঁজাখুঁজি করেও কিচ্ছুটি পাওয়া গেল না। আমাদের মনে হচ্ছে হয়ত পা ফসকে কোনো খাদেই পড়ে গেছে সে”।

দীপঙ্কর এক দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দেচানের কথা শেষ হওয়ার পর শুধোলেন, “কিন্তু বায়চং কী বলছে সে কথা কি আপনি জানেন?”

“না তো, কী বলছে সে?” অবাক হয়ে বায়চং এর দিকে তাকাল লোসাং।

বায়চং মাথা নিচু করে বসে, লোসাং এর প্রশ্ন তার কানে ঠিকই গেছে কিন্তু মাথা তুলছে না।

দীপঙ্কর বললেন, “থাক্, আমিই বলছি। বায়চং এর বক্তব্য ওর বোনকে কোনো ডাইনি এসে নিয়ে গেছে”।

“ডাইনি?” দু বন্ধুই খুব অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় হেসে উঠল। লোসাং বলল, “প্রভু, আপনি যাওয়ার আগে ওকে ভালোমতন শিক্ষা দিয়ে যান। বলে যান ডাইনি বলে কিছু হয় না”।

দীপঙ্কর কিছু না বলে চুপ করে রইলেন।

লোসাং হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আমরা তাহলে এখন আসি?”

“আসুন”।

দেচান বায়চং কে নিয়ে যাবে বলে হাত বাড়াচ্ছিল, দীপঙ্কর নরম গলায় বললেন, “ও যদি আজকের রাতটা আমাদের কাছে থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা আছে? আমরা কাল বিকালেই চলে যাব। তার আগে যদি ওর কাছ থেকে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায়”।

লোসাং নিজে কিছু না বলে দেচানের দিকে তাকাল। দেচান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আসলে গত চার দিন ধরে ও শিক্ষামন্দিরে আসছে না, তাই ওকে আজ নিয়ে যেতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি যখন বলছেন, তখন থাক্ না হয়”।

দীপঙ্কর ঈষৎ বিস্মিত হয়ে দেচানকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি শিক্ষক?”

“হ্যাঁ, এই গ্রামের ছেলেদের আমরা অতি অল্প বয়স থেকেই বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র নিয়ে শিক্ষা দিতে থাকি”।

বীরভদ্র ভেবেছিলেন দীপঙ্কর হয়ত খুশি হয়ে বিশদে জানতে চাইবেন, কিন্তু দীপঙ্কর আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।

দেচান আর লোসাং বেরিয়ে যেতে দীপঙ্কর বীরভদ্রদের বললেন, “তোমরা থাকো। আমি দেখি গাঁওবুড়োর বাড়িতে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা”।

জয়শীল তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “আপনি কেন যাবেন! আমি যাই?”

দীপঙ্কর বললেন, “না, তোমরা থাকো। গাঁওবুড়োর সাথে আমার কিছু কথা আছে”।

চার

গাঁওবুড়ো বাড়ি ছিল না কিন্তু তার বউ দীপঙ্করকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠল। দীপঙ্করের বহু বারণ সত্ত্বেও গরম জলে পা ধুইয়ে তাঁকে এনে বসাল অতিথিকক্ষে। দীপঙ্কর যতই বলেন, “মা, আপনি ব্যস্ত হবেন না” সে ততই অস্থির হয়ে পড়ে দীপঙ্করকে কি ভাবে সেবা করা যায় সেই ভেবে। দীপঙ্কর খাবারের সন্ধানে এসেছেন শুনে বুড়ি তড়িঘড়ি শাম্পা (যবের পরিজ), থেংথুক (একরকম সুপ), নানারকম ফল আরো কত কি নিয়ে হাজির।

এলাহি বন্দোবস্ত দেখে দীপঙ্কর যারপরনাই বিব্রত হলেন। হাতজোড় করে বললেন, “মা, আমরা সন্ন্যাসী মানুষ। এত খাবারের প্রয়োজন নেই”।

গাঁওবুড়োর বউয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, বলল “আপনাকে আর একটা দিন সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। দয়া করে বঞ্চিত করবেন না”।

দীপঙ্কর হতাশ হয়ে জয়শীলকে ডেকে আনবেন বলে উঠতে যাচ্ছেন এমন সময়ে বুড়ি জিজ্ঞাসা করল, “বাবা, মেয়েটিকে সত্যিই কী ডাইনি নিয়ে গেছে?”

দীপঙ্কর একটু অবাক হয়ে তাকালেন। “সে কথা এখনো জানি না মা, কিন্তু আপনার স্বামীই তো বলছিলেন এ গ্রামে কখনো কোনো ডাইনি ছিল না”।

বুড়ি চোখ মুছে বলল, “আছে বাবা, ডাইনি আছে। আমার কথা এরা কেউ বিশ্বাস করবে না কিন্তু আমি জানি ডাইনি আছে”।

“আপনি জানেন ডাইনি আছে?” দীপঙ্কর বেশ জোর দিয়েই প্রশ্নটা করলেন।

“হ্যাঁ, সেই যে আমার কোল খালি করে দিয়ে গেছে”। বুড়ির চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে পড়তে লাগল।

দীপঙ্কর চমকে উঠেছেন, অপলকে তাকিয়ে রয়েছেন বুড়ির দিকে।

চারপাশে একটু দেখে নিয়ে গলাটা খাদে নামিয়ে বুড়ি বলল, “আমারও এক মেয়ে ছিল বাবা। আজ বছর দশেক হয়ে গেছে সে নিরুদ্দেশ। তাকে দিয়েই তো শুরু, তারপর এক এক করে আরো অনেক মেয়েকেই পাওয়া যায় নি। লোকে সবসময়ই ভাবে এরা বুঝি খাদে পড়ে মরেছে কিন্তু আমি জানি বাবা এদের সবাইকেই ডাইনি নিয়ে গেছে”।

ফিসফিস করে বলেই চলে, “আরো লোকে দেখেছে সে ডাইনিকে। কালো পোশাকে সে ভেসে বেড়ায়, কারোর সাধ্যি কি তাকে ধরে!”।

“এরা সবাই কি বাচ্চা মেয়ে? বায়চং এর বোনের মতন?”

“প্রায় সবাই, শুধু আমার মেয়েটাই বড় ছিল। তার তখনই বয়স হবে পনেরো ষোল”।

সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছিলেন দীপঙ্কর, বুড়ির পরের কথায় থেমে গেলেন। “বড় বাপন্যাওটা মেয়ে ছিল গো, আমরা তাকে মণি বলে ডাকতাম। শয়তানি ডাইনি তাকে কোথায় তাকে নিয়ে চলে গেল কে জানে। এ গাঁয়ের মেয়েদের ভাগ্যই খারাপ বাবা”।

“একথা কেন বলছেন মা?”

“কেন বলব না? এ গাঁয়ে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই দেখছি কত মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু হল”।

“অপঘাতে মৃত্যু?” দীপঙ্কর সচকিত হয়ে বসেন।

“হ্যাঁ বাবা। সে সময় দুপুরের পর থেকেই মেয়েদের রাস্তায় বেরনো বন্ধ হয়ে যেত। তাও প্রায় প্রতি দিনই খবর আসত কার মাথায় পাথর গড়িয়ে এসে পড়েছে, কে পা পিছলে খাদে পড়ে গেছে, কার ঘাড় ভেঙ্গে দিয়ে গেছে কোন অপদেবতা”।

“সেরকম অপঘাতে মৃত্যু এখন আর হয় না?”

“না এখন কমে এসেছে, কিন্তু তাতেই বা কী? এখন যে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে, ডাইনির”।

দীপঙ্কর উঠলেন, বুড়ির সঙ্গে কথোপকথনের পরে মাথাটা চিন্তায় বোঝাই হয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। ধ্যানে বসতে পারলে ভাল হত।

দীপঙ্কর বেরোচ্ছেন, আর গাঁওবুড়োও ঢুকছে। গাঁওবুড়োর ঠিক পেছনেই ছিল বায়চং এর মামা লোসাং। দীপঙ্কর আর লোসাং এর কেউই কাউকে দেখতে পাননি, ফলে দু’জনের মুখোমুখি ধাক্কায় দীপঙ্করের হাত থেকে একটি খাবারের পাত্র পড়ে গেল, ভাগ্য ভালো যে পাত্রটিতে কোনো খাদ্যবস্তু ছিল না।

লোসাং তাড়াতাড়ি সেই পাত্র কুড়োতে গিয়ে উহহ করে উঠল, মনে হল মুখোমুখি সংঘর্ষে ভালোই ব্যথা পেয়েছে সে।

দীপঙ্কর পাত্রটি কুড়িয়ে নিয়ে রওনা দিলেন। একটু চিন্তাতেই পড়ে গেলেন যেন, এত রাত্রে গাঁওবুড়ো আর লোসাং এর কিসের বৈঠক?

জয়শীল এবং বীরভদ্র দু’জনেই চিন্তা করছিলেন দীপঙ্করের দেরি দেখে, দু’জনেই হাঁফ ছেড়ে বাচলেন। বায়চং ঘরের এক কোণে চুপটি করে বসে ছিল, সেও দীপঙ্করকে দেখে উঠে এসেছে।

দীপঙ্কর বায়চং এর মাথায় হাত বুলিয়ে খাবার তুলে দিলেন।

রাতের খাওয়ার পর বীরভদ্র শোওয়ার আয়োজন করছেন এমন সময় মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। কুকুরের ডাকটা জোর থেকে জোরালো হচ্ছে দেখে দীপঙ্কর এবং জয়শীল দু’জনেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। কুকুরটা আরো একবার জোরে ডেকে উঠল, আর মনে হল গাঁওবুড়োর ঘরের পাশ দিয়েই কে যেন হুড়মুড় করে দৌড়ে পালাল।

জয়শীল চিন্তান্বিত মুখে দীপঙ্করের দিকে তাকালেন। দীপঙ্করের ভুরূ কুঁচকে গেছে, “নজরদারির জন্য চর বসেছে। জয়শীল, আজকে রাতটা একটু সজাগ থাকতে হবে”।

“যথা আজ্ঞা”।

ওনাদেরকে ঘরে ঢুকতে দেখে বীরভদ্র বললেন “গাঁওবুড়োর কুকুর আছে জানতাম না তো। চেঁচাচ্ছিল কেন?”

জয়শীল চোখের ইশারায় বীরভদ্রকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যাতে বায়চং কিছু না বুঝতে পারে। বায়চং জয়শীলকে কথা না বলতে দেখে কি বুঝল কে জানে, বলল “লুম বিন”।

দীপঙ্কর ঘুরে তাকালেন, “কি বলছ বায়চং?”

বায়চং একটু জড়সড় হয়ে বলল, “গাঁওবুড়োর কুকুরকে তোমরা চেন না? বুড়ো কুকুর, ওর নাম লুম বিন্”।

“তাই নাকি? লুম বিন্ নাম?”, দীপঙ্কর বেশ অবাক হয়েছেন বলে মনে হল।

আরো রাতের দিকে বীরভদ্র আর বায়চং ঘুমিয়ে পড়লেন, জয়শীলের চোখও প্রায় বুযে আসছে। মাঝে একবার শুনলেন দীপঙ্কর অস্ফূটে বলে চলেছেন, “মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা”। নামগুলো বড় চেনা চেনা ঠেকল জয়শীলের কিন্তু ঘুমের ঘোরে কিছুতেই খেয়াল করতে পারলেন না কোথায় শুনেছেন। মাঝরাতের দিকে দীপঙ্কর জয়শীলকে জাগিয়ে ঘুমোতে গেলেন। ঘুমনোর আগে শুধু বললেন, “ডাইনি যদি সত্যিই বায়চং এর বোনকে নিয়ে গিয়ে থাকে তো ভালোই করেছে”।

জয়শীল অবাক। প্রভুর হেঁয়ালি এমনিই বুঝতে পারেন না, তার ওপর মাঝরাত দেখে আর বিশেষ চেষ্টা করলেন না।

পাঁচ

জয়শীল সকালে উঠে দেখলেন দীপঙ্কর ঘরে নেই। বীরভদ্রও উঠে পড়েছেন কিন্তু জানালেন দীপঙ্করকে তিনিও দেখতে পান নি। দু’জনেই বেরোলেন গুরুকে খুঁজে বার করতে। খুব দূরে যেতে হল না, কয়েক পা হাঁটতেই দেখা গেল দীপঙ্করকে।

কিন্তু দীপঙ্করকে দেখে দু’জনেরই চক্ষুস্থির হয়ে গেল।

বীরভদ্র বারেবারে গড় হয়ে প্রণাম করতে লাগলেন।

জয়শীল দু’হাত জড়ো করে একবার মাথায় আর একবার বুকে ঠেকাতে লাগলেন।

স্বাভাবিক! দীপঙ্কর মাটি থেকে অল্প ওপরে শূন্যে ভাসছেন। কিছুক্ষণ সেরকম অবস্থায় থেকে আবার মাটিতে নেমে এলেন, পরক্ষণেই আবার শূন্যে ভেসে উঠলেন।

“প্রভু, এ কি লীলা আজ দেখালেন আপনার ভক্তদের”, জয়শীল আর আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না। আবেগের চোটেই সম্ভবত দু’জনের চোখও বন্ধ হয়ে গেছিল। চোখ অবশ্য অল্প পরেই খুলে ফেলতে হল কারণ ততক্ষণে দীপঙ্করের গর্জন দু’জনের কানে গিয়েই পৌঁছেছে।

“মূর্খ, মূর্খ, মূর্খ”।

জয়শীল আর বীরভদ্র দু’জনেই থতমত খেয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দীপঙ্কর এবার সরোষে জিজ্ঞাসা করলেন, “মানুষ শূন্যে ভাসতে পারে?”

এ প্রশ্নের কি উত্তর হয়!

জয়শীল চুপ করে রইলেন, বীরভদ্র আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু আপনি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র”।

দীপঙ্কর মাথা নাড়তে নাড়তে এদের দিকে এগিয়ে এলেন, “আমি ভগবান বুদ্ধের বরপুত্র কিনা তা জানি না তবে বুদ্ধ যে তোমাদের মতন ফাঁপা মগজ দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে পাঠান নি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ”।

“জয়শীল, তুমি আমার বাঁ পাশে এসে দাঁড়াও আর বীরভদ্র তুমি থাকো ডানদিকে”।

বীরভদ্র দেখলেন দীপঙ্কর তাঁর ডান পায়ের জুতো থেকে অতি সন্তর্পণে পা’টি বার বার করে জুতোর সঙ্গে আড়াআড়ি করে পা’টি বাইরে রাখলেন। ফলে ডান পায়ের জুতোটি এখন দীপঙ্করের ডান পায়ের পাতা এবং বাঁ পায়ের জুতোর মধ্যে আটকে রইল। দীপঙ্কর এবার বাঁ পা’টিকে শূন্যে তুলে ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।

বাঁ দিক থেকে জয়শীল অবশ্য শুধুই দেখতে পেলেন তার প্রভুর একজোড়া জুতো আরো একবারের জন্য হাওয়ায় ভেসে উঠল। দীপঙ্করের নির্দেশে জয়শীলও ডান দিকে আসতে তবে রহস্য উদ্ধার হল।

বীরভদ্র এবং জয়শীল দু’জনেই কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। বীরভদ্র নাকের ভেতর থেকে ফোঁৎ করে একটা শব্দ করে বলে উঠলেন, “বুঝলাম। এতেও অবশ্য সাধনার ব্যাপার আছে”।

দীপঙ্কর জুতোয় পা গলাতে গলাতে বললেন, “সে কথা আর বলতে। ক’টার সময় ঘুম থেকে উঠেছি বলে তোমার মনে হয়?”

“কিন্তু প্রভু, এই যাদুবিদ্যা দিয়ে কী উদ্দেশ্য সিদ্ধি হবে?”

দীপঙ্কর মুচকি হাসলেন, “সব সময় কি আর উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যই জ্ঞান আহরণ করতে হবে? এই যে সকাল সকাল নির্ভেজাল আনন্দ পেলে, তার দাম নেই?”

বলতে বলতে হঠাৎ ঘুরে তাকিয়েছেন বীরভদ্রের দিকে, “মেখলা কে ছিলেন? কে ছিলেন মেদিনী? আর কঙ্খলাই বা কে?”

আচম্বিতে প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসায় বীরভদ্র একটু ঘাবড়ে গেছিলেন কিন্তু বিক্রমশীলে খোদ দীপঙ্করের কাছেই তিনি পাঠ নিয়েছেন প্রাচীন তিব্বতী পুঁথির। এই নামগুলোর সঙ্গে তিনি পরিচিত। একটু ভেবে বললেন, “এনারা সবাই পূর্বভারতীয় ডাকিনী। বিশেষ বিশেষ সিদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন এনারা, প্রত্যেকেরই শিষ্যসংখ্যাও ছিল প্রচুর”।

“ঠিক বলেছ বীরভদ্র। এই তিনজনের সঙ্গে আর কারোর নাম মনে পড়ছে?”

বীরভদ্র তাঁর মন্ডিত মুস্তকে বহু হাত বুলিয়েও খেয়াল করতে পারলেন না। দীপঙ্কর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বয়স হচ্ছে বীরভদ্র তোমার। ভঙ্গালের বিক্রমপুরে যেখানে আমার বাড়ি ছিল, তার আশেপাশের সমস্ত জলাশয় এক বিশেষ শাকে ছেয়ে থাকত। লোকে বলে সে শাক খেলে বুদ্ধি বাড়ে, স্মৃতি ফিরে আসে। তোমার শুকনো দেশে তো সে শাক পাওয়া যাবে না, নাহলে প্রত্যহ ওই শাক বেটেই তোমার খাওয়াতাম”।

কি বলবেন বুঝতে না পেরে বীরভদ্র মাথা চুলকোতে লাগলেন। দীপঙ্কর জয়শীলের দিকে ফিরে বললেন, “আমাকে এখন একটু বেরোতে হবে। আমি ফিরে আসার আগে বায়চংকে তৈরি করে রেখো, এসেই আবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। আর হ্যাঁ, সঙ্গে প্রচুর পরিমানে নুন নিও”।

“নুন?!”

জয়শীলের বিস্মিত প্রশ্নে দীপঙ্কর বললেন, “চিন্তা নেই, গাঁওবুড়োর বাড়ি থেকে কাল নুনও নিয়ে এসেছি”।

“আজ্ঞে, সে কথা বলছি না। নুন দিয়ে কী হবে?”

“তোমার কেশহীন মুন্ডে যখন জলৌকা টুপ টুপ করে পড়বে তখন ব্যবস্থা করতে হবে না? নাকি কুচকুচে কালো মাথায় যৌবন ফিরে পেতে চাও?” বলে হাসতে হাসতে দীপঙ্কর ঘরে ঢুকে গেলেন।

জয়শীল মনে মনে শব্দকোষ হাতড়াচ্ছেন দেখে বীরভদ্র বললেন, “জোঁক, জোঁক”।

“ওহ্ জোঁক, তাই বলুন”, বলতে গিয়ে খেয়াল পড়ল জোঁক বস্তুটি কি। জয়শীল টের পেলে গলা শুকিয়ে আসছে। ওদিকে বীরভদ্রও অস্থির হয়ে পড়েছেন, বহু বছর ধরে গুম্ফা আর মহাবিদ্যালয়ে থেকে থেকে সামান্য প্রাকৃতিক সমস্যার কথা ভেবেও চিন্তায় পড়ে যান। দুর্ভাবনার চোটে দু’জনেই জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেলেন দীপঙ্কর কোথায় যাচ্ছেন।

ছয়

দীপঙ্কর অবশ্য বেশী দূরে যান নি, গেছেন পাশেই গাঁওবুড়োর বাড়িতে। সাতসকালে দীপঙ্করকে দেখে গাঁওবুড়ো একটু হকচকিয়েই গেল। কুশলাদি বিনিময়ের পর দীপঙ্কর বললেন, “আমরা আজই চলে যাচ্ছি। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, জরুরী কথা”।

গাঁওবুড়ো একটু বাঁকা হাসল কী? দীপঙ্করের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনাকে তো আগেই বলেছি বায়চং এর বোনের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। সে হারিয়ে গেছে খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু খাদে পড়ে গেলে আর কিই বা করার আছে?”

দীপঙ্কর মৃদু হাসলেন, “বায়চং এর বোনকে নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে আসিনি। কিন্তু হ্যাঁ, ওই খাদে নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়েই দু’চার কথা ছিল”। মনে হল অন্দরমহল থেকে এক জোড়া চোখ যেন দীপঙ্করের কথায় আরো উৎসুক হয়ে উঠল।

গাঁওবুড়ো একটু ব্যাজার মুখে দীপঙ্করকে অতিথিকক্ষে নিয়ে এল, তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বলল, “বলুন কি বলতে চান”।

দীপঙ্কর দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তার আগে আপনার স্ত্রীকে ডেকে নিন”।

“আমার স্ত্রীকে? কেন কেন?” ভারী চমকে উঠল গাঁওবুড়ো।

“উনি দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন যে। আর সেটা বড় কথা নয়, যে কথা বলব সেটা শোনা ওনারও প্রয়োজন”।

গাঁওবুড়োকে আর কিছু বলতে হল না, বুড়ি দরজা খুলে সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে পড়েছে। গাঁওবুড়ো গর্জন করে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে পাত্তা না দিয়ে বুড়ি দীপঙ্করের পা জড়িয়ে ধরল, “আপনি কাল চলে যাওয়ার পর থেকেই মন বড় উচাটন হয়ে আছে বাবা, আমাকে শান্তি দিন”।

“উঠুন মা”, দীপঙ্কর সস্নেহে বুড়িকে তুলে ধরলেন, “আপনাকে শান্তি দেবেন পরম করুণাময় ভগবান বুদ্ধ। আমি শুধু কিছু রহস্যের ওপর যবনিকাপাত ঘটাতে এসেছি”।

গাঁওবুড়োর সেই হম্বিতম্বি উড়ে গেছে, সে এখন নির্নিমেষে দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

“আপনারা জানেন, আমি ভারতবর্ষের মানুষ। তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে এই প্রথম চলেছি সে দেশে। কিন্তু তা বলে ভাববেন না সে দেশ আমার সম্পূর্ণ অজানা। বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ে আমরা বহু বছর ধরে অতি আগ্রহের সঙ্গে তিব্বতী পুঁথি অধ্যয়ন করে চলেছি। সেরকম ই এক পুঁথিতে আমি হদিশ পেয়েছিলাম নাম পেয়েছিলাম পূর্ব ভারতীয় কিছু মহিলার – মেখলা, মেদিনী, কঙ্খলা। এনাদেরকে সেই পুঁথিতে ডাকিনী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে এনারা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, তারপর দীক্ষা দিয়েছিলেন বেশ কিছু পুরুষকেও। ডাকিনী হিসাবে এনারা নাকি জানতেন অনেক তন্ত্রমন্ত্রও”।

বুড়ি ফিসফিসিয়ে উঠল, “ডাইনি?”

“সে পুঁথিতে নাম ছিল আরো এক ডাকিনীর”, দীপঙ্কর থামেন।

বুড়ো বুড়ি দু’জনেই চুপ।

“তাঁর নাম মণিভদ্রা। মণি তো তিব্বতি নাম নয়, তাই না?”

গাঁওবুড়ো আমতা আমতা করে থাকে।

“শোনা যায় মণিভদ্রার শিষ্যদের গোপন একটি সংঘ ছিল লুম্বিনীতে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আপনার মেয়ের প্রিয় কুকুরের নাম লুম বিন হওয়ার বোধহয় একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, তাই না?”।

বুড়ি গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে তাকায়, মহা আক্রোশে চেঁচিয়ে ওঠে, “কোথায় নিয়ে গেছ তুমি আমাদের মেয়েকে? কেন আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছ তাকে?” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

বুড়ো মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর অতি ধীর স্বরে বলে, “আমি নিয়ে যাইনি বউ, সে নিজেই চলে গেছে। আমি শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছি”।

“পৌঁছে দিয়ে এসেছে? কোথায়? কোথায় রেখে এসেছ তাকে? কেন দশ বছর ধরে তাকে একটাবারের জন্যও দেখা করতে দাওনি আমার সঙ্গে?”, বুড়ি থরথর করে কাঁপতে থাকে।

গাঁওবুড়ো দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে, ফিসফিস করে বলে, “নাহলে যে তোমায় মেয়েও কোনো একদিন খাদের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেত অথবা অথবা……”

“অথবা পাহাড় থেকে তার ওপর গড়িয়ে পড়তে কোনো পাথর”।

দীপঙ্করের কথা শুনে বুড়ি এবার তার দিকেই ঘুরে তাকায়, দু’হাত জড়ো করে বলে, “প্রভু, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন। এ জীবনে আর ক’টা দিনই বা আছে? শুধু তাকে ফিরে পেতে চাই, আর কিছু চাই না”।

দীপঙ্কর ব্যথিত মুখে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বুড়িকে বলেন, “মা, আমার ধারণা আপনার মেয়ে অনেক বড় এক কাজে হাত দিয়েছে। সে কাজ চলবে আমৃত্যু, আর তাই অতি কষ্টে সে ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছে সমস্ত সাংসারিক মায়া”।

বলতে বলতে গাঁওবুড়োর দিকে ফিরে চান দীপঙ্কর, “আমার ধারণা কি ঠিক?”।

গাঁওবুড়ো কাঁপতে কাঁপতে হাত জড়ো করে, বলে “প্রভু, আপনি সর্বজ্ঞ। মণি আজ মণিভদ্রা, এ গ্রামের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্ব সে একার হাতে তুলে নিয়েছে। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছে এ পাপ আশপাশের আরো অজস্র গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কাজ তাই শেষ হওয়ার নয়”।

“মণি, আমার মণি ডাইনি হয়ে গেছে? এ নিশ্চয় সেই সর্বনাশী ডাইনির কাজ, যে তাকে ধরে নিয়ে গেছিল”,  হাহাকার করে ওঠে বুড়ি।

গাঁওবুড়ো আবার জড়িয়ে ধরে বুড়িকে, “শান্ত হও। তোমাকে কি বললাম একটু আগে?মণিকে কোনো ডাইনি ধরে নিয়ে যায়নি, সে স্বেচ্ছা- নির্বাসনে গেছে”।

এবার দীপঙ্কর বলেন, “আপনি প্রথম থেকেই শুরু করুন। হয়তো তবেই আপনার স্ত্রী ঘটনাপ্রবাহটি বুঝতে পারবেন, আমিও পাব কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর”।

“তাই হোক”, ধপ্ করে মাটিতে বসে পড়ে গাঁওবুড়ো, “এ পাপের কথা আজ নয় কাল নিজের মুখেই বলতে হত”।

সাত

“আমাদের পরিবারের পুরুষরা যুগ যুগ ধরে এ গ্রামকে শাসন করে এসেছে। এ কথা কত পুরুষ আগের, সে ঠিক আমিও জানি না। ঠিস্রোং ছিলেন তাঁর মা – বাবার নয়নের মণি, গ্রামেরও সবাই তাঁকে বড় ভালবাসত। ছবি আঁকতে পারতেন, বাঁশি বাজাতে পারতেন, এ তল্লাটের সব আঞ্চলিক ভাষায় তিনি ছিলেন সমান দড়। সকাল সন্ধ্যা ঘোড়ায় চড়ে যখন গ্রামের পাহাড়ি পথ ধরে যেতেন তখন ছেলেমেয়ে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, এত সুপুরুষ ছিলেন ঠিস্রোং।

কিন্তু সব থেকে বেশী খাতির তিনি পেতেন তাঁর ধার্মিকতার দরুণ। ছোটো থেকেই প্রবল বুদ্ধভক্ত ছিলেন ঠিস্রোং, গ্রামের সমস্ত বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বসিয়ে বুদ্ধের জীবনকাহিনী শোনাতেন। শোনা যায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে নাকি কিছু পুঁথিও লিখেছিলেন।

তাঁর বাবা-মা যখন ঠিস্রোং এর বিয়ের তোরজোড় শুরু করলেন তখন ঠিস্রোং করজোড়ে তাঁদের কাছে ছ’টি মাস সময় প্রার্থনা করলেন। ইচ্ছে, বিয়ের আগে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী দর্শন করে আসবেন, সেখানকার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। একমাত্র ছেলের কথা বাবা-মা ফেলতে পারলেন না, সানন্দেই অনুমতি দিলেন। এক সকালে নিজের প্রিয় ঘোড়া, কিছু পাথেয় আর কয়েকটি পুঁথি নিয়ে ঠিস্রোং এ গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন।

ছ’মাস কেটে গেল, ঠিস্রোং ফিরে এলেন না। বাবা – মা উদ্বিগ্ন হলেন কিন্তু ভাবলেন হয়ত পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি। আরো মাস চারেক কাটবার পর ঠিস্রোং এর বাবা মরীয়া হয়ে গ্রামেরই কিছু লোককে পাঠালেন খবর আনতে। তারা ফিরে এসে খবর দিল কেউ ঠিস্রোং এর হদিশ জানে না, লুম্বিনীতে তিনি গেছিলেন ঠিকই কিন্তু তিন মাস পর থেকেই তাঁকে আর কেউ দেখেনি।

মরীয়া হয়ে ঠিস্রোং এর বাবা আরো লোকজন নিয়ে নিজেই গেলেন লুম্বিনী, ততদিনে প্রায় এক বছর কেটে গেছে। বহু সময় এবং অর্থ ব্যয় করার পর খবর পাওয়া গেল ঠিস্রোং দীক্ষা নিয়েছেন, তাঁর দীক্ষাগুরু স্বয়ং ডাকিনী মণিভদ্রা। বহু কষ্ট করে ঠিস্রোং এর বাবা ছেলের সঙ্গে নাকি দেখা করতে গেছিলেন, তারপর কি হয়েছিল কেউ জানে না। অনেকে বলে ঠিস্রোং বাবাকে শেষবারের জন্য প্রণাম করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিলেন, আর কেউ কোনোদিন তাঁকে দেখেনি। অনেকে আবার বলেন ঠিস্রোং মণিভদ্রাকে ছেড়ে আসতে রাজি না হওয়ার তাঁর বাবা রাগে অন্ধ হয়ে পুত্রহত্যা করে আসেন।

ঠিস্রোং না ফিরলেও লোকজন নিয়ে ঠিস্রোং এর বাবা ফিরে আসেন। এসে দত্তক নেন গ্রামেরই এক ছেলেকে”।

একটানা কথা বলে গাঁওবুড়ো এবার থামল, কিন্তু শ্রান্তিতে নয়, পরবর্তী কথাগুলো বলার আগে যেন তার শ্রোতাদের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করাটাই উদ্দেশ্য। করুণ চোখে বুড়ি আর দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তারপরের ইতিহাস বড়ই ভয়ঙ্কর। মেয়েদের সমস্তরকম স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল। এর আগে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ না হলেও মেয়েরা সমান অধিকার ভোগ করতেন। এখন গ্রামের প্রায় সব মেয়েদের বাড়িতে বন্দী করে রাখা হল”।

“যত দিন যেতে লাগল মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের সীমা পরিসীমা রইল না। আর সেই সঙ্গে মেয়ে ধর্মগুরুরা আর ডাকিনী রইলেন না, তাঁরা হয়ে গেলেন ডাইনি। অন্ধকারের দূত, পাপাচারের প্রতীক। অহরহ ডাইনি অপবাদ দিয়ে গ্রামের মহিলাদের পুড়িয়ে মারা শুরু হল”।

দীপঙ্কর পাথর হয়ে শুনছিলেন, গাঁওবুড়ো থেমে গেছে দেখে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, “সে ইতিহাস তো কখনই শেষ হয়নি, তাই না?”

গাঁওবুড়ো লজ্জায়, অনুশোচনায় যেন কুঁকড়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল, “না, সে ইতিহাস ভয়াল থেকে ভয়ালতর হয়ে উঠেছে। মেয়েরা বড় হওয়া মাত্র তাদেরকে ছেলেদের থেকে সরিয়ে নেওয়া হত, ছেলেদের বা অন্য মেয়েদের সঙ্গে যাতে তারা মিশতে না পারে তাই জন্য বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে রেখে দেওয়া হত তাদের। আর পারতপক্ষে যদি বাইরে কেউ যেত তাহলেই ঘনিয়ে আসত মৃত্যু”।

বুড়ি শিউরে শিউরে উঠছিল। গাঁওবুড়োর কথায় শুনে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে এই অপদেবতারা সব আমাদের বন্ধু প্রতিবেশী? তারাই তাহলে খুনী?”

গাঁওবুড়ো চুপ করে থাকে।

দীপঙ্করে বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, “হ্যাঁ মা, চরম নারীবিদ্বেষে এই গ্রামের শয়ে শয়ে মেয়ে খুন হয়েছে। যাদের বাইরের গ্রামে ঠিক সময়ে বিয়ে হয়েছে তারাই শুধু বেঁচে গেছে”।

“খুন তো বোধহয় আপনিও করেছেন, তাই না?”

গাঁওবুড়োর অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠল। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলল, “কিন্তু মণি চলে যাওয়ার পর করিনি। বিশ্বাস করুন প্রভু, ভগবান বুদ্ধের দিব্যি”।

গাঁওবুড়োর কপাল ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরছে, কিন্তু বুড়ির চোখে এক ফোঁটা করুণা দেখতে পেলেন না দীপঙ্কর, সে চোখ জুড়ে শুধুই জিঘাংসা।

“আমার আরো ধারণা পৌরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপনারা বহু বছর ধরেই বাচ্চা ছেলেদের সামরিক শিক্ষালয়ে পাঠাতে থাকেন। সেখানে তারা শেখে যার গায়ের জোর বেশী, যার কষ্টসহিষ্ণুতা বেশী, সেই একমাত্র পুরুষ। যারা কষ্ট সহ্য করতে পারে না তাদের মানুষ বলে গণ্য করা হয় না, তারা নিকৃষ্ট প্রজাতি। এ গ্রামের বায়চং রা আরেকটু বড় হলেই শিখবে মেয়েদের কোনো স্থান নেই এ সমাজে। তাই না? বায়চং এর কালশিটে দাগগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আগের দিন যখন ছেলেরা জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে ফিরছিল তখন প্রায় সবারই পিঠে, মুখে সেই একই কালশিটে দাগ দেখে আমি নিশ্চিত হই। ভালো কথা, কত বছর হলে এ গ্রামের বাচ্চাদের দেচানের শিক্ষালয়ে পাঠানো হয়?”।

গাঁওবুড়ো মিনমিন করে বলে, “পাঁচ বছর”।

বুড়ি বাঘিনীর মতন লাফিয়ে পড়ে গাঁওবুড়োর ওপর। তার মাথা ধরে ঠুকতে থাকে দেওয়ালে। দীপঙ্কর বুড়ির সামনে গিয়ে হাতজোড় করতে বুড়ি এবার কান্নায় ভেঙ্গে ফেলে। দীপঙ্করের দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “আমাকে সত্যি করে বলুন বাবা, আমার মেয়েকেও কি এই পাষন্ডরা মেরে ফেলেছে?”

সৌম্যসুন্দর হেসে বুড়ির দিকে তাকান দীপঙ্কর। “আপনি এখনো বুঝতে পারেন নি মা? আপনার মেয়েই যে এদের হয়ে প্রায়শ্চিত্তটা করছে। সে যে মণিভদ্রার নতুন অবতার, ডাইনির ছদ্মবেশে এসে সে গ্রামের বাচ্চা মেয়েগুলোরই প্রাণ বাঁচাচ্ছে। সে ডাইনি নয়, ডাকিনী। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করে তুলছে এ গ্রামের মেয়েদের, তাদেরকে নতুন করে বাঁচার হদিশ দেখাচ্ছে”।

দীপঙ্কর এবার ফিরে তাকান গাঁওবুড়োর দিকে, “আমি জানি পাহাড়ের ওপারের জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও থাকেন মণিভদ্রা। বায়চং এর চোখে ধুলো দিতে পারলেও আমাকে ঠকাতে পারবেন না। মাটি থেকে শূন্যে উঠে যেতে দেখে বায়চং ভেবেছিল মণিভদ্রা বোধহয় ভেসে ভেসে খাদের দিকেই যাচ্ছেন। উনি কিন্তু বায়চং এর বোনকে ধরে ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বায়চং যা দেখেছে তা শুধুই দৃষ্টিবিভ্রম, এক অভিজ্ঞ যাদুকরীর হাতের কাজ, থুড়ি পায়ের কাজ।

আমাকে কিন্তু মণিভদ্রার সঙ্গে যে একবার দেখা করতেই হবে। আপনি নিয়ে যাবেন আমাকে?”।

গাঁওবুড়োর চোখে যেন দৃষ্টি নেই। হাহাকার ভরা গলায় বলে চলে, “পাথরটা গড়িয়ে ফেলার সময় দেখতে পাইনি দোহনার পেছনে মণিও আসছে। ওই পাহাড়ের বাঁকেই ঘটেছিল, শেষ মুহূর্তের চেষ্টাতেও আমি মণির থেকে আড়াল হতে পারিনি। দেখে ফেলেছিল আমাকে। দেখেছিল ওর প্রাণের বন্ধু দোহনাকে আমি খুন করেছি। সে রাত্রে মণিকেও সব বলতে হয়েছিল, সব শোনার পর যেভাবে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে সে দৃষ্টি আমি এখনো ভুলতে পারি না। তার চোখ বলছিল তুমি নরকের কীট, আমি সত্যিই নরকের কীট”।

বলতে বলতে ফের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে গাঁওবুড়ো। দীপঙ্কর কিছুই বলেন না, একবারের জন্যও চেষ্টা করেন না কোনো সান্ত্বনাবাক্য শোনানোর।

“আর আমার কথা একবারও বলেনি মণি মা?”, চোখ ছলছল করে ওঠে বুড়ির।

“তোমার কথাই বলছিল শুধু”, বুড়ো বুড়ির দিকে তাকানোরও সাহসটুকু পায় না, “বলেছিল যে দিন তোমার পাপের কথা মা’র কাছে ধরা পড়বে তখন তাকে বলো মণির জীবনে কোনো বাবা নেই, আছে শুধু মা। মার থেকে বিচ্ছেদযন্ত্রণা মণিকে সারাজীবন ভোগ করতে হবে, কিন্তু তাকে বলো মণির কোনো উপায় নেই”……বলতে বলতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় গাঁওবুড়ো, তারপর বলে, “সে বলেছে তোমাকে বলতে অজস্র জীবন বাঁচানোর জন্য সে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে”।

হয়ত নিজের কানেই নিজের কথাগুলো অবিশ্বাস্য ঠেকে, তাই বুড়িকে আর কিছু বলে না গাঁওবুড়ো। দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলে, “এখন তো হবে না। আজ সন্ধ্যায় নিয়ে যান আপনাকে সে জঙ্গলে। কিন্তু জানি না সে আসবে কিনা। তার চোখ সর্বত্র, কিন্তু তার নিজের ইচ্ছা না হলে সে দেখা দেবে না। আমি মাস দু’মাসে একবার জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে কিছু খাবারের রসদ দিয়ে আসি শুধু। সে রাত্রের পর আর তাকে দেখিনি। না, দেখেছি, কিন্তু অনেক দূর থেকে। তার কিছু নির্দেশ থাকলে শুধু সেটুকুই শুনেছি”।

আট

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চলেছেন দীপঙ্কর। তার ঠিক পেছনের ঘোড়াতেই রয়েছেন জয়শীল, তাঁর কোলের কাছে বসে বায়চং, তারও পেছনে আসছেন বীরভদ্র। গাঁওবুড়ো ঠিকই তাঁদেরকে পথ দেখিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছিল। বীরভদ্র এবং জয়শীলকে জঙ্গলের ঠিক বাইরে রেখে গাঁওবুড়োর সঙ্গে ভেতরে ঢুকেছিলেন শুধু দীপঙ্কর। দু’টি ঘন্টা অপেক্ষা করেছেন কিন্তু মণিভদ্রা আসেনি। নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে গাঁওবুড়ো শুধু কপাল চাপড়েছে, কিন্তু দেখা মেলেনি ডাকিনীর। অবসন্ন গাঁওবুড়ো দীপঙ্করের সঙ্গে আর ফিরতে চায়নি। রাত্রের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যেই এক পাথরের ওপর শয্যা নিয়েছে সে, দীপঙ্করের মনে হল এই প্রথম যেন অপরাধের বিস্তৃতিটা গাঁওবুড়োর কাছে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এক বিষাদক্লান্ত মানুষ যার অবসাদ কোনোকালেই সারবে না, আর তাই হয়ত বাঁচার ইচ্ছাটুকুও চলে গেছে।

জয়শীল আর বীরভদ্র এখনো কিছু জানেন না, উদগ্র কৌতূহলে তাঁরা পাগল হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দীপঙ্করের মুখ দেখে তাঁকে প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না কারোরই। বায়চং এর অবশ্য কোনো কৌতূহল নেই, সে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। দীপঙ্কর জঙ্গলে ঢোকা মাত্র সে ভেবে এসেছে ঠাকুর তার বোনকে নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু দীপঙ্করকে খালি হাতে বেরিয়ে আসতে দেখে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। বায়চং এর দুঃখ যেন গ্রাস করেছে জয়শীল আর বীরভদ্রকেও।

জয়শীল একবার মুখ ঘুরিয়ে পেছনের জঙ্গলটা দেখার চেষ্টা করলেন। কেন অতীশ ঢুকেছিলেন ওই জঙ্গলে? গাঁওবুড়োই বা গেল কোথায়? হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে তাঁর সম্বিত ফিরে এলে। চেঁচিয়ে উঠেছে বায়চং, থরথর করে কাঁপছে। ওনারা পাহাড়ের সেই বাঁকটিতে এসে হাজির হয়েছেন কিন্তু সামনেই থেমে আছে দীপঙ্করের ঘোড়া।

কেন থেমে আছে তা দেখতে পেয়েছে বায়চং, এখন জয়শীলও দেখতে পেয়েছেন। বাঁকের ঠিক মুখটিতেই এসে দাঁড়িয়েছে যেন এক প্রেতিনী, কালো পোশাকে তার সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত। এক পলকের জন্য মনে হল বা সে শূন্যে ভাসছে।

দীপঙ্কর ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছেন কিন্তু এগোচ্ছেন না।

বীরভদ্রের ঘোড়াটি এখন জয়শীলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে, দু’জনে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন দীপঙ্কর নতজানু হয়ে প্রণাম জানাচ্ছেন সেই প্রেতিনীকে।

কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল কান্নার শব্দ। না, সে কান্না কোনো ভৌতিক কান্না নয়, নয় কোনো অলৌকিক কান্না। জয়শীল বা বীরভদ্র হয়ত ভাবলেন দীপঙ্করের অতিলৌকিক শক্তিতে পরাভূত হয়েছে অপশক্তি, হয়ত মায়ার বাঁধন কেটে গেছে বলেই শোনার গেছে এক মানুষের কান্না।

কিন্তু তা তো নয়।

দীপঙ্কর জানেন তা নয়।

এ কান্না মণিভদ্রা শুধু নিজের জন্য কাঁদছেন না, কাঁদছেন সেই সমস্ত মেয়ের জন্য যাঁদের রক্তে ভেসে গেছে এই পাহাড়ি গ্রাম, কাঁদছেন সেই সব মেয়ের জন্য যারা প্রাণ না খুইয়েও যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত হয়ে এসেছেন নিজভূমে। কাঁদছেন কারণ হয়ত এই প্রথমবার এ গ্রামের মাটিতে কোনো পুরুষ প্রণাম জানালেন কোনো নারীকে।

দীপঙ্কর দেখলেন মণিভদ্রার পেছনে কে যেন নড়ে উঠল, তারপরেই মণিভদ্রা দু পা পিছিয়ে গেলেন। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটি ছোট মেয়ে, পেছনে জয়শীলের লন্ঠনের আলোয় তার মুখের একাংশ দেখা যাচ্ছে, বায়চং এর সঙ্গে তার মুখের মিল খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে না।

দীপঙ্করের ইশারায় পেছন থেকে এগিয়ে এসেছে বায়চং, বোনের কাছে দৌড়ে যাচ্ছিল সে। মণিভদ্রার ছায়ামূর্তিকে নড়ে উঠতে দেখে দীপঙ্কর বায়চংকে দৌড়তে বারণ করলেন। ঠিক যে জায়গাটিতে ভাই বোনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল সেখানেই আবার তারা দাঁড়িয়ে। ডেকি কিন্তু দাদার দিকে এগিয়ে এল না, একটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটু ভেঙ্গে অভিবাদন জানাল শুধু। তারপর এক পা, দু পা করে পিছোতে পিছোতে ফের ফিরে গেল মণিভদ্রার কাছে। দীপঙ্করের দূর থেকে বুঝতে পারলেন না, কিন্তু মনে হল এক মুহূর্তের জন্য মণিভদ্রা তাঁর দিকে তাকালেন। কিন্তু সেটা বিভ্রমও হতে পারে, কারণ অন্ধকার আর গাঢ় কুয়াশার মধ্যে মুহূর্তের মধ্যেই ডেকিকে নিয়ে মিলিয়ে গেছেন মণিভদ্রা।

দীপঙ্কররা আবার রওনা দিয়েছেন।

জয়শীল এবার সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, বায়চং কে কি গাঁওবুড়োর বাড়িতে রেখে যাব আমরা?” বোনকে একবার ছুঁতেও না পেরে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে গেছিল বায়চং, জয়শীল জলের ঝাপটা দিয়ে তাকে জাগিয়েছেন। এখন সে চুপ করে আছে, বায়চং এর দুখী মুখ এর আগে বহুবার দেখেছেন জয়শীল রা কিন্তু এই প্রথম যেন তাকে বড় গম্ভীর লাগছে। মনে হচ্ছে নিমেষের মধ্যে তার বয়স বেড়ে গেছে।

দীপঙ্কর উত্তর দিলেন, “হয়ত তার দরকার পড়বে না। গ্রামের ঠিক বাইরে একজনের থাকার কথা, সে না এলে তখন ভাবা যাবে”।

দীপঙ্কর যেমনটি বলেছিলেন ঠিক তেমনটিই ঘটল, গ্রামের শেষ বাড়িটি ছাড়িয়ে আরেকটি পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল অন্ধকারে অপেক্ষা করছেন কোন এক ঘোড়সওয়ার।

“আমার চিঠি আপনার হাতেই পৌঁছেছিল লোসাং?”।

সামনে এগিয়ে এলেন লোসাং, বায়চং এর মামা। ঘোড়া থেকে নেমে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালেন দীপঙ্করকে, “হ্যাঁ, গাঁওবুড়ো নিজে এসে আমাকে সে চিঠি দিয়ে গেছে”।

“বেশ”, দীপঙ্কর লোসাং এর মুখের দিকে তাকালেন, “বায়চং কে আপনার বন্ধুর চোখ এড়িয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আপনিই তো?”।

সম্মতি জানালেন লোসাং।

“সেদিন বায়চং কে নিতে এসেও যখন জিজ্ঞাসা করলেন না সে কিভাবে আমার কাছে পৌঁছল তখনই অল্পবিস্তর সন্দেহ হচ্ছিল। কালকে আপনাকে ব্যথায় কাতর হতে দেখে নিঃসন্দেহ হলাম। টানা চার দিন ধরে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরপুঙ্গবদেরও গায়ে ব্যথা হওয়াইর কথা”। দীপঙ্কর যেন একটু ব্যঙ্গাত্মক, একটু আক্রমণাত্মকও বটে, “সব থেকে কাছের বন্ধুটি জানতে পারলে কী হত লোসাং? আপনাকেও মেয়েদের মতন দুর্বল ভাবত কী? একটা বাচ্চা মেয়েই তো হারিয়েছে, সে আর এমন কী অঘটন!”।

লোসাং মাথা নিচু করে ছিলেন, এবার দীপঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বায়চং এর মা আমার সবথেকে ছোটো বোন। পাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তার। নিরন্তর অত্যাচারে তার শরীর দুর্বল হয়ে এসেছিল, ডেকিকে জন্ম দিতে গিয়ে সে মারা যায়। মৃত্যুর সময় আমি তার কাছে ছিলাম না, কিন্তু তার কষ্টে ভরা দুটি চোখ আমি বহুবার দেখেছি। যে কয়েকবার পালিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম সে কিছুই বলত না, শুধু চুপ করে চেয়ে থাকত আমার দিকে। জানত আমারও তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর আমি শপথ নিয়েছিলাম তার ছেলে মেয়েদের কোনো অনিষ্ট আমি হতে দেব না, ডেকি হারিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল হয়ত আপনিই এর সুরাহা করতে পারেন, তাই চুপি চুপি গিয়ে বায়চংকে রেখে এসেছিলাম আপনাদের তাঁবুর সামনে। ও-ও কথা দিয়েছিল ঘুণাক্ষরেও আমার নাম নেবে না”।

কথা বলতে বলতে লোসাং অস্থির হয়ে ওঠেন, “আর সে শপথের জন্যই আজ আরো একবার আপনার শরণাপন্ন আমি। বায়চংকে নিয়ে যান এখান থেকে, আপনার কাছে রেখে প্রকৃত শিক্ষা দিন, বুদ্ধের ক্ষমাসুন্দর বাণীগুলি ওকে শোনান যাতে কোনো একদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে আসতে পারে প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক হয়ে। এসে মানুষের অন্ধ অহংবোধকে ঘুচিয়ে তুলতে পারে, ফের সাম্যের জয়গান শোনাতে পারে”।

দীপঙ্কর ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকেন তারপর বলেন, “আমি এত বড় দায়িত্ব তো নিতে পারি না। তিব্বতে আমার জন্য যে কাজ পড়ে রয়েছে তাই যথেষ্ট, তার বাইরে আর কোনো গুরুভার নেওয়ার সামর্থ্য আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার বিশ্বাস এখানে না হোক, আরো কয়েকশ বা কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে এমন শিক্ষালয় নিশ্চয় আছে যেখানে বায়চং মানুষের মতন মানুষ হয়ে উঠতে পারে। সেরকম প্রতিষ্ঠান খুঁজে না পাওয়া অবধি বায়চং আমার সঙ্গে থাকবে”।

তারপরই তাঁর খেয়াল পড়ে, “কিন্তু বায়চং? সে কী আসতে চায়?”

সে আসতে চায়, জয়শীলের কোলছাড়া হওয়ার কোনো ইচ্ছাই বায়চং দেখায় না।

……………………………………………………………………………………………………

মধ্যরাত্রি, তিন সন্ন্যাসী আর এক বালক ঘোড়ার পিঠে চড়ে দ্রুত পাহাড়ের উতরাই বেয়ে নেমে আসছেন। অনেক পথ যাওয়া বাকি, তাও তো তাঁরা জানেন না আরো কত বিভীষিকা অপেক্ষা করে আছে তাঁদের জন্য। এই মুহূর্তে অবশ্য তাঁরা সে নিয়ে ভাবিত নন। সামনের সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, “জয়শীল ঘুমিয়ে পড়ো নি তো?”

দ্বিতীয় জন ঘুম জড়ানো চোখে উত্তর দিলেন, “না প্রভু”।

ঠান্ডা হাওয়ার কনকনে শব্দের মধ্যেই প্রথম জনের গলা শোনা গেল ফের, এবারে একটু কঠোর, “এই শেষ সুযোগ তোমার। পরের বারেও খেয়াল না থাকলে আমি বিক্রমশীলেই ফেরত যাব। এখন শোনো, একটা গল্প বলি…… বহু বহু বছর আগে এক তরুণ থাকতেন এরকমই এক পাহাড়ি গ্রামে, তাঁর নাম ঠিস্রোং”।

উত্তুরে হাওয়া এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল, তারপর ফের হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে।

(তথ্যঋণ কৃতজ্ঞতা –  চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী (অলকা চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্টুপ), অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অলকা চট্টোপাধ্যায়, নবপত্র প্রকাশন))

tb-dakini-2

মুদ্রা অবলুপ্তি – কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

500-note

(Photo Courtesy : Dekh bhai meme)

গুগল অনুবাদ দেখাল demonetization বাংলা মুদ্রারহিতকরণ। কথাটা খটমট ত বটেই  তা ছাড়া রহিতকরণ শব্দটির গায়ে এমনই পরিভাষা পরিভাষা গন্ধ যে মনস্থির করলাম সাদাসিধে ‘অবলুপ্তি’ বলাই ভালো। ভারতে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট  তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গেই এই ব্লগপোস্টটির অবতারণা। গত দেড় সপ্তাহে পত্রপত্রিকায় নেহাত কম লেখালেখি হয়নি এ নিয়ে (যদিও বাংলায় বিশ্লেষণী লেখা চোখে পড়ার মতন কম), কিন্তু অধিকাংশ লেখাতেই অর্থনীতির তত্ত্বকে সন্তর্পণে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থনীতিরই ছাত্র, তাই ভাবলাম দু’কলম লিখে ফেলি। আরো একটা কথা বলা দরকার, মুদ্রা অবলুপ্তি আদৌ কালোবাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে কিনা সে নিয়ে কিছু লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু দেখতে চাইব এই অবলুপ্তিকে ধরে নিয়েও আগের স্থিতাবস্থায় পৌঁছনো আদৌ সম্ভব কিনা।

শুরু করব অপেক্ষাকৃত সহজ একটি তত্ত্ব দিয়ে যার পোশাকি নাম ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’। তত্ত্বটির দীর্ঘ একটি ইতিহাস আছে, তবে এই মুহূর্তে সেই ইতিহাস নিয়ে কথা না বললেও চলবে। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশারকেই এই তত্ত্বের জনক বলে ধরা হয়। কলেজে যাঁরা ন্যূনতম অর্থনীতির পাঠ নিয়েছেন তাঁদের হয়ত নামটি মনে পড়ে যেতে পারে। ফিশার খুব সহজ একটি সমীকরণের মাধ্যমে মুদ্রার যোগান, পণ্য মূল্য এবং  পণ্যসম্পদের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। সমীকরণটি এরকম,

m (মুদ্রার যোগান) X v (মুদ্রার গতিবেগ) = p (সমস্ত পণ্যের গড় মূল্য) X Q (বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ)

v আদতে velocity, তাই পদার্থবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের থেকে আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি গতি এবং বেগকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য।

ধরা যাক  ভারতবর্ষের এক মিনিয়েচার সংস্করণে ১ দিনে মোট ১০০০ খানা জিনিসপত্র লেনদেন হয়েছে। আরো ধরা যাক সেই সমস্ত জিনিসের গড় মূল্য ৩ টাকা এবং দেশে সেই মুহূর্তে মোট ৫০০ টি ১ টাকার নোট আছে। ফিশারের সমীকরণের হিসাবে, ওই ৫০০ টি নোটের প্রতিটিকে তাহলে ৬ বার ব্যবহৃত হতে হবে (মানে আপনার হাত থেকে সে নোট গেল বইয়ের দোকানে, দোকানীর স্ত্রী আবার সেই নোটটি দিয়ে কিনে আনলেন ফলস পাড়, ফলস পাড় যিনি বেচলেন তাঁর ছেলে আবার সেই একই নোট নিয়ে কিনতে গেল চপ, এরকম আর কি)।

একবার চট করে মিলিয়ে হিসেবটা মিলিয়ে নিতে পারেন।

৫০০ X ৬  = ৩ X ১০০০

যদি ৫০০ টি ১ টাকার নোট না থেকে ২০০ টি ১ টাকা আর ৫০ টি ২ টাকার নোটে থাকে, তখন?  সমীকরণ থেকে ফের বার করে ফেলতে পারেন উত্তর,

(২০০ X ১ + ৫০ X ২) X মুদ্রার গতিবেগ = ৩ X ১০০০

পাওয়া গেল মুদ্রার গতিবেগ = ১০, অর্থাৎ প্রতিটি নোটকে এবার ১০ বার হাত বদল হতে হবে। এবার আপনি বলতেই পারেন কিন্তু কে মাথার দিব্যি দিয়েছে যে ১ টাকা আর ২ টাকার নোটকে একই সংখ্যায় হাত বদল হতে হবে? নাহ, সত্যিই সে দিব্যি কেউ দেয়নি। তখন অবশ্য সমীকরণটা একটু বদলে যাবে।

(২০০ X ১ X x) + (৫০ X ২ X y) = ৩ X ১০০০

বুঝতেই পারছেন x (১ টাকার নোটের গতিবেগ ) আর y (২ টাকার নোটের গতিবেগ) এর মানের ওপর কোনো শর্ত আরোপ না করলে এ ক্ষেত্রে অনেক কটা সমাধানই হতে পারে – যেমন, (x = ৪ , y = ২২ ), (x = ১৫  , y = ০), (x = ০ , y = ৩০ ) এবং আরো অজস্র।

এবার এই তিন নম্বর সমাধানটি নিয়ে একটু মাথা খাটানো যাক – (x = ০ , y = ৩০ )।

ধরা যাক, ৮ই নভেম্বরের মতনই কোনো এক দিন ওই মিনিয়েচার ভারতের জনগণ সকালে উঠে দেখলেন ১ টাকার নোট রাতারাতি বাতিল হয়ে গেছে।  নোট বাতিলের পরেও কি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে  ব্যাঘাত না ঘটা সম্ভব? সম্ভব, অনেক রকম ভাবেই সে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। ওই তিন নম্বর সমাধানটি এরকমই একটি প্রতিশ্রুতি – অর্থাৎ দেশের মানুষকে ২ টাকার নোট নিয়ে ১০ বারের জায়গায় ৩০ বার দোকানে যেতে হবে। সামগ্রিক ভাবে পণ্যসম্পদের পরিমাণ একই থাকছে কিন্তু এখন মানুষকে নানা বাহানা বানিয়ে দোকানে যেতে হবে।  এত বার এবং এত বিভিন্ন দোকানে যাওয়ার দরকার আমাদের নাই থাকতে পারে।

তাহলে উপায়?

দ্বিতীয় উপায় হল, নোটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যাক। ৫০টা ২ টাকার নোট তো থাকল, সরকার যদি আরও ১০০ খানা ২ টাকার নোট সরবরাহ করতে পারেন তাহলেই কেল্লা ফতে, ১০ বারের বেশী দোকানে মোটেই যেতে হবে না। এটাই বোধহয় সবথেকে সহজ উপায়, কিন্তু সবথেকে সহজ উপায়ও যদি সরকার কার্যকর না করে উঠতে পারেন? তখন কি করা?

আরো একটা উপায় আছে, যদি গড় পণ্যমূল্য কোনো ভাবে কমে যায়। ৩ টাকার জায়গায় যদি কোন ম্যাজিকে জিনিসপত্রের দাম ১ টাকা হয়ে যায়, তাহলেও ওই দশবার দোকানে গেলেই চলবে। কিন্তু কে করবে এই অসাধ্য সাধন? আর কে, দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক!  কিন্তু ধরা যাক, সে ব্যাঙ্কের রকস্টার  গভর্নর সবাইকে কাঁদিয়ে কয়েকদিন আগেই আলবিদা বলেছেন, ব্যাঙ্কের কাজকর্মে মন নেই।  অতঃ কিম?

আচ্ছা আচ্ছা, ভুরূ কুঁচকোবেন না। ধরে নিলাম ব্যাঙ্কের যথারীতি কাজকর্ম চলছে, কিন্তু দামটা কমবে কি ভাবে? দু’টো প্রধান উপায়। এক হল, বাজারে টাকার যোগান কমিয়ে দেওয়া যাতে পণ্যের চাহিদা কমে যায় (মানুষের হাতে নগদ টাকা যেহেতু বেশী থাকছে না) কিন্তু মনে রাখা দরকার আমাদের সমস্যা শুরুই হয়েছে  টাকার যোগান কমে গিয়ে, আরো যোগান কমিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হবে। মানুষজনের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনার জন্যও টাকা থাকবে না।

দু নম্বর রাস্তা হল – টাকা যোগান এক রেখে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া। ফলে হবে কি, মানুষ খরচ করার থেকে ওই নগদ টাকা ব্যাঙ্কে রাখতে বা বিনিয়োগ করতে বেশী উৎসাহী হবেন।  কিন্তু এক্ষেত্রেও একটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে, কি বলুন তো? মানুষজন না কিনছেন বই, না কিনছেন ফলস পাড় এমনকি চপ তেলেভাজা দেখলেও আসল শিল্প চাই বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আরেকবার সমীকরণ টা মনে করাই,

m (মুদ্রার যোগান) X v (মুদ্রার গতিবেগ) = p (সমস্ত পণ্যের গড় মূল্য) X Q (বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ)

m কমে গেছে, v আর বাড়া মুশকিল – ফলে p ও যদি না কমে আগের স্থিতাবস্থা একমাত্র তখনই ফিরবে যদি  Q নিজেই কমে যায়।

বুঝতেই পারছেন Q কমে যাওয়াটা কাজের কথা নয়। এই পণ্যসামগ্রী যদি আবশ্যিক নাও হয়, পণ্যসম্পদের পরিমাণ কমে যাওয়াটা যে কোনো অর্থনীতির পক্ষেই বড় ধাক্কা। একটা দেশের অর্থনীতি তো শুধু এক দিনের ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’ দিয়ে চলে না, পরবর্তী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আনার জন্য Q কে শুধু স্থির রাখলেই হবে না, যতটা সম্ভব বাড়ানো উচিত। সে কথা মাথায় রেখেই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক মিল্টন ফ্রীডম্যান বলেছিলেন ঘোরতর মন্দার বাজারে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কদের উচিত হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মানুষকে টাকা বিলোনো। বলা বাহুল্য যে হেলিকপ্টার এখানে রূপক মাত্র।  ফ্রীডম্যান বলতে চেয়েছিলেন মন্দা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রধান উপায় হল মানুষদের হাতে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছিয়ে দেওয়া।

ফ্রীডম্যানের আইডিয়াটি বিতর্কসাপেক্ষ, আমরা আপাতত হেলিকপ্টার ছেড়ে মাটির কাছাকাছিই ফিরে আসি। ওপরের পুরো আলোচনাটাই করা হয়েছে ফিশারের সমীকরণটি বাস্তবিক এরকমটি মেনে নিয়ে। কিন্তু  হতে পারেই যে ফিশারের তত্ত্বটি পুরোপুরি ঠিক নয়। আধুনিক অর্থনীতির আর এক পন্ডিত জন মেইনার্ড কেইনস এমনটিই বলেছিলেন। কেইনসের মূল বক্তব্য ছিল  মানুষ কিছু টাকা সবসময়ই নিজের হাতে রেখে দিতে চাইবেন। কেন? কারণ অনেক। আচম্বিতে কোনো বিপদ আসতে পারে, পুরনো ঋণের ওপর সুদের হার বেড়ে যেতে পারে বা ভবিষ্যৎ-এর কোনো বড় খরচের জন্য (ছেলেমেয়ের পড়াশোনা কি বাবা-মার চিকিৎসার খরচ) তিল তিল করে কিছু টাকা এখন থেকেই জমাতে হতে পারে।

অর্থাৎ, কেইনস বলছেন মানুষের কত টাকার প্রয়োজন তা নির্ধারিত হবে শুধু তার আয় দিয়ে নয়, বাজারের সুদ দিয়েও। যারা অঙ্কের ভাষা ভালো বোঝেন তাদের জন্য এই থিয়োরীও সমীকরণের মাধ্যমেই লেখা যায়,

Demand for money = M = M1 (y) + M2 (r) যেখানে y হল আয় আর r সুদের হার।

কেইনসের তত্ত্ব সত্যি হলে দু’টি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় – প্রথমত, কিছু মানুষের কাছে আগের দিনের বা আগের মাসের বা আগের বছরের m এর কিছু অংশ রয়ে গেছে অর্থাৎ হয়ত ১ টাকা আর ২ টাকার নোটের আসল সংখ্যা আরো বেশী; আর দ্বিতীয়ত  ‘কোয়ান্টিটি থিয়োরী অফ মানি’-র ওই v অর্থাৎ মুদ্রার গতিবেগ এক এক মানুষের জন্য এক এক রকম হবে।

এবার একবার চট করে মিনিয়েচার ভারত থেকে আসল ভারতে ফিরে আসা যাক। দেশের মুদ্রার ৮৬ শতাংশই ছিল ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোটে, তাই আগের  m রয়ে গেলেও সম্ভাবনা খুবই বেশী যে সে টাকাও রয়ে গেছে ওই ৫০০ আর ১০০০ হয়েই। সুতরাং, খুব কিছু কাজের কাজ হবে না।

আর v? কেইনসের বক্তব্য ধরলে এটা মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক যে যারা একটু বেশীই ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন তাদের জন্য v কম হওয়াটাই দস্তুর। তাহলে এরকম মানুষ কি আদৌ আছেন যাদের v গড়ের থেকেও বেশী? যাঁরা আছেন বলে মুদ্রা অবলুপ্তি ঘটলেও আগের স্থিতাবস্থায় ঠিকই ফেরত যাওয়া যাবে?

আছেন।

যাঁরা ‘প্লাস্টিক মানি’ অর্থাৎ ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন।

কিন্তু মনে রাখা দরকার আমরা মিনিয়েচার ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছি। আসল ভারতের জনসংখ্যার কত শতাংশ প্লাস্টিক মানি ব্যবহার করে থাকেন? সবথেকে আশাবাদী পরিসংখ্যান বলছে মেরেকেটে দুই শতাংশের কাছাকাছি।  অতএব, কেইনসের তত্ত্বকে মেনে নিলেও আমাদের জন্য কোনো সুখবরই অপেক্ষা করে নেই। আরোই ভয়ের কথা এই যে, সরকার টাকার জোগান দিতে যদি অস্বাভাবিক বেশি সময় নেন এবং ততদিনে পণ্যসম্পদ ক্রয়বিক্রয়ের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যায় তাহলে সেই সব পণ্যের যোগানদাররাও দোকান বন্ধ করে অন্য কাজে মন দেবেন। কি কাজ? সে চাষবাসও হতে পারে, বাপ-ঠাকুরদার রেখে যাওয়া পয়সা ওড়ানোও হতে পারে এমন কি চাইলে মুদ্রা অবলুপ্তির কারণ নিয়ে পি-এইচ-ডিও করতে যেতে পারেন। কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে এই যে পণ্যসম্পদের যোগান কমে গেলে বাজারে দাম বাড়বে বই কমবে না!

গত বছর হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ তাঁর বিতর্কিত বই ‘দ্য কার্স অফ ক্যাশ’ এ সওয়াল করেছিলেন কাগুজে টাকার ব্যবস্থাটিকেই সম্পূর্ণ ভাবে তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সওয়াল করতে গিয়ে এটাও জানিয়েছিলেন যে আমেরিকার মতন উন্নত  অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর দেশেও দশ থেকে পনের বছর ধরে এই কাজটি হওয়া উচিত। রোগফ আরো বলেছেন  সর্বদরিদ্র মানুষগুলির জন্য বিনামূল্যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল ফোন পরিষেবার বন্দোবস্ত না করে এ কাজ করা যাবে না। নরেন্দ্র মোদী অবশ্যই এই মুহূর্তে ভারতবর্ষ থেকে কাগুজে টাকা তুলে দিতে চান নি, কিন্তু তারপরেও রোগফের কথাগুলি দেখায় কেন যে কোনো রকম মুদ্রা অবলুপ্তিকরণের আগেই দরকার দীর্ঘ প্রস্তুতি। কালোবাজারিদের রোখার জন্য আকস্মিক ঘোষণা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ, কিন্তু বিন্দুমাত্রই প্রস্তুতি নিয়ে একাজে পা বাড়ালে পা ফালাফালা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

যাঃ কলা!

ওয়াশিংটন ডিসি-র চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষর মতে ভারতীয় হাতি দিনে প্রায় দেড়শ কেজি খাবার খায়, তার মধ্যে একশ পঁচিশ কেজি খড়। ফল সেখানে নিতান্তই সাড়ে চার কেজি, আর তার পুরোটাই কলা নয়। পাকস্থলী দিয়ে হৃদয় জয়ের থিয়োরীটি যদি দেবতাদের জন্যও ভ্যালিড হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে যে প্রেয়সী পদে অধিকতর দাবী ছিল খড় বউয়ের। কিন্তু সে আর হল কই? শুকনো প্রায় পুড়ে যাওয়া চামড়ার খড়বউ নয়, গণেশের পাশে দিব্যি জায়গা করে নিলেন সতেজ, তন্বী, হরিৎবর্ণা কলাবউ। সাধে লীলা মজুমদার বলে গেছেন ‘পৃথিবীটাই অসাড়’।

পুরাণ জানাবে  হস্তীমুন্ড গণেশের কিউটনেস নিয়ে এ যুগের বালখিল্যরা যতই লাফালাফি করুক না কেন, সে যুগে পাত্রী খুঁজে পেতে হয়রান হতে হয়েছিল। গার্গী, লোপামুদ্রা, অপালাদের সময়, সাত চড়ে রা কাড়বে না এরকম দেবী বা মানবী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর সাত চড়ে রা না কাড়া পাত্রী ছাড়া কেই বা ওহেন কিম্ভূতকিমাকার বরকে পছন্দ করবে? পোটেনশিয়াল পাত্রীরা শাস্ত্র গুলে খেয়ে থাকলে আরোই সমস্যা, সেখানে কোনো পুঁথি জানাচ্ছে গণেশের আজীবন ব্রহ্মচারী হয়ে থেকে যাওয়ার কথা, কোথাও আবার লক্ষ্মী সরস্বতীর সঙ্গে গণেশের সম্পর্কটি আদৌ ভাই বোনের কিনা সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং, ব্রীড়াভারে দোদুল্যমান কলাবউ ছাড়া গতি কি? ও হ্যাঁ, ভাঙ্গা দাঁতটিকেও ভুলে গেলে চলবে না। দক্ষিণী শাস্ত্রর কথা অনুযায়ী অতিভোজনের ফলে পেট ফেটে মিষ্টি বেরিয়ে এলে চাঁদ সেই দেখে বিস্তর হাসাহাসি করছিল, চাঁদকে শায়েস্তা করার জন্যই নিজের দাঁত নিজে ভেঙ্গে ছুঁড়ে দেন গণেশ। পরিমিতিবোধের অভাব, অতি উত্তেজনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

নৃতত্ববিদরা অবশ্য বলবেন নবপত্রিকার অপরিহার্য অঙ্গ কলাবউকে পুজো করা কৃষিপ্রধান গ্রামবাংলার স্বাভাবিক রিচুয়াল। শুধু তো  কলাগাছ নয়, তার সঙ্গে পুজো পাচ্ছে কচু, বেল, ধান, মান, হলুদ, ডালিম,  অশোক, জয়ন্তী গাছও। কিন্তু এত গাছ থাকতে কলাকেই কেন প্রাধান্য দেওয়া হল? লজিস্টিকস একটা কারণ অবশ্যই হতে পারে – একটা বেল বা ডালিম গাছকে তো মণ্ডপে তোলা যায় না, আবার ধান বা কচু এনে হাজির করলে তা চোখেই ধরবে না। সেদিক থেকে কলাবউ এর সাইজ ও শেপ (আহেম্) এর সঙ্গে টক্কর দেওয়া মুশকিল। কিন্তু শুধুই কি লজিস্টিকস? পুরাণ জানাচ্ছে কলাগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ব্রহ্মাণী। ব্রহ্মার মতনই দুর্গার এই অবতারেরও তিনটি মুখ – অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এর পরিচায়ক। এবং হ্যাঁ, ব্রহ্মার মতনই ইনিও সৃষ্টির দেবতা।

সৃষ্টি এবং কলা?

‘Kali’s Child’ বইয়ে জেফ্রি ক্রিপাল লিখেছেন বাংলার তন্ত্রসাধনায় ব্রহ্মাণী পুজোয় বরাদ্দ থাকত রক্তমাখানো কলা। এখানে কলা যে পুরুষ লিঙ্গর প্রক্সি সে কথা বলাটাই বাহুল্য। কলা গাছ যেন বাংলার অর্ধনারীশ্বর, পুরুষ এবং প্রকৃতির অভূতপূর্ব  সহাবস্থান।  মনে রাখা ভালো পুরাণ হোক বা উপনিষদ, গণেশকে কিন্তু সবসময়ই স্বয়ম্ভূ হিসাবেই দেখানো হয়েছে। এমনকি যে সব পুরাণে বলা হয়েছে দুর্গা নিজেই গণেশকে বানিয়েছেন সেখানেও ফুটনোটে লেখা থাকছে চানের সময় ঝরে পড়া ধুলো থেকেই গণেশের জন্ম, অর্থাৎ গণেশের জন্মের উপাখ্যানটিও যেন আরেক প্রক্সি, উর্বর সুজলা সুফলা পৃথিবীর।

অবশ্য সৃষ্টিরহস্য নিয়ে মাথা যখনই ঘামানো হয়েছে, কলাকে সরিয়ে রাখা যায় নি। অন্তত যে সব দেশে কলাগাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়, সেই দেশের মানুষরা কলাকে ভুলে থাকতে পারেন নি।

পলিনেশিয়ান দ্বীপগুলির কথাই ধরুন, ডাঙ্গায় রইল কিছু ফলের গাছ আর তার বাইরে জল। সুতরাং, এই দ্বীপের মানুষগুলির অন্যতম প্রধান দেবতা কানালোয়া কি ভাবে পূজিত হবেন? জলে থাকলে অক্টোপাস হিসাবে। আর ডাঙ্গায় এলে? ঠিক ধরেছেন, কলাই বটে। মিশরের শিল্পকলায় প্রায়শই দেখা যেত পুনর্জন্মের দেবতা ওসিরিসের কপালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট কলাপাতা, হ্যাঁ প্রাচীন মিশরেও কলাগাছ প্রজননক্ষমতার প্রতীক। উৎসাহীরা হয়ত এও জানবেন যে কলা নিয়ে আদিখ্যেতা স্রেফ পেগান পূজারীদের নয়। আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক সুইডিশ বৈজ্ঞানিক কার্ল লিনিয়াস বিশ্বাস করতেন সাপের সঙ্গে মোলাকাতের পর আদম আর ইভ যা পরেছিলেন তা নেহাতই কলা গাছের পাতা।  লিনিয়াস অবশ্য আইডিয়াটি পেয়েছিলেন ইসলামিক মিথ থেকে, যেখানে আপেল নয় কলাকেই বলা হয়েছে স্বর্গের ফল।

কলাবউকে নিয়ে বেশ কিছু  কথা হল, গণেশের কাছে একবার ফিরি। মনে রাখা ভালো বৈদিক সাহিত্যে গণেশের কোনোরকম উল্লেখ নেই। মহাভারতে যে গণেশকে আমরা দেখি তিনি শ্রুতিধর লেখক, যাকে ব্যস্ত রাখতে বেদব্যাস হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলেন। মহাভারত বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাসদেব এবং গণেশের এই গল্প আদি মহাভারতে ছিল না, অনেক পরে সংযোজিত হয়েছে। ইরাবতী কার্ভে-র অসাধারণ বই ‘যুগান্ত’ পড়লে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায় কিভাবে হাজার হাজার বছর ধরে আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষরা ক্রমান্বয়ে মহাভারত (এবং রামায়ণ) কে নিজেদের মর্জি অনুযায়ী বাড়িয়ে গেছেন, গণেশের গল্প সেই অনৃতভাষণের অংশ বিশেষ। হয়ত মহা শ্রুতিধর কোনো লেখক (যাঁর নাম সত্যিই গণেশ) আদতেই লিখতে বসেছিলেন মহাভারতের গল্প, পারিশ্রমিক হিসাবে চেয়ে নিয়েছিলেন নিজের অমরত্ব। কি আর করা, যিনি বলছিলেন তাঁকে রাজি হতে হল। তবে অমরত্বের বায়নাক্কায় কথক বোধহয় সামান্য বিরক্তই হয়েছিলেন। নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জুড়ে দিলেন হাতির মাথা (হাতিই কেন? সে আরেক থিয়োরী, পরে কখনো আড্ডায় বসা যাবে)। সম্ভবত মস্তিষ্কের সাইজ দেখে এবং বুদ্ধিধর, সিদ্ধিদাতা সুলভ প্রভূত বিশেষণের পাল্লায় পড়ে লেখক গণেশ এহেন ফ্যান্টাসি ফিকশন নিয়ে আর বাক্যব্যয় করেন নি।

গণেশ এলেন।

কিন্তু কলাবউয়ের আসতে তখনো ঢের দেরী।

পাণ্ডববর্জিত জায়গা নাম দিয়ে আর্যভাষীরা যে বাংলায় আসতে অস্বীকার করেছিলেন সেখানেই যে এরকম বিবাহবিভ্রাটে পড়তে হবে তা বোধহয় গণেশ বা ব্যাসদেব কেউই কল্পনা করতে পারেননি, নইলে বিয়েটা ওই হাজার বছর আগেই চুকিয়ে ফেলা যেত। আসলে দেখতে পেতেন আর্যভাষীদের পৌরুষতন্ত্র নয়, আমরা আপন করেছিলাম কালী ও ব্রহ্মাণীর নারীশক্তিকে।  উড়ে এসে জুড়ে বসা গণেশের জন্য আমাদের পছন্দের পাত্রীকে অন্তত লজিক দিয়ে হঠানো যাবে না।

সুতরাং?

আর কি, যাঃ কলা!

kola-bou

(স্থিরচিত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা, চিত্রগ্রাহক – রণজিৎ নন্দী)

মেমবউ

ফেসবুকের বন্ধুদের দৌলতে এ সপ্তাহে প্রায় অবিশ্বাস্য একটি ট্রেলর দেখলাম, বাংলা সিরিয়ালের। অবিশ্বাস্য কেন? কারণ ৩৬ সেকন্ডের জন্য ভুলে গেছিলাম সালটা ২০১৬। সাড়ে বত্রিশ ভাজার যেসব পাঠকরা এখনো এ ট্রেলর দেখে উঠতে পারেননি তাঁদের জন্য রইল ইউটিউবের লিঙ্ক,

ক্যারলকে ধন্যবাদ, অপ্রাকৃত চুল এবং অসম্ভব উচ্চারণ নিয়ে উদয় হওয়ার পরেও ওনার দৌলতে বেশ কিছু বিস্মৃতপ্রায় মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। আজ সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাতায় তাঁদের কে নিয়েই দু’চার কথা থাকল, সেই সব বাঙালি মেমবউ কদাচিৎ স্মরণে আসেন যে !

 রেবেকা ম্যাকভিটিস এবং  এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া

শুরুতে বলে রাখা ভালো, উইকিপিডিয়ায় গেলে দেখবেন হেনরিয়েটার বদলে লেখা আছে আঁরিয়েতা। কিন্তু গোলাম মুরশিদ ‘আশার ছলনে ভুলি’ বইটিতে যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন হেনরিয়েটা আদৌ ফরাসী ছিলেন না। আমিও গোলাম মুরশিদকে অনুকরণ করে হেনরিয়েটাই লিখলাম।

মাইকেল মধুসূদনের প্রথম স্ত্রী ছিলেন রেবেকা ম্যাকটিভিস, আর দ্বিতীয়া স্ত্রী হেনরিয়েটা। অন্তঃসত্ত্বা রেবেকা স্বাস্থ্য ফেরানোর অভিপ্রায়ে যখন দূরদেশে তখনই মধুসূদনের সঙ্গে হেনরিয়েটার প্রণয়ের সূত্রপাত। রেবেকার জন্য তো ট্রাজেডি বটেই, হয়ত হেনরিয়েটার ট্রাজেডিরও এখান থেকেই শুরু। গোলাম মুরশিদ জানিয়েছেন অনাথ রেবেকার শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি, কিন্তু হেনরিয়েটা শিক্ষিতা ছিলেন। হয়ত সে কারণেই মাইকেল ক্রমে ক্রমেই রেবেকার থেকে দূরে সরে গেছিলেন। চার সন্তান সহ অসহায়া রেবেকাকে ছেড়ে হেনরিয়েটার সঙ্গে ঘর বেঁধে মাইকেল যা অন্যায় করেছিলেন তার তুলনা মেলা ভার। মাইকেল মধুসূদনের আরেক জীবনীকার যোগীন্দ্রনাথ বসু জানিয়েছেন রেবেকার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিল। স্বামীর খামখেয়ালিপনা নিয়ে কথা শোনাতেন, শেষে মধুসূদনের বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পড়ে যাওয়ার পর তিনি নিজেই সংসারে থাকতে অস্বীকার করেন। হেনরিয়েটা কিন্তু মাইকেলের সব সিদ্ধান্তই মুখ বুজে মেনে নিতেন। শুধু তাই নয়, মাইকেলের সাহিত্যসঙ্গিনী হওয়ার লক্ষ্যে হেনরিয়েটা বাংলাও শিখতে শুরু করেছিলেন। হেনরিয়েটা না থাকলে মধুসূদন নির্বিঘ্নে সাহিত্যসৃষ্টি  আদৌ করতে পারতেন কিনা সে নিয়েও বহু গবেষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

রেবেকা এবং হেনরিয়েটা দু’জনের সঙ্গেই মধুসূদনের আলাপ মাদ্রাজে, সেই মাদ্রাজ থেকেই হেনরিয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে মধুসূদন কলকাতায় আসেন ১৮৫৫ সালে। রেবেকা অতি কষ্টে চার সন্তানকে বড় করেছিলেন কিন্তু আর বিয়ে করেননি।  ১৮৯২ সালে রেবেকা মারা যান টিবি রোগে, তাঁর নামের পেছনে তখনো লাগানো ছিল ‘ডাট’ পদবীটি। অথচ তারও উনিশ বছর আগেই মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে মারা গেছেন হেনরিয়েটা এবং মধুসূদন, কপর্দকশূন্য অবস্থায়। মধুসূদনের অমিতব্যয়িতাকে হেনরিয়েটা কোনোদিনই শুধরোতে পারেন নি, উপরন্তু কবির খামখেয়ালিপনা এবং কদাচিৎ দুর্ব্যবহারে বিদ্যাসাগরের মতন শুভানুধ্যায়ীরাও সরে গেছিলেন। হেনরিয়েটার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের একটি প্রীতিমধুর সম্পর্ক ছিল, খানিকটা হেনরিয়েটার কারণেই বিদ্যাসাগর বহুদিন ধরে মাইকেলকে আর্থিক সাহায্য করে গেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, হেনরিয়েটা যখনই সংসারকে সামান্যটুকুও স্থিতি দিতে চেয়েছেন, মধুসূদন নিজেই একটা দুর্দম ঝড়ের মতন এসে সেই স্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়ে  গেছেন।

নেলী সেনগুপ্ত

ns

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাউনিং কলেজে বি-এ ডিগ্রী নিতে এসেছিলেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। আর সেখানেই আলাপ এডিথ এলেন গ্রে-র সঙ্গে। অবশ্য এডিথের সঙ্গে আলাপ হওয়ার সময় যতীন্দ্রনাথ আইনের ডিগ্রীও নিয়ে নিয়েছেন। এডিথকে আইনের পাঠ না দিলেও সন্দেহ নেই যতীন্দ্রমোহনের স্মার্ট পারসোনা টি এডিথের মনে বিশেষ ছাপ ফেলেছিল। বিয়েতে কোনো পক্ষেরই মত থাকার কথা নয়, তাই বিয়ে মুলতুবি রেখে যতীন্দ্রনাথ ফিরে আসছিলেন দেশে। পরে মত বদলে এডেন থেকে ফিরে যান কেম্ব্রিজে, এবং এডিথকে বিয়ে করেই কলকাতায় ফেরেন। যতীন্দ্রমোহন মধুসূদনের মতন খামখেয়ালি ছিলেন না কিন্তু রাজনীতি এবং দেশোদ্ধারের টানে হাইকোর্টের তুমুল পসার ছেড়ে দেন। সেই সময় হেনরিয়েটার মতনই নেলীকেও দাঁতে দাঁত চেপে সংসার চালাতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক কারণে যতীন্দ্রমোহন কলকাতা ছেড়ে চলে যান চট্টগ্রামে, এবং সেখানে বহুবার কারাবরণ করেন। যতীন্দ্রমোহনের সঙ্গে নেলীকেও তখন বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল জেলে। আর এই সময় থেকেই নেলীরও একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সত্ত্বা বিকশিত হতে থাকে। তারই ফল, ১৯৩৩ সালে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হওয়া। নেলির আগে মাত্র দু’জন মহিলাই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের পদ পেয়েছিলেন, অ্যানি বেসান্ত এবং সরোজিনী নাইডু।

ছেচল্লিশের সেই ভয়াবহ দিনগুলির সময় নেলী দাঙ্গা থামাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। হয়ত সেই কারণেই এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে তাঁর একটা আত্মিক সম্পর্ক থাকার কারণে নেহরু দেশভাগের পরে নেলীকে চট্টগ্রামেই থাকতে অনুরোধ করেন। নোয়াখালির দাঙ্গার পর সংখ্যালঘুদের ভরসা দেওয়ার জন্য নেলী সেনগুপ্তর মতন কোনো ব্যক্তিত্বকেই দরকার ছিল। প্রায় আমৃত্যু ছিলেন সেখানে, জীবনের শেষ বছরটায় কলকাতার ফিরে আসেন চিকিৎসার কারণে।

লীলা রায়

lila-ray

‘মেমবউ’ এর ক্যারলের উচ্চারণ শুনে আমার সবার আগে লীলা রায়ের কথাই মনে পড়ল। না লীলা রায় ওরকম অবাস্তব অ্যাক্সেন্ট নিয়ে কথা বলতেন না, বরং সাধারণ কথোপকথনের সময়েও সাধু ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তবে ওনার কথা বলার ভঙ্গীটি নিয়ে সেই বিখ্যাত গল্পটি মনে পড়ে গেল (যেটি আমি সম্ভবত পড়েছিলাম কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘মজলিশ’ বইটিতে)। মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেছেন অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে, বাইরের বাগানে দেখেন লীলা রায় কাজ করছেন। লীলা জানালেন অন্নদাশঙ্কর দেখা করতে পারবেন না। কেন? ‘উনি সৃষ্টির কাজে ব্যাপৃত আছেন।’ মুজতবা একটু মনঃক্ষুণ্ণ সম্ভবত, মনে মনে বললেন, ‘তাহলে আপনি এখানে কি করছেন?’।

লীলা রায়কে নিয়ে একটি চমৎকার লেখা পাওয়া যায় অন্তর্জালে, যেটি লিখেছেন স্বয়ং আনন্দরূপ রায়, অন্নদাশঙ্কর এবং লীলার পুত্র। উৎসাহীরা এখানে দেখতে পারেন। টেক্সাসের মেয়ে অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্নডর্ফের নাম লীলা রেখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর নিজেই। নামকরণ প্রসঙ্গে ‘মনস্বী অন্নদাশঙ্কর’ বইয়ে ‘জীবন কথা’ প্রবন্ধে সুরজিৎ দাশগুপ্ত  লিখেছেন, ”লীলা হল সৃষ্টি আর সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার প্রকাশ। আর এই স্রষ্টাই হলেন পরমসত্তা। এখন থেকে ঘরনির মধ্যে অন্নদাশঙ্কর দেখলেন অন্যতম সৃষ্টির লীলা।’ এই সময় অন্নদাশঙ্কর ‘লীলাময় রায়’ ছদ্মনামেও লেখালেখি করেছেন। দেশে পুরোপুরি থিতু হয়ে যাওয়ার পর পশ্চিমী আদবকায়দাগুলো ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য লীলা রায়ের শরণাপন্ন হতেন অন্নদাশঙ্কর, অথচ এই লীলাই বাড়িতে দিব্যি শাড়ি আর কার্ডিগান পরে ঘুরে বেড়াতেন।

লীলা কলকাতায় এসেছিলেন ১৯৩০ সালে, তারপর প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাহিত্যচর্চার নিরলস সাধনা করে গেছেন। ক্ষিতিমোহন সেনের বাংলার বাউল নিয়ে বইয়েরও যেমন অনুবাদ করেছেন, তেমনই অনুবাদ করেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘ফটিকচাঁদ’। কবিতাও যেমন লিখেছেন, লিখেছেন ‘ইংরেজি সহজ পাঠ’। লীলা রায়ের কাজের ব্যাপ্তিকে আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি, তাঁর লেখালেখি এবং অনুবাদ নিয়ে খুব একটা ওয়াকিফ-হাল ও নই। হয়ত ভবিষ্যৎ-এও অন্নদাশঙ্করের সহধর্মিণী হিসাবেই পরিচিতি থেকে যাবে লীলার।

মিলাডা গঙ্গোপাধ্যায়

mg

লীলা রায়ের ন’বছর পর চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ভারতে এসে পৌঁছন মিলাডা। অবনীন্দ্রনাথের নাতবৌ তিনি, শিশুসাহিত্যিক এবং সংখ্যাতত্ত্ববিদ মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী। উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডনে গেছিলেন দু’জনেই, সেখানেই মোহনলালের সঙ্গে মিলাডার আলাপ। মিলাডারও কাজের পরিসরটি অত্যন্ত বিস্তৃত। মৌচাক এর মতন ছোটদের পত্রিকায়  গল্পও লিখেছেন, আবার নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে বিস্তর ডকুমেন্টেশনও করে গেছেন (পিলগ্রিমেজ টু দ্য নাগাজ বোধহয় ওনার সবথেকে বিখ্যাত বই)। নাগাল্যান্ডে গিয়ে কিছু চমৎকার ফটোও তুলেছিলেন মিলাডা, তার কিছু দেখা যাবে এখানে। সাহিত্য এবং সমাজ চর্চার পাশাপাশি সংসারটিও দিব্যি চালিয়ে গেছেন মিলাডা, ঠিক লীলা রায়ের ধাঁচেই। বন্ধু এবং শ্রদ্ধাস্পদ ইন্দিরা চক্রবর্তীর কাছে শুনেছি মিলাডা তাঁর মেয়ে ঊর্মিলাকে পৌঁছতে এবং নিয়ে আসতে প্রায়ই উপস্থিত হতেন ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে।

লীলা রায় শোনা যায় তাঁর সন্তানদের দশ বছর হওয়ার আগে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শিখতে দেন নি। ঊর্মিলা কিন্তু জানিয়েছেন মা’র দৌলতে তিনি এবং তাঁর সহোদর মিতেন্দ্র চেক এবং বাংলা দুটো ভাষাই শিখেছিলেন। মিলাডা এবং মোহনলালের জন্যই অবশ্য গড়পড়তা বাঙালিরও চেক্ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। মিলাডার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল। প্রতিষ্ঠাতা সতীকান্ত গুহর অনুরোধে মিলাডা সাউথ পয়েন্ট  স্কুলের নার্সারি বিভাগে শিক্ষকতার ভার নেন। যে সময় শিশুদের ডায়েট নিয়ে সচেতনতা ছিল না বললেই চলে, মিলাডা তখন স্বেচ্ছায় কচিকাঁচাদের জন্য ডায়েট প্ল্যানও বানিয়ে গেছেন। এ দেশে আসার এক বছরের মধ্যেই দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেট-এ মিলাডা এই নিয়ে একটি প্রবন্ধও লেখেন, ‘দ্য অ্যাকটিভ চাইল্ড – দ্য হেলদি চাইল্ড’।

তিন বছর আগে চলে গেছে মিলাডার জন্মশতবর্ষ,  আনন্দবাজারের কলকাতা কড়চায় দু’টি পরিচ্ছেদ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেলাম না ইন্টারনেটে।

এলেন রায়

er

এলেন গটসচাকের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের আলাপ জার্মানিতে। এলেনের জন্ম অবশ্য প্যারিসে, এবং জন্মেছিলেন এক ইহুদী পরিবারে। কুমারী জয়াবর্ধনে তাঁর ‘দ্য হোয়াইট ওম্যান’স আদার বার্ডন’ বইয়ে জানিয়েছেন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মতনই এলেন-এরও ঝোঁক ছিল র‍্যাডিকাল পলিটিক্সের দিকে, এবং এই ঝোঁক সেই কুড়ি একুশ বয়স থেকেই। ২০১৬ তে যখন দেশ জুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে, তখন এলেনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি  আমাদের আরোই ভাবিয়ে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সারা ইউরোপের দুর্দশার এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে এলেন দায়ী করেছিলেন ‘the absurdity of hostile patriotisms’ কে। এ বৈষম্য ঘোচানোর জন্য এলেন বিশ্বাস করতেন বিপ্লব ছাড়া পথ নেই। মনে রাখা ভালো যে এলেনের সঙ্গে আলাপের কিছুদিন আগেই জার্মান ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছে মানবেন্দ্রনাথের লেখা বই, ‘রেভলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন চায়না’।

১৯৩০-এ মানবেন্দ্রনাথ দেশে ফিরে আসেন, ৩১ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে বারো বছরের কারাদন্ড হয় মানবেন্দ্রনাথের। পরে মেয়াদ কমে সাজা দাঁড়ায় ছ’বছরের, মানবেন্দ্রনাথ ছাড়া পান ১৯৩৬-এ। সাজা কমে যাওয়ার পেছনেও এলেনের কিছু অবদান থাকতে পারে,  এলেনের অনুরোধেই একাধিক ভারতীয় এবং ইউরোপীয়ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চিঠি লিখে মানবেন্দ্রনাথের কারাদন্ড কমানোর অনুরোধ জানান।  এলেন মুম্বই এসে পৌঁছন ১৯৩৭-এ, সেই বছরের বিয়ে করে দু’জনে দেরাদুনে চলে যান। আর এই সময় থেকেই দু’জনেই কমিউনিজম থেকে সরে আসতে থাকেন, প্রচার করতে শুরু করেন ‘র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম’ বা ‘নব মানবতাবাদ’ নামক এক নতুন রাজনৈতিক মতবাদের। মানবেন্দ্রনাথ জেল থেকে বার্লিনে এলেনকে অনেক কটি চিঠি লিখেছিলেন, এলেনের প্রায় একার উদ্যোগেই ১৯৪৩-এ সেই সব চিঠি একত্রিত হয়ে প্রকাশিত হয় ‘লেটারস ফ্রম জেল’ নামে। কয়েক বছর পর থেকেই বেরোতে শুরু করে সেই বিখ্যাত পত্রিকা ‘র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট’, ৫৪ সালে মানবেন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পর প্রায় ছ’বছর ধরে এলেন ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদক।

বিপ্লবী তরুণী এলেনের মানবিক দিকগুলো নিয়ে মানবেন্দ্রনাথের শিষ্য এবং জীবনীকার শিবনারায়ণ রায় অনেক কিছু বলেছেন। তাঁকে একটু উদ্ধৃত করি এখানে, ”মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনো অমিলই যে কখনো বিরোধের আকার নেয় নি তার একটা কারণ তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার সুগভীর শ্রদ্ধা, এবং অন্য কারণ মানবেন্দ্রপত্নী এলেনের সতর্ক স্নেহ’। মানবেন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পরেও এলেনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল মানবেন্দ্রনাথের প্রায় সব রাজনৈতিক সতীর্থ এবং শিষ্যদের। হয়ত লীলা রায় বা মিলাডা গঙ্গোপাধ্যায়ের মতনই এলেন-ও পণ করেছিলেন সারা জীবন ধরে নিজেকে অফুরন্ত কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত রাখার, সে সুযোগ অবশ্য তিনি পাননি। ১৯৬০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর দেরাদুনেই রহস্যজনক ভাবে খুন হন এলেন, আততায়ী ছিল তাঁর এবং মানবেন্দ্রনাথের পূর্বপরিচিত। রাজনৈতিক হত্যাকান্ড না নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে এখনো।

 

একটি তিতকুটে লেখা

৬ই জুলাই প্রকাশিত হয়েছে খাদ্যসংস্কৃতি বিষয়ক সঙ্কলন ‘নুনেতে ভাতেতে’। বইটির প্রকাশক ‘The Cafe Table’, সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের অনার্য তাপস এবং পশ্চিমবঙ্গের রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল। অনার্য তাপসের অনুরোধে আমিও একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলাম সঙ্কলনটির জন্য, সেটিই আজকে তুলে দিলাম ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ ব্লগে।

পাকপ্রণালীর বই দু’ বাংলাতেই প্রচুর আছে কিন্তু বাংলা কি বিশ্বের খাবারদাবার নিয়ে মজলিশি বা বিশ্লেষণধর্মী লেখা চট করে পাওয়া যায় না। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত কি প্রতাপকুমার রায়ের মতন ব্যতিক্রমী লেখকদের সংখ্যা এতই কম যে তাঁদের অনবদ্য প্রবন্ধগুলি  অধিকংশ সচেতন বাঙালি পাঠকেরও চোখ এড়িয়ে গেছে।  আবার সময় সময় শুধুমাত্র হেঁসেলের চৌহদ্দি পেরোতে না পারায় চেখে উঠতে পারিনি কল্যাণী দত্তের ‘থোড় বড়ি খাড়া’ বা সামরান হুদার ‘পুবালি পিঞ্জিরা’ ও ‘অতঃপর অন্তঃপুরে’-র মতন বইগুলি, যেখানে মর্মস্পর্শী স্মৃতিকথনে উঠে এসেছে রান্না বা খাবারদাবারের প্রসঙ্গ। ‘নুনেতে ভাতেতে’র লেখাগুলি রাধাপ্রসাদ কি কল্যাণী কি সামরানের লেখার সমগোত্রীয় এ কথা বলছি না কিন্তু এনারা যে লেগ্যাসি রেখে গেছেন সেটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সাধু ও গুরুত্বপূর্ণ  পদক্ষেপ। আমার ধারণা সমমনস্ক বন্ধুদের এই প্রচেষ্টাটি ভালো লাগবে, নজর কেড়ে নেবে বিষয়বৈচিত্র্যও।

বইটি পড়তে চাইলে প্রকাশকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন ফেসবুকের মাধ্যমে – https://www.facebook.com/nunetebhatete/?fref=ts

Nunete Bhatete

সেই বাঙালি সন্ন্যাসী

DS1

বিক্রমশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বাঙালি সন্ন্যাসী চলেছেন তিব্বতের পথে, তিব্বতের রাজার বিশেষ অনুরোধে বৌদ্ধ ভিক্ষু জয়শীল এসেছেন তাঁকে নিয়ে যেতে। সঙ্গে আছেন আরেক ছাত্র ও সন্ন্যাসী বীরভদ্র। জয়শীলের আশা নেপালে কিছুদিন থাকতে হলেও তাঁদের গুরুকে নিয়ে বছরখানেকের মধ্যে তিব্বতে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু বিধি বাম, একের পর এক অতিলৌকিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁদের। বাঙালি সন্ন্যাসীটিও জেদ ধরে আছেন, সমস্ত অতিলৌকিক রহস্যকেই যুক্তিজালে খন্ডিত না করা অবধি তাঁর শান্তি নেই।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান কে নিয়ে সে সব গল্প তো ইতিহাসে পাওয়া যাবে না, তাই কলম ধরতে হল। সিরিজের প্রথম গল্প ‘ডাকিনী ও সিদ্ধপুরুষ” পড়া যাবে টগবগ পত্রিকার ‘সরল দে সংখ্যা’য়, প্রকাশিত হতে চলেছে এই জুন মাসেই। বন্ধুরা নজর রাখুন টগবগের ফেসবুক পেজটিতে –https://www.facebook.com/groups/652430701572990/

সঙ্গের অনবদ্য ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী শ্রী সুমিত রায়।

উগ্র জাতীয়তাবাদ, সমস্যা যখন গোটা পৃথিবীর

২৫শে মে’র আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর-সম্পাদকীয়তে আমার লেখা   এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে (http://www.anandabazar.com/editorial/violent-nationalism-is-winning-everywhere-1.394601)।

Trump-Putin-1-1024x675

ভারতে মোদী, ইজরায়েলে নেতানইয়াহু, তুরস্কে এরদোয়ান, পোল্যান্ডে দুদা, রাশিয়ায় পুতিন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবী জুড়ে এতজন কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি রূপে তখতে বসে থাকতে বোধহয় আমরা আগে দেখিনি। অবশ্য পরিস্থিতির চাপে যেখানে আঙ সান সু চি রোহিঙ্গাদের বার্মিজ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন বা এঞ্জেলা মার্কেল জার্মানি তথা ইউরোপীয়ন ইউনিয়নকে সিরিয়ান শরণার্থীদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তুরস্ককে কোটি কোটি ইউরো দান করছেন সেখানে মেনে নেওয়া ভালো যে আলো ক্রমে নিভিছে। আগামী নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদটি গ্রহণ করলেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়। এই জাতীয়তাবাদ দেশবাসী নয় দেশকে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়,  এবং দেশ নামক সেই বিমূর্ত ধারণাটিকে দেশবাসীর মাথায় গেঁথে দেওয়ার জন্য  এমন দিনের গল্প শোনায় যেখানে ইতিহাস, পুরাণ আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ যে নেহাত কথার কথা নয় সেটা দেশে বসে অধিকাংশ মানুষই বিলক্ষণ টের পান কিন্তু সে সমস্যা যে শুধু ভারতের নয় সেটা বোঝার সময় এসেছে।

আন্দ্রেই দুদার কথাই ধরুন। ভদ্রলোকের দয়ার শরীর, কোটি কোটি সিরিয়ান এবং আফ্রিকান শরণার্থীদের মধ্যে জনা দেড়শকে ঠাঁই দিয়েছেন পোল্যান্ডের মাটিতে; যারা ঢুকেছেন তাঁরাও অবশ্য প্রায়ই মারধোর খাচ্ছেন। কিন্তু দুদা শুধু শ্বেতাঙ্গ পোলিশদের ত্রাতা হিসাবেই দেখা দেননি, ইতিহাসকেও দস্তুরমতন নিজের পথে চালাতে চাইছেন। পোলিশ রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন পোল্যান্ডের ইতিহাসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল হাজার বছর আগের এক পোলিশ রাজার ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া। ভেবে দেখুন একবার, এই সেই দেশ যেখানে নাজি অত্যাচারের দগদগে স্মৃতি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, এই সেই দেশ যেখানে স্টালিন এবং তাঁর অনুগামী পোলিশ কম্যুনিস্টরা চল্লিশ বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে জেলে পুরে রেখেছেন, এই সেই দেশ যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ইহুদীরা বহু বছর ধরে নির্যাতিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু না, এত ঘটনাবহুল আধুনিক ইতিহাসের কোনোকিছুই পোলিশ রাষ্ট্রপতির কাছে গুরুত্ব পায় নি (কিছু ঘটনা স্রেফ অস্বীকারও করেছেন), গুরুত্ব পেয়েছে শুধুই ধর্ম।

অতি জাতীয়তাবাদের একটি প্যাটার্ন বুনে দেওয়ার জন্য বহু মানুষ সমস্যাটিকে ধর্মের ক্যালাইডোস্কোপে দেখতে চান। বর্তমান পৃথিবী অবশ্য সঘোষে জানাচ্ছে অতি জাতীয়তাবাদ কোনো বিশেষ ধর্মের কুক্ষিগত অধিকার নয়। তাকানো যাক ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মুসলিমপ্রধান তুরস্কের দিকে।  ধর্মনিরপেক্ষতা এবং উদারপন্থার নিরিখে মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের সমস্ত  দেশগুলির মধ্যে তুরস্ক ছিল সর্বতোভাবে অগ্রগামী।  অটোমান সাম্রাজ্যের শেষের সময়ে আর্মেনিয়ান গণহত্যার বিভীষিকাময় দিনগুলির থেকে দেশটিকে উদারপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়াটা মোটেই সহজ কাজ ছিল না কিন্তু কেমাল আতাতুর্ক সেটাই করে দেখিয়েছিলেন।  আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একশ বছর হতে চলল, খাতায় কলমে তিনি এখনো এ দেশের জনক অথচ তাঁর ধ্যানধারণার গুরুত্ব যেন ক্রমেই কমে আসছে। শেষ কয়েক বছর ধরে এ দেশের তাবড় নেতারা ঘটা করে পালন করছেন কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনবার্ষিকী। তাঁদের বিশ্বাস গত শতাব্দীতে ঘটা তুরস্কের মুক্তিযুদ্ধ নয়,  ১৪৫৩তে বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনই নাকি উন্মেষ ঘটিয়েছে তুর্কী জাতীয়তাবাদের। মনে রাখা ভালো যে আদি অটোমানরা এসেছিলেন তুর্কমেনিস্তান থেকে, ইস্তানবুল থেকে যার দূরত্ব প্রায় হাজার দুয়েক মাইল। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও তুরস্কের মতন আধুনিক একটি দেশে ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে, বিস্ময়াতীত ট্র্যাজেডি ছাড়া কি বলবেন বলুন? তবে সবসময় যে এত স্থূলপদ্ধতিতেই জাতীয়তাবাদ চাগিয়ে তোলা হয় সে কথা ভাবলে ভুল হবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯১৫-র আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে তুরস্কের কোনো সরকারই গণহত্যা বলে স্বীকার করেনি, অথচ বর্তমান সরকারের কর্ণধাররা প্রায় আচম্বিতেই বলতে শুরু করেছেন যে তাঁরা সেই সুদূর অতীতের কথা ভেবে ব্যথিত। তাহলে কি আলো দেখা গেল? না। কারণ যে আর্মেনিয়ানরা খুন হয়েছিলেন তাঁদেরকে এখন বলা হচ্ছে অটোমান আর্মেনিয়ান, অথচ অটোমান রাজপরিষদরাই যেনতেন প্রকারেণ চেয়েছিলেন আর্মেনিয়ানদের  এ দেশ থেকে দূর করতে। সে কথা ভোলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এক বৃহৎ জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে, যেন তুরস্ক রাষ্ট্রে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার চিরকাল অক্ষয় স্থান ছিল এবং পনের লাখ মানুষের মৃত্যু স্রেফ কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির  সংঘাতের ফল।

কেউ নরম গলায় মিষ্টি হেসে উগ্র জাতীয়তাবাদকেই ভবিতব্য বলে চালানোর চেষ্টা করছেন কেউ আবার পেশী ফুলিয়ে গরম বুলি আউড়ে প্রমাণ করতে চাইছেন জোর যার মুলুক তার। আজ আট মাসের বেশী সময় ধরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস করার  কাজে সহায়তা করছে অথচ কতজন শরণার্থীকে পুতিন আশ্রয় দিয়েছেন নিজের দেশে? গত বছর চারশ বিরাশি জন সিরিয়ানকে রাশিয়া অস্থায়ী শরণার্থী হিসাবে দেশে ঢুকতে দিয়েছে, আর স্থায়ী শরণার্থী এক জন মানুষও হতে পারেননি। অথচ সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা অনুযায়ী রাশিয়ার প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ পুতিনের  আগ্রাসনকে সমর্থন করছেন। ২০১৪তেও প্রায় ঊননব্বই শতাংশ রাশিয়ান জানিয়েছিলেন ইউক্রেনের উচিত ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার হাতেই তুলে দেওয়া। পেরেস্ত্রৈকা এবং গ্লাসনস্ত উত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়ায় মধ্য এশিয়া এবং বাল্টিক সাগরের পাশের সোভিয়েত কলোনিরা যতই খুশী হোক না কেন, খোদ রাশিয়ার জাত্যভিমানে যে বড়সড় একটা আঘাত পৌঁছেছিল সেটা বলা বাহুল্য। শুরুর দিকের চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অপ্রতুলতায় মানুষ  এসব নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামাননি কিন্তু আস্তে আস্তে যেই দেশের অর্থনীতিতে স্থিতি আসতে শুরু করেছে, পশ্চিমী দুনিয়া ‘ইমার্জিং ইকোনমি’ তকমা লাগিয়েছে রাশিয়ার মানুষও হৃতগরিমা কি ভাবে ফিরে পাওয়া যায় সে নিয়ে অল্পবিস্তর ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন। দুঃখের ব্যাপার এই যে এমন এক মানুষের হাতে ততদিনে ক্ষমতা পৌঁছেছে যিনি হৃতগরিমা শুধুই খুঁজে পেয়েছেন উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তারের মধ্যে। ওদিকে রাশিয়ার অর্থনীতি শেষ দু’তিন বছর ধরেই মুহ্যমান হয়ে আছে। পুতিন যতই তেলের দাম পড়ে যাওয়াকেই দায়ী করুন  না কেন এটা ঘটনা যে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা এই সবকিছু মিলে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন ভেতরফোঁপরা। কিন্তু সে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় বা ইচ্ছা পুতিনের আছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু শুধু পোল্যান্ড, রাশিয়া বা তুরস্ক নয় গোটা ইউরোপ জুড়েই অতি রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের সমর্থন পাচ্ছে – ফ্রান্স, হল্যান্ড কি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে গড়ে মোট ভোটের দশ থেকে কুড়ি শতাংশ এখন এদের দখলে। সিরিয়া এবং আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা অবশ্যই ইউরোপের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, এঞ্জেলা মার্কেলের মতন তুলনামূলক ভাবে উদারপন্থী নেতাদের ওপরে আর ভরসা রাখতে পারছেন না তাঁরা। কিন্তু শুধু সেই কারণেই কি উগ্র জাতীয়তাবাদের এত বাড়বাড়ন্ত? মনে হয় না।  বিশ্বায়িত পৃথিবীতেও নিরানব্বই আর এক শতাংশের ফারাক বেড়ে চলতে দেখলে কোন মানুষের আর বিশ্বনাগরিক হিসাবে পরিচয় দিতে ভালো লাগে? একজন তুর্কী দেখছেন বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া কি মাল্টার মতন দেশও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের সদস্যপদ পাচ্ছে স্রেফ ধর্ম ও বর্ণ পরিচয়ে, একজন পোলিশ দেখছেন একমাত্র ইউরোপীয় দেশ হিসাবে মন্দার বাজারে সাফল্যের মুখ দেখলেও লভ্যাংশের সিংহভাগটা সেই চলে যাচ্ছে ইউরোপীয় সুপারপাওয়ারদের কাছেই, একজন সার্বিয়াান দেখছেন শুধু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় থাকার জন্য যোগ্যতা সত্ত্বেও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢুকতে পারছেন না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হোক বা আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, রাষ্ট্রপুঞ্জ হোক  বা ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষের কাছে এই সংস্থাগুলি যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল তার অধিকাংশই পূর্ণ হয় নি। একথা অনস্বীকার্য যে বিশ্বায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত সমাজ পেয়েছে অনেক কিছুই কিন্তু সেই এক কুমীরছানাকে বার বার দেখিয়ে উন্নত দেশগুলি তার ফায়দা তুলেছে হাজার গুণ। স্বভাবতই যে মানুষগুলির ভাগ্যে কিছুই জোটেনি (এবং তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ) তাঁরা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন, আর জাতীয়তাবাদের শুরুর কথাও সেখানেই লুকিয়ে। ভুললে চলবে না এমনকি উন্নত দেশগুলিতেও আর্থিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার যে খনিশ্রমিকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাবেন বলে পণ করেছেন তাঁদেরকেও কিন্তু ধোঁকার টাটি কম দেখানো হয়নি। মানুষের চরিত্রগত লোভ ও খলতা, হাজার হাজার বছরের সামাজিক ইতিহাস, গণতন্ত্রের সার্বিক বিকাশ না ঘটা এসবের কোনোকিছুকেই অস্বীকার করছি না কিন্তু আশাভঙ্গের আখ্যানটিরও একইরকম গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

 

রাজনৈতিক লক্ষ্য, অর্থনৈতিক বাস্তব – প্রসঙ্গ যখন নির্বাচন

West Bengal Politics

বাহাত্তর সালে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম থেকে বেরিয়ে এসে এম-জি- রামচন্দ্রন প্রতিষ্ঠা করেন নতুন দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম। তার ঠিক এক বছর আগে তামিলনাড়ুর পঞ্চম বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪ টি আসনের মধ্যে করুণানিধির দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম পেয়েছিল ২০৫ টি আসন, নিকটম প্রতিদ্বন্দ্বী কামরাজের জাতীয় কংগ্রেস (অর্গানাইজেশন) পেয়েছিল একুশটি আসন। আরো চার বছর আগে প্রথমবারের জন্য তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসকে হটিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে এই ডি-এম-কে। রামচন্দ্রনের এ-আই-এ-ডি-এম-কে ও প্রতিষ্ঠিতে হওয়ার পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচন (১৯৭৭) লড়েই ক্ষমতায় চলে আসে।

পাশের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে অবশ্য কংগ্রেস সত্তরের দশকেও পূর্ণ ক্ষমতা উপভোগ করে গেছে। কম্যুনিস্টদের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সে রাজ্যে সিপিএম এবং সিপিআই মিলে খান কুড়ির বেশী আসন কোনোদিনই পায় নি। ১৯৮৩তে প্রথমবারের জন্য রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে যখন এন-টি রামারাও এর তেলেগু দেশম ২৯৪ টি আসনে মধ্যে ২০১ খানি জিতে ক্ষমতায় আসে। তেলেগু দেশমের প্রতিষ্ঠা ১৯৮২ সালে।

হালের আম আদমি পার্টিও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরেই ক্ষমতায় আসে ২০১৩ তে, শেষ হয় দিল্লী বিধানসভা থেকে কংগ্রেসের পনেরো বছরের দীর্ঘ শাসন।

এই দলগুলির পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসকে রাখুন। বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্য কিন্তু তৃণমূল শুরুতেই পায়নি, অপেক্ষা করতে হয়েছে তেরোটি বছর। কেন? জ্যোতি বসুর ক্যারিশমা কি কংগ্রেসের সাবোটাজ জাতীয় থিয়োরীগুলোকে উপেক্ষা করলে দু’টি আপাতসম্ভব ব্যাখ্যা্র ওপর আমরা জোর দিতে পারি – ১) রাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টের কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন, ২) তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক লক্ষ্যটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্ফুট হয়নি। পুরো আশির দশকের স্থবির অর্থনৈতিক চিত্রটি উনিশশ নব্বইয়ের শেষে বা দু’হাজারের শুরুতেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চোখে ধরা পড়েনি একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই প্রায় সমস্ত পরিসংখ্যানের মাপকাঠিতেই কলকাতা প্রথম সারির মহানগরীর মধ্যে জায়গা হারাতে শুরু করে, বেঙ্গালুরু বা হায়দ্রাবাদের উত্থানও সচেতন মানুষদের নজর এড়ায়নি বলেই আমার ধারণা। কলকাতাই পশ্চিমবঙ্গ নয় কিন্তু এ কথা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অনস্বীকার্য যে গরীব রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা – স্বাস্থ্য – শিল্প জনিত সাফল্য প্রথম থেকেই কলকাতা নির্ভর, বিধান রায়ের আমল থেকে শুরু করে জ্যোতি বসুর আমল পর্যন্ত। জ্যোতিবাবুরা যে সাফল্যের সঙ্গে গ্রামবাংলায় ভূমিসংস্কার করতে পেরেছিলেন তার ছিটেফোঁটাও গ্রামের স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় দেখাতে পারেননি। এহেন পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল যে ফায়দা তুলতে পারত তৃণমূল তা পারেনি। বলা বাহুল্য যে বহু বছর ধরেই মানুষ সিপিএম বিরোধিতার বাইরে তৃণমূলের রাজনৈতিক লক্ষ্য কিছু দেখতে পাননি।

দ্বিতীয়বারের জন্য বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরের দিন এ কথাগুলো কেন তুলছি সে নিয়ে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। একটাই কারণ, দু’হাজারের তৃণমূলের মতনই দু’হাজার ষোলর কংগ্রেস বা বামফ্রন্টেরও কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য আমরা দেখতে পাই নি, যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় আসা অবশ্যই কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে না এবং বাংলার মানুষ সেটা যে বিলক্ষণ জানেন সেটাও টের পাওয়া গেছে। অথচ দু’হাজার ষোল সালের অর্থনৈতিক বাস্তবটিকে মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়াটাই হতে পারত বিরোধীদের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য, এবং আমার বিশ্বাস সেটি সঠিকভাবে করতে পারলে এরকম ভাবে ধুয়েমুয়ে যেতে হত না। অর্থনৈতিক বাস্তবটি কি সেটি এবার একটু দেখে নেওয়া যাক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রাজ্যওয়াড়ি বাজেট নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে শেষ পাঁচ বছরের (২০১০ – ২০১৪) মতন ২০১৫ তেও ঋণ এবং রাজ্যের উৎপাদন সম্পদের (গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) আনুপাতিক হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ special category (অর্থাৎ উত্তর পূর্বাঞ্চল, কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখন্ড) রাজ্যগুলিকে বাদ দিয়ে সারা দেশের মধ্যে সবথেকে খারাপ অবস্থায় আছে। শুধু এটুকু তথ্যে অবশ্য পুরো চিত্রটি ফুটে উঠবে না – ২০১০ সালে যেখানে প্রতি এক টাকা সমতুল্য পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করতে গিয়ে আমরা চুয়াল্লিশ পয়সা ধার করেছি, সেটা ২০১৫ সালে নেমে এসেছে সাড়ে পঁয়ত্রিশ পয়সায়। রঘুরাম রাজন এবং তাঁর সহকর্মীদের ধারণা ২০১৬ তে সেটা আরো নেমে তেত্রিশ পয়সা হবে। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে বাম আমলের তুলনায় তৃণমূল সরকার ধার এবং আয়ের অনুপাত ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে পেরেছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার যে বেশ বড় একটা ঋণের অঙ্ক খাতায় রেখে বিদায় নিয়েছিলেন সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তৃণমূলের নেতারা কারণে অকারণে সেটা মনে করিয়ে দেন বলে বিরক্তি আসতে পারে কিন্তু এটা ঘটনা যে ২০১১ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় পশ্চিমবঙ্গের ধারের পরিমাণ ছিল এক লাখ চুরানব্বই হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর পরে সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে দু লাখ চুরাশি হাজার কোটিতে। কিন্তু রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে এই সংখ্যাগুলো?

একের পরে ছ সাতটা শূন্য বসলেই যেখানে আমরা সংখ্যাগুলি ধারণা করতে হিমশিম খাই সেখানে দু-তিন লাখ কোটি শব্দবন্ধ প্রায় পরাবাস্তব ঠেকতে পারে। কিন্তু আপনার আমার সংসারের জন্য যেটা সত্যি সেটা একটা রাজ্য বা দেশের ক্ষেত্রে নাও সত্যি হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন ধারের পরিমাণ বেড়ে গেলেই যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কমবে এরকম কোনো কথা নেই। ভারতবর্ষের নিজেরই ঋণ এবং জাতীয় আয়ের অনুপাত ৬৫% (অর্থাৎ ১ টাকার পণ্য উৎপাদন করতে ৬৫ পয়সা ধার করতে হচ্ছে) কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের (৭.৩%) হিসাবে চীন ছাড়া অন্য কোনো উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ ভারতকে ছুঁতে পারেনি। ঋণ এবং আয়ের অনুপাতের দিক থেকে এরকম কোনো ম্যাজিক নাম্বার নেই বলেই অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন যা ছুঁয়ে গেলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। আই-এম-এফ এর ভূতপূর্ব রিসার্চ ডিরেক্টর কেনেথ রোগফের মতন হাতে গোনা যাঁরা বিপরীত মত পোষণ করেন তাঁরাও বলছেন অনুপাতটি উন্নত দেশের ক্ষেত্রে নব্বই এবং উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে সত্তর ছুঁইছুঁই হলে তবেই একটা আশঙ্কা থেকে যায়। অবশ্য একটি দেশের ঋণের সিংহভাগটাই আসে বিদেশী সংস্থার থেকে যেটা পশ্চিমবঙ্গের মতন রাজ্যের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিদেশী সংস্থা ঋণ দেওয়ার অর্থ দেশের অর্থনীতি নিয়ে তারা আশাবাদী এবং তাই ডলার, পাউন্ড বা ইয়েন আসতে সমস্যা হচ্ছে না। অবশ্য সব সময় যে কোনো এক সংস্থাই টাকা দেবে এরকম কোনো কথা নেই, অন্য দেশ বা অনাবাসী ভারতীয়রাও টাকা ধার দিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের ঋণের খাতে কিন্তু চোখ বোলালে দেখা যাচ্ছে ওই দু লাখ চুরাশি হাজার কোটি টাকা ঋণের একাশি শতাংশ-ই এসেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ন্যাবার্ড, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতন সংস্থার থেকে। এর সঙ্গে যদি কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ধারের পরিমাণটাও জোড়েন তাহলে দেখা যাবে অনুপাতটি ছিয়াশি শতাংশ ছুঁই ছুঁই অর্থাৎ ধারের অধিকাংশটাই অভ্যন্তরীণ। কিন্তু এ ঘটনা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই সত্যি। ঋণের উৎসগুলি জানার পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়েও পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হিসাবে কিরকম করছে? রাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তালিকা জানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সমস্ত রাজ্যগুলির মধ্যে বারো নম্বরে, বৃদ্ধির হার ৭.১৫%। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, পাঞ্জাবের মতন বেশ কিছু তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে পিছিয়েই আছে।

কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আর উন্নয়ন সমার্থক নয়, আর তাই জন্যই শুধু ৭.১৫% সংখ্যাটি ধরে বসে থাকলে চলবে না। দেখা যাক উন্নয়নের খাতে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ কতটা বেশী বা কম খরচ করছে। ২০১৪ সালে রাজ্যগুলির সর্বমোট খরচের শতাংশের হিসাবে শিক্ষা এবং সংস্কৃতি খাতে পশ্চিমবঙ্গের স্থান মহারাষ্ট্র ও বিহারের পরেই। স্বাস্থ্যের খাতেও দেখা যাচ্ছে প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দুটি চিত্রই আশাব্যঞ্জক যদিও সংস্কৃতির খাতে কিছুটা কমিয়ে শিক্ষার খাতে খরচটা আরো বাড়ালে রাজ্যের মানুষ হয়ত অখুশি হবেন না। কিন্তু যে মুহূর্তে রাস্তা, সেতু বা বিদ্যুৎ সংক্রান্ত পরিকাঠামোর খরচের দিকে নজর পড়বে, বোঝা যাবে এই ভালো লাগাটা নেহাতই তাৎক্ষণিক। বিবেকানন্দ উড়ালপুল বা উল্টোডাঙ্গা উড়ালপুলের মতন দুর্ঘটনার পেছনে যে বেশ একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে সেটা ঠাহর হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট টি দেখলে। প্রধান সতেরোটি রাজ্যের মধ্যে রাস্তা বা সেতু খাতে সবথেকে কম খরচ করেছে পাঞ্জাব, আর তার পরেই রয়েছে আমাদের রাজ্য। রাস্তা, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর প্রারম্ভিক খরচটিই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতন, আর তারপর তো ‘কস্ট ওভাররান’ অর্থাৎ সময়ের মধ্যে শেষ করতে না পারার গুনাগার আছেই। তাই এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত পরিকাঠামোগুলি গড়ে তোলার জন্য দরকার বড় বিনিয়োগের। আর ঠিক সেই জায়গাটিতেই রাজ্য সরকার ব্যর্থ।

কিন্তু কেন?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য নিয়ে কিছু মৌলিক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন খাতে রাজ্য সরকার যা টাকা রাখতে পারত তার অনেকটাই চলে যাচ্ছে ওই অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ মেটাতে। একথাটা আমাদের কাছে নতুন নয়, তৃণমূলের নেতারা বেশ কয়েক বছর ধরেই এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অবস্থাটা যে কত খারাপ সেটা তথ্যগুলো না দেখলে বোঝা যায় না। গত আর্থিক বছরে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ের থেকে শুধুমাত্র সুদের খরচ মেটাতেই গেছে ২০ টাকারও বেশী। তার আগের দুই বছরে ওই সংখ্যাটি ছিল তেইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলির গড় সুদের খরচ সেখানে মাত্রই ১০ টাকা। অর্থ দফতরের কর্তারা যা বলছেন তাতে মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো চিত্র দেখা যাবে। ব্যয় যেখানে বেড়েই চলেছে সেখানে অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য আয় বাড়াটাও জরুরী, কিন্তু সেখানেই বা আশার আলো কোথায় দেখা যাচ্ছে? এ বছরের ফেব্রুয়ারীতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তৃণমূলের ঘরের লোক সুগত মারজিত ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’ তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জানিয়েছেন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের দুরবস্থা চোখে পড়ার মতন। যদিও সুগতবাবুর প্রবন্ধটি ২০১১-১২ আর্থিক বছরের তথ্যের ভিত্তিতে লেখা, কিন্তু শেষ তিন বছরে এমন কিছু গঠনমূলক পরিবর্তন এ রাজ্যে দেখা যায়নি যাতে সে প্রবন্ধের মূল সিদ্ধান্তগুলিকে উড়িয়ে দেওয়া যায়। সুগতবাবু এবং তাঁর সহ-লেখকদের বক্তব্য অনুযায়ী শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে পিছিয়ে থাকার জন্য শুল্ক আদায়ের জায়গাটিই সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে সঞ্চয় করার প্রবণতাও অনেকটাই বেশী, ভোগ্যবস্তু তাঁরা কম কিনছেন বলে সেখানেও শুল্কের মাধ্যমে রাজস্ব বিশেষ আদায় করা যাচ্ছে না। কেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ খরচ কম করছেন সেটা এ প্রবন্ধ থেকে বোঝা না গেলেও ‘ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে’ তে চোখ বোলালে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শহর এবং গ্রামে ভোগ্যবস্তুর পেছনে খরচের ব্যবধান একশ শতাংশেরও বেশী। পশ্চিমবঙ্গ ধনী রাজ্য নয়, এমনকি মাঝারি আয়ের বাকি রাজ্যগুলির তুলনাতেও বহু বছর ধরে আমরা ভালো ফল দেখাতে পারিনি কিন্তু তার পরেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই তীব্রতা আমাদেরকে স্তম্ভিত করে তোলে। আর এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্যই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে চিট ফান্ডগুলির শিকার হচ্ছেন। চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবেতেই শহরের তুলনায় গ্রামবাংলায় এতটাই দৈন্য যে মানুষগুলি প্রাণপাত করে সঞ্চয় করে চলেছেন একটা মিরাকলের আশায়। আর ওই যে ৭.১৫% হারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কথা বলছিলাম সেটিও কিন্তু এই বৈষম্যের কথা বলে না। সংখ্যাটা একটা ওপর ওপর আশ্বাস দেয় বটে কিন্তু ওই পর্যন্তই।

ঋণের বোঝা আবশ্যিক ভাবে খারাপ নয় কিন্তু ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের ঘরে কিছুই জমা না পড়লে ঘোর দুর্দিন আসতে বাধ্য। পূর্ব এশিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার অর্থনৈতিক ইতিহাস দেখায় এই একই পরিস্থিতিতে একটি দেশ বা রাজ্যের আর্থসামাজিক স্থিতিটুকু নষ্ট হয়ে যায়, দেখা দেয় তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতা। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি দেখলে আশাবাদী হওয়ার বিশেষ কিছু থাকে না, তৃণমূলের আমলে যৎসামান্য উন্নতিটুকুও নেহাত জলের উপর নাকটুকু ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। বিদেশী বা দেশী বিনিয়োগ আনতে পারলে একটা কাজের কাজ হয় বটে কিন্তু সেক্ষেত্রে বর্তমান এবং ভূতপূর্ব সরকারদ্বয়ের ব্যর্থতার ইতিহাস কোনো বাঙ্গালীরই অজানা নয়। তাহলে করণীয় কি? ঋণ মকুব অবশ্যই একটি আপৎকালীন উপায়। মুখ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সহ তৃণমূলের সমস্ত নেতারা বারম্বার কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ঋণ মকুবের জন্য, একে শুধু হতাশার প্রতিফলন হিসাবে দেখলে ভুল হবে। ওই যে শুরুতেই জানিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গের ঋণের প্রায় ছিয়াশি শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণ, তাই কেন্দ্রের পক্ষে ঋণ মকুব করা সত্যিই সম্ভব। ভুললে চলবে না যে শেষ তিন বছরে প্রায় সওয়া এক লাখ কোটির মতন কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে এই ভারতবর্ষেই। এই একটা জায়গায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের এককাট্টা হওয়া উচিত। জাতীয় গড়ের থেকে দশ শতাংশেরও বেশী হারে যেখানে আমরা সুদ মেটাচ্ছি সেখানে অবান্তর রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা উচিত নয়। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন এ নিয়ে মতবিরোধের আদৌ সুযোগ আছে কি? কিন্তু ঋণ মকুব নেহাতই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রারম্ভিক স্ট্র্যাটেজি মাত্র, ঘুরে দাঁড়ানোটা বাস্তবায়িত করতে গেলে দরকার আশু অর্থনৈতিক সংস্কারের। সেই সংস্কার কিভাবে আসতে পারে সে নিয়ে বিশেষ আলোকপাত বিদায়ী সরকার করতে পারেননি। আগামী সরকারও তো সেই proverbial নতুন বোতলে পুরনো মদ, সুতরাং সেই এক লোকেরাই আচম্বিতে দিশা দেখাবেন এটা আমি অন্তত ভাবতে পারছি না।

কিন্তু মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। অর্থনৈতিক বাস্তবকে সবার সামনে আনতে গেলে বামফ্রন্টকে তাঁদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতেই হবে। ২০১৬-র নির্বাচনী প্রচার থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সেরকম কোনো ইচ্ছাই তাঁদের ছিল না, হয়ত ভবিষ্যৎ-এও হবে না। জোটসঙ্গী হিসাবে কংগ্রেসকেও বাধ্য হয়ে একই রাস্তা নিতে হয়েছে। বাকি থাকে বিজেপি, তাঁরা নরেন্দ্র মোদীকে জগৎভূষণ, বিপত্তারণ রূপে দেখাতেই এমন ব্যস্ত যে পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগই পান নি।

পরের পাঁচ বছরে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস কি বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজী কি হবে তা আমি জানি না। এও জানি না যে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ কি লং টার্ম প্ল্যানিং এর কথা ভাববেন। শুধু এইটুকু বলতে পারি যে এটাই যদি পশ্চিমবঙ্গের ‘স্টেডি স্টেট ইকুইলিব্রিয়াম’ হয়ে থাকে তাহলে নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির উঠে আসার জমি কিন্তু প্রস্তুত। রামচন্দ্রন, রামারাও বা কেজরিওয়ালের মতন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উঠে আসবেন কিনা, উঠে এলেও কর্পোরেট অর্থশক্তি ছাড়া দাঁড়াতে পারবেন কিনা, অর্থের সুরাহা হলেও মমতার মতন টেনাসিটি দেখাতে পারবেন কিনা সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনই মিলবে না কিন্তু আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির ভারতীয় ইতিহাসটিকে দেখলে এহেন ভবিষ্যৎকে আষাঢ়ে গল্প বলে হয়ত উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

ফিদেল, বারাক এবং বর্ণবাদের উত্তরাধিকার

Fidel-Castro-vs-Barack-Obama

অশোক মিত্র সম্পাদিত ‘আরেক রকম’ পত্রিকায় সম্প্রতি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার ঐতিহাসিক হাভানা সফর উপলক্ষ্যে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, আরো আলোচনার অবকাশ রাখে, সেই ভেবেই ব্লগে তুলে দিলাম লেখাটি। সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের মতামত এবং আলোচনা পেলে বড়ই ভালো লাগবে। ধন্যবাদ প্রাপ্য বন্ধু এবং আনন্দবাজার পত্রিকার  সাংবাদিক অমিতাভ গুপ্তকে, ওর উৎসাহ ছাড়া লেখাটি হয়ত আদৌ লিখে উঠতে পারতাম না । আরেক বন্ধু, অর্থনীতিবিদ শুভনীল চৌধুরীকেও ধন্যবাদ লেখাটি সযত্নে স্ক্যান করে পাঠানোর জন্য।

(ফিদেল কাস্ত্রো এবং বারাক ওবামার স্থিরচিত্র উৎস – Google images)

1

2

3

ইস্তাহারের প্রহসন, প্রহসনের ইস্তাহার

Cong-left_2767317f

‘The writing on the wall’

বাক্যবন্ধটি নেহাতই বাগধারা তবে দেওয়াল লিখন দেখে কখনো সখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা আঁচ পাওয়া যায় বটে। ‘বন্দে ইনকিলাব’ হলেও একটা কথা ছিল, ‘মাতরম জিন্দাবাদ’ বললেও একটা ছাড় দেওয়া যেতে পারত কিন্তু ‘ইনক্লাব মাতারম’ (বিপ্লবী মা? মা-কে নিয়ে বিপ্লব? কেই বা জানে!) দেখলে মনে হয় যে অশিক্ষার রাজনীতি বহু বছর ধরে বাংলাকে ভেতরফোঁপরা করে ছেড়ে দিয়েছে তার থেকে আরো বহু যুগ আমাদের মুক্তি নেই, সামনের দিনগুলোয় রাজনৈতিক পরিবর্তন হোক কি না হোক। তবে সে আঁধারের গভীরতাকে ঠাহর করতে গেলে দেওয়াল লিখন ছেড়ে ছাপার অক্ষরে একবার চোখ বোলানো দরকার।

ভোট‘যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহার খুঁটিয়ে দেখছিলাম। বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে দলগুলির বিশেষ তাপউত্তাপ ছিল এমন অপবাদ কেউ দেবেন না, তবে এই ইস্তেহারগুলির ছত্রে ছত্রে যে পরিমাণ আলস্য, প্রতারণা এবং অবান্তর বাক্যালাপ ঝরে পড়ছে তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে নেতারা ধরেই নিয়েছেন ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপ’ থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তাই নেই। “কর্মসংস্থানের মূল লক্ষ্যে ছোট এবং মাঝারি শিল্পের ওপর গুরুত্ব বজায় থাকবে। বৃহৎ শিল্প গড়ারও চেষ্টা করা হবে”। এমনভাবেই শুরু হচ্ছে সিপি(আই)এম এর নির্বাচনী ইস্তাহারের শিল্পসংস্থান অনুচ্ছেদটি। টোনটা লক্ষ্য করুন, ‘বৃহৎ শিল্প গড়ারও চেষ্টা করা হবে’! একে নিছক সান্ত্বনাপ্রদান বলবেন নাকি সর্বহারার বাস্তববোধ? ষোল পাতার ইস্তাহারের প্রায় প্রতিটি লাইনের শেষে অবধারিত ভাবে থাকছে দুটি শব্দ – ‘হবে’ অথবা ‘হবে না’। কি ভাবে হবে, কেনই বা হবে না, কে হওয়াবে সেসব নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেন নি এনারা। বাংলার অর্থনীতিবিদরা ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’তে লিখে লিখে হদ্দ হয়ে গেলেন যে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ প্রভূত পিছিয়ে, বাম আমলের তুলনায় তৃণমূলের আমলে আদায় সামান্য বেড়েছে বলে জলের উপরে নাকটুকু কোনোমতে ভাসিয়ে রেখেছি মাত্র। সেই রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি নিয়ে কি ভাবছেন লেফট ফ্রন্ট? কোনো উত্তর নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর দিক থেকে সতেরোটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে আমরা আছি ষোল নম্বরে। অসীম দাশগুপ্ত, নিরুপম সেনের উত্তরাধিকারীরা এ তথ্য আদৌ জানেন কিনা বোঝা গেল না কারণ বিদ্যুৎ পরিকাঠামো কি ভাবে গড়ে উঠবে সে নিয়ে এক সেকন্ডও বাজে খরচ করেন নি তাঁরা, সোজা লিখে দিয়েছেন ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগে গ্রহণ করা হবে’। মুদ্রণপ্রমাদ টা নজর করবেন, ‘উদ্যোগ’ নয় ‘উদ্যোগে’! খসড়াটা তৈরী হওয়ার পর কেউ যে একবার পড়েও দেখেন নি সেটা বেশ বোঝা গেল।

শিক্ষা প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘শিক্ষায় বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং সাম্প্রদায়িককরণ বন্ধ করা হবে’। ভালো কথা কিন্তু মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকের ৩০০০ এর বেশী কলেজের সঙ্গে আমরা চারশ একুশটি সরকারী কলেজ নিয়ে (২০১৪-র হিসাব অনুযায়ী) কি ভাবে পাল্লা দেব সে নিয়ে কোনো হদিশ নেই।অন্য রাজ্যের অধিকাংশ কলেজেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিন্তু নেই মামার থেকে কানা মামা যে কতটা বেশী গ্রহণযোগ্য সে নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার থাকে না। বেসরকারী কলেজ না থাকার কস্ট-বেনিফিট নিয়ে আলোচনাটুকু তো অন্তত শুনতে চাইবেন আপনি, তাই না? কাকস্য পরিবেদনা! নন্দীগ্রাম এবং সিঙ্গুরের ভূত যে আরো বহুদিন বামেদের তাড়া করে বেড়াবে তা ইস্তাহারে একবার চোখ বোঝালেই টের পাওয়া যায়, ‘শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। এহেন বালখিল্য কথার বাইরে প্রাপ্তি শূন্য। সরকারের ভূমিকাটা ঠিক কি হবে? মধ্যস্থতাকারীর নাকি ক্রেতার? LARR (Right to fair compensation and transparency in land acquisition, rehabilitation and resettlement act) নামক জাতীয় জমি অধিগ্রহণ নীতির সঙ্গে কতটা সাযুজ্য বা সামঞ্জস্য থাকবে রাজ্য সরকারের নীতির? শুধুমাত্র বেসরকারী প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের নীতিই বা কি হওয়া উচিত? কোনো প্রশ্নেরই উত্তর তো পাবেনই না উল্টে মনে হওয়া বাধ্য যে অর্থনৈতিক ভাবে আগের ভুলত্রুটি থেকে কোনো শিক্ষাই এরা নেন নি।

বামেদের মতন চরম ঔদাসীন্য কিন্তু ঘাসফুলের মালীরা দেখাননি। যেটুকু ক্রেডিট তাঁদের প্রাপ্য তা অবশ্যই দিতে হবে। সিপি(আই)এম এর ষোল পাতার জায়গায় তৃণমূলের একশ বিয়াল্লিশ পাতার ইস্তাহার – সেখানে যথেষ্ট তথ্য আছে, ‘কমপেয়ার অ্যান্ড কনট্রাস্ট’ আছে, কি কি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। স্পষ্টতই তৃণমূলের ইস্তাহারটি যারা বানিয়েছেন তাঁরা বামেদের তুলনায় অনেক বেশী খেটেছেন। সমস্যা হল সেসব তথ্য বহুলাংশে অসম্পূর্ণ। তৃণমূলের ইস্তাহারের প্রতিটি চিত্রলেখে দু’টি করে স্তম্ভ – ২০১১’র শেষে মা কি ছিলেন আর ২০১৫’র শেষে মা কি হয়েছে। অথচ তুলনাটা হওয়া উচিত ২০১১’র শেষে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় আমরা কোথায় ছিলাম আর ২০১৫’র শেষে তাদের তুলনাতেই আমরা কোথায় আছি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক – তৃণমূলের ইস্তাহারের একচল্লিশ নম্বর পাতায় দেখানো হচ্ছে ২০১১-তে যেখানে রাজ্যের উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে gross enrolment ratio ছিল ১২.৬% সেটাই ২০১৫-র শেষে বেড়ে হয়েছে ১৭.৫%। তাহলে ব্রাউনি পয়েন্টস দিই? সেখানেই যে গন্ডগোল। ২০১১তে ৩৫টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে gross enrolment ratio-র হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল সাতাশ, আর ২০১৫ র শেষে সেটা দাঁড়িয়েছে ছাব্বিশ। সুতরাং পাঁচ বছরে বাকি ভারতের তুলনায় আমাদের উন্নতি বলতে গেলে ইতরবিশেষ, সংখ্যাতত্ত্বের পরিভাষায় যাকে হাইপথেসিস টেস্টিং বলে তার নিরিখে হয়ত আদৌ কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি। আরো একটা তথ্য দেওয়া যাক যেটা তৃণমূলের ইস্তাহারে পাবেন না – প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ২০১১ সালে আমাদের ছিল ৮ টি কলেজ, ২০১৫ তে হয়েছে ৯টি; পাঁচ বছর আগেও আমাদের র‍্যাঙ্ক ছিল ৩২/৩৫, এখন ৩৩/৩৬।

আবার ধরুন বত্রিশের পাতায় দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে যেখানে বামফ্রন্ট সরকার মাত্র ১০৪০ কোটি টাকা খরচ করেছিলেন স্বাস্থ্য পরিষেবায়, তৃণমূলের আমলে চার বছরে সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১৫৯ কোটি টাকা। খুশী হবেন কি? প্লীজ না। যে মাপকাঠিতে দেখা উচিত সেটা হল রাজ্যের মোট বাজেটের কত শতাংশ আমরা স্বাস্থ্যের জন্য খরচ করছি? ২০১১-র শেষে সংখ্যাটা ছিল ৭.১৪%, ২০১৫তে সেটা দাঁড়িয়েছে ৫.২%। পাঁচ বছর আগে আমরা শতাংশের এই হিসাবে সারা ভারতের মধ্যে ছিলাম পাঁচ নম্বরে, এখন পিছিয়ে হয়েছি সাত (নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানাকে না ধরেই)। প্রধান বিরোধী দল হিসাবে হয়ত ভাববেন বামফ্রন্ট এইখানে জোর চেপে ধরবে শাসক দলকে। সে গুড়ে বালি, ষোল পাতায় কোনোরকমে দায় মেটাতে হলে যা হয় তাই হয়েছে। কিছু অতীব সুপারফিসিয়াল কথা ছাড়া বামেদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ইস্তাহারে ভাবিয়ে তোলার মতন একটা কথা পাবেন না – ‘নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রয় বন্ধ করতে হবে’, ‘সরকারি চিকিৎসকদের হয়রানি বন্ধ করা হবে’, ‘ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি…সেই একঘেয়ে ‘হবে’, ‘হবে’, ‘হবে’ অর্থাৎ কিচ্ছুটি হবে না।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছিলাম ছাত্রনির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জনৈক জাঠ ছাত্র ঘোষণা করেছিল তাকে নির্বাচিত করলেই প্রত্যেকটি হোস্টেল নিজস্ব সুইমিং পুল পাবে। বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহার দেখে ছোকরাটির কথা মনে পড়ে গেল। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেখানে পশ্চিমবঙ্গের তিন লাখ কোটি টাকা ঋণের একটা নয়াও মকুব করছে না সেখানে রাজ্য নেতৃত্ব দাবী করছেন সমস্ত সরকারী হাসপাতালে অন্ততপক্ষে কুড়ি শতাংশ বেড বাড়ানো হবে, সঙ্গে থাকবে অত্যাধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী। কে দেবে এই টাকা? গৌতম আদানি? তা না হলে মুশকিল আছে কারণ রাজস্ব আদায় কিভাবে বাড়বে সেই প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, “we propose better tax compliance”। ব্রিলিয়ান্ট! স্বপ্নে পোলাও খেলে বেশী ঘি দিয়ে খাওয়াটাই দস্তুর, সুতরাং আরো জানিয়েছেন দু’বছরের মধ্যে রাজ্য কর্মচারীদের কেন্দ্রের সমতুল্য মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে, মাইনে এবং পেনশন বাড়ানো হবে, রাজ্য জুড়ে তৈরী হবে নতুন নতুন রাস্তা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র, পঞ্চাশ শতাংশ বেশী পুলিশ থানা বসবে, রাজ্য জুড়ে কোল্ডস্টোরেজের ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ করে ফেলা হবে, প্রত্যেক কন্যাসন্তানের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড ডেপোজিট রাখা হবে, প্রাইমারি স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে বই – পোষাক এবং জুতো দেওয়া হবে, ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষায় আশি শতাংশ মার্কস পেলেই পাওয়া যাবে বিনামূল্যের ল্যাপটপ…আরো কত কি! স্বয়ং মধুসূদন দাদাও দু’বার ভাবতেন এহেন প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়ার আগে। এর সঙ্গে সঙ্গে আরো জানানো হচ্ছে যে বিদ্যুৎশুল্ক কমানো হবে, সার্বিক ভাবেই শুল্ক মাসুলের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ আয় কি ভাবে হবে তা নিয়ে সম্যক কোনো ধারণাই নেই, এদিকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে রীতিমতন পঞ্চবর্ষীয় পরিকল্পনা। এই ইস্তাহার নিয়ে বিজেপির অন্তত তিন লাখ কোটি দেনার ব্যাপারে মুখ খোলা উচিত নয় কারণ জাদুবলে যদি এই সব কিছু বাস্তবায়িত হয়ও রাজ্যের ঋণ অনায়াসে আরো তিন লাখ কোটি ছুঁয়ে যেতে পারে।

ইস্তাহারেই যেখানে এত অবহেলা, আসল সময়ে আরো কত দুর্দশা অপেক্ষা করছে কে জানে। দোষ তো আমাদেরও, সারদা – নারদ – নন্দীগ্রাম – কানহাইয়া কুমার – মুনমুন সেন – চাষার ব্যাটা এবং আরো হাজারখানা ফাঁড়া কাটিয়ে আজও জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারছি না আলোচনাটা কবে হবে?

(স্থিরচিত্র – অশোক চক্রবর্তী, ‘The Hindu’)